• রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ০৪:৩৫ অপরাহ্ন

প্যারালাইসিসে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন শেরপুরের হাফেজ মাওলানা নুরুল ইসলাম মাহমুদী

মইনুল হোসেন প্লাবন, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশকাল : মঙ্গলবার, ৬ এপ্রিল, ২০২১

প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তি হারিয়ে প্রায় এক বছর যাবত চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছেন শেরপুরের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, ওয়াজিনে কেরাম হাফেজ মাওলানা মোঃ নুরুল ইসলাম মাহমুদী (৫৫)। এক বছর আগের হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (ব্রেইন স্ট্রোক) হলে তার শরীরের এক পাশ ডান পা, হাত ও চোখ নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সেই থেকে চিকিৎসা চালাতে গিয়ে আর্থিকভাবে পর্যুদস্ত হয়ে পড়লেও ফিরে আসেনি সুস্থতা। ফলে সহায়-সম্বল বলে থাকা নিজের এক খণ্ড ভিটেবাড়িতেই মানবেতর জীবন-যাপন কাটছে তার। সম্প্রতি সমাজসেবা বিভাগের আওতায় তার ভাগ্যে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড মিললেও কেবল তা দিয়েই চলছে না জীবন। সেবাযত্ন, চিকিৎসা আর খাওয়া-দাওয়াসহ সব ক্ষেত্রেই রয়েছে ঘাটতি। আর ওই অবস্থায় সম্পূর্ণ মানবিক কারণে ওই অসহায় আলেম ব্যক্তির সহায়তায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি বা বিত্তবানদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

জানা যায়, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার মুন্সীরহাট এলাকার মৃত আলী হোসেনের প্রথম স্ত্রীর একমাত্র সন্তান মোঃ নুরুল ইসলাম মাহমুদী। তার মা মারা যাবার পর পিতা দ্বিতীয় বিয়ে করলে এবং ওই সংসারে সন্তানাদি জন্ম নেওয়ার পর নুরুল ইসলামের প্রতি বেড়ে যায় অযত্ন-অবহেলা। এক পর্যায়ে সে এলাকার মাদ্রাসায় পড়াশোনা অবস্থায় ময়মনসিংহ জামিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে হাফেজ ও মাওলানা পাশ করে ১৯৮৪ সালে শেরপুরে আসেন। এরপর প্রথমে সদর উপজেলার চরশেরপুর ইউনিয়নের টাঙ্গারপাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এছাড়া শহরের লাহিড়ি কাচারি জামে মসজিদে ইমামতি করতে থাকেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় বিভিন্ন ইসলামী ধর্মসভায় ওয়াজে বক্তা হিসেবে অংশ নেওয়ায় এবং তার জ্ঞানগর্ভ ও সুমধুর কণ্ঠের ওয়াজ শুনে ধর্মপ্রাণ মুসল্লীরা অভিভূত হয়ে পড়লে শেরপুরে বেড়ে যায় তার পরিচিতি। ওই অবস্থায় শেরপুরের বিশিষ্ট শিল্পপতি আলহাজ্ব মোঃ ইদ্রিস মিয়ার উদ্যোগে শহরের শেখহাটি এলাকায় ইদ্রিসিয়া জামিয়া সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলে তার প্রতিষ্ঠাতা সুপারের দায়িত্ব বর্তায় তার উপর। বেশ কিছুদিন ওই দায়িত্ব পালন অবস্থায় ১৯৮৯ সালে শহরের দমদমা মহল্লাস্থ আলহাজ্ব মোঃ সুরুজ্জামান মাস্টারের মেয়ে দেলোয়ারা জাহান শিউলিকে বিয়ে করে শ্বশুরের দেওয়া এক খণ্ড জমিতে বসতি স্থাপন করে সেখানেই বসবাস করে আসছিলেন। এক পর্যায়ে ইদ্রিসিয়া মাদ্রাসাটি দাখিল লাইনে অগ্রসর হলে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে দমদমা হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও স্থানীয় বড় মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এদিকে তাদের সংসারে নুসরাত জাহান দিপ্তী নামে একমাত্র সন্তানের জন্ম হলেও ২০১০ সালের দিকে অ্যাজমাজনিত রোগে মারা যান স্ত্রী শিউলি। সেই থেকে একমাত্র সন্তানের পাশাপাশি দু’একজন শিক্ষার্থী-ছাত্র তার সেবাযত্ন করে আসছিল। ওই অবস্থায় মেয়েটি শহরের ডাঃ সেকান্দর আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর প্রায় একবছর আগে বাজিতখিলা ইউনিয়নের কুঠুরাকান্দা এলাকায় তার বিয়ে হয়। সেই থেকে স্বামী সংসারের কারণে অসুস্থ পিতার দেখাশোনা বা সেবাযত্নের সুযোগ খুব একটা হয়ে উঠে না একমাত্র সন্তানের। ফলে মফিজুল ইসলাম নামে তার এক ছাত্র পাশে থেকে সেবাযত্ন করে আসছেন। আর পাশেই বসবাসকারী ছোট ভাইরা ভাই আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মোঃ আব্বাস আলী ও শ্যালক হুমায়ুন কবীর তার খোঁজ-খবর রাখছেন। কিন্তু এতোদিনে নিজের চিকিৎসা, খাওয়া-দাওয়া চালাতে গিয়ে একেবারেই অর্থশূন্য হয়ে পড়েছেন মাওলানা নুরুল ইসলাম মাহমুদী। তার সহায়-সম্বল বলতে ৫ শতকের এক খণ্ড জায়গা ও অসম্পূর্ণ একটি হাফবিল্ডিং ছাড়া আর কোন কিছুই নেই। সম্প্রতি সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় তার ভাগ্যে একটি প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড মিললেও তাতেই সমাধান হচ্ছে না সবকিছু। এছাড়া একটা হুইল চেয়ারের অভাবে বসতঘর থেকে বাইরে আনা-নেওয়া কাজেও পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ।

এ বিষয়ে নুরল ইসলামের ভাইরা আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মোঃ আব্বাস আলী বলেন, হাফেজ মাওলানা নুরুল ইসলাম ছিলেন একজন খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ ও সুবক্তা। কেবল শেরপুর নয়, বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলেই একজন ওয়াজিনে কেরাম হিসেবে তার যথেষ্ট সুখ্যাতি রয়েছে। সেই হিসেবে তিনি অনেকেরই চেনা। কিন্তু গত বছরের ৮ মার্চ হঠাৎ করেই তিনি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর ময়মনসিংহ মেডিকেলসহ বিভিন্ন হাসপাতালে তার চিকিৎসা করালেও কোনো উন্নতি হয়নি। তার আর্থিক অবস্থাও খারাপ। পরিবারে কোনো ছেলে নেই। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হওয়ায় তাকে দেখার দায়িত্ব আমাকে নিতে হয়েছিল। ফুটফুটে মেয়েটার সংসার এখন ভাঙার পথে। কারণ মেয়েটি শ্বশুরবাড়ি চলে গেলে নুরুলকে দেখাশোনার কেউ থাকে না। এখন তার সেবাযত্নের জন্য সার্বক্ষণিক যেমন একজনকে রাখা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি তার চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহসহ দুইজনের খাবার ব্যবস্থারও প্রয়োজন। এছাড়া একটি হুইল চেয়ার না থাকায় বসতঘর থেকে বাইরে নিয়ে সাথেই অবস্থান করতে হয় আরেকজনকে। আর এজন্য প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি বা বিত্তবানদের সহায়তা ছাড়া তার বাঁচাই দূরূহ।
হাফেজ নুরুল ইসলামের সাথে থাকা তার এক ছাত্র মফিজুল ইসলাম বলেন, আমরা শত শত ছাত্র হুজুরের কাছ থেকে দ্বীনি শিক্ষা নিয়েছি। আজ একবেলা খাবারের জন্য তাকে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। তার বাড়ির পাশের একটি মাদরাসা থেকে মাঝে-মধ্যে খাবার আসে। একজন কোরআনের হাফেজ এতোটা মানবেতর জীবন-যাপন করবেন তা আমাদের জানা ছিল না।
এ বিষয়ে জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এটিএম আমিনুল ইসলাম বলেন, ইতোমধ্যে হাফেজ নুরুল ইসলামের জন্য একটি প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিছু অফিসিয়াল নিয়ম মানলে তাকে কষ্ট করে ব্যাংকে আসতে হবে না। ভাতার সম্মানী বিকাশ অ্যাকাউন্টে চলে যাবে। তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধীর হুইল চেয়ারের জন্য সমাজকল্যাণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করা যেতে পারে। এছাড়া তার চিকিৎসার কাগজপত্রসহ একটি নির্ধারিত ফরমে আর্থিক সহায়তার জন্যও আবেদনের সুযোগ রয়েছে।


এই বিভাগের আরও খবর