• রবিবার, ১৩ জুন ২০২১, ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
৭০০ বছরের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো শাহজালাল মাজারের ওরস হচ্ছে না দ্রুত বর্ধনশীল উন্নতজাতের ‘সুবর্ণ রুই’ মাছের জাত উদ্ভাবন প্রেম করে বিয়ের পর স্ত্রী-শ্যালিকাকে ভারতে পাচার, ময়মনসিংহে গ্রেফতার ২ শেখ হাসিনা পরিবেশবান্ধব উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছেন : এনামুল হক শামীম ময়মনসিংহ নগরীর মশক নিধনে খাল-ড্রেনে মশাভুক মাছ অবমুক্ত শেরপুরে ভাইকে বেঁধে রেখে বিধবা তরুণীকে গণধর্ষণ ॥ গ্রেফতার ২ ঝিনাইগাতীতে মাদকের ১০ মামলার আসামিসহ গ্রেফতার ৪ বাংলাদেশের নাটকের ইতিহাসে অপুর্ব’র অনন্য রেকর্ড ভালো জাতের আম কীভাবে চিনবেন ৩ আসনের উপনির্বাচনে নৌকার মাঝি মিন্টু-হাবিব-হাসেম

প্রাণি-প্রকৃতিপ্রেমী যুবক ইমরান

শ্যামলবাংলা ডেস্ক
/ ১৬২ বার পঠিত
প্রকাশকাল : বুধবার, ২৬ মে, ২০২১

পুরো নাম ইমরান এইচ মণ্ডল। লোকে ডাকেন পাখিবাজ ইমরান, কেউ বলেন পাখিপ্রাণ ইমরান। এত বেশি পাখিপ্রেমী যে, এতদাঞ্চলে পাখির কথা উঠলেই তার নামটা আপনিতেই গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। শৈশব থেকেই পাখিবান্ধব ইমরান। পাখিকে কেবল আলাদা করে যত্ন করেন এমন নয়! অন্যান্য প্রাণীদের প্রতিও তিনি সমান দরদ পুষে রাখেন। এমনকি পাড়ার লোকেরা যখন দলবেঁধে সাপ-সাপ রব তুলে মারতে উদ্যত হয়, তখনও তিনি বলে ওঠেন- দয়া করে ওদের মারবেন না! ওরা তো নিরীহ প্রাণী! কে শোনে তার কথা! আপনারা কেন বুঝতে পারছেন না! সব সাপ বিষাক্ত নয়, সবার দাঁতে বিষ থাকে না।

গাইবান্ধা জেলার একবারে দক্ষিণের সীমানা ঘেঁষা বাইগুনি গ্রামে জন্ম নেওয়া ইমরান নিজ গ্রামের বাইরেও আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামেও ছড়িয়ে দিয়েছেন পাখির আবাস। বাইগুনির পরেই ছায়াঘেরা, নদী আশ্রিত, দিগন্ত বিস্তারি রূপবান এক গ্রাম গড়ফতেপুর। গ্রামের কোমর ধরে বয়ে বয়ে দক্ষিণে চলে গেছে সড়কিদহ। দহের পাড় বেঁধে দুইতলা-তিন তলার মতো উঁচু করে। সেই উঁচুতে বানানো হয়েছে চৌচালা বারামখানা। চারপাশ থেকে গাছেদের ছায়া এসে পড়েছে বারামখানার মাথায়, পুবদিকে পা ছড়ালেই নদী, তারপর ওপারের পাথার, সোনালি সোনালি ক্ষেত লাফ দিয়ে দিয়ে চলে গেছে দূর থেকে আরও দূর। পশ্চিমে বাগান। বিরল প্রজাতির পারুল থেকে নিয়ে ছোট বড় শৌখিন বৃক্ষাদি, লতানো গুল্মরাজি, নীলকণ্ঠের পাশে দুই-একটা মাধবিলতা আর ওদের ফাঁকে ফাঁকে হরেক বাহারি ফুলগাছ। গাছে গাছে ফুটে আছে- নীল, লাল, গোলাপি, হলুদ, মেরুন, সাদা, খয়েরি, গুড়ি গুড়ি বেগুনিসহ হরেক রকমের ফুল। ফুলে প্রজাপতি পড়েছে। ওরা উড়ছে, নামছে, বসছে। পাখিদের কার্যক্রমটা উপরে গাছেদের ডালে ডালে।

জানা যায়, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ এলে ব্যস্ততার আর শেষ থাকে না। কালবৈশাখী ঝড়ে যখন পাখির বাসাগুলো তছনছ হতে থাকে, তখন ইমরানের মনও এলোমেলো হয়ে যায়, দলবল সঙ্গে করে এক আশ্রম থেকে আরেক আশ্রমে ছুটতে থাকেন তিনি। গাছে গাছে নতুন করে হাঁড়ি লাগান, ছিটকে পড়া বাচ্চাদের পরম আদরে বাসায় তুলে দেন। আহত বাচ্চাদের শুশ্রূষা করেন, সুস্থ করে তোলেন।

বর্ষাকাল শুরু হয়ে গেলে দম নেওয়ারও দম থাকে না তার। পাখিদের প্রতি ওই মায়ার পেছনে তার কোনো হাত নেই, সহজভাবেই কেঁদে ওঠে তার হৃদয়। তিনি বলেন, ‘পাখির কষ্ট আমার সহ্য হয় না, আমি ওদেরকে ভীষণ ভালোবসি’। তাছাড়া ওরা তো আমাদের প্রতিবেশী, ওদেরও তো বাঁচার অধিকার আছে, ওরা উপকার করে। এরকম নাজুক কথায় কে কান দেবে! উল্টো আড়ালে আবডালে লোকে তাকে ক্ষ্যাপা বলত! কোনো নিন্দাতেই ইমনারকে অবশ্য থামানো যায়নি, তিলে তিলে বরং পশুপাখিদের প্রতি তার মায়া আরও বেড়ে গেছে। তারপর ডালপালা ছাড়িয়ে আশপাশের গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

বারামখানাজুড়ে কিচিরমিচির শব্দ, ঝিম দুপুরে একটানা প্রকৃতির একটানা অচেনা এক গুঞ্জনে যেন মুখরিত হয়ে আছে পাখি-প্রজাপতিদের এ মচ্ছব-বারামখানা। পাখিপ্রাণ ইমরান পাখিদের খোঁজখবর করতে প্রায়শই এদিকে চলে আসেন তিনি। বারামখানায় বসে বসে দেখে নেন পাখিদের চলাচল, ভালো-মন্দ। পরিচয় হতে যা দেরি, সহজ হতে সময় লাগল না, ইমরান নিজেই ঘুরে ঘুরে গাছেদের তলে তলে নিয়ে গিয়ে পাখিদের দেখাতে লাগলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে পাখিদের সংসার দেখি, উড়াউড়ি এবং আনন্দ দেখি। ইমরান আঙুলের ইশারায় জলাভুমির ওপারের পাটের আবাদ দেখান-ওই যে দেখুন, ওখানে একটা কাশবন ছিল, বন্যার সময় টুনটুনি পাখিরা বাসা করত, আফসোস মুখে তিনি আমার চোখের দিকে তাকান-আচ্ছা বলেন তো, ওরা এখন কোথায় যাবে! আমি কিছু বলি না, তার নাছোড় চোখে চেয়ে চোখ নামিয়ে নিই, সামনে যেতে থাকি। ইমরান থামেন না- এই যে মানুষ আবাদের কথা বলে, গাছ কে আগাছা নাম দিয়ে, এভাবে ঝোপ-ঝাঁড় জঙ্গল সাফ সাফাই করছে, মানুষ গ্রাম কেটে কেটে শহর বানাচ্ছে!

ইমরান বুঁদবুঁদ করে আরও কি কি যেন বলে যেতে থাকেন, সেদিকে আমার মন থাকে না। ভাবি- মানুষ যেভাবে সুবিধাবাদী হয়ে উঠছে, তাতে একদিন হয়ত সবুজ বলে কিছুই আর থাকবে না। শহর কি এভাবেই একদিন গিলে নেবে গাঁওকে? অথচ গ্রাম একদা এক সহজ জনপদ ছিল। ধানকাটার গান, ধুয়া, মারফতি, যাত্রাপালা,পালাগান, কবিগান, পুঁথিপাঠ, কেচ্ছাকাহিনী, গীত-গজল জারি-সারি মুর্শিদীর টানে দুলে উঠত গ্রামজীবন।

গ্রাম-শহর নিয়ে কল্পনায় বেশি দূর যেতে পারি না, তার আগেই ইমরান গলা বাড়ান, চলেন ওই দিকে যাই। আমরা ফের উল্টো দিকে ফিরতে থাকি। দুপুর গড়িয়ে যায়। বারামখানার টাইলস বাঁধানো মেঝেতে কাঁত বসে থাকি, খুঁটিতে হেলান দেই। তারপর যে যার মতো আনমনা হয়ে যাই। অনেকক্ষণ কোনো কথা হয় না! এক নাগারে নিরাময়ী সবুজ দিগন্তের দিকে চেয়ে থাকি। দূরে একটা ফিঙ্গে লেজ নাঁচিয়ে ফসলের মধ্যে ডুব দেয়। ৪০ সদস্যের পরিবেশবান্ধব ওই পরিবার পাখিসেবার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কাজেও হাত লাগিয়েছে। ইমরানের কাছ থেকে শোনা ওইসব গল্পগুলো পুরোপুরি ছবি করতে পারি না।

বাতাসে দুটো শালিক ছানার একটানা চি চি মি চি আওয়াজ ভেসে আসে। হাঁড়ির মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সদ্য চোখফোটা ছানাদের মুখের দিকে অপলক চেয়ে থাকেন ইমরান। কী গভীর এক মমতায় তার চোখ দুটো চকচক করে ওঠে।


এই বিভাগের আরও খবর
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!
error: বিষয়বস্তু সুরক্ষিত !!