মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান, শেরপুর : ‘রঙ্গরসের দিন, ছিল আমার একদিন/বার ঘন্টার বেলা আমার সন্ধ্যা হল, পাখি উড়ে যাবার বুঝি সময় হল’-এমন শত আধ্যাত্মিক গানের আত্মিক পথিক, স্বরাজে যার সুমধুর সুর, তাকে নিয়ে নিবিড় পথচলার শ্রান্তির ফাঁকে আজকের এই লেখা। হতাশাগ্রস্ত এক জন্মান্ধ; যার মোহিত সুরে বেদনা-বর্ষার বিষাদ, অন্তরে বরিষণের ব্যথা, ক্লান্ত পরিশ্রান্ত পথিক হৃদয়, সুরের মুর্ছনায় উজ্জীবিত হয়; তিনি আর কেউ ননÑ শেরপুর-জামালপুরের অতি পরিচিত মুখ অন্ধ পথশিল্পী মোহন আলী।
১৯৬৩ সালে জামালপুর সদরের রানাগাছা ইউনিয়নের নান্দিনা গ্রামের ধনাঢ্য রায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মোহন। তার বাবা ছিলেন ইন্দ্রকুমার রায়, মাতা অরুণা দেবী। ৫ সন্তান নিয়ে সুখী সুন্দর পারিবারিক জীবন ছিল তাদের। ৫ সন্তানের মধ্যে মোহন ছিল পঞ্চম। মোহনের বয়স যখন ৭/৮ মাস, তখনই তার মা অরুণা দেবী পরলোক গমন করলে তার বড়দিদি রঙিলা দেবী তাকে কোলে-কাঁখে মানুষ করেন। এমন অবস্থায় তার বাবা ইন্দ্র কুমার দ্বিতীয় বিয়ে করলে জন্মান্ধ মোহনের জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। সময়টা ছিল ১৯৭১। তিনি ছিলেন ৭/৮ বছরের অন্ধ বালক। চারিদিকে বাজছিল যুদ্ধের দামামা। বড়ভাই বিধান চন্দ্র রায় মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করলে পাকিস্তানী দোসর রাজাকাররা তাদের সর্বস্ব লুটে নেয়। অসহায় হয়ে পড়ে পুরো রায় পরিবারটি। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দারিদ্রের কষাঘাতে ছন্দহীন জীবনে ভাগ্য অন্বেষণে বাড়ি ছেড়ে ময়মনসিংহ সদরের কেওয়াটখালী শ্মশানে আশ্রয় নেয় মোহন। ছোটবেলা থেকেই বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে অন্যদের তন্ময় করাই ছিল তার কাজ। এরই ধারাবাহিকতায় আধ্যাতিক গানের জগতে অনুপ্রবেশ তার। শ্মশানের জীবনযাপন ভাল না লাগায় ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জ জামাল উদ্দিন হেকিমের তত্বাবধানে এক বছরের অধিক সময় শুধু খাদ্যের বিনিময়ে বাজারে বাজারে গান গেয়ে ঔষধ বিক্রির কাজ করেন। পরে ওখান থেকে জামালপুরে ডেঙ্গারঘর গ্রামে কাজী সাধুর আসরে গান শেখার মনস্থ করে তার সেবায় নিয়োজিত হন। এরই ফাঁকে ফাঁকে জামালপুর রেল স্টেশন ও শেরপুর ফেরীঘাটে স্বরাজ নিয়ে দরাজ গলায় গান গেয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত পথযাত্রীদের মনোরঞ্জন দিয়ে উপার্জন করতে শেখেন। ওইসময় কাজী সাধুর এক অমর বাণী ‘এক জায়গায় পাবি শিক্ষা, অন্য জায়গায় পাবি ভিক্ষা’ এ আর্শিবাদকে সাঙ্গ করে জামালপুরস্থ হযরত শাহ জালাল (রা.) মাজারের খাদেম জামাল উদ্দিন আহমেদের সান্নিধ্য লাভ করেন। সময়টা ৮২/৮৩ সালের কথা। খাদেম জামাল উদ্দিন সাহেব মারা গেলে তার গ্রামের বাড়ি ধানুরপাড়া মাজারের খাদেম নিযুক্ত হন। আর ওইসময় এলাকার লোকজন মোহনের উপার্জিত যৎসামান্য যা ছিল তাই দিয়ে ৭ শতক জমি কিনে দেন। ওইসময় রায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করা মোহন মাজারে মাজারে দিনাতিপাতের এক পর্যায়ে ইসলাম ধর্মে অনুপ্রাণিত হয়ে এবং মুসলমানদের সুহৃদ ভালবাসায় আকৃষ্ট হয়ে নিজ ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আনোয়ারা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিবাহিত জীবনে এক বছরের মাথায় তাদের কোলজুড়ে আসে দিলরুবা ইসলাম দোলা। সে বর্তমানে চট্টগ্রাম মহিলা পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। এরপর দ্বিতীয় পুত্র মোঃ রতন সরকার স্থানীয় নন্দীর বাজার উদয়ন একাডেমী থেকে এসএসসি পাস করেছে। ছোট ছেলে মোঃ মানিক মিয়া শেরপুর শহরের দিশা প্রিপারেটরী এন্ড হাই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। এ অবস্থায় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন মোহনের জন্য অসাধ্য হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, ব্রহ্মপুত্র ফেরীঘাট, জামালপুর রেল স্টেশন, আন্তঃজেলা বাস সার্ভিসগুলোতে প্রতিদিন স্বরাজ, বাঁশের বাঁশিতে সুরের ঝংকার তুলে যা আয় হতো তাতে স্বাচ্ছন্দ্যেই চলছিল আমার সংসার। এখন ট্রেনে গান গাইতে গেলে রেল পুলিশ ও টিটি সাহেবরা ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেয়। ব্রহ্মপুত্র ফেরীঘাটে ব্রিজ নির্মিত হওয়ায় ও সিএনজি অটোরিক্সার যুগে জামালপুর-শেরপুর জেলার বাস সার্ভিসগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার সুরের পরিসর ছোট হয়ে গেছে। অন্যদিকে ডিজিটাল এ যুগে বড় বড় শিল্পীদের গান যেখানে হরহামেশাই মোবাইলে শোনা যায়, সেখানে মোহনের মত পথ শিল্পীদের বাশির সুরে এখন আর কারও মন টলে না। তবুও জীবন-জীবিকার তাগিদে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার কথা ভেবে লোকজনের সামনে স্বরাজের ঝংকার তুলি। যাতে মানুষ গান শুনতে আগ্রহী হয়। এতে অনেকেই ২/১ টাকা দিয়ে বিদায় দেয়। আবার অনেকেই আমার দারিদ্রতার হতশ্রী দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ অবস্থায় জন্মান্ধ পথ শিল্পী মোহনের দৈন্যতা আর ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যত ভাবনা তাকে ভাবিয়ে তুলছে। মোহন আরও জানায়, আমার বড় দাদা বিধান চন্দ্র রায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুবাদে বিভিন্ন জাতীয় প্রোগ্রামে দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার সুযোগ হয়েছে। সেই সুবাদেই শেরপুর-জামালপুর অঞ্চলের শীর্ষ জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সমাজের অর্থ ও বিত্তবানসহ সরকারি-বেসরকারি ছোট-বড় কর্মকর্তা-কর্মচারি, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, সকলেই আমাকে চেনেন, আমিও তাদের চিনি। কিন্তু আমার হেন দুরবস্থায় এগিয়ে আসছেন না কেউ। কথাগুলো বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোহন আলী। এরপর কিছুটা সময় নীরব থেকে ন্বরাজে হৃদয়বীণার সুরে গেয়ে উঠেন, ‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে, একটু সহানুভূতি, মানুষ কি পেতে পারে না?’
শুধুই নিজের প্রিয় সন্তানের কথা ভেবে নয়, মোহনের মত অসহায় দিন-দরিদ্র মানুষের সন্তানরাও যেন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশ ও জাতির সেবায় নিয়োজিত হতে পারেÑ এই প্রত্যয়ে আমরা সকলেই মোহনের মেধাবী সন্তানের সুশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে সাহায্যের হাত প্রসারিত করি। সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা- মোহনের বিকাশ একাউন্ট নাম্বার ০১৯৪২১৭৭৯৩৪।




