ড. আবদুল আলীম তালুকদার

পৃথিবীর অনেক দেশ বিনা রক্তপাতে ঔপনিবেশিক পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়েছে। কিন্তু আমাদের স্বাধীনতা এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া। যা বাঙ্গালি জাতির জন্য বিশেষ গৗরবের ও আত্মমর্যাদার। হাজার বছরের বাঙ্গালি জাতির আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল এই স্বাধীন স্বার্বভৌম বাংলাদেশ। একদিনে হঠাৎ করে বিশেষ কোন মুহূর্তে এই বিজয় অর্জিত হয়নি। চুড়ান্ত বিজয় তথা আকাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জিত হয় নয় মাসের সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
ভুলে গেলে চলবে না- আজ যা অর্জন, তার কিছুই হয়তো সম্ভব হতো না, যদি না বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি তৈরী না হতো। লাখ লাখ শহীদ ও অগণিত মা বোনের জীবন-সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এ স্বাধীনতা সত্যিকার অর্থে তখনই সার্থক হবে, যখন দেশের প্রতিটি মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে তার মৌলিক চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করতে পারবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এ জাতির দীর্ঘ ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অধ্যায়। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধারা হলেন এ জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। প্রশ্ন হলো, যে লক্ষ্য ও আদর্শ সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল সাধারণ মানুষ, সে লক্ষ্য ও আদর্শ কতটা অর্জিত হয়েছে? স্বাধীনতার প্রধান আকাঙ্খা ছিল সব ধরনের অধীনতা থেকে মুক্তি এবং সমাজে গণতন্ত্র, ন্যায় ও সমতা প্রতিষ্ঠা। আমরা সে সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে কতটা পেরেছি ?
প্রত্যেক জাতিরই গর্ব করার কিছু বিষয়ের পাশাপাশি কিছু গভীর ক্ষত ও গ্লানি থাকে। বাঙালি জাতির গর্ব করার প্রধানত দুটো জায়গা- বাংলা ভাষা রক্ষার জন্য রাজপথে রক্তদান এবং একাত্তরে চরম ত্যাগ ও রক্তক্ষয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। আর অত্যন্ত গ্লানিময় অধ্যায় হচ্ছে দুই লাখেরও বেশী মা-বোনের সম্ভ্রমহানি। ওই দুঃসহ স্মৃতি স্মরণে এলে সচেতন বাঙালি মাত্রই আবেগে আপ্লুত হয়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারে না ।
মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরেও আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি পুরোপুরিভাবে আসেনি। সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, মানবাধিকার, ভোটের অধিকার ও আইনের শাসনজনিত গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিও খুব একটা সুখকর নয়। এ জন্য আমাদের আরো তৎপর ও মনোযোগী হওয়াসহ অসীম ত্যাগ স্বীকার করার মন মানসিকতা অর্জন এখন একান্ত জরুরী বিষয়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গণতন্ত্রকে আরো দ্রুততার সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে দলমত নির্বিশেষে। গণতন্ত্র এগিয়ে গেলেই দেশ আরো এগোবে এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হলেও এর ঐতিহাসিক পটভূমি ছিল সুদূর প্রসারী। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ ছিল হিন্দু, অপরদিকে পাকিস্তানে প্রাধান্য ছিল মুসলমানদের। পাকিস্তানের ছিল দু’টি অংশ- পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান। সংস্কৃতিগতভাবে পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছিল এটা দিবালোকের মত সত্য। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল এ স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে দেশের পুরো জনসাধারণকে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ত্যাগ তিতীক্ষার ফল আমাদের এ স্বাধীনতা। অনেক দুঃখ-কষ্ট-যাতনা, আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের রক্ত¯œাত একটি পতাকা। এ পতাকা আমাদের অহংকার। স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিক হিসাবে এ কষ্টার্জিত পতাকাকে কোনোভাবেই অমর্যাদা করা কোন বাঙালির জন্য সমীচীন হবে না।
আত্মসচেতন বাঙালি হিসাবে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, স্বপ্ন ছাড়া বাংলাদেশকেও এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। স্বপ্নবিলাসী বাঙালি দেশের ভবিষ্যৎ গড়বে, বেঁচে থাকার সংগ্রাম করবে এটাই স্বাভাবিক। দেশের সাধারণ মানুষকে প্রান্তিক ও মানবেতর পর্যায় থেকে আমাদের মুক্তি দিতেই হবে। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ক্ষুধা ও দারিদ্য্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষনের শপথও ছিল তার মধ্যে। অন্ন,বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা- এ সব ক্ষেত্রে চার দশকের অধিককাল সময়েও আশানুরুপ অগ্রগতি হয়নি। এখনো দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ দারীদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করছে। নিরন্ন মানুষের হাহাকার এখনো গ্রামীণ জনপদে চোখে পড়ে। স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশের পর বিগত ৪৫ বছরে বাংলাদেশ লালন করেছে অমিত সম্ভাবনা, আশা ও স্বপ্ন। হাজারো পিছুটান সত্ত্বেও দেশটির অগ্রগতি ও উত্তরণ সত্যিই বিস্ময়কর। তবে এখনো আমাদের পুরোপুরি অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। এখন আমাদের সকলের উচিত দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করা। স্বাধীনতার পর এই দীর্ঘ সময়ে আমাদের অনেক সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি। এশিয়ার ব্যাঘ্র হিসাবে বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে খ্যাত।
বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনাময় একটি দেশ- এ কথা বারবার উচ্চারিত হয়ে আসছে। এ সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠা পাবে বা বাস্তবায়ন ঘটবে তার শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মানব সম্পদ উন্নয়ন প্রচেষ্ঠা, নারীর অধিকার সংরক্ষণ, মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ এবং দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সহ সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করার মধ্য দিয়ে। দেশ থেকে দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। সে জন্য প্রয়োজন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা।
পাহাড়সম স্বপ্ন বুকে নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রায় অর্ধ শতাব্দী সময়ের এ পথ পরিক্রমায় সে স্বপ্নের কতটা পূরণ হয়েছে, আজ সে হিসাব মেলাতে চাইবে বাঙালি জাতি সত্ত্বার প্রায় সবাই। এর মধ্যে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। রাজনীতি এগিযেছে অমসৃন পথে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বারবার ধাক্কা খেয়েছে অনাকাঙ্খিত ঘটনায়। জনবহুল ও সীমিত সম্পদের এ দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ রুপে গড়ে তোলার কাজও সহজ ছিল না। যে কোন জাতির শক্তির প্রধান উৎস ঐক্য। প্রায় সবক্ষেত্রেই অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন এটি। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় অর্জনের পেছনে কাজ করেছিল মত-পথ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে স্বাধীনতার পর আমরা সে ঐক্য ধরে রাখতে পারিনি। রাজনৈতিক বিভাজন দেশে গণতন্ত্রের ভিত সুদৃঢ় করার পথে বড় অন্তরায় হয়ে রয়ে গেছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের নেতৃত্বকে। সেজন্য জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোয় অভিন্ন নীতি অনুসরণ অপরিহার্য। আমাদের সম্ভাবনা অসীম। জাতীয় ঐক্য ছাড়া তা যথার্থভাবে কাজে লাগানো যাবে না। দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে সব সমস্যা মোকাবেলায় সচেষ্ট হলে আমাদের অগ্রগতি ঘটবে দ্রুত। বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও দেশের মানুষের কল্যাণে রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক বিভেদ-হানাহানি ভুলে দেশকে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেবে এটাই এ দেশের সমাজ সচেতন নাগরিকের প্রত্যাশা।
লেখকঃ কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও প্রভাষক, শেরপুর সরকারি কলেজ, শেরপুর।




