বিপ্লব দে কেটু
আমাদের বাঙ্গালী কৃষ্টি-সংস্কৃতির আরেকটি অধ্যায় হলো পহেলা বৈশাখ। আর এই পহেলা বৈশাখকে ঘিরে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে জায়গা ভেদে একেক জায়গায় একেক রকম আচার-অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। যদিও এ বছর একই দিনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন হতে যাচ্ছে। এটা কোন স্থায়ী সমাধান নয়। হয়তো আগামী পহেলা বৈশাখটা এভাবে একই দিনে নাও উদযাপন হতে পারে! আমার আলোচনার বিষয় এই দিনটিকে নিয়ে। যে দিনটিতে আমার দেশের মানুষ একই সংস্কৃতিতে যুক্ত হয়ে এক রাস্তায় হাটবে, এক ভাষায় কথা বলবে। এখানে নেই কোন দল, নেই কোন মত, নেই কোন ভিন্নতা। তবে এটা বলতে পারি, পহেলা বৈশাখটা আমাদের একেবারে নিজস্ব একটা সংস্কৃতি। এটাকে আলাদা করে ভাবা যাবে না। ভাবার উপায়ও নেই ।
আমাকে যদি কেউ প্রশ্ন করেন পহেলা বৈশাখ মানে কি ? আমি বলবো পহেলা বৈশাখ মানে চৈত্রের ভর দুপুরে তপ্ত মাঠের প্রখর তাপে এক কোদাল কাঁচা মাটি। যেখানে আমার আবহমান বাংলার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। পহেলা বৈশাখ মানে আমার লাল-সবুজের পতাকা, পহেলা বৈশাখ মানে আমার কৃষকের মুখে পাকা ধানের হাসি, পহেলা বৈশাখ মানে আগের দিন অর্থাৎ ৩০ শে চৈত্র শাক তিতা খেয়ে দিনটিকে বিদায় দেওয়া।
বৃটিশদের ২শ বছর শাসনের পর আমাদের দেশে পাকিস্তানিরা শাসন করেছে। আমাদের যাদের বয়স স্বাধীনতার আগে বা পরে তারাই কোন বিশেষ বিষয়ে উদ্বৃতি দিতে গেলে যদি বিষয়টি ৪৭ এর আগে বা পরে হয়, তাহলে বলে থাকি বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের পরে বা আগে। আর যদি ৭১ এর আগে বা পরে হয়, তাহলে বলি স্বাধীনতার আগে বা পরে। তাইতো স্বাধীনতার পরে অর্থাৎ হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলের পর থেকেই পহেলা বৈশাখের এই জটলার সৃষ্টি হয়, আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে। আর এই বিষয়টার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাও নেই আমার কাছে, যে কি কারণে পূরোনো এই সংস্কৃতিটার ব্যত্যয় ঘটলো। তার আগে অর্থাৎ এরশাদের আগেও পহেলা বৈশাখ আমার মনে হয় একই সংস্কৃতিতে গাঁথা ছিল।
এখন যা হচ্ছে গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালের ১৪ এপ্রিল সোমবার পহেলা বৈশাখ। পঞ্জিকামতে সেদিন ছিল ৩০ শে চৈত্র পরদিন পহেলা বৈশাখ। একই আকাশ, একই বাতাস, একই সংস্কৃতির একই পরিমন্ডলে এটা কি ? এটা কি ধর্মীয় উৎসব ? মোটেই না! কোন জাতিকে কি পহেলা বৈশাখ উইল করে দেওয়া হয়েছে ? যে এটাকে ওরা ধর্মীয় আলোকে পালন করবে ! হ্যাঁ যদি কেউ এই দিনটাকে ধর্মীয় আলোকে পালন করতে চায়, ওটা সম্পূর্ণ ওই লোক কিংবা ওই ব্যক্তি গোষ্ঠীর নিজস্ব বিষয়। কিন্তু পহেলা বৈশাখ সার্বজনীন। ধর্ম যার যার, পহেলা বৈশাখ সবার।
আমার কাছে মনে হয় আমরা গোটা বাঙালি জাতি অর্থাৎ হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান যারা এই বাংলা ভাষা-ভাষীর আমরা না বুঝেই সহজেই অনেক কিছু মেনে নেই। পৃথিবীর অন্য কোন জাতি এত সহজে নিজের ইতিহাস ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভাবে না। ১৪ ই এপ্রিল কি এটা ইংরেজি মাসের একটি তারিখ। ১৪ এপ্রিলকে স্মরণ করে ঠিক রেখে আমার পহেলা বৈশাখ এর দিন-ণ ঠিক করতে হবে! তাহলে আমার অস্তিত্ব ঠিক থাকলো কিভাবে ? এ জায়গা থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। আর এ জায়গা থেকে সরে আসতে হলে আমাদের স্বাধীনতার আগে কিংবা বৃটিশ আমলের আগে-পরের কোন এক সময়ের বছর থেকে অনুসরণ করতে হবে- আমাদের পহেলা বৈশাখের ধারাবাহিকতাকে। আমি সবার আগে স্মরণ করবো আমার বাংলা সনকে। ধর্মীয় দিক থেকে বিচার করলে মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজস্ব একটা সন আছে তা হলো হিজরি সন। সেটা ধর্মীয় কার্যক্রমের জন্য অবশ্যই তাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমি সে আলোচনায় যাবো না ।
আমরা চাইবো আগামী ৩০ চৈত্র ১লা বৈশাখ এর কোন ভাগ-বাটোয়ারা থাকবে না। এটা হবে, গোটা জাতির কৃষ্টি- সংস্কৃতির উৎসব। যেমন ২১ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। আমরা চাইবো আমাদের পহেলা বৈশাখ ঘটা করে পালন করবো, দেখবে সারা বিশ্ব।

লেখক : সাংবাদিক, শেরপুর।




