• রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৮:৩১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
৭০০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো শাহজালাল মাজারের ওরস হচ্ছে না দ্রুত বর্ধনশীল উন্নতজাতের ‘সুবর্ণ রুই’ মাছের জাত উদ্ভাবন প্রেম করে বিয়ের পর স্ত্রী-শ্যালিকাকে ভারতে পাচার, ময়মনসিংহে গ্রেফতার ২ শেখ হাসিনা পরিবেশবান্ধব উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছেন : এনামুল হক শামীম ময়মনসিংহ নগরীর মশক নিধনে খাল-ড্রেনে মশাভুক মাছ অবমুক্ত শেরপুরে ভাইকে বেঁধে রেখে বিধবা তরুণীকে গণধর্ষণ ॥ গ্রেফতার ২ ঝিনাইগাতীতে মাদকের ১০ মামলার আসামিসহ গ্রেফতার ৪ বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে অপুর্ব’র অনন্য রেকর্ড ভালো জাতের আম কীভাবে চিনবেন ৩ আসনের উপনির্বাচনে নৌকার মাঝি মিন্টু-হাবিব-হাসেম

রফিক মজিদ’র গদ্য ‘অভিমানি কন্যা

শ্যামলবাংলা ডেস্ক
/ ১০৭ বার পঠিত
প্রকাশকাল : শনিবার, ৫ জুন, ২০২১

দরিদ্র ঘরের সামছুন্নাহার রেখা এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতি উপজেলার গান্ধিগাঁও গ্রামে। ভাঙ্গাচোড়া ছনের মাটির ঘরে তার বড় ভাই ও মাকে নিয়ে সংসার। বড় ভাই গাজিপুর একটি গার্মেন্টসে চাকুরি করে নিজের পেট চালায়। আর মা বাড়ির সামনে উঠানে কিছু সবজি চাষ ও হাস-মুড়গি পালন করে মেয়েকে নিয়ে কোন রকমে দিন যাপন করে। রেখার অভাবি সংসার বলে সে শেরপুর শহরে ছাত্রী মেসে থেকে প্রাইভেট পড়িয়ে তার লেখাপড়ার খরচ চালায়। কারণ, রেখা যখন ক্লাস সেভেনে পড়ে তখন তার বাবা ওসমান আলী সৌদি আরব গিয়ে কিছুদিন যোগাযোগ রাখলেও বছর খানিক পর নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। অর্থাৎ তাদের সাথে কোন রকম যোগাযোগ রাখেনি ওসমান আলী। একই গ্রামের বদরুল আলম রেখার বাবার সাথে সৌদি যায়। রেখা ও তার ভাইবোন বদরুলের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানায়, ‘কিছুদিন আগে তিনি এই কোম্পানী থেকে অন্য কোম্পানীতে বেশি বেতনে চলে যাওয়া পর থেকে তার সাথে আর কোন যোগাযোগ রাখেনি। হয়তো সেখানে ভালো অবস্থায় আছে এবং বিয়ে থা করে নতুন সংসার গড়েছে।’ এসব কথা শুনে রেখা ও তার মা-ভাই কষ্ট ভরা বুকে ওসমান আলী তথা রেখার বাবাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে।
দীর্ঘদিন বাবার সাথে যোগাযোগ না থাকায় রেখা তার বাবার স্মৃতিকে অনেকটাই মুছে ফেলে। এখন তার সেই ছোট বেলার মতো অন্যের বাবাকে মেয়েকে কোলে নিয়ে আদর করা, মেয়ের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, মেয়ের নানা বায়না মেটাতে বাবাদের অস্থিরতার দৃশ্য রেখার মনে একটুও দাগ কাটে না। কারণ, রেখা তার বাবার সাথে যোগাযোগ নেই প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। বেঁচে আছে না মরে গেছে সেটাও জানে না। আবার ভাবে বদরুল চাচার কথাও ঠিক হতে পারে, হয়তো সেখানে আরো একটি বিয়ে করে বাংলাদেশে তাদের কথা ভুলে গেছে। রেখা ক্লাস সেভেন থেকে এসএসসি, এইচএসসি এবং সর্ব শেষ অনার্স ফাইনাল ইয়াওে পড়ছে রেখা। সময় গড়িয়েছে অনেক। বাবার শুন্যতা আস্তে আস্তে রেখার মনেও বাবা শুন্য হয়ে পড়ে। কৈশোর থেকে যৌবন পেরুচ্ছে বাবার আদর-ভালোবাসা ছাড়াই।
ক’দিন পরেই ঈদ। রেখার কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। তাই শহর থেকে বাড়ি ফিরবে দু’একদিনের মধ্যে। মেসে বসে সর্বশেষ প্রাইভেট পড়ানো টাকা হিসেব করছে রেখা। মেস ভাড়া, বই-খাতা কেনা ও খাওয়া-দাওয়ার খরচ বাদে হাতে আছে মাত্র ৩ হাজার টাকা। ক’দিন আগে বান্ধবীদের সাথে মার্কেটে গিয়ে একটি দোকানের শো-রুমে সাজানো একটি জামার প্রতি নজর কাড়ে রেখার। কিন্তু সাধ থাকলেও সাধ্য নেই তার। ওই জামার দাম চেয়েছিলো ৩ হাজার টাকা। কিন্তু ঈদে শুধু নিজের চিন্তা করলে হবে না, বাড়িতে মা আছে। ভাই না হয় তার রোজগার দিয়ে নিজের কোন রকমে চলে। মা’র জন্য কিছু কিনে আনলে আনতে পারে। আমার তো কিছু কেনা দরকার মা’র জন্য। এসব ভাবতে ভাবতে মার্কেটে গিয়ে রেখা তার মা’র জন্য একটি শাড়ী এবং তার নিজের জন্য কম দামের একটি জামা কিনে কিছু টাকা সঞ্চয় রেখে মেসে ফিরে আসে। পরদিন ভোরে বাড়ি চলে যাবে। ইতিমধ্যে অনেক মেয়ে মেস থেকে বাড়ি চলে গেছে। রেখা রাতে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করে আজ যদি তার বাবা থাকতো তবে কত ভালো হতো। বাবার কাছে কত কিছুই না আবদার করতার। কিন্তু নিয়তি তার সে আশার গুড়ো বালি হয়েছে। তাই চোখের কোন জমে থাকা কষ্ট চোখের জলের সাথে টপ করে পড়ে বালিশ ভিজে যায়। এমন সময় মা’র ফোন আসে। চোখের জল মুছে মা’র ফোন রিসিভ করে। মা এসময় জানায়, ‘রেখা মা হঠাৎ করে এতো বছর পর তোর বাবা ফোন করেছিলো। তোর নাম্বার নিয়েছে। তোর সাথে কথা বলবে।’ এ কথা শুনে রেখা আনন্দে আত্মহারা হওয়ার কথা থাকলেও উল্টো অভিমান করে কওে বসে বাবার প্রতি। ভাবে, দীর্ঘ দিন পর তার বাবা তাকে শত আদর, ভালোবাাস, আব্দার, সখ মিস করার পর এখন নিজের পায়ে দাড়ানোর সময় মেয়ের খোঁজ নিতে আসছে। রেখা মনে মনে ঠিক করে হাজার ফোন করলেও বাবার সাথে কোন কথা বলবে না। এসব নানা চিন্তা করতে করতে রাতে আর ঘুমাতে পারেনি রেখা। সকাল হয়ে যায়।
গোছগাছ করে মেস থেকে বাড়ির উদ্যেশে বের হয়। রেখা যখন শহরের গৌরিপুর তার মেস থেকে রিক্সায় খোয়ারপারের উদ্যেশে রওনা হয় ঠিক তখন একটি অচেনা নাম্বার থেকে ফোন বেঁজে উঠে। রেখা খেয়াল করে দেখে নাম্বারটি বিদেশের হবে। কারণ তার বাবা যখন তাকে ফোন করতো তখন এরকম নাম্বার থেকে ফোন করতো। তাই সে বুঝতে পেয়ে মনে মনে ঠিক করলো এতোদিন পর মেয়ের কথা মনে পড়ছে, আমার বাবা নেই, সে মরে গেছে, কোন কথা নেই তার সাথে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে ফোনটা তার বাবার কী না সিউর হই আগে এটাও ভাবে সে। তাই দ্বিতীয় বাওে ফোনে রিসিভ করে রেখা। ফোন রিসিভ করার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভরাট কণ্ঠে বলে উঠে, ‘রেখা মা কেমন আছ, আমি তোমার বাবা।’ একথা শুনেই রেখার তার বাবার উপর রাগ ও অভিমান রেড়ে যায়। তাই ফোনটা কেটে দিয়ে মনে মনে ভাবে এতাদিনে বাবাগিড়ি দেখাতে আসছে, আমি চিনি না তাকে, হাজার ফোন করলেও তার সাথে কথা বলবো না। এক পর্যায় রেখা তার ফোন সাইলেন্ট কওে ব্যাগে রেখে দেয়।
এদিকে ঘণ্টাখানিকের মধ্যে রেখা বাড়ি পৌঁছে যায়। বাড়ি পৌঁছে প্রথমে বিষয়টি তার মাকে না জানিয়ে ঘরে ঢুকে ব্যাগ রাখতে গিয়ে মনে হয়, তার বাবা আরো ফোন করেছিলো কী না দেখি! একথা ভেবেই ফোন হাতে নিয়ে দেখে ৩৫ বার মিসকল। একটু আর্শ্চয্য হয়। অভিমানের মাত্রা একটু কমে আসে। ফোন হাতে নিয়ে দেখছে আর ভাবছে, দেখি কত বার ফোন দিতে পারে। এভাবে দেখতে দেখতে যখন ৩৮ বার ফোন বেঁজে উঠে তখন রেখার মনটা হঠাৎ গলতে শুরু করে। এমন সময় রেখার মা ঘরে ঢুকে রেখা সব খুলে বলে। রেখার মা জানায়, আরে পাগলি ফোনটা ধরবি তো। তোর বাবার কোন দোষ নেই। কোন বিয়েও করেনি। ৯ বছর আগে যখন ভালো চাকুরি পেয়ে আগের কম্পানী ছেড়ে দেয় তখন ওই কোম্পানীর মালিক তোর বাবাকে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগে মামলা দিয়ে জেলে পাঠায়। এতোদিন জেলেই ছিলো। তার পরের মালিকটি খুবই ভালো ছিলো। জেলখানা থেকে তাকে সোজা তার কারখানায় নিয়ে নতুন চাকুরি দিয়েছে। এক মাস হলো তার চাকুরি। প্রথম মাসের বেতন পেয়েই ফোন করে আমাকে ১০ হাজার টাকা আর ঈদে তোর জন্য জামা-কাপড় কেনার জন্য আরো ১০ হাজার টাকা পাঠিয়েছে। জেল খানায় থাকায় কোন খোঁজ খবর নিতে পারেনি। ভাগ্য ভালো জেল থেকে বেড়িয়েই তার পরের মালিক তাকে চাকুরি দিযেছে। তা না হলে আবারও জেল খেঁটে দেশে আসতে হতো। ফোন ধর মা রাগ করিস না। এদিকে রেখার বাবা ৪০ বার ফোন দিয়ে ফেলেছে।
মার কাছে বাবার এসব কাহিনী শুনে তার সকল রাগ-অভিমান মোমের মতো গলে নরম হয়ে যায়। এবার উদগ্রিব হয়ে উঠে বাবার আরেকবার ফোন দিলেই ধরবে। কারণ, বাবা আমার সাথে কথা বলার জন্য ৪০ বার কল দিয়েছে। আমার বোঝা উচিৎ ছিলো ফোনটা অবশ্যই খুব জরুরী। বাবাও খুব কষ্ট পাচ্ছে মনে হয়। এবার ৪১ বার ফোনে রেখা ফোন ধরে কেঁদে উঠলো, ‘বাবা…, স্যারি বাবা, আমি বুঝতে পারিনাই তুমি কত কষ্টে ছিলে। আমি এভাবে তোমার সাথে কথা বলবো না। তোমাকে এক নজর দেখবো বাবা। তুমি ইমোতে কল দাও, প্লিজ বাবা…।’ এভাবে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে রেখা। দীর্ঘ ৯ বছরের জমিয়ে রাখা কান্না একসাথে বের হয়ে আসছে। একটু পর রেখার বাবার ইমুতে কল দিলে বাবাকে দেখেই মোবাইল বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো, ত‘ুমি কবে আসবা বাবা। আমাকে একটু আদর করবে না। আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি বাবা ফোন না ধওে, আমাকে মাফ করে দিয়ো। এখানে রেখা কাঁদে আর ফোনের ওপারে রেখার বাবা কাঁদে। সেইসাথে তার মাও কাঁদে। বাবা বলে ‘মাওে জেল থেকে কত চেষ্টা করছি তোদের বিষয়টা জানাতে, কিন্তু পারিনাই। এখন যেখানে আছি, খুব ভালো আছি। দেখি মলিককে বলে কোরবানীর ঈদের আগে আসার চেষ্টা করবো। নতুন চাকুর এবং আকামা পেলাম মাত্র। তাই এখন কোন অবস্থায় ছুটি দিবে না।’ এসময় বাবার এসব কথা শুনে রেখার বুকে বাবা হারার চাপা কান্না শেষ হয়ে যায়। বাবাকে পেয়ে রেখা যেনো নতুন জীবন ফিরে পায়। বাবার প্রতি রাগ-অভিমান ভেঙ্গে ভালোবাসার দুয়ার খুলে দেয় রেখা।


এই বিভাগের আরও খবর
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!