
কথায় বলে-বোবার কোন শত্র“ নেই। আমার মতে শত্র“ ছাড়া কোন প্রাণী বা জীব নেই। থাকতে পারে না। পুরুষ সিংহ, বাঘ, কুমির এবং গরিয়াল নিজের বাচ্ছা নিজেই খেয়ে ফেলে । বোয়াল মাছ সব মাছের রাক্ষস, পরগাছা বা গুল্মরতা ফলজ ও বনজ বৃক্ষের বিকাশ রোধ করে,আগাছা ফসলের ক্ষতি সাধন করে,শেয়াল মুরগী থেকে ছাগলছানা এমন কি শিশু সন্তান পর্যন্ত খেয়ে ফেলে। চোরের শ্বশুরবাড়ি নেই; বধূবেশী নারী একান্নভুক্ত পরিবার ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করে ফেলে। আফ্রিকায় এমন একটি উপজাতি আছে, যে উপজাতিতে বৃদ্ধ মানুষকে হত্যা করে খেয়ে ফেলার রীতি প্রচলিত আছে।
যেহেতু অভিধানে ধূর্ত,কপট,ছলচাতুর,টাউট,প্রতারক,খুনি,লুটেরা,লম্পট প্রভৃতি শব্দের উপস্থিতি আছে,সেহেতু সব প্রাণী বা জীবেরই শক্র আছে। যারা বংশ বিস্তার ঘটায় তাদের সবারই আবেগ,উচ্ছাস,স্পৃহা, লোভ, মোহ,কাম, ক্রোধ চেতনা ও আকাঙ্খা আছে । আছে সবারই এমন একটা মন,হায়া-কায়া, মায়া-মমতা, শক্র-মিত্র। সে পশু-পক্ষীই বলুন,বৃক্ষ-লতা-জলজই বলুন আর কীট পতঙ্গ-সরীসৃপই বলুন; যার জীবনীশক্তি আছে, তারই একাধিক রিপু আছে-আছে শত্র“।
এই শত্র“কেই ভদ্র ভাষায়-বিরুদ্ধবাদী বল্ েপথের ভিখারী থেকে রাষ্ট্র প্রধান পর্যন্ত বিরুদ্ধবাদীর শ্যণদৃষ্টির শিকার। আবার প্রত্যেক ব্যক্তিই কিন্তু বিরুদ্ধবাদী। যেমন ধরুন,আমি যেসব বিরুদ্ধবাদীর কথা লিখতে যাচ্ছি-আবার আমিও কিন্তু তাদেরই বিরুদ্ধবাদী। মন ও মতের সাথে মিল নেই বলেই বিরুদ্ধবাদী সৃষ্টি হয়। আর এর পেছনে কাজ করে ‘স্বার্থ’ নামক শব্দটি । আবার ভ্রান্ত ধারনা ও অজ্ঞতা থেকেও বিরুদ্ধবাদীর উৎপত্তি হয়। এর পেছনে চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র নামক শব্দটি সক্রিয় থার্কে। মহল বা ব্যক্তি বিশেষের প্ররোচনায় ‘ক্রোধ’ শব্দটি ব্যক্তি বা গোষ্ঠিকে বিকারগ্রস্ত করে তোলে। তখন এদের দ্বারা যে কোন কাজ করানো সম্ভব।
আমাদের মাঝে দু’ধরণের বিরুদ্ধবাদী রয়েছে । একটি সচেতন অপরটি অসচেতন। অসচেতনবাদীরাই জীবনভর ভ্রান্ত পথে পরিচালিত। পরশ্রীকতরতা আর পরশ্র“তিকাতরতা মিলে ‘স্নায়ুযুদ্ধ”। এই স্নায়ুযুদ্ধের শিকার হয়ে এরা তিল তিল করে বিলুপ্তি ঘটায় এদের ব্যক্তিত্বের বিকাশ। আপন মেধা, মনন,ও নৈতিকতাকে জিঘাংসার যুঁপকাষ্ঠে বলি দেয়। এরা দলে ভারী হলেও কালের আর্বতে অন্ধকারের আস্তাকুড়েই থেকে যায়। এরা নিজেদের ক্ষণস্থায়ী স্বার্থটাকেই বড় করে দেখে। সচেতনবাদীদের সাথে চিরদিনই এদের আপোষহীন সংগ্রাম চলে। সচেতনবাদীরা সর্বদা এদের ভুল ভাঙার্ঁনোর চেষ্টা করলেও অজ্ঞানতার কারণে এরা ভুল সিদ্ধান্তেই অটল থেকে সচেতনবাদীদের কুৎসা রটনায় আরো দ্বিগুণ তৎপর হয়ে ওঠে। সচেতনবাদীরা তাই এদের সাথে আপোষে আসতে পারে না ।
আমাদের এই দুই অংশ একত্রিত হলেই সাম্যের সৃষ্টি হতে পারে। অসচেতনবাদীদের পথে আনতে হলে সচেতনবাদীদের দু’চারজনকে ওদের সাথে মিশে যেতে হবে, গোয়েন্দাগিরি করতে হবে। অত্যন্ত কৌশলে এদের মাঝে সচেতনতার বীজ আস্তে আস্তে ঢোকাতে হবে। তবেই হয়তো সম্ভব হবে এ জটিলতার অবসান ঘটানো । অসচেতনবাদীদের বিপরীতমুখী অবস্থানের ফলেই আমাদের মাঝে নৈতিক অধঃপতন এসেছে। এসেছে সামাজিক অবক্ষয় ও অর্থনৈতিক দূরবস্থা। পিতা-পুত্রে দ্বন্দ্ব,দাম্পত্য কলহ, প্রতারণা-ছলচাতুরী, ধূর্ততা-কপটতা, আরো অনেক কিছু। মূর্খ মিত্রের চেয়ে শিক্ষিত শত্র“ ঢের ভাল। কারণ মূর্খজনরা স্বার্থের লোভে বা বড় হবার আশায় আপজনদের হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। আবার সচেতনবাদীরাও অনেক সময় এ পথটি বেছে নিতে বাধ্য হয়। যেমন-সম্রাট অশোকের কথাই ধরা যাক, অশোক তাঁর নিরানব্বই ভাইকে হত্যা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন। বাদশাহ আওরঙ্গজেবও তাই করেছিলেন। দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি মূহুর্তের সাথে আমরা অভিনয় করে যাচ্ছি। কৃত্রিম হাসিমুখে চাকচিক্য পোশাক পরে অত্যন্ত সুনিপন ভাবে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেককে দেখাচ্ছি-খুব সুখে আছি, শান্তিতে আছি, ভাল আছি। ‘জানিনা ‘ক’ এর মাথা, ইংলিশ ছাড়া কই না কথা’। সেই যে ভদ্রলোকটি-যিনি চলন্ত ট্রেনে বসে তার বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণের কাহিনী শোনাচ্ছিলেন। ভদ্রলোকের কথা বলার ফাঁকে একজন যাত্রী বললেন-‘জিওগ্রাফী সম্পর্কে আপনার ভাল ধারণা আছে দেখছি’। ভদ্রলোক তৃপ্তির হাসি হেসে বলেছিলেন জ্বি -হ্যা-ওখানেও কিছুদিন ছিলাম।
সামান্য একটু আধটু মধ্যপ্রাচীয় আর ইউরোপীয় কাহিনী শুনেই বোকার মত সাচ্চা মিথ্যা বয়ান গেয়ে বেড়ানো আমাদের যেন ফ্যাশানে পরিণত হয়েছে। অজ্ঞানতার জন্যই এমনটি হয়। সচেতনতার অভাবেই আমাদের এমন অবস্থা। আমরা অপরের পরিচয়ে পরিচিত হতেও বেশী ভালবাসি। যেমন ধরুন, অমুক মন্ত্রী আমার দুলাভাই, তমুক সচিব বা ডিরেক্টর আমার খালু বা মামা। এসব আত্মপ্রসাদজনিত পরিচিতি আমাদের অভ্যাসিত করে তুলে্েছ। এসব সূত্রের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে আমরা প্রচুর ফায়দাও লুটে থাকি। এক্ষেত্রে আমাদের চরিত্র গঠন ও সচেতন হওয়া উচিৎ। তজ্জন্য প্রয়োজন ব্যাপক অধ্যবসায়ের। আমরা যা ভাবি, বুঝি ও করি তা কতটুকু ন্যায়সঙ্গত তা আগে ভেবে দেখতে হবে। তবেই সুষ্ঠু সুন্দর ফলশ্রুতি পাব । নিঃসঙ্গ জীবনেও বেচে থাকার প্রেরণা লাভ করতে পারবো। আমি তো মনে করি, পৃথিবীতে বিশ্বস্ত বন্ধু আমি ছাড়া আমার আর কেই নেই। সে প্রেমিকাই বলুন, ঘরের স্ত্রীই বলুন, ব্যবসায়িক পার্টনারই বলুন, সবাই সুযোগ সন্ধানী, স্বার্থন্বেষী ও প্রতারক। একজনের সাময়িক ক্ষতি করে ভোগাস লাভবান হওয়া কেবল মূর্খেরই শোভায়। বন্ধুৃ আমার নেই, কারণ যার যত বেশী বন্ধু বা ঘনিষ্ঠজন আছে তার তত বেশী বিপদ। যদিনা সে কোন সাংগঠনিক ব্যক্তি হয়। তাহলে যে কোন ঘটনায় বা বিপদে ফেঁসে যেতে হবেই। সুতারাং নিরাশ হবার কোনই কারণ থাকতে পারে না।
সুবিধাবাদীদের পরিচয় কি? এরা বিভিন্ন সভা সমিতি ও ব্যক্তির কাছে যা শোনে তা আরো সুন্দর করে হুবহু বলতে পারে-এদের কথা বলবার সুন্দর ভঙ্গিমা রয়েছে। কথার মারপ্যাঁচে এরা যেকোব ব্যক্তির সমর্থন আদায় করে নিতে পারে। দালালীর কাজেও এরা দক্ষতার নৈপুণ্যতা রাখে। একজন সচেতন ব্যক্তির সবচেয়ে দুর্বল দিকটি হল তাঁর ভদ্রতা। এই ভদ্রতার উপর সরাসরি আঘাত হেনে লোক সমক্ষে অপমানিত করে এরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকে। এরা অত্যন্ত ধূর্ত ও কুটবুদ্ধির অধিকারী। এরা সচেতনবাদী হলেও মূলত অবচেতনবাদীদের কর্ণধার। অবচেতনবাদীদের এরাই নেপথ্য থেকে পরিচালিত করে। এদেরকেই বলা হয় ’টাউট’ বা বাকস্বভাবশিল্পী। ইংরেজিতে বলে White criminal এদেরকে সবাই চিনলেও সরাসরি কেউ অভিযুক্ত করতে পারে না। কারণ, এরা ইঙ্গিতের মাধ্যমে নেপথ্য থেকে কাজ পরিচালনা করে থাকে। কোন সাক্ষী রেখে কাজ করে না ।
এরাই ফসলের মাঠের আপাটে গোপাটে হারামজাদা ঘাস। খুন, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষণ, প্রতারণা, ছলচাতুরী প্রভৃতি সমাজবিরোধী কার্যকলাপের পেছনে এরা নেপথ্য নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। ভাত রান্না করার আগে যেমন মহিলারা চাল থেকে ধান বা তুষ খুটে খুটে বেছে বা ঝেড়ে ফেলে দেয়, তেমনিভাবে এদেরকেও সমাজ থেকে নির্মমভাবে বহিস্কার করতে হবে। নইলে এই আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় এদের কুমন্ত্রণার বীজ সংক্রমণের মত ছড়িয়ে পড়বে জনসাধরণের মধ্যে।
বাইরে এরা ব্যক্তি হিসাবে যেমন ভদ্র ও সম্মানী ভেতরে ভেতরে তেমনি জঘন্য ও দুর্ধর্ষ। নেপথ্যে থেকে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এরাই পরিচালনা করে থাকে। আবার প্রকাশ্যে এরাই এ সবের সর্বাগ্রে প্রদিবাদ জানায়। এসব কার্যকলাপই হচ্ছে এদের আয়ের একমাত্র উৎস। তাই সর্বোচ্চ মহল থেকে সব ধরনের মানুষের সাথে এদের ওঠা বসা। এদের ক্ষমতাও প্রচুর। এদের অনেক চামচাও থাকে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেও এরা স্থানীয় পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকে। এরা নির্বাচনের মাধ্যমে মন্ত্রী পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই জ্ঞানপাপীদের নৈপুন্যপূর্ণ ছলচাতুরীকে অবচেতনরা সুন্দর গুণাবলী মনে করে থাকে। এরা দেশের সমাজপতি বা কর্ণধার পর্ষদেরও একটা অংশ দখল করে থাকে। এদের কথায় ও কাজে কোন মিল নেই। ধর্ম বলতে এরা নিজেদের স্বার্থকেই বোঝে। সম্ভাবনাময় প্রতিভাকে এরা সব সময় দাবিয়ে রাখে। এদের নির্মূল করতে হলে সচেতনবাদীদের ক্ষমতায় আসতে হবে এবং সম্রাট অশোক ও বাদশাহ আওরঙ্গজেবের মতো প্রাক্কালীন দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রশাসনিক গোঁজামিল আর ক্ষমতা লাভ বা দখলের মহড়া বন্ধ করে সত্যিকার দেশপ্রেমিকের আত্মপ্রকাশ ঘটুক নইলে স্বাধীকার, স্বাধীনতা, সভ্যতা, কৃষ্টি এ সবই অর্থহীন হয়ে পড়বে। বহিঃশক্তির প্রভাবে মারাত্মক অবনতি ডেকে আনবে এই জাতির ভাগ্যাকাশে।
চাহিদা পূরণের ন্যুনতম সুযোগ সৃষ্টি করে সামাজিক অবক্ষয় রোধকল্পে সচেতনবাদের বিপ্লব এনে অর্থনৈতিক মুক্তি সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে একটি স্বনির্ভর জাতি গঠনের বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হোক। নইলে অন্ধকারের আস্তাকুড়-ই হবে আমাদের আসল ঠিকানা।
(নিবন্ধটি ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ৭ জুলাই রচিত)
লেখক : কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।





