• মঙ্গলবার, ১৮ মে ২০২১, ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন

নালিতাবাড়ীতে সহযোগিতার অভাবে ক্রমেই কমে যাচ্ছে বক বাড়ির বক

খোরশেদ আলম, ঝিনাইগাতী
প্রকাশকাল : বৃহস্পতিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২১

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে অবহেলায়-অযত্ন আর স্থানীয়দের অসহযোগিতায় ক্রমেই কমে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘বক বাড়ি’র বক পাখি। বক পাখিদের ওই আবাসস্থল হচ্ছে উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের দিকপাড় গ্রামের ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়িতে। কিন্তু ব্রজেন্দ্র চন্দ্র মারা যাওয়ার পর থেকে স্থানীয় অধিবাসীদের অসহযোগিতা এবং এক শ্রেণির শিকারিদের লুলোভ দৃষ্টির কারণে ক্রমেই সেখান থেকে কমে যাচ্ছে বক পাখি। অন্যদিকে ওই বক বাড়ি রক্ষায় নেই স্থানীয় কর্তৃপক্ষও রয়েছে উদাসিন, নেই তাদের কোন সহযোগিতা।
জানা যায়, প্রায় ৪ দশকের উর্ধ্বকাল যাবত বাঘবেড় ইউনিয়নের দিকপাড় গ্রামের পাখিপ্রেমী ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়িতে বক পাখির অভয়ারণ্য গড়ে উঠে। তার বাড়ির চারপাশজুড়ে বিশাল বাঁশঝাড় ও নারিকেল গাছসহ বড় বড় গাছ থাকায় শতশত বকপাখি ওই বাড়িতে অবস্থান করে। প্রতিবছর চৈত্র-বৈশাখে ঝাঁকে ঝাঁকে ওই বাড়িতেই এসে বক পাখিগুলো বাসা বানায়, ডিম পাড়ে, বাচ্চা ফোটায়। তারপর আশ্বিন-কার্তিক মাসে উড়ে যায়। ওই সময়টাতে সকাল-সন্ধ্যা ওদের ডাকে মুখর থাকে গোটা বাড়ি। বকের ওই অভয়ারণ্য দেখতে প্রতিদিন এলাকার শতশত মানুষের ভিড় জমে ওই বাড়িতে।

বাড়ির কর্তা ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মন বক পাখিগুলোকে নিয়মিত পরিচর্যা করতেন। অনেক সময় বকগুলো তার ঘরে নেমে এসে আহার করতো। ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের শরীরে এসে বসতো বক পাখি। তখন থেকেই ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের বাড়িটি ‘বক বাড়ি’ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে। গত প্রায় এক বছর পূর্বে বজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের মৃত্যু হয়। তিনি মারা যাওয়ার পর থেকেই বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বক পাখিগুলো। বর্তমানে অযত্ন-অবহেলা ও পাখি শিকারিদের অত্যাচারে দিনে দিনে বকগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে।
ব্রজেন্দ্র চন্দ্র বর্মনের ছেলে সতীন্দ্র চন্দ্র বর্মন, সুকেন্দ্র চন্দ্র বর্মন ও রমেশ চন্দ্র বর্মন জানান, বর্তমানেও যে পরিমাণ বকপাখি রয়েছে, সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে এখনও অভয়ারণ্যটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তারা জানান, বকগুলো আহার করতে গেলে আশেপাশের শিকারিরা ধরে নিয়ে যায়। আবার রাতের অন্ধকারে প্রতিবেশীরা বাঁশঝাড়ে উঠে ধরে নিয়ে যায়। তাদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বকপাখিগুলোকে রক্ষা করা সম্ভব।
শেরপুর জেলা বার্ড কনজারভেশন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ফকির শহীদুজ্জামান জানান, সর্বাগ্রে বাঁশের ঝাড় রক্ষা করতে হবে। আশেপাশের লোকজনদের সচেতন করতে হবে। কারণ তারাই বকগুলোতে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। জীববৈচিত্র্য বিভাগসহ স্থানীয় প্রশাসনও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তার মতে, বক বাড়ির ঐতিহ্য রক্ষায় মালিকেরা যে ত্যাগ স্বীকার করছেন, তারা যেহেতু খুব একটা অবস্থা সম্পন্ন নয়, এজন্য তাদেরকে সরকারিভাবে বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনাও দেওয়া প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে শেরপুরের পরিবেশ অধিদপ্তরের নবাগত সহকারী পরিচালক পারভেজ আহমেদের সাথে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। তবে জেলা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আল আমিন জানান, বন্যপ্রাণী ও পাখি শিকার আইনতঃ দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই বক বাড়ির ওই বকগুলো রক্ষায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন স্থানীয় অধিবাসীদের সচেতনতা। বক নিধন বা বক শিকারের পাশাপাশি তাদের প্রজননের এই সময়ে যেন উৎপাত বা শিকারিদের দৌরাত্ম না থাকে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। আর শেরপুরের সহকারী বন সংরক্ষক ড. প্রাণতোষ চন্দ্র রায় বলেন, ঐতিহ্যবাহী বক বাড়িতে এবার বক কম আসার তথ্যটি জানা ছিল না। দ্রতই সেখানে গিয়ে বক বাড়ি রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

 


এই বিভাগের আরও খবর