শ্যামলবাংলা ডেস্ক : চলতি বছর সংস্কৃতি অঙ্গন হারিয়েছে অবদান রাখা বেশ ক’জন কৃতী ব্যক্তিত্বকে। এক সময় যারা তাদের প্রতিভার আলোয় আলোকিত করেছে শিল্পাঙ্গন। তারা আজ চিরদিনের জন্য পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। চিরপ্রস্থানে যাওয়া এই বিশিষ্টজনেরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে চিরস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন।

এন্ড্রু কিশোর : (৪ নভেম্বর ১৯৫৫—৬ জুলাই ২০২০)
বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক সম্রাট বলা হয় এন্ড্রু কিশোরকে। ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করে চলতি বছরের ৬ জুলাই রাজশাহীর একটি হাসপাতালে ৬৪ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রে ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তাঁর কেউ’ গানের মধ্য দিয়ে এন্ডু কিশোরের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক যাত্রা শুরু হয়। এর দুই বছর পর ১৯৭৯ সালে ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ গানের মধ্য দিয়ে তুমুল পরিচিত পান এন্ড্রু কিশোর। গানটির গীতিকার মনিরুজ্জামান মনির, আর সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন আলম খান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। তার খুব জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে ‘জীবনের গল্প আছে বাকি অল্প’, ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’, ‘আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমার বাবার মুখে প্রথম যেদিন শুনেছিলাম গান’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, ‘পড়ে না চোখের পলক’, ‘ওগো বিদেশিনী’, ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’, ‘আমি চিরকাল প্রেমেরও কাঙ্গাল’ প্রভৃতি।
এন্ডুকিশোর আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। তার দুই সন্তান- একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। অস্ট্রেলিয়ায় থেকে তারা পড়াশুনা করছেন। সিডনিতে গ্রাফিকস ডিজাইনে পড়ছেন মেয়ে মিনিম এন্ড্রু সংজ্ঞা। আর ছেলে জে এন্ড্রু সপ্তক পড়ছেন ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে। তিনি থাকেন মেলবোর্নে।
চলচ্চিত্র অভিনেতা সাত্তার : (২৬ মে ১৯৫৮—৫ আগস্ট ২০২০)
আশির দশকের জনপ্রিয় বাংলাদেশী চলচ্চিত্র অভিনেতা সাত্তার। দেশের জনপ্রিয় নায়িকা শাবানা, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, জিনাত, কবিতা, অলিভিয়া, রানীদের নায়ক ছিলেন তিনি। ‘রঙ্গীন রাখাল বন্ধু’, ‘রঙ্গীন রূপবান’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘আলোমতি প্রেম কুমার’, ‘মধুমালা মদন কুমার’, ‘সাগর কন্যা’, ‘শীষ মহল’, ‘ঘর ভাঙ্গা সংসার’, ‘জেলের মেয়ে রোশনী’, ‘ঝড় তুফান’সহ ১১০টির বেশি ছবিতে অভিনয় করেছেন নায়ক সাত্তার। মৃত্যুরপর শেষ ইচ্ছানুযাযী তাকে নায়ণগঞ্জ রূপগঞ্জে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সুর সম্রাট আলাউদ্দীন আলী : (২৪ ডিসেম্বর ১৯৫২—৯ আগস্ট ২০২০)
বাংলা গানের উজ্জল নক্ষত্র আলাউদ্দীন আলী। বাংলা চলচ্চিত্রে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় কালজয়ী গান গান তৈরি করেছেন তিনি। একাধারেসুরকার, সংগীত পরিচালক, বেহালাবাদক ও গীতিকার ছিলেন তিনি। গান লিখে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছেন। গুণী এই মানুষের জন্ম ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে। তাঁর বাবা ওস্তাদ জাদব আলী। মায়ের নাম জোহরা খাতুন। ১৯৬৮ সালে বাদ্যযন্ত্রশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে পা রাখেন তিনি। শুরুটা শহীদ আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে, পরে প্রখ্যাতসুরকার আনোয়ার পারভেজের সঙ্গে কাজ করেন দীর্ঘদিন। লোকজ ও ধ্রুপদি গানের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা আলাউদ্দীন আলীর সুরের নিজস্ব ধরন বাংলা সংগীতে এক আলাদা ঢং হয়ে উঠেছে প্রায় চার দশক।
কে এস ফিরোজ : (৭ জুলাই ১৯৪৬ —৯ সেপ্টেম্বর ২০২০)
চলতি বছরের ১৪ সেপ্টম্বর দেশের বরেণ্য অভিনেতা কে এস ফিরোজ ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। নিউমোনিয়ায় ফুসফুসে ইনফেকশন হয়ে মৃত্যু হয় তার। বনানী কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত হোন কে এস ফিরোজক। নাট্যদল ‘থিয়েটার’–এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে অভিনয়ে কে এস ফিরোজের পথচলা শুরু। এই দলের হয়ে তিনি অভিনয় করেছেন ‘সাত ঘাটের কানাকড়ি’, ‘কিং লিয়ার’ ও ‘রাক্ষসী’ নাটকে। কে এস ফিরোজ ১৯৬৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। মেজর হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে ১৯৭৭ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। তাঁর পুরো নাম খন্দকার শহীদ উদ্দিন ফিরোজ।
সাদেক বাচ্চু : (১ জানুয়ারি ১৯৫৫—১৪ সেপ্টেম্বর)
১৪ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ঢাকাই ছবির বর্ষিয়ান অভিনেতা সাদেক বাচ্চু। ৬৬ বছর বয়সী এ অভিনেতা দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০১৩ সালে তার হৃদ্যন্ত্রে অস্ত্রোপচারও করাতে হয়েছিল। করোনায় আক্রান্ত ছিলেন এ অভিনেতা।
বহুমাত্রিক এই অভিনেতার উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘জীবননদীর তীরে’, ‘জোর করে ভালোবাসা হয় না’, ‘তোমার মাঝে আমি’, ‘ঢাকা টু বোম্বে’, ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘এক জবান’, ‘আমার স্বপ্ন আমার সংসার’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’, ‘বধূবরণ’, ‘ময়দান’, ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘প্রিয়জন’, ‘সুজন সখী’ প্রভৃতি।
আলী যাকের : (৬ নভেম্বর ১৯৪৪—২৭ নভেম্বর ২০২০ )
৭৬ বছর বয়সে চলতি বছরের ২৭ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা ও নাট্য ব্যক্তিত্ব আলী যাকের। আলী যাকের দেশের একজন গুণী ও বর্ষীয়ান অভিনেতা। ছোট পর্দায় অভিনয়ের সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চেও দাপুটে বিচরণ ছিল তার। মঞ্চে নুরুলদীন, গ্যালিলিও ও দেওয়ান গাজীর চরিত্রে অভিনয় করে জয় করেছেন দর্শক হৃদয়। এছাড়াও ‘অচলায়তন’, ‘বাকী ইতিহাস’, ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘তৈল সংকট’, ‘এই নিষিদ্ধ পল্লীতে’, ‘কোপেনিকের ক্যাপ্টেন’সহ বেশ কয়েকটি মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’র মতো দর্শকপ্রিয় টিভি নাটকেও দেখিয়েছেন নিজের অভিনয় কারিশমা। বেতারে ৫০টির বেশি নাটক করেছেন। অভিনয় করেছেন বেশকিছু চলচ্চিত্রেও। আলী যাকের টেলিভিশনের জন্য মৌলিক নাটকও লিখেছেন। নানা বিষয়ে দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করেছেন। তার প্রকাশিত বই- ‘সেই অরুণোদয় থেকে’, ‘নির্মল জ্যোতির জয়’। আলী যাকের ১৯৭২ সালের আরণ্যক নাট্যদলের ‘কবর’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পথচলা শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে যোগ দেন নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ে। আমৃত্যু এই নাট্যদলেই ছিলেন তিনি।
চিত্রসম্পাদক আমিনুল ইসলাম মিন্টু : (৫ আগস্ট ১৯৩৯-১৯ ডিসেম্বর ২০২০)
করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলতি বছরের ১৯ ডিসেম্বর ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন চিত্রসম্পাদক আমিনুল ইসলাম মিন্টু। চিত্রসম্পাদক হিসেবে চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া মিন্টু ১৯৩৯ সালের ৫ আগস্ট সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬০ সালে প্রখ্যাত চিত্র সম্পাদক বশীর হোসেনের সহকারী হিসেবে ‘চান্দা’ সিনেমা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। একক চিত্র সম্পাদক হিসেবে তার প্রথম কাজ করা মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘পয়সে’ সিনেমার মাধ্যমে। এটি মুক্তি পায় ১৯৬৩ সালে।
চিত্র সম্পাদক হিসাবে তার কাজ করা চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে, মালা, আখেরি স্টেশন, তালাশ, পায়েল, আনাড়ি, চকোরী, চান্দ অর চাঁদনী, পীচঢালা পথ, দাগ, বিজলী, দি রেইন, কি যে করি, জাদুর বাঁশী, আসামী হাজির, সারেং বউ, অঙ্গার, দাবী, আসামী, ফকির মজনু শাহ, অনুরাগ, সোহাগ, জিঞ্জির, আরাধনা, ভাঙ্গা গড়া, আঘাত, অপেক্ষা, গরীবের বউ, অজান্তে ।




