• রবিবার, ১১ এপ্রিল ২০২১, ০৩:৫১ অপরাহ্ন
/ Uncategorized

প্রযুক্তি উন্নয়নের এ যুগে মফস্বল সাংবাদিকতার মানোন্নয়ন কবে ঘটবে? -মুগনিউর রহমান মনি

শ্যামলবাংলা ডেস্ক
/ ৯৪ বার পঠিত
প্রকাশকাল : বুধবার, ৩১ জুলাই, ২০১৩

    Mugniur Rahman Moni     একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় পেয়েছি। মানুষ তার সকল কাজেই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার ঘটিয়ে দর্শক ও পাঠকের কাছে হয়েছে সমাদৃত। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়নে মফস্বল সাংবাদিকতায় এখনও আশাতীত মানোন্নয়ন ঘটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনতিই ঘটেছে। অনেক অযোগ্য লোকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে মহান, সম্মানজনক এবং প্রতিভাদীপ্ত এ পেশায়।
আমার নিজ জেলার কথাই বলি, হাতে গোনা কয়েকজন সাংবাদিক ছাড়া বাকী সবাই এ পেশায় নির্লজ্জভাবে অনুপ্রবেশ করেছেন। শুধু অনুপ্রবেশ নয়, তাদের নির্লজ্জ দাপট, দালালি, সিন্ডিকেট নিউজ, ফরমায়েসি খবরসহ যাবতীয় কু-কর্মের কারণে যারা সাংবাদিকতাকে মহান, সম্মানজনক এবং প্রতিভাদীপ্ত পেশা হিসেবে জেনে এখানে পা রেখেছিলেন তাদের পা এখন থেমে যাবার উপক্রম হয়েছে। তারা এখন নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিতে অনেকটা লজ্জাবোধ করছেন। আর এ সুযোগে সাংবাদিকদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে কুন্ঠিত হচ্ছেনা নাগরিক সমাজ।
জেলায় সাংবাদিকদের মধ্যে কয়েকজন রয়েছেন যারা ‘সাংবাদিক’ শব্দটি শুদ্ধভাবে উচ্চারণ না করে বলেন ‘সম্বাদিক’। জানিনা এটা ইচ্ছাকৃত, না অনিচ্ছাকৃত। অবশ্য যারা এ কাজটি করছেন তারাই এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন। কারণ তারা একেকজন স্থানীয়, আঞ্চলিক ও জাতীয় একাধিক বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজী দৈনিক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। তাদের কারো কারো পকেটে এক ডজন, দেড় ডজন সাংবাদিক পরিচয় পত্রও পাওয়া যায়। কোনো অফিসে তার সঙ্গে কোনো কিছু হয়েছে তো তিনি তার সব কার্ড (পরিচয় পত্র) টেবিলের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন, ‘ঠিক আছে- বিষয়টি আমার দেখবার আছে’। আসলে ওই সাংবাদিক (!) বন্ধু সাংবাদিকতার ‘স’ যে জানেন না, এটা তিনি না বুঝলেও সবাই কিন্তু তা বোঝেন। তিনি আবার কিছু স্বার্থান্বেষী ও সুযোগ সন্ধানী জ্যেষ্ঠ বা সমসাময়িক দাপুটে (?) সাংবাদিকের ফুট ফরমায়েস খেটে থাকেন। যে কারণে তিনি অফিস আদালতে গিয়ে এ কর্মগুলো করতে পারেন। আসলে তিনি বিজ্ঞাপন সংগ্রহ ও অফিসের কর্তা ব্যক্তির নিকট থেকে অবৈধ সুযোগ নিতেই এ জগতে এসেছেন। সমাজ বা সমাজের নাগরিককে কিছু দিতে নয়। এ সকল টাউট ও কুলাঙ্গারদের হাত থেকে কবে এ মহৎ পেশা ও পবিত্র অঙ্গন মুক্ত হবে এ প্রশ্নও রয়েছে নাগরিকদের মুখে।
অনেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বন্ধুকে এখনও দেখছি তাঁরা সংবাদ সংগ্রহ ও প্রেরণের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার কোনা রকম নীতিমালা মানছেন না। এটি কি তাঁরা ইচ্ছে করেই করছেন নাকি বিষয়টি সম্বন্ধে তাঁরা সম্যক ধারণা রাখেন না। শুধু তাই নয় সংবাদ লিখন, ভিডিওগ্রাফী এবং ফটোগ্রাফী কোনটাতেই তারা সংবাদ কাঠামো ও ব্যাকরণ মানছেন না। ফলে তাঁদের অনুজরা সেসব ভুল দেখে দেখেই ভুল সাংবাদিকতায় পটু (!) হয়ে ওঠছেন। সবচেয়ে যে বিষয়টি বেশি লক্ষণীয় তা হলো মফস্বল সাংবাদিকতায় ‘সাংবাদিকতা নীতিমালার’ চর্চা না হওয়ায় ক্রমেই সাংবাদিকদের আচরণে বেয়াদবীর লক্ষণ আশংকাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এ থেকে দ্রুত উত্তরণ না ঘটলে এর ফলাফল খুব একটা শোভনীয় হবার নয়।
প্রযুক্তির উন্নয়ন হলেও মফস্বল সাংবাদিকতায় প্রতিভা নেই এমন অযোগ্যদের অনুপ্রবেশ ঘটায় আশাতীত মানোন্নয়ন হচ্ছে না। এ বিষয়টি এখন অনেককেই খুব ভাবিয়ে তুলছে। এসব তথাকথিত সাংবাদিকরা ‘ঢাল নাই, তলোয়ার নাই, নিধিরাম সর্দার’ সেজে বসে আছেন। তাদের ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা ও প্রযুক্তির অন্যান্য সরঞ্জামাদি নেই, এমনকি কাগজ কলমেও ঘাটতি রয়েছে। এসব ব্যক্তিরা এখন দাপুটে সাংবাদিক সাজার অভিনয় ও কৌশল সবকিছুই চালিয়ে যাচ্ছেন রীতিমত। আর এসব ঢাল তলোয়ারহীন অযোগ্যদের অনুপ্রবেশ ঘটায় দেখা যাচ্ছে একটি পেন ড্রাইভ অথবা cc, bcc’র কল্যাণে তারাই দাপুটে বড় সাংবাদিক বনে যাচ্ছেন! এরকম ঘটনা যে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার এ সময়েই ঘটছে তা নয়, এ ধরণের ঘটনা পূর্বেও ঘটেছে তবে তা ছিল কিছুটা ভিন্ন। এজন্য বর্তমানের চেয়ে কিছু বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে তাদের। ফলাফলে ওইসব অযোগ্যরাও সময়ের পরিক্রমায় কিছুটা হয়তো জানতে ও শিখতে সক্ষম হয়েছেন।
এক সময় টেলিফোনে নিউজ ডেসপাস করতে হলেও অন্যের লেখা খবরের প্রতিটি লাইনই তাকে বার কয়েক পড়তে হতো। আবার যখন ফ্যাক্সে নিউজ পাঠাতে হতো তখন ‘ওই’ সাংবাদিককে অন্যের লেখা খবরটি দেখে দেখে আবার লিখতে হতো। অবশ্য এর ব্যতিক্রমও ঘটতো, অনেকেই শুধু ফ্লুইড (বিমোচন কালি) দিয়ে পূর্বের নামটি মুছে দিয়ে নিজের নামটি স্বাক্ষর করে দিতেন। অনেককেই তাও করতে হতো না। যিনি প্রক্সি দিতেন তিনিই ওই স্বাক্ষরের কাজটি সেরে ফেলতেন। যে কারণে মফস্বল সাংবাদিকতায় ওই সময়ে ‘কপি টু পিএস’ এবং বর্তমানে ‘ছিছি সাংবাদিক’ কথাগুলো অনেকের মুখেই উচ্চারিত হতে শুনেছি এবং শুনছি। তাও আবার অনেক নাগরিকের সামনেই। তখন লজ্জায় মাথা নীচু হয়ে যায়।
মোদ্দা কথা, নিজস্ব মিডিয়া হাউজ বা সংশ্লিষ্ট কোনো হাউজে মফস্বল সাংবাদিকদের নিয়মিত কারিগরি ও নৈতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে তবেই ‘ধানের চিটা’ (অযোগ্যদের) আলাদা করা সম্ভব হবে। এজন্য সকল গণমাধ্যমকেই এগিয়ে আসতে হবে আন্তরিকতার সাথে। তবেই পবিত্র এ অঙ্গন কলংকমুক্ত হবে এবং প্রতিভাদীপ্ত তরুণরা এ মহৎ পেশায় এগিয়ে আসবে। তাহলেই সংবাদপত্রের মতো দর্পণে জাতির আসল চেহারা ফুটিয়ে তোলার দায়িত্বটা সাংবাদিকগণ যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন মেঘমুক্ত আকাশের গতিময় বাতাসে উড়ে যাবে সেসব ‘ধানের চিটা’।

লেখক: কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও কলাম লেখক।


এই বিভাগের আরও খবর