• বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন

এডভোকেট আব্দুস ছামাদ : পরিচ্ছন্ন রাজনীতির দীক্ষক

রফিকুল ইসলাম আধার , সম্পাদক
প্রকাশকাল : মঙ্গলবার, ৬ এপ্রিল, ২০২১

বন্ধু আওয়ামী লীগ-ব্যবসায়ী নেতা কানু চন্দ্র চন্দের মোবাইলে দেখা একটি কার্টুনের ব্যঙ্গ ছিল এরকম, ‘এক ভিক্ষুক আরেক ভিক্ষুককে বলছে, চল দোস্ত ভিক্ষা ছেড়ে দিয়ে রাজনীতি করি। উত্তরে অপর ভিক্ষুক বলে ওঠে, শা.. তর কোন মান-সম্মান নাই? ভিক্ষা ছাইড়া রাজনীতি করবি?’ ওই কার্টুনের ব্যঙ্গোক্তির যথার্থতা আমাদের চলমান রাজনীতিতে কতটুকু প্রতিফলিত হচ্ছে তার মূল্যায়ন না করেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, রাজনীতিতে অপরাজনীতির অনুপ্রবেশ ও দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি বাসা বেঁধে বসেছে বলেই তা নিয়ে খোদ ভিক্ষুক পর্যন্ত মন্তব্য করার সাহসটি পাচ্ছে। অন্যদিকে আলো-আঁধারের খেলায় দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির নামে অপরাজনীতি চলছে বলেই তার সারি সারি হোতা ও গডফাদারদের মাঝেও এখনও খুঁজে পাওয়া যায় কিছু কিছু আদর্শবাদী ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক। ঠিক এমনই একজন কেবল আদর্শ ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকই নন, তার দীক্ষক ছিলেন এডভোকেট আব্দুস ছামাদ।
হ্যা, আমাদের শেরপুর অঞ্চলের পরিচ্ছন্ন রাজনীতির দীক্ষক এডভোকেট আব্দুস ছামাদের কথাই বলছি। ১৯২৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শেরপুর শহরের তৎকালীন নবীনচর মহল্লার সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এডভোকেট আব্দুস ছামাদ। তিনি ১৯৪৮ সনে মেট্রিকুলেশন, ১৯৫০ সনে আইএ, ১৯৫২ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে বি.এ পাস করেন। কিন্তু স্কুল জীবনেই তার মাঝে নেতৃত্বের স্ফূরণ ঘটে। যে কারণে ১৯৪৫-৪৬ সনে শেরপুর ভিক্টোরিয়া একাডেমীর অষ্টম ও নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় তৎকালীন পাকিস্তান অর্জন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন এলাকায় জনসভায় বক্তৃতা দেন। এর আগে তিনি অর্থাৎ ১৯৫২ সনে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ওই আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে একই বছরের ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের ১৯ নং কক্ষ হতে গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন বিনাবিচারে কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকেন। পরবর্তীতে মুক্তি পেয়ে খালেক নেওয়াজ ও শামছুল হক চৌধুরীর সাথে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সদস্যরূপে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

১৯৫৩ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলএলবিতে ভর্তি হন এবং মুসলীম লীগ বিরোধী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি হওয়ায় তিনি বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকেন। ১৯৫৪ সনে মুসলিম লীগ বিরোধী সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের তদানীন্তন জামালপুর মহকুমার আহবায়ক নির্র্বাচিত হন এবং একই বছর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে জামালপুর মহকুমায় নির্বাচন পরিচালনায় অংশ নেন। এরপর কয়েক বছর তিনি সরকারি চাকুরিতে কাটান। ১৯৬৪ সনে তৎকালীন শেরপুর থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরপর কয়েকবার মিলে একাধারে দীর্ঘ ১১ বছর একই পদের দায়িত্ব পালন করেন। একইসাথে তিনি ১৯৬৪ সনে শেরপুর পৌরসভার বিডি মেম্বার নির্বাচিত হন এবং আইয়ুব খান বিরোধী গণআন্দোলনের সময় প্রতিবাদস্বরূপ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সর্বপ্রথম তিনিই ওই দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৬৫ সনে শেরপুর বারে আইনপেশায় যোগদান করেন এবং তৎকালীন থানা বারের সাধারণ সম্পাদকসহ ৫ দফায় নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে জামালপুর এবং শেরপুর অঞ্চলে বাঙালি মুক্তির সনদ ৬ দফা প্রচারণাসহ ৬৮-৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বদান করেন। ১৯৭১ সালের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক নির্বাচিত হন এবং সম্মিলিত গণআন্দোলনের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ওইসময় ভারতগমন করেন এবং মুজিবনগর সরকারের অধীনে ইয়্যুথ এন্ড রিসিপশন ক্যাম্প এর ডেপুটি ডিরেক্টর নিযুক্ত হয়ে আসাম প্রদেশের শীলচরের পানিবুড়া ইয়্যুথ ক্যাম্প থেকে শুরু করে মেঘালয় প্রদেশের সীমান্তবর্তী ক্যাম্পসমূহের তদারকির দায়িত্ব পালন এবং মুজিবনগর সরকারের তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও ইয়্যুথ এন্ড রিসিপশন ক্যাম্প, বোর্ড অব কন্ট্রোলের চেয়ারম্যান প্রফেসর এম ইউসূফ আলী এমএনএ’র সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে ইয়্যুথ ক্যাম্প তদারকির দায়িত্ব পালন করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে স্ব-পরিবারে হত্যার পর তিনি গ্রেফতার হন এবং এক বছরের অধিক সময় বিনাবিচারে আটক থাকেন। ১৯৭৫ সনে বঙ্গবন্ধুর বাকশালের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সনে তিনি শেরপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালে ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার দলে যোগদানের জন্য তার প্রতি চাপ প্রয়োগ করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ত্যাগ করে তার দলে যোগদান না করায় তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। ১৯৯০ এর স্বৈরাচার পতন ও ১৯৯৬ এর অসহযোগ আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন তিনি। ওইসময় তার বক্তব্য বিবিসি ও ভিওএ’সহ দেশি-বিদেশি প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হয়। ১৯৯৬ সনে জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৯ সনে তিনি দ্বিতীয় দফায় শেরপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় পৌর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের এক-দেড় বছরের মাথায় তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই অসুস্থতার রেশ ধরেই ২০০৭ সালের ৬ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।
এডভোকেট আব্দুছ সামাদের জীবদ্দশার ৭৮ বছরের মধ্যে যার প্রায় ৬০ বছরই কেটেছে রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জনসেবার মধ্য দিয়ে। মূলতঃ কৈশোরে স্কুল জীবনেই তার মাঝে নেতৃত্বের স্ফুরণ ঘটে। যে কারণে ১৯৪৫-৪৬ সনে শেরপুর ভিক্টোরিয়া একাডেমীর অষ্টম ও নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় তৎকালীন পাকিস্তান অর্জন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন এলাকায় জনসভায় বক্তৃতা দেন। এরপর থেকেই শুরু হওয়া সাহসী তেজোদীপ্ত ও প্রাণোচ্ছ্বল যুবক আব্দুস ছামাদের পথচলা আর থেমে থাকেনি। ছাত্র ও যুব রাজনীতির সফল গন্ডি পেরিয়ে মূল সংগঠনের ধাপে ধাপে থানা, মহকুমা ও জেলা পর্যায়ের কর্ণধার হবার পরও অহমিকা ও লোভ কখনওই তাকে স্পর্শ করেনি। তিনি যেমন ছিলেন লোভ-লালসার উর্ধ্বে, তেমনি ছিলেন বদমেজাজী ও রাগমুক্ত একজন স্পষ্টভাষী। যেন সত্য ও সাহসী উচ্চারণ ছিল তার জীবনের অন্যতম প্রধান অনুসঙ্গ। উচ্চতা, বর্ণে ও পরিচ্ছন্নতায় তিনি ছিলেন অনন্য। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে চলাফেরার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন কেবল যথেষ্টই নয়, শতভাগ সাবধানী।
এক্ষেত্রে তার সাথে ঘটে যাওয়া একটি স্মৃতিকথা তুলে ধরছি। ১৯৯৯ সনে দ্বিতীয় দফায় শেরপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পর সকাল ১০টার দিকে এলাকার একটি সমস্যা নিয়ে সদর থানার বিপরীত পাশে থাকা তার ল’ চেম্বারে কথা শেষ করে বিদায় নিতে চাইতেই তিনি আমাকে একটি রিক্সা ডাকতে বলেন এবং আমাকে (তখন আমি শিক্ষানবীশ আইনজীবী) নিয়েই কোর্টে পৌঁছবেন জানালে আমি চেম্বার থেকে বেরিয়েই রিক্সা ডাকি। ততক্ষণে তিনিও বেরিয়ে আমার পাশে। কিন্তু ডাক পেয়ে একটি রিক্সা আমাদের কাছে ঘেঁষতেই তিনি হাত নেড়ে ‘চলবে না’ বলে বিদায় করে দেন। এরপর আরেকটি রিক্সা ডাকলেও একই উত্তর তার। অগত্যা তৃতীয় দফায় ডাকা রিক্সাতে দু’জনেই চেপে বসি কোর্টের উদ্দেশ্যে। ততক্ষণে তার তেজোদীপ্ত প্রশ্ন, পর পর দু’টি রিক্সা ডাকার পরও উঠলাম না তার কারণ বুঝতে পেরেছ? উত্তরটি খেয়াল না হওয়ায় আমি তখন ইতস্তত করতেই তিনি বলে উঠেন, ‘আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছো কেন? ওগুলোতে পা দানি ছিলো না। ব্রেক করলেই তো সটকে পড়বো রাস্তায়। দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেশি।’ এরপর থেকেই বুঝতে ও জানতে শিখেছি তার সাবধানী চলাফেরা।
আরেকটি স্মৃতি মনে পড়ছে। সেটি হচ্ছে ১৯৯৯ সনে পৌর নির্বাচনের সময়। কোর্ট অঙ্গনে কথা হয় সন্ধ্যার পর মোবারকপুর আখেরমামুদের বাজারে পথসভার পূর্বে বিকেলে নওহাটা এলাকায় তার সাথে সময় দিতে হবে। কথা মোতাবেক তাকে নিয়ে নওহাটা এলাকায় গণসংযোগে যাই। ওই অবস্থায় প্রায় সবগুলো বাড়ির গৃহকর্তাদের ডাকাডাকি এবং তাদের সাথে আমার পরিচিতি ও সম্পর্কে তিনি অভিভূত হয়ে পড়েন। এক পর্যায়ে একই রিক্সায় ফেরার সময় তিনি আমাকে এই বলে আশির্বাদ করেন যে, অল্প সময়ে বেশ তো পরিচিতি। পেশাগত জীবনে পড়াশোনা করবে আর রাজনীতিসহ সর্বত্র সততা ও নিষ্ঠার সাথে চলবে। আমার বিশ্বাস, তুমি একসময় ভাল অবস্থানে পৌঁছবে।
সুতরাং সাদা পাজামা-পাঞ্জাবীর মতো পরিচ্ছন্ন যে মানুষটি জীবনের ৫ ভাগ সময়ের ৪ ভাগ সময়ই কাটিয়েছেন সততা, নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে, রাজনীতির মাধ্যমে আদর্শ প্রতিষ্ঠা, আদর্শ কর্মী গড়া, গণমানুষের অধিকার আদায় আর পরোপকারই ছিলো যার ব্রত, সেই মানুষটির অর্জনের তুলনায় প্রাপ্তি ছিল নগণ্য। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তিনি যা রেখে গেছেন, তা শেরপুরের ইতিহাস যতদিন থাকবে, ততোদিনই তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার আদর্শ অনুসরণ ও তার চর্চা যতক্ষণ যে রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গণে চলমান থাকবে, ততক্ষণ সেই সেই অঙ্গণে পরিচ্ছন্নতা টিকে থাকবে। জয়তু পরিচ্ছন্নতার রাজনীতি, জয়তু পরিচ্ছন্নতার দীক্ষক, জয়তু এডভোকেট আব্দুস ছামাদের নীতি-আদর্শ।

(২০১৮ সালে ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীর এই লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হলো)
লেখক : রাজনীতিক, আইনজীবী ও সাংবাদিক, শেরপুর।

 


এই বিভাগের আরও খবর