• বৃহস্পতিবার, ১৫ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন

মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য…

শ্যামলবাংলা ডেস্ক
/ ৬৫৫ বার পঠিত
প্রকাশকাল : মঙ্গলবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০১৭

‘মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না’- এই লাইনের প্রত্যেক শব্দই মানবজীবনে অনেক গুরুত্ব বহন করে। ২৩ জানুয়ারী সোমবার বিকেলে বাবার এক জরুরী কাজে গিয়েছিলাম শেরপুর শহরের দিঘারপাড় মহল্লায়।

গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর আগে দেখি আমার বাইকের মিটারে তেলের সিগনাল লো দেখাচ্ছে, তাই কিছুক্ষণ বাবার সাথে থেকে একা বের হয়ে আসলাম কাছের এক পেট্রোল পাম্প থেকে তেল নিতে।

পেট্রোল পাম্প থেকে বের হয়ে একটু সামনে শেরপুর শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত রাস্তা খোয়ারপাড় মোড়, যেখানে শেরপুর জেলার জন্য ০ কিলোমিটার ধরা হয়। সেখানে দূর থেকে খেয়াল করলাম মেইন রোডে অনেকগুলো লোকজন কয়েকজনকে ঘিরে হৈ চৈ করছে।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে কৌতূহলী মন, আরও যেহেতু প্রধান সড়কের মাঝখানে ঘটনাটি তাই এগিয়ে গেলাম। ঘটনাস্থলটা আরও ক্লিয়ার করি যেখান থেকে শেরপুর-ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর বাস ছেড়ে যায়।

সেখানে গিয়ে দেখলাম একজন দম্পতি মোটরসাইকেল এক্সিডেন্ট করে পরে রয়েছে, দু’একজন সাহায্যের হাত বাড়ালেও বাকি অর্ধশতজন দাড়িয়ে হা করে তামাশা দেখছে।

অথচ ঘটনাটি ঘটার ৭-৮ মিনিট পর আমি সেখানে পৌঁছেছি। যাই হোক কথায় কথা বাড়ে তাই একটু সংক্ষিপ্ত করি, ওই অবস্থায় আমার বাইকটি রাস্তার ডান পাশে স্ট্যান্ড করে লোকটির বাইকসহ তাকে মেইন রোড থেকে পাশের এক মেডিসিন কর্নারে নিয়ে গেলাম।

তখন লোকটির মুখে চোখে ছিল ভয়ের ছাপ এবং তিনি বারবার শখের নতুন বাইকটির দিকে অসহায় ভাবে তাকাচ্ছিলেন। উনি যেহেতু বেশী আঘাতপ্রাপ্ত তাই উনাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে, পরে তার স্ত্রীকে কয়েকটি ছোট ছোট ব্যাগসহ একই স্থানে আনলাম।

মহিলাটি শুধু হাতের তালুতে ব্যথা পেয়েছে আর লোকটি শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে হাটুতে ইনজুরিটা ছিল মারান্তক। এতক্ষন যা করার সব একাই করে যাচ্ছি অথচ একজনের বিপদে সকলের এগিয়ে আসাটা দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যেই পরে। লোকটির হাটুর অবস্থা এতই অবনতি হচ্ছিল যে রক্তের সাথে ডিম্বাকৃতির মত ফুলে উঠছিল, তাই বরফের খোঁজে এদিক ওদিক ছুটতে লাগলাম।

সর্বশেষ আশপাশের কয়েক দোকান থেকে অল্প করে সংগ্রহ করা বরফ কুচি গুলো ছোট এক পলিথিনে ভরলাম, আহত লোকটির হাটুতে স্যাভলন দিয়ে পরিষ্কার করে পরে নিজ হাতে তার পায়ে থাকা জুতো ও মোজা খুলে দিয়ে সেখানে বরফ লাগিয়ে রাখলাম। ততক্ষনে লোকটি লজ্জা পেয়ে বললেন, আরে ভাই কি করছেন আপনি, দিন আমি পারবো। বললাম, ভাই আমি নিজেও কয়েকবার মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ফেইস করেছি তাই আমি জানি সে সময় কত যন্ত্রনার ও কষ্টের।

বরফ লাগানোর ফাকে উনার পরিচয় জিজ্ঞেস করলাম, উত্তরে তিনি বললেন, আমার বাড়ি জামালপুর জেলায়, সম্প্রতি বিয়ে করেছি এবং শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলাতে আনসার ভি.ডি.পি তে চাকুরিরত।

তারপর বললাম দুর্ঘটনাটি হলো কিভাবে, তখন তিনি জানালেন ঝিনাইগাতি বাসস্ট্যান্ড এর পাশে এক ফল ব্যবসায়ী ধূলো-বালি থেকে বাঁচতে পাইপ দিয়ে মেইন রোডে পানি দিচ্ছিল, আর সেই পানি থেকে নিজেকে সেইভ করতে আমি রাস্তার বাম পাশ থেকে ডান পাশে চলে আসি। ঠিক সেই মুহূর্তে অপর দিক থেকে আসা আরেকটি দ্রুতগামী মোটরসাইকেলের সাথে আমার বাইকটি ধাক্কা লাগে, আর সেখানেই আমরা স্বামী-স্ত্রী আহত হই।

প্রায় ঘন্টাখানেক তাদের সাথে সময় কাটানোর পর লোকটি আমার পরিচয়টা জানতে চাইলে বললাম যে, আমি একজন জেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা ও পাশাপাশি একটি প্রজেক্ট এ কাজ করি। তারপর উনি ছলছল চোঁখে বললেন ভাই আপনার ফোন নাম্বারটা দেওয়া যাবে, উত্তরে বললাম কেন না অবশ্যই।

নাম্বারটি দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে আসলাম। আমি নিজেকে জাহির করতে এতগুলো কথা আপনাদের জানাইনি, আমার কাছে তখনই নিজেকে একজন কর্তব্যপরায়ন স্বার্থক মানুষ মনে করেছি যখন তারা দু’জনই সুস্থভাবে বাড়িতে পৌঁছে আমাকে ফোন দিয়ে বললো, জাহিদুল ভাই আপনার উপকার ভোলার নয়, আমরা দু’জনই আপনার প্রতি চির কৃতজ্ঞ।

লেখক : জাহিদুল খান সৌরভ, সংবাদকর্মী, শেরপুর।


এই বিভাগের আরও খবর