
নালিতাবাড়ী প্রতিনিধি : ২৪ এপ্রিল; সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডীর ৩ বছর পূর্তির পরও শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নিহত ৯ শ্রমিকের স্বজনদের বিলাপ আজও থামেনি। ওই দিনে কে জানতো আব্দুল মুন্নাকে হারাতে হবে ছেলে, মেয়ে ও ছেলের বউকে। সাভারে রানা প্লাজা ধ্বসে শুধু আব্দুল মুন্না নন, নালিতাবাড়ী উপজেলার অনেকেই হারিয়েছেন মা বাবা ও সন্তান।
রবিবার বিকেলে সরেজমিনে নালিতাবাড়ী পৌর শহরের চকপাড়া মহল্লায় গিয়ে রানা প্লাজা ধসে নিহতের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই প্রিয়জনের মুখটাও দেখতে পারেননি। স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ওই ঘটনায় এলাকার এমনই এক স্বজন হারা বাবা আব্দুল মুন্না। তিনি হারিয়েছেন ছেলে, মেয়ে ও ছেলের বউকে। তিনি জানান, ভয়াবহ ওই ভবন ধসের ঘটনায় তিনি তার মেয়ের লাশটা পর্যন্ত পাননি। এখন তার পরিবার জুড়ে শুধু হাহাকার। আব্দুল মুন্না জানান, সংসারে একটু স্বচ্ছলতার আশায় ২ ছেলে ৩ মেয়ে ও ছেলে বউকে নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাভারে। সেখানে তিনি কুলিগিরি করতেন। আর ছেলে সেলিম রানা, ছেলের বউ রহিমা ও মেয়ে মনিরা কাজ করতো রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় নিউ বটম গার্মেন্টেসে সুইং অপারেটর ও হেলপার হিসেবে। তিনি আরও জানান, ধ্বসের ঘটনার ৩ দিন পর অধর চন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে ছেলের বউ রহিমা ও এর দু’দিন পর ছেলে সেলিম রানার লাশ পেলাম। মেয়ে মুনিরার লাশ তো পেলামই না। ১০ মাসের নাতি রনিকে নিয়ে চলে এলাম নালিতাবাড়ীর নিজের ঠিকানায়। মাত্র ৮ মাসের মাথায় বাবা-মার স্নেহ বঞ্চিত নাতিটিও একদিনের ডায়রিয়ায় মারা গেল। ছেলে শাহীনুরকে দিয়েছিলাম স্থানীয় একটা লেদ মেশিন কারখানায় কাজ করতে। সেখানে দুঘটনায় তার ডান হাতের কবজি হারিয়ে বাড়িতে বসে আছে। এখন মেয়ে শুক্কুরি, মাঞ্জুরা আর তার স্ত্রীকে নিয়ে ৫ সদস্যের সংসার। বিভিন্ন সংস্থা থেকে দেওয়া ছেলে মেয়ে ও নাতির জন্য দেওয়া ৪ লাখ টাকায় জমি এগ্রিমেন্ট নিয়ে চাষাবাদ করে কোন মতে চলছেন।
একই মহল্লার আঃ রফিক ও আনোয়ার বেগম কন্যা রোকসানা আক্তার রনি ছেলে রাসেলকে নিয়ে অভাবের তাড়নায় সাভারে গিয়েছিলেন। সেখানে রফিক আনোয়ারা রানা প্লাজার পাশে হোটেল চালাতেন আর মেয়ে রোকসানা রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় কাজ করতেন। একই সঙ্গে কাজ করতেন রোকসানার স্বামী ইমরান হোসেন। ঘটনার ৩ দিন পর মেয়ে ও ৫ দিন পর মেয়ের লাশ পান তারা। এখন তাদের রেখে যাওয়া সন্তান রণিকে নিয়ে তারা চকপাড়া মহল্লায় কোনমতে বেঁচে আছেন। তাদের জীর্ণ টিনের ঘরটিতে ঢুকতেই নজরে পড়লো রোকসানা ইমরানের ছবি। নিহত বাবা মায়ের ছবি আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছিল তাদের আদরের সন্তান সাড়ে ৫ বছরের সিয়াম। এখন ওই ছবিটাই তার সম্বল।
আর ওই এলাকার হারেজ আলী জানান, রানা প্লাজা ধসে তার বড় ছেলে আব্দুল হালিম ছন্দা নামে ৩ বছরের এক কন্যা রেখে মারা গেছে। সেই ছিল তার ৫ সদস্যের পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ছেলের মৃত্যুর পর বিভিন্ন জায়গা থেকে যেটুকু আর্থিক সহায়তা পেয়েছিল, তার সিংহভাগ নিয়ে ছেলের বউ হেলেনা নাতিকে ফেলে রেখে অন্য স্বামীর ঘরে চলে গেছে। ফলে এক দুর্বিষহ জীবন কাটছে হারেজ আলীর।
বাবা হাবিবুর রহমান ও মা রুবি বেগম তাদের দুই সন্তান আবু জাফর সেন্টু ও সেকান্দরকে হারিয়ে এখন পাগল প্রায়। রুবি বেগম জানান, এক ছেলের লাশ পেলেও, আরেক ছেলের লাশ পাইনি। একই মহল্লার মন্নাফ মিয়ার কন্যা মানছুরা আক্তার মুন্নি (১৮) ভবন ধসের এক ঘন্টা পর উদ্ধার হয়ে সাভার সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে জীবনটা ফিরে পেয়েছেন । তবে এখন বেঁচে আছেন জীবন্মৃত হয়ে। মানছুরা জানান, মাত্র ৩ মাস আগে তিনি কাজ নিয়েছিলেন, রানা প্লাজার তৃতীয় তলায় নিউ ওয়েভ বটমে। ভবন ধসের ঘটনায় নিচে নামতে গিয়ে দোতলার সিঁড়িতে আটকা পড়েন। মাথায় এবং শরীরে প্রচন্ড আঘাত প্রাপ্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সাভার সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসা নেওয়ার পর সে বেঁচে উঠে। তারপর চলে আসে বাড়িতে। ৩ বছর পার হলেও সেই ভয়াবহ ঘটনার আতঙ্ক এখনও কাটেনি। সে জানায়, এক বছর পর আবার একটি গার্মেন্টেসে কাজ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু গার্মেন্টেসে ঢুকলেই আমার চোখের সামনে সেদিনের দৃশ্য ভেসে উঠে। এ ছাড়াও মাঝে মাঝেই মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা হয়। তাই এখন বাবার বোঝা হয়ে আছি। আহত হওয়ার পর ৪ বারে বিকাশের মাধ্যমে ৯৫ হাজার টাকা পেয়েছিলাম। সে টাকা আমার ওষুধ কিনতেই শেষ হয়ে গেছে।





