এম. সুরুজ্জামান (নালিতাবাড়ী) শেরপুর : শেরপুর জেলার অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র নালিতাবাড়ী উপজেলায় স্থাপিত ‘মধুটিলা ইকোপার্ক এ এবারের ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ভ্রমনপিয়াসী ও দর্শনার্থীদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠেছে। সীমান্তবর্তী ওই পার্কের চারপাশে উচু-নিচু পাহাড়ীটিলা, কৃত্রিম লেক আর সবুজের সমারোহ দেখতে ভ্রমনপিয়াসীরা ভীড় জমাচ্ছেন। প্রকৃতির সান্নিধ্য আর প্রাণ খুলে নির্মল বায়ুর শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহনের মজা পেতে বর্তমানে বর্ষা মৌসুমকে উপেক্ষা করে এখানে ভ্রমন করে কর্মক্লান্তি ভুলে আনন্দচিত্তে নিজগৃহে ফিরে যাচ্ছেন পর্যটকরা। তাই ঈদের ছুটি কাটাতে ইট, কাঠ, কংক্রিট আর পাথরে গড়া নগর জীবনের কোলাহল ছেড়ে দুর দুরান্ত থেকে ইকোপার্কে বেড়াতে আসছেন তারা। দর্শনার্থী, পর্যটক ও ভ্রমন পিয়াসীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যাবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। তাছাড়া এই পার্কের ভেতরে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যদেরকে টহল দিতে দেখা গেছে।
ওই পার্কটির প্রধান ফটক পেড়িয়ে ভেতরে ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে সারি সারি গাছ। রাস্তার ডান পাশে খোলা প্রান্তর আর দু-পাশে রকমারি পণ্যের দোকান। সামনের ক্যান্টিন পার হলেই পাহাড়ী ঢালু রাস্তা। এর পরই হাতি, হরিণ, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সিংহ, বানর, কুমির, ক্যাঙ্গারু, মৎস্য কন্যা, মাছ ও পাখির ভাষ্কর্য। পাশের আঁকাবাঁকা পথে ঘন গাছের সারি লেকের দিকে চলে গেছে। তারপর কৃত্রিম লেকের উপর ষ্টারব্রীজ। দেখে প্রাণ পায় নব চেতনা, মন হাড়িয়ে যায় যেন প্রকৃতির মাঝে। লেকে নৌকায় চরে ঘুরাফেরার পর পাহাড়ের চুড়ায় পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে আরোহণ করলেই নজর কেড়ে নেয় ভারতের উঁচু নিচু পাহাড় আর সবুজের সমারোহ। প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন ভ্রমন পিয়াসীরা।
পর্যটক জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী অনার্স কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র রাসেল মিয়া (১৮) জানান, মধুটিলা ইকোপার্কে ঘুরে তিনি প্রকৃতির নিখাদ সৌন্দর্য উপভোগ করে খুব মজা পেয়েছেন। তবে তিনি বলেন, এই পার্কে সীমানা প্রাচীর বা কাঁটা তারের বেড়া না থাকায় উত্তর দিকে ঘুরতে গিয়ে প্রায় ভারতে চলে গিয়েছিলেন। তখন স্থানীয় লোকজন তাকে সহায়তা করে পার্কে ফেরত পাঠান। তিনি বলেন, এই পার্কের নিরাপত্তার জন্য জরুরী ভিত্তিতে সীমানা প্রাচীর বা বাউন্ডারী দেয়াল নির্মাণ করা প্রয়োজন।
অপর দর্শনার্থী টাংগাইল জেলার সখীপুর উপজেলার মজনু মিয়া (২৫) বলেন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখে খুব ভাল লাগলো। যদি কৃত্রিমতা বাদ দিয়ে এই পার্কে জীবন্ত বিভিন্ন জীব-জানোয়ারের সমাহার ঘটানো যেতো তাহলে দর্শনার্থীরা আরো আকৃষ্ট হতো।
পাশ্ববর্তী বাতকুচি গ্রামের রফিকুল ইসলাম ও নালিতাবাড়ীর নয়াবিলের দুধকুড়া গ্রামের মারুফ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, ইকোপার্কটি জীববৈচিত্র ও বিভিন্ন প্রাণির সমাহার ঘটিয়ে যেভাবে সাজানোর কথা ছিল এখনও তার কিছুই হয়নি। কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টির অভাবে সম্ভাবনাময় ইকোপার্কটির সম্ভাবনা ম্লান হতে বসেছে। পেডেল বোর্ডগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে এগুলো সচল করা প্রয়োজন। কারন ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে প্রকৃতির অপার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের টানে বারবার এ পার্কে ছুটে আসেন।
বিনোদন ও পাহাড়ী এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য পার্কটি বিশাল ভূমিকা রেখেছে। সম্ভাবনাময় এ পার্কটির প্রতি নজর দেওয়ার জন্য জোড় দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
এমনকি এই ইকোপার্কটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখান থেকে ভারতের দুরত্ব ১ কিলোমিটার। যুগ যুগ ধরে সীমান্তবর্তী এ পাহাড়ে গারো আদিবাসীরা বসবাস করে আসছেন। এখান থেকে খুব সহজে আদিবাসী গারোদের জীবনধারা ও সংস্কৃতি খুব কাছে থেকে দেখারও সুযোগ রয়েছে।
মধুটিলা ইকোপার্কের প্রধান গেইটের ইজারাদার মোহাম্মদ আলী জানান, এবছর ২৯ ডিসেম্বর/১৫ থেকে ২৮ ডিসেম্বর/১৬ সাল পর্যন্ত এক বছরের জন্য ১৫ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪০ টাকায় (ভ্যাট ও আয়করসহ) ইজারা নিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, কর্তৃপক্ষ যদি ইকোপার্কের ভাষ্কর্যগুলো, বিভিন্ন স্থাপনা রং করত ও পানীয় জলের ব্যাবস্থা করত তাহলে ভ্রমনপিয়াসীদের দুর্ভোগ আরো লাঘব হতো। এছাড়া সু উচ্চ টাওয়ার, মিনি চিড়িয়াখানা ও লেক ৪ লাখ ৭৯ হাজার টাকায় আলাদাভাবে ইজারা দেয়া হয়েছে।
ইজারাদার আরও জানান, ইকোপার্কের পর্যটকদের বাড়তি আর্কষনের জন্য অতি সম্প্রতি এখানে অজগর সাপ ও গন্ধগকুল নামের প্রাণী আনা হয়েছে। এগুলো দেখতে জনপ্রতি ৫ টাকায় টিকিট নিতে হচ্ছে। এছাড়া মিনি চিড়িয়াখানায় জীবন্ত হরিণ রয়েছে ৭টি। তিনি আরও জানান, এখানে ঢুকতে জনপ্রতি ১০ টাকা, বড় বাস ৬০০ টাকা, মিনিবাস ৪০০টাকা, মাইক্রোবাস ২০০ টাকা, মোটরসাইকেল ৩০ টাকায় টিকেট কাটার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে আলাদা আলাদা ফি দিয়ে, পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠা, শিশু পার্কে প্রবেশের সুযোগও রয়েছে। শুধু দিনের বেলায় ব্যবহারের জন্য ভ্যাটসহ ৪ হাজার ৭০২ টাকার বিনিময়ে পাহাড়ের চূড়ায় চার কক্ষ বিশিষ্ট শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) সুসজ্জিত মহুয়া নামের রেষ্ট হাউজ। এ রেষ্ট হাউজ ব্যবহার করতে চাইলে মধুটিলা রেঞ্জঅফিস, ময়মনসিংহ অথবা শেরপুর বন বিভাগ অফিসে বুকিং দিতে হয়। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে ডিসপে¬ মডেল, তথ্য কেন্দ্র, গাড়ী পার্কিং জোন, ক্যান্টিন, মিনি চিড়িয়াখানা, বন্যপ্রাণির বিরল প্রজাতি পশু-পাখির ভাষ্কর্য। আরো আছে জীবন্ত হরিন, ঔষধি ও সৌন্দর্য বর্ধক প্রজাতির বৃক্ষ এবং ফুলসহ বিভিন্ন রঙ্গের গোলাপের বাগান।
মধুটিলা ইকোপার্কের ভারপ্রাপ্ত রেঞ্জকর্মকর্তা ইলিছুর রহমান বলেন, তৃতীয় ফেইজে বিগত ২০০৯ সালে এ পার্কের আরও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ঝুলন্ত ব্রিজ, লেক এক্সটেনশন, মসজিদ নির্মান ও অফিস ভবন নির্মানসহ পার্কটির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রস্তাবনা পাঠানো হলে তা নাকচ করা হয়। তবে সরকার প্রতি বছর এ পার্ক থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার রাজস্ব আয় করলেও পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য কোন প্রকার অর্থ ব্যয় করছে না। আমরা মাঝে মাঝেই উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে আসছি। এখনও ওই প্রস্তাবনা পাশ হয়নি।
শেরপুর জেলা শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার, নালিতাবাড়ী উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তরে পোড়াগাঁও ইউনিয়নে ময়মনসিংহ বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় মধুটিলা ফরেষ্ট রেঞ্জের সমেশ্চুড়া বন বীটের আওতায় ৩৮০ একর বনভূমিতে গারো পাহাড়ের মনোরম পরিবেশে সরকারীভাবে বিগত ২০০০ সালে নির্মিত হয় ‘মধুটিলা ইকোর্পাক’ তথা পিকনিক স্পট। স্থাপনকাল থেকেই প্রায় সারা বছরই এ পার্কে পর্যটকরা ভীড় জমান।
রাজধানী ঢাকা থেকে মধুটিলা ইকোপার্কের দুরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। ঢাকা বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুর আসতে হবে। শেরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী বাজার পর্যন্ত লোকাল বাস সার্ভিস রয়েছে। এ ছাড়াও শেরপুর থেকে ভাড়ায় সিএনজি অথবা মটরসাইকেলযোগে মধুটিলা ইকোপার্কে আসা যায়। অথবা নিজস্ব গাড়ীতে সরাসরি ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে শেরপুর পৌঁছানোর আগে নকলা উপজেলা থেকে নালিতাবাড়ী উপজেলা সদর হয়ে ইকোপার্কে আসা সহজ হয়। সব মিলিয়ে সম্ভাবনাময় এই ইকোপার্কে প্রায় সারা বছরই দেশি-বিদেশি পর্যটক ও ভ্রমন পিয়াসীদের ভীড় লেগেই থাকে।




