মাথায় মুক্তচিন্তার খড়গ। সকল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অপরাধে সোচ্চার আমার হাতের অমূল্য কলম। তবুও ভয়ে ভয়ে লিখছি কখন জানি কারও বিদ্বেষের শিকার হয়ে নতজানু হয়ে যাই। তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণেই আজ সারা বিশ্বে নাগরিক সাংবাদিকতার মতো এক মহাপরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। শহরতলী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কোথাও কোন অপরাধ সংঘটিত হলে, যেকোন সচেতন নাগরিক একা বা সম্মিলিতভাবে তার প্রতিবাদ করতে পারেন। ধরুন সিলেটের সামিউল আলম রাজন হত্যাকান্ডের কথাই। প্রযুক্তি শিশুটিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও ফুটেজ প্রচার না করলে রাষ্ট্র তথা সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে তুলতে পারতো না। নীরবে নিভৃতেই কাটতো বিচারের বাণী। কেবলমাত্র প্রযুক্তির কল্যাণেই হত্যাকান্ডের মূল হোতা কামরুল দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে গিয়েও রেহাই পায়নি।

তথ্যপ্রযুক্তি আমাদেরকে এনে দিয়েছে অপার সম্ভানাময় এক রাষ্ট্রের। ইন্টারনেট বর্তমানে সকলের জন্য তথ্য বিনিময়ের অন্যতম প্রধান পথ। অন্য সকল পথ যখন বন্ধপ্রায়, ঠিক তখনই দেশের কোটি কোটি মানুষ তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে তাদের সুপ্ত স্বপ্নের কথা বিনিময় করছে সহসাই। ইন্টারনেট উন্মুক্ত থাকার সুবাদে আমরা সারাবিশ্বে সকল ভালোমন্দ কর্মকান্ডের খোঁজ-খবর জেনে সকল উন্নয়নমুখী ভাবধারার শরিক হতে পারছি সদা সর্বদাই। কিন্তু আঁধারের বিপরীতে যেমন আলো, তেমনি ভালোর বিপরীতে মন্দও লুকায়িত। তথ্যপ্রযুক্তির যে কেবলমাত্র উন্নয়নের ও যোগাযোগের বিপথমুক্ত বাহন ঠিক তা নয়। এখানেও রয়েছে নানা বাধা-বিপত্তি। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তেই ঘটছে ‘সাইবার ক্রাইম’। নারীরাই সাইবার ক্রাইমের শিকার বেশি হচ্ছেন। কেবল অশ্লীল ভিডিওচিত্র ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করা শুধু তাই নয়, ইন্টারনেট অপব্যবহারকারীরা প্রতিনিয়ত একের পর এক অপরাধ করেই যাচ্ছে।
একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট কানেকশন, আর সেলফি হচ্ছে নতুন প্রজন্মের সার্বণিক হাতিয়ার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বদৌলতে সেলফি শব্দ ও সংস্কৃতি জনপ্রিয়তা পেয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি। তবে তা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছে হাটে, মাঠে, ঘাটে, পথে-প্রান্তরে সর্বত্রই আজ সেলফির জয়জয়কার। সত্যিই এই অভিনব পদ্ধতি ছবি তোলার এবং সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাবলম্বী করেছে। এটা এক অর্থে বেশ ভাল ও আনন্দের কথা। ব্যস্ত দুনিয়ায় পরনির্ভরশীলতা যতটা কমবে ততই মঙ্গল। কিন্তু সবকিছুতে স্বনির্ভরতা মানুষকে করে তুলে স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক। আত্মকেন্দ্রিক ও বিচ্ছিন্নভাবে বেঁচে থাকা মানুষ কখনও সমষ্টিগতভাবে কোন জাতিকে দাঁড় করাতে পারে না। তাই সেলফি ম্যানিয়ার স্রোতে গাঁ ভাসিয়ে দেওয়ার আগে এর ভবিষ্যত সম্পর্কে জানা দরকার। কেননা সামষ্টিকতা ছাড়া ব্যক্তি বা মানুষ মূল্যহীন। অথচ আমরা ইদানিং আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি বহুলাংশে। এমনি অবস্থায় আজকের সামাজিক গণমাধ্যমের যুগেও মানুষ হয়ে উঠেছে অসামাজিক। বিভিন্ন সামাজিক গণমাধ্যমে প্রতিহিংসা ও হীনস্বার্থে কেউ কেউ কিশোর-কিশোরী মেয়েদের ছবি সম্বলিত স্ট্যাটাস দিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। অশ্লীল ছবি ছড়িয়ে দিয়ে শিশু-কিশোর মনে অপ্রত্যাশিত যৌনাচারিতার জন্ম দিচ্ছে। ফলে কিশোর-কিশোরীরা তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ ও পূর্ণতা লাভের আগেই যৌন কামনায় কামুক হয়ে উঠছে। ফলে সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটছে শিশু ধর্ষণ ও বাড়ছে কিশোর অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ গণমাধ্যমের সূত্র ধরে হচ্ছে প্রেম, প্রণয়, বিয়ে ও বিচ্ছেদের মতো ঘটনা। ইন্টারনেট ব্যবহার করে জঙ্গি তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে একটি গোষ্ঠি সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রকাশিত খবরে জানা যায় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাকারদের কবলে পড়লে তা ৪/৫ দিনের অব্যাহত প্রচেষ্টায় চালু করা সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া রাজধানীর মুগদায় ছেলে শিশুদের দিয়ে একটি স্টুডিওতে পর্ণো ছবি তৈরি করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বাজারজাত করায় শিশু সাহিত্যিক টিপু কিবরিয়াসহ তার দুই সহযোগিকে ২০১৪ সালে গ্রেফতার করে সিআইডি।

তথ্য-প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে যদি অপরাধীও বৃদ্ধি পায়, তবে তা কোন ইতিবাচক দিক নয়। এক্ষেত্রে অপরাধীর অপরাধ দমনে সুষ্ঠু আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশাসনকে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনে তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের পদক্ষেপ নিতে পারে। সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সুষ্ঠু নীতিমালার অভাব, তথ্য-প্রযুক্তি আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকায় ভূয়া পরিচয় নিয়ে নামে-বেনামে খোলা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাউন্ট। এ কারণে অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই এটা মনে রাখা দরকার, যখন কোন অপরাধী অপরাধ করে পার পেয়ে যায়, তখন সে আরও বেপরোয়ার হয়ে উঠে। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রেও এর কোন ভিন্নতা নেই। এজন্য সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন অপরিহার্য। সাইবার ক্রাইম অধিকাংশ ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা লেনদেন ও ব্যাংকিং জালিয়াতিসহ সমাজের প্রতিষ্ঠিত মুক্ত চিন্তার মানুষের নামে অবমাননাকর ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে হেয় করার অপচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এমনি একটি অনাকাঙ্খিত ঘটনার শিকার শেরপুর প্রেস কাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ কর্মকর্তা এবং স্থানীয় দৈনিক তথ্যধারা সম্পাদক। তাদের সম্পর্কে কথিত এক সাংবাদিক ২৯ অক্টোবর তার ফেইসবুক স্টেটাসে নগ্নভাবে বিষোদগার করে তা ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া প্রেস কাবের গতিশীল কর্মকান্ডে ঈর্যান্বিত মহলের যোগসাজসে ‘রেড ওয়াইন’ নামে একটি ফেইসবুক ফেইক আইডির মাধ্যমে শুধু প্রেস কাব কর্মকর্তারাই নয়, সাইবার নগ্নতার শিকার হয়েছেন আরও কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সু-প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। আইসিটি এ্যাক্ট এর আওতায় ওইসব অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা থাকলেও তার প্রয়োগ সামান্যই। স্বাধীন মত প্রকাশের নামে অনাচার বরদাশত করা যায় না। ইন্টারনেট বর্তমান বিশ্বের একটি শক্তিশালী উদ্ভাবন। মাত্র ৩০ বছরের ব্যবধানে বিশ্বের চেহারা বদলে দিয়েছে। তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে উদ্ভাবিত হচ্ছে নতুন নতুন ফর্মূলা। বিশ্ব রাজনীতির চেহারাও পালটে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তথ্য-প্রযুক্তির সুফল মানুষের ক্রমশই সহজলভ্য হচ্ছে। এ অবস্থায় যারা মুক্ত চিন্তার সুপ্ত বিকাশ ঘটিয়ে ভাল কিছুর সুবাস প্রতিটি মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে, তাদেরকে বিভিন্নভাবে হেয় করার মানসিকতা নিয়ে একটি দুষ্টচক্র তথ্য-প্রযুক্তির অপব্যবহার করছে। ইতোমধ্যে আমাদের দেশেও কয়েকজন মুক্তচিন্তার বিকাশমান উদ্ভাবককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আবার অনেককেই বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। হয়তো ঘটনা ঘটেও যেতে পারে। তবে পুলিশ কি একইভাবে নীরব দর্শকই রয়ে যাবে ? যখনই কোন ঘটনা ঘটে তার সকল দায় এড়াতে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, দক্ষ জনবলের অভাব ও নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলে এড়িয়ে যাবে প্রশাসন- এটা হয় না। যদি তাই হয় তাহলে সরকারি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চেয়ে অপরাধীরা কি বেশি দক্ষ, সুসজ্জিত ? তারা কতটুকু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, যা সরকারের নেই- এ প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
যখন বিবেকবান মানুষরা তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্লোবাল বিশ্বায়নের চিন্তা করছে, তখন তার অপব্যবহ্রাও প্যারাসাইটের মতো দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। যা এখনই প্রতিহত করতে প্রত্যেককে সোচ্চার হওয়া দরকার। আজকের এই সভ্য সমাজে যখন একজন মানুষ আরেকজন মানুষের চোখ উপড়ে নিচ্ছে, মানুষ মানুষকে নিপুণভাবে হত্যা করছে, খুচিয়ে মারছে, পুড়িয়ে মারছে, একজন আরেকজনের প্রতি চরম নৃশংস আচরণ করছে, তখন আমাদের আবেগ অনুভূতিতে এতটুকুও সাড়া জাগছে না। আবার ওইসব নৃশংস ঘটনার দৃশ্যও কেউ কেউ অবলীলায় ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
ক্রমেই যেন ভাবলেশহীন, ভোঁতা, নিঃসাড় হয়ে যাচ্ছি আমরা। ঘটনা ঘটছে, প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছি না। প্রতিরোধ গড়ে তুলছি না। আশ্চর্য এক উদাসিনতা নিয়ে বাঁচতে শিখেছি আমরা। এ অবস্থায় সাইবার ক্রাইম একটি জাতীয় সমস্যা, যা জাতির অগ্রযাত্রায় বড় বাধাস্বরূপ। এই অসুস্থ্যতা থেকে যত দ্রুত সম্ভব পরিত্রাণ প্রয়োজন। নইলে আত্মমগ্নতায় আচ্ছন্ন নার্সিসের প্রতিকী মৃত্যুর মতো হবে মানবতার মৃত্যু। মৃত্যু হবে সুষম তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার। ধ্বংস হবে সভ্যতার যতসব অর্জন। তাই রাষ্ট্র তথা সমাজ সামষ্টিকভাবে ওই ভয়াবহ সাইবার ক্রাইম বন্ধে সময়োপযোগি পদক্ষেপ নিতে না পারলে সামষ্টিকভাবেই ওই ভয়াবহ পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার আশংকা রয়েই যাবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, শ্যামলবাংলা২৪ডটকম, নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক দশকাহনীয়া, শেরপুর, ই-মেইল : zubairrahman13@yahoo.com




