শ্যামলবাংলা ডেস্ক : এবার একাত্তরে স্বাধীনতার উষালগ্নে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যার দায়ে প্রধান ২ আলবদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। ৩ নভেম্বর রবিবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ওই রায় ঘোষণা করেন।
দন্ডিত ২ আলবদর নেতার বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ শিক্ষক, ৬ সাংবাদিক, ৩ চিকিৎসকসহ ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে অপহরণ ও হত্যার আনীত ১১টি অভিযোগই প্রমানিত হয়েছে।
মামলরা বিবরণে প্রকাশ, একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর রাতে দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দিন হোসেন এবং পিপিআইর চিফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হককে বাসা থেকে অপহরণ করা হয়। ১১ ডিসেম্বর ভোরে দৈনিক পূর্বদেশের চিফ রিপোর্টার আ ন ম গোলাম মোস্তফা, ১২ ডিসেম্বর বিবিসির সংবাদদাতা ও সাবেক পিপিআইর জেনারেল ম্যানেজার নিজাম উদ্দিন আহমদ, ১৩ ডিসেম্বর দৈনিক শিলালিপির সম্পাদিকা সেলিনা পারভীন এবং ১৪ ডিসেম্বর দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লা কায়সারকে অপহরণ করা হয়। একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, ড. আবুল খায়ের, ড. সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. সিরাজুল হক খান, অধ্যাপক ফয়জুল মহি, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ মর্তুজাকে অপহরণ করা হয়। ১৫ ডিসেম্বর বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক ডা. আলিম চৌধুরী এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট ডা. ফজলে রাব্বীকে অপহরণ ও নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। অপহৃত সাংবাদিকদের মধ্যে সেলিনা পারভীনের অর্ধগলিত লাশ রায়েরবাজার বধ্যভূমি থেকে একাত্তরের ১৮ ডিসেম্বর পাওয়া যায়। অন্য সাংবাদিকদের লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলা হয়। অভিযুক্ত দু’জন ছাত্রজীবন থেকে ইসলামী ছাত্রসংঘের সক্রিয় সদস্য হিসেবে এবং পরে হাইকমান্ডের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেন। চৌধুরী মঈনুদ্দীন আলবদর বাহিনীর ‘অপারেশন ইনচার্জ’ এবং আশরাফুজ্জামান খান ‘চিফ এক্সিকিউটর’ বা ‘প্রধান জল্লাদ’ ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে আলবদরের একটি সশস্ত্র দল পরিকল্পিতভাবে ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের অপহরণ করে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে। তারা বুদ্ধিজীবীদের বাড়ি থেকে অপহরণের পর মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের নির্যাতন ক্যাম্পে নিয়ে যেত। সেখানে আটকে রেখে তাদের ওপর চালানো হতো নির্যাতন। এর পর মিরপুর ও রায়েরবাজার ইটখোলা বধ্যভূমিতে নিয়ে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে লাশ ফেলে দিত।
২ মে দু’জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। এর পর তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এর পরও তারা হাজির না হওয়ায় ২৭ মে তাদের পলাতক ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। ২৪ জুন ১১টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করার মধ্য দিয়ে তাদের বিচার শুরু হয়। ওই মামলায় ১৫ জুলাই সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৫ জন সাক্ষ্য দেন। ২২ সেপ্টেম্বর এ মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষীদের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। পলাতক এ দুই অভিযুক্তের পক্ষে কোনো সাক্ষী না থাকায় ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে এ মামলায় যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়। ৩০ সেপ্টেম্বর যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়।

এদিকে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় প্রসিকিউশনের সমন্বয়ক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান বলেন, চোধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা ১১টি অভিযোগের সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে। তাদের প্রত্যেকটি অপরাধে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বিচারের পথ আরও প্রশস্ত হলো। এর মধ্য দিয়ে একাত্তরে যারা স্বজন হারিয়েছেন তাদের পরিবার স্বস্তি পাবে। এ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, তাদের মধ্যে এই প্রথম শুধু বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে বিচার হচ্ছে। বর্তমানে আশরাফুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের জ্যামাইকা এলাকায় এবং চৌধুরী মঈনুদ্দীন লন্ডনে রয়েছেন। এ প্রসঙ্গে এম কে রহমান বলেন, কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর সাহিদুর রহমান। পলাতক দুই আসামির পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া দুই আইনজীবী আবদুস শুকুর খান ও সালমা হাই টুনি।




