রাত ৮:০১ | শনিবার | ৮ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

হিংসা হচ্ছে, নিউজিল্যান্ড!

মনজুরুল আহসান বুলবুল

হিংসে হচ্ছে! আসলেই প্রচণ্ড হিংসে হচ্ছে!! ঐ যে বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলেছিলেন, পরশ্রীকাতর শব্দটা সম্ভবত পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় নাই। বাঙালিরা ‘পরশ্রীকাতর’ বলেই বাংলা ভাষায় এর অবস্থান। নিজের সেই পরশ্রীকাতর চরিত্রটি দাবিয়ে রাখতে পারছি না। নিউজিল্যান্ডের ভালো দেখে পরশ্রীকাতর হয়ে পড়ছি।

img-add

১.
৯ জুন ২০২০, যেদিন বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭৫ জনে সেদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়া খবর দিচ্ছে কোভিডমুক্ত জীবনের প্রথম দিন মঙ্গলবার [৮ জুন ২০২০] নিউজিল্যান্ডের লাখ লাখ বাসিন্দা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে, শপিং ও পার্টিতে মেতে উঠেছেন তারা। তিন মাসেরও বেশি সময় পর স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল পুরো নিউজিল্যান্ড।
খবরের এতটুকু দেখেই সব হিংসা গিয়ে পড়লো ছোট দেশ নিউজিল্যান্ডের ওপর।

বাংলাদেশে করোনা আক্রমণের তিনমাস পূর্ণ হল ৮ জুন। এই নব্বই দিনে বাংলাদেশ ‘সাধারণ ছুটি’ আর ‘লকডাউন’ এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর করোনার বিরুদ্ধে ৪৯ দিনের যুদ্ধে জয়ী হয়ে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটন বুক ফুলিয়ে হাসছে।

নাগরিকরা বলেছেন, ‘আজ শহরে তিন মাসের বেশি সময় পর বহু মানুষ দেখলাম। লোকজন শপিং করছে, খাচ্ছে। একে-অন্যের হাত ধরে বেড়াচ্ছে। দেখতে কী যে ভালো লাগছে।’ বিপণি বিতানের লোকজন বলছেন, এখন দোকানে কোনো সামাজিক দূরত্ব নেই। দোকান জমে উঠেছে।

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দেশ নিউজিল্যান্ডে মাত্র ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। এদের মধ্যে এক হাজার ১৫৪ জন করোনায় আক্রান্ত হন। আর মারা যান ২২ জন। তবে গত ২২ দিনে নতুন করে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গত এক সপ্তাহ ধরে মাত্র একজন রোগীই করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি সেরে উঠলে দেশটি ভাইরাসের মরণ ছোবল থেকে মুক্তি পায়।

তাদের যে জনসংখ্যা, তার সাথে বাংলাদেশের জন সংখ্যার তুলনা করা যায় না। বিষয়টি জন সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হতেই পারে। কিন্তু আমি দেখতে চাই ব্যবস্থাপনার দিক থেকে।

নিউজিল্যান্ড বলছে, কোভিড-১৯ রোগের কম্যুনিটি সংক্রমণ বন্ধ করতে সমর্থ হয়েছে দেশটি, যে কারণে তারা কার্যকরভাবে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান বলেছেন, তার দেশ এখনকার মত ‘এ যুদ্ধে জিতেছে’। নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অ্যাশলি ব্লুমফিল্ড বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পেরেছি বলে আমাদের বিশ্বাস।

তবে মিস আর্ডান এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক দুজনই সতর্ক করেছেন যে, ভাইরাস নির্মূল হবার ঘোষণা দেয়ার মানে এই নয় যে, দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত কেউ আর নতুন করে শনাক্ত হবেন না। কিন্তু সে সংখ্যা হবে খুবই কম এবং সহজে সামালযোগ্য।

নিউজিল্যান্ড কীভাবে সফল হলো:
দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান বলেন, টানা ৭ সপ্তাহের লকডাউন চলাকালে নিউজিল্যান্ডবাসী বিপুল আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। সংক্রমণ হার কমিয়ে আনতে দেশবাসীর এই অতুলনীয় অবদানের কারণেই দেশ করোনামুক্ত হয়েছে। এই সাফল্যের সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে নিজের শোবার ঘরে একাকী কিছুক্ষণ নেচেছেন বলে জানান দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান।

কোভিড-১৯ হুমকির বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা অর্জনে পাঁচটি পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে নিউজিল্যান্ড করোনামুক্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

ক. বাধ্যতামূলক ফেব্রিক মাস্ক ব্যবহার:
শারীরিক দূরত্বের পাশাপাশি সরকার গণপরিবহন ও বিমানে ফেব্রিক মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে। ল্যানসেটে প্রকাশিত পর্যালোচনা অনুযায়ী, সাধারণ ফ্যাব্রিক মাস্কগুলো খুবই কার্যকরী।

খ. ডিজিটাল মাধ্যমে কন্ট্রাক্ট-ট্রেসিং:
কন্ট্রাক্ট-ট্রেসিংয়ের জন্য নিউজিল্যান্ড ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছে। ডাউনলোডযোগ্য অ্যাপ দেশটিতে অপর্যাপ্ত ছিল। ফলে নিউজিল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর উভয় দেশই ব্ল–টুথ-সক্ষম ডিভাইস ব্যবহার করেছে।

গ. সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি:
বিদেশ ফেরতদের জন্য নিউজিল্যান্ড কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তাদের জন্য ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

ঘ. নিবেদিত জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থা:
নিউজিল্যান্ডের জাতীয় জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো কয়েক দশক ধরে ভঙ্গুর ছিল। এ ভঙ্গুরতার মধ্যে ২০১৬ সালে এবং ২০১৮ সালে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে সেই দেশে। মার্চে স্বাস্থ্য খাতে ভঙ্গুরতার বিষয়ে সমীক্ষা প্রতিবেদন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতেই নেয়া হয়েছিল কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ।

ঙ. নিউজিল্যান্ডে যখন মাত্র ডজনখানেক রোগী শনাক্ত হয়, তখনই কঠোর লকডাউন আরোপ করা হয় এবং নমুনা পরীক্ষার হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে জোরদার করা হয় কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এর ব্যবস্থাও।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরুর পর পরই যদি দ্রুত লকডাউন না দেয়া হত, তাহলে দিনে এক হাজারের ওপর নতুন রোগী শনাক্ত হত। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি কত খারাপ হতে পারত কেউ জানে না, কিন্তু আমাদের আগাম পরিকল্পনায় আমরা সবচেয়ে ভয়ানক পরিস্থিতি এড়াতে পেরেছি।

২.
তবে এমন সাফল্য শুধু নিউজিল্যান্ডই নয়, দেখিয়েছে আরও আটটি দেশ। বিশ্বের আরও যে ৮টি দেশ প্রাণঘাতী করোনাকে বিদায় করেছে সেগুলো হলো:

মন্টেনিগ্রো: ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবার শেষে করোনা পৌঁছেছিল মন্টেনিগ্রোতে। গত ১৭ মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণের খবর পাওয়া যায় ৬ লাখ ২২ হাজার জনসংখ্যার দেশটিতে। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৪ জনে। তবে সেখানেই শেষ। সংক্রমণ শুরুর মাত্র ৬৮ দিনের মধ্যই নিজেদের করোনামুক্ত ঘোষণা করে দেশটি। এ সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে কড়া লকডাউন দিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সীমান্ত, জনসমাবেশ বন্ধ করার মতো ব্যবস্থাগুলো।

ইরিত্রিয়া: আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলীয় দেশটিতে জনসংখ্যা ৬০ লাখের মতো। গত ২১ মার্চ নরওয়ে-ফেরত এক ব্যক্তির শরীরে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস ধরা পড়ে সেখানে। এরপর সংক্রমণ কিছুটা ছড়ালেও মাত্র ৩৯ জনেই আটকে যায় তা। গত ১৫ মে করোনামুক্তির ঘোষণা দিয়েছে ইরিত্রিয়া। সংক্রমণ প্রতিরোধে তারাও লকডাউন করেছিল গোটা দেশ।

পাপুয়া নিউ গিনি: দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশটিতে গত ২০ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। পরের চার সপ্তাহে সেখানে আক্রান্ত হন আরও সাতজন। ৪ মে’র মধ্যেই অবশ্য সুস্থ হয়ে ওঠেন সবাই। এরপর আর কেউ আক্রান্ত হননি। প্রায় ৮১ লাখ জনসংখ্যার দেশটি সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়েছিল কড়া ব্যবস্থা। রাত্রিকালীন কারফিউয়ের পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হয় ইন্দোনেশিয়া সীমান্ত। এশিয়া থেকে পর্যটক প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় গণপরিবহন ও জমায়েত।

সিশেলস: ভারত মহাসাগরীয় দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র ১১ জন। ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন সবাই। ৯৭ হাজার জনসংখ্যার এ দেশে প্রথম করোনা ধরা পড়ে ১৪ মার্চ। এরপর পরই প্রমোদতরী বন্ধের পাশাপাশি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ইরান ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয় তারা। এপ্রিলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ানো হয় ।

হলি সি: ছোট্ট নগররাষ্ট্রটিতে মাত্র ১২ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন করোনায়। ৬ জুনের মধ্যে করোনা নেগেটিভ প্রমাণিত হয়েছেন সবাই। সংক্রমণ শুরুর পরপরই সব ধরনের পর্যটন নিষিদ্ধ করেছিল দেশটি। এমনকি পোপ ফ্রান্সিসের জনসমাবেশে উপস্থিতিও বন্ধ করে দেয়া হয়। শহরের বাসিন্দাদের ঘরে বসে কাজ করতে বলা হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে প্রত্যেক বাড়ি দিনে দুইবেলা খাবার পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস: ক্যারিবিয়ান দেশটি করোনামুক্ত হয়েছে গত ১৯ মে। ২৪ মার্চ নিউইয়র্ক-ফেরত দুইজনের মাধ্যমে সেখানে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয়। এর পরপরই বন্ধ করে দেয়া হয় বিমানবন্দর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনাবশ্যক সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। জারি করা হয় কারফিউও। ফলে বিপদ বেশি দূর আগায়নি। মাত্র ১৫ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫২ হাজার জনসংখ্যার দেশটিতে। ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন সবাই।

ফিজি: প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত দেশটিতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১৯ মার্চ। সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে দেয়া হয় সব ধরনের বিমান চলাচল। বাইরে থেকে আসা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক করা হয় ১৫ দিনের কোয়ারেন্টাইন। দেশটিতে মোট ১৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের সবাই সুস্থ হয়ে ওঠার পর গত ২০ এপ্রিল নিজেদের করোনামুক্ত ঘোষণা করেছে ফিজি।

পূর্ব তিমুর: দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটি করোনা সংক্রমণ শুরুর দিকেই সতর্ক ব্যবস্থা নিয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতেই তারা চীন থেকে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে, বন্ধ করে দেয় ইন্দোনেশিয়া সীমান্ত। ২১ মার্চ সেখানে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর পরপর বন্ধ করে দেয়া হয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিষিদ্ধ করা হয় জনসমাবেশ, বিদেশফেরতদের বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। দেশটিতে মোট ২৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত ১৫ মে তাদের শেষ রোগীটিও সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন।

৩.
অন্যদিকে বিপরীত উদাহরণও আছে! পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া করোনাভাইরাস মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন সেদেশের প্রেসিডেন্ট জন ম্যাগুফুলি! সোমবার [৮ জুন-২০২০] রাজধানী দোদোমা’র একটি চার্চে দেওয়া ভাষণে তার দেশ ‘করোনামুক্ত’ বলে দাবি করেন ম্যাগুফুলি। তিনি বলেন, ‘ঈশ্বর তানজানিয়ার সঙ্গে রয়েছেন, তাই এদেশে শয়তানের সব কূটকচাল বিফল হবে। এ কারণে করোনাও এখানে পরাজিত হয়েছে।’

বিবিসি, আনাদলু এজেন্সি খবর দিচ্ছে, গত মাসে তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাস এক সতর্কবার্তায় জানায়, দারুস সালামের হাসপাতালগুলোতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ভিড় দেখা গেছে। ফলে সেখান থেকে আরও বেশি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা উড়িয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যাগুফুলি দেশবাসীকে বেশি বেশি প্রার্থনা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি দেশবাসীকে স্বাভাবিক জীবন-যাপনেরও আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সোমবার তার দেশকে করোনামুক্ত ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, তানজানিয়ার সব ধর্মের মানুষকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। আমরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি উপবাস ও প্রার্থনা করেছি যাতে তিনি আমাদের দেশ ও বিশ্বকে মহামারি থেকে মুক্তি দেন। সৃষ্টিকর্তা জবাব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি এবং আমি নিশ্চিত বহু তানজানিয়ান বিশ্বাস করেন যে, সৃষ্টিকর্তা করোনাভাইরাস নির্মূল করেছেন।’

প্রেসিডেন্ট ম্যাগুফুলি তার বক্তব্যে পুরোহিত ও উপাসকদের গ্লাভস ও মাস্ক না পরার জন্য প্রশংসা করেন।

সামাজিক মাধ্যমে তানজানিয়ার নাগরিকরা তাদের প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণার প্রতি সাধুবাদ ও প্রশংসা জানিয়েছেন। এই হলো করোনা মুক্তির তানজানিয়া মডেল! এই মডেলের সুবিধা হলো, পরিস্থিতি যাই হোক, ঈশ্বরের ওপর সব দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে। ওই যে, আমাদের দেশে আল্লার মাল আল্লাহ নিয়ে যাওয়ার মতো!

৪.
এই প্রেক্ষাপটেই দুনিয়া থেকে করোনাভাইরাস শেষ হতে ঢের বাকি আছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসি। কোভিড-১৯ রোগকে তিনি সবচেয়ে খারাপ দুঃস্বপ্ন বলে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, গত চার মাস সময়ে এই ভাইরাসটি পুরো বিশ্বে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবন সংস্থার একটি সম্মেলনে নির্বাহীদের সামনে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, রোগটি এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

ডা. ফাউসি বলেন, লাখ লাখ লোক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে রোগটি ঘনীভূত হয়েছে। তার মতে, ইবোলা ভীতিজনক ছিল, তবে রোগটি সহজে সংক্রামিত হতে পারে না। ইবোলার প্রাদুর্ভাব সবসময় একেবারেই স্থানীয় হয়। এইচআইভিকে গুরুত্ব দিয়েও ফাউসি জানান, অনেকেই এইডসকে হুমকি মনে করে না। কারণ এটা নির্ভর করে ‘আপনি কে, আপনি কোথায় আছেন এবং আপনি কোথায় থাকেন’-এ বিষয়গুলোর ওপর। কিন্তু করোনা পুরো গ্রহকে ছাপিয়ে গেছে।

৫.
কোভিড নিয়ে বাংলাদেশের গা ছাড়া ভাব কতটা ভয়াবহ, একটু স্মরণ করিয়ে দিই। মার্চের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনা আঘাত হানে। তার একমাস পরে ৩ এপ্রিল-স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়। করোনা ভাইরাস নিয়ে এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এর মধ্যে ৬৫ ভাগ বিভিন্ন অসংক্রামক ব্যাধিতে মারা যান, ২৪ ভাগ মানুষ মারা যান বার্ধক্যজনিত কারণে।

তিনি বলেন, করোনার কারণে এই মৃত্যুর হার বাড়েনি বরং বাংলাদেশে যে স্বাভাবিক মৃত্যু আছে সেটাই বজায় রয়েছে। পরে তিনি নিজেও করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্যই প্রমাণ করে, আমরা বিষয়টির গুরুত্বই শুরুতে বুঝতে পারিনি। পরতে পরতে আমাদের গা ছাড়া ভাব, সমন্বয়হীনতাসহ নানা অব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র দেখেছি ও দেখছি।

৬.
এই রকম একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে কোথায়, কিভাবে যাব তা নিয়ে ভাবনা শুধু নয়, কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

আমাদের সামনে দুইটি উদাহরণ। নিউজিল্যান্ড ও আরও ছোট আটটি দেশ। যারা বিজ্ঞানসম্মত নানা উদ্যোগ আর কঠোর ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নিজেরা করোনামুক্ত হয়েছে। আর তানজানিয়া – যারা মনে করে প্রার্থনা করেই ‘করোনা শয়তান’কে দূর করা গেছে।

৭.
করোনামুক্ত নিউজিল্যান্ডবাসীদের দেখে নিভৃত জীবন যাপনে গৃহবন্দী আমরা যতই হিংসা করি, আমরা যদি বাঁচতে চাই তাদের কঠোর ব্যবস্থাপনার পথ ধরেই আমাদের এগুতে হবে। শুধু প্রার্থনা করে শয়তান দূর হয় না, শয়তান দূর করতে অন্য ব্যবস্থাও লাগে। নিউজিল্যান্ড তাই করেছে। তাই হিংসার সাথে সাথে তাদের অনুসরণ করাটাই জরুরি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, এডিটর ইন চিফ, টিভি টুডে।

Print Friendly, PDF & Email
এ সংক্রান্ত আরও খবর

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» মুক্তাগাছায় বাসচাপায় ৭ জন নিহত

» শেরপুরে বঙ্গমাতার জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সেলাই মেশিন বিতরণ

» চুয়াডাঙ্গায় বাসচাপায় ৬ জন নিহত, আহত ৪

» শ্রীবরদীতে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছার জন্মদিন পালিত

» ঝিনাইগাতীতে ইয়াবাসহ ২ ব্যবসায়ী গ্রেফতার

» এবার করোনায় আক্রান্ত মাশরাফির বাবা-মা

» নকলায় বঙ্গমাতার জন্মদিনে সেলাই মেশিন বিতরণ ও নগদ অর্থ সহায়তা প্রদান

» কেরালায় দুর্ঘটনাগ্রস্ত উড়োজাহাজটির ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার

» জাতির পিতার সংগ্রামে প্রেরণা যুগিয়েছেন বঙ্গমাতা: প্রধানমন্ত্রী

» বঙ্গবন্ধুর সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন বঙ্গমাতা : কাদের

» দেশে করোনায় আরও ৩২ মৃত্যু, শনাক্ত ২৬১১

» সফলতার দৃপ্ত প্রত্যয়ে এগিয়ে যাচ্ছে শেরপুর জেলা বেতার শ্রোতা ক্লাব

» ভারতে ১৯০ আরোহী নিয়ে বিমান দুই টুকরা, নিহত ২০ , আহত শতাধিক

» বঙ্গমাতার ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ

» শেরপুরে বন্যার্তদের মাঝে শেখ রাসেল ফাউন্ডেশন ইউএসএ ইন্ক’র উদ্যোগে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

  রাত ৮:০১ | শনিবার | ৮ই আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ২৪শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

হিংসা হচ্ছে, নিউজিল্যান্ড!

মনজুরুল আহসান বুলবুল

হিংসে হচ্ছে! আসলেই প্রচণ্ড হিংসে হচ্ছে!! ঐ যে বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বলেছিলেন, পরশ্রীকাতর শব্দটা সম্ভবত পৃথিবীর অন্য কোন ভাষায় নাই। বাঙালিরা ‘পরশ্রীকাতর’ বলেই বাংলা ভাষায় এর অবস্থান। নিজের সেই পরশ্রীকাতর চরিত্রটি দাবিয়ে রাখতে পারছি না। নিউজিল্যান্ডের ভালো দেখে পরশ্রীকাতর হয়ে পড়ছি।

img-add

১.
৯ জুন ২০২০, যেদিন বাংলাদেশে কোভিড-১৯ আক্রান্তের সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯৭৫ জনে সেদিন আন্তর্জাতিক মিডিয়া খবর দিচ্ছে কোভিডমুক্ত জীবনের প্রথম দিন মঙ্গলবার [৮ জুন ২০২০] নিউজিল্যান্ডের লাখ লাখ বাসিন্দা মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে, শপিং ও পার্টিতে মেতে উঠেছেন তারা। তিন মাসেরও বেশি সময় পর স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে উচ্ছ্বসিত ছিল পুরো নিউজিল্যান্ড।
খবরের এতটুকু দেখেই সব হিংসা গিয়ে পড়লো ছোট দেশ নিউজিল্যান্ডের ওপর।

বাংলাদেশে করোনা আক্রমণের তিনমাস পূর্ণ হল ৮ জুন। এই নব্বই দিনে বাংলাদেশ ‘সাধারণ ছুটি’ আর ‘লকডাউন’ এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর করোনার বিরুদ্ধে ৪৯ দিনের যুদ্ধে জয়ী হয়ে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটন বুক ফুলিয়ে হাসছে।

নাগরিকরা বলেছেন, ‘আজ শহরে তিন মাসের বেশি সময় পর বহু মানুষ দেখলাম। লোকজন শপিং করছে, খাচ্ছে। একে-অন্যের হাত ধরে বেড়াচ্ছে। দেখতে কী যে ভালো লাগছে।’ বিপণি বিতানের লোকজন বলছেন, এখন দোকানে কোনো সামাজিক দূরত্ব নেই। দোকান জমে উঠেছে।

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের দেশ নিউজিল্যান্ডে মাত্র ৫০ লাখ মানুষের বসবাস। এদের মধ্যে এক হাজার ১৫৪ জন করোনায় আক্রান্ত হন। আর মারা যান ২২ জন। তবে গত ২২ দিনে নতুন করে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। গত এক সপ্তাহ ধরে মাত্র একজন রোগীই করোনায় আক্রান্ত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি সেরে উঠলে দেশটি ভাইরাসের মরণ ছোবল থেকে মুক্তি পায়।

তাদের যে জনসংখ্যা, তার সাথে বাংলাদেশের জন সংখ্যার তুলনা করা যায় না। বিষয়টি জন সংখ্যাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হতেই পারে। কিন্তু আমি দেখতে চাই ব্যবস্থাপনার দিক থেকে।

নিউজিল্যান্ড বলছে, কোভিড-১৯ রোগের কম্যুনিটি সংক্রমণ বন্ধ করতে সমর্থ হয়েছে দেশটি, যে কারণে তারা কার্যকরভাবে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান বলেছেন, তার দেশ এখনকার মত ‘এ যুদ্ধে জিতেছে’। নিউজিল্যান্ডের স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অ্যাশলি ব্লুমফিল্ড বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য আমরা অর্জন করতে পেরেছি বলে আমাদের বিশ্বাস।

তবে মিস আর্ডান এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক দুজনই সতর্ক করেছেন যে, ভাইরাস নির্মূল হবার ঘোষণা দেয়ার মানে এই নয় যে, দেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত কেউ আর নতুন করে শনাক্ত হবেন না। কিন্তু সে সংখ্যা হবে খুবই কম এবং সহজে সামালযোগ্য।

নিউজিল্যান্ড কীভাবে সফল হলো:
দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান বলেন, টানা ৭ সপ্তাহের লকডাউন চলাকালে নিউজিল্যান্ডবাসী বিপুল আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছেন। সংক্রমণ হার কমিয়ে আনতে দেশবাসীর এই অতুলনীয় অবদানের কারণেই দেশ করোনামুক্ত হয়েছে। এই সাফল্যের সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আনন্দে নিজের শোবার ঘরে একাকী কিছুক্ষণ নেচেছেন বলে জানান দেশটির প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডান।

কোভিড-১৯ হুমকির বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা অর্জনে পাঁচটি পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে নিউজিল্যান্ড করোনামুক্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

ক. বাধ্যতামূলক ফেব্রিক মাস্ক ব্যবহার:
শারীরিক দূরত্বের পাশাপাশি সরকার গণপরিবহন ও বিমানে ফেব্রিক মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করে। ল্যানসেটে প্রকাশিত পর্যালোচনা অনুযায়ী, সাধারণ ফ্যাব্রিক মাস্কগুলো খুবই কার্যকরী।

খ. ডিজিটাল মাধ্যমে কন্ট্রাক্ট-ট্রেসিং:
কন্ট্রাক্ট-ট্রেসিংয়ের জন্য নিউজিল্যান্ড ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেছে। ডাউনলোডযোগ্য অ্যাপ দেশটিতে অপর্যাপ্ত ছিল। ফলে নিউজিল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুর উভয় দেশই ব্ল–টুথ-সক্ষম ডিভাইস ব্যবহার করেছে।

গ. সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি:
বিদেশ ফেরতদের জন্য নিউজিল্যান্ড কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তাদের জন্য ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

ঘ. নিবেদিত জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থা:
নিউজিল্যান্ডের জাতীয় জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো কয়েক দশক ধরে ভঙ্গুর ছিল। এ ভঙ্গুরতার মধ্যে ২০১৬ সালে এবং ২০১৮ সালে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে সেই দেশে। মার্চে স্বাস্থ্য খাতে ভঙ্গুরতার বিষয়ে সমীক্ষা প্রতিবেদন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়েছিল। সে প্রেক্ষিতেই নেয়া হয়েছিল কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ।

ঙ. নিউজিল্যান্ডে যখন মাত্র ডজনখানেক রোগী শনাক্ত হয়, তখনই কঠোর লকডাউন আরোপ করা হয় এবং নমুনা পরীক্ষার হার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে জোরদার করা হয় কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং এর ব্যবস্থাও।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরুর পর পরই যদি দ্রুত লকডাউন না দেয়া হত, তাহলে দিনে এক হাজারের ওপর নতুন রোগী শনাক্ত হত। তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি কত খারাপ হতে পারত কেউ জানে না, কিন্তু আমাদের আগাম পরিকল্পনায় আমরা সবচেয়ে ভয়ানক পরিস্থিতি এড়াতে পেরেছি।

২.
তবে এমন সাফল্য শুধু নিউজিল্যান্ডই নয়, দেখিয়েছে আরও আটটি দেশ। বিশ্বের আরও যে ৮টি দেশ প্রাণঘাতী করোনাকে বিদায় করেছে সেগুলো হলো:

মন্টেনিগ্রো: ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবার শেষে করোনা পৌঁছেছিল মন্টেনিগ্রোতে। গত ১৭ মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণের খবর পাওয়া যায় ৬ লাখ ২২ হাজার জনসংখ্যার দেশটিতে। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৪ জনে। তবে সেখানেই শেষ। সংক্রমণ শুরুর মাত্র ৬৮ দিনের মধ্যই নিজেদের করোনামুক্ত ঘোষণা করে দেশটি। এ সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে কড়া লকডাউন দিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সীমান্ত, জনসমাবেশ বন্ধ করার মতো ব্যবস্থাগুলো।

ইরিত্রিয়া: আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলীয় দেশটিতে জনসংখ্যা ৬০ লাখের মতো। গত ২১ মার্চ নরওয়ে-ফেরত এক ব্যক্তির শরীরে প্রথমবারের মতো করোনাভাইরাস ধরা পড়ে সেখানে। এরপর সংক্রমণ কিছুটা ছড়ালেও মাত্র ৩৯ জনেই আটকে যায় তা। গত ১৫ মে করোনামুক্তির ঘোষণা দিয়েছে ইরিত্রিয়া। সংক্রমণ প্রতিরোধে তারাও লকডাউন করেছিল গোটা দেশ।

পাপুয়া নিউ গিনি: দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশটিতে গত ২০ মার্চ প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। পরের চার সপ্তাহে সেখানে আক্রান্ত হন আরও সাতজন। ৪ মে’র মধ্যেই অবশ্য সুস্থ হয়ে ওঠেন সবাই। এরপর আর কেউ আক্রান্ত হননি। প্রায় ৮১ লাখ জনসংখ্যার দেশটি সংক্রমণ প্রতিরোধে নিয়েছিল কড়া ব্যবস্থা। রাত্রিকালীন কারফিউয়ের পাশাপাশি বন্ধ করে দেয়া হয় ইন্দোনেশিয়া সীমান্ত। এশিয়া থেকে পর্যটক প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় গণপরিবহন ও জমায়েত।

সিশেলস: ভারত মহাসাগরীয় দেশটিতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল মাত্র ১১ জন। ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন সবাই। ৯৭ হাজার জনসংখ্যার এ দেশে প্রথম করোনা ধরা পড়ে ১৪ মার্চ। এরপর পরই প্রমোদতরী বন্ধের পাশাপাশি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ইরান ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয় তারা। এপ্রিলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরও বাড়ানো হয় ।

হলি সি: ছোট্ট নগররাষ্ট্রটিতে মাত্র ১২ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন করোনায়। ৬ জুনের মধ্যে করোনা নেগেটিভ প্রমাণিত হয়েছেন সবাই। সংক্রমণ শুরুর পরপরই সব ধরনের পর্যটন নিষিদ্ধ করেছিল দেশটি। এমনকি পোপ ফ্রান্সিসের জনসমাবেশে উপস্থিতিও বন্ধ করে দেয়া হয়। শহরের বাসিন্দাদের ঘরে বসে কাজ করতে বলা হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে প্রত্যেক বাড়ি দিনে দুইবেলা খাবার পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস: ক্যারিবিয়ান দেশটি করোনামুক্ত হয়েছে গত ১৯ মে। ২৪ মার্চ নিউইয়র্ক-ফেরত দুইজনের মাধ্যমে সেখানে প্রথম সংক্রমণ শুরু হয়। এর পরপরই বন্ধ করে দেয়া হয় বিমানবন্দর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অনাবশ্যক সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। জারি করা হয় কারফিউও। ফলে বিপদ বেশি দূর আগায়নি। মাত্র ১৫ জন আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫২ হাজার জনসংখ্যার দেশটিতে। ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন সবাই।

ফিজি: প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে অবস্থিত দেশটিতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ১৯ মার্চ। সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করে দেয়া হয় সব ধরনের বিমান চলাচল। বাইরে থেকে আসা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক করা হয় ১৫ দিনের কোয়ারেন্টাইন। দেশটিতে মোট ১৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের সবাই সুস্থ হয়ে ওঠার পর গত ২০ এপ্রিল নিজেদের করোনামুক্ত ঘোষণা করেছে ফিজি।

পূর্ব তিমুর: দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটি করোনা সংক্রমণ শুরুর দিকেই সতর্ক ব্যবস্থা নিয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতেই তারা চীন থেকে বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে, বন্ধ করে দেয় ইন্দোনেশিয়া সীমান্ত। ২১ মার্চ সেখানে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর পরপর বন্ধ করে দেয়া হয় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিষিদ্ধ করা হয় জনসমাবেশ, বিদেশফেরতদের বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। দেশটিতে মোট ২৪ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। গত ১৫ মে তাদের শেষ রোগীটিও সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন।

৩.
অন্যদিকে বিপরীত উদাহরণও আছে! পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া করোনাভাইরাস মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন সেদেশের প্রেসিডেন্ট জন ম্যাগুফুলি! সোমবার [৮ জুন-২০২০] রাজধানী দোদোমা’র একটি চার্চে দেওয়া ভাষণে তার দেশ ‘করোনামুক্ত’ বলে দাবি করেন ম্যাগুফুলি। তিনি বলেন, ‘ঈশ্বর তানজানিয়ার সঙ্গে রয়েছেন, তাই এদেশে শয়তানের সব কূটকচাল বিফল হবে। এ কারণে করোনাও এখানে পরাজিত হয়েছে।’

বিবিসি, আনাদলু এজেন্সি খবর দিচ্ছে, গত মাসে তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাস এক সতর্কবার্তায় জানায়, দারুস সালামের হাসপাতালগুলোতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের ভিড় দেখা গেছে। ফলে সেখান থেকে আরও বেশি করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে মার্কিন দূতাবাসের সতর্কবার্তা উড়িয়ে দিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যাগুফুলি দেশবাসীকে বেশি বেশি প্রার্থনা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি দেশবাসীকে স্বাভাবিক জীবন-যাপনেরও আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সোমবার তার দেশকে করোনামুক্ত ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, তানজানিয়ার সব ধর্মের মানুষকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই। আমরা সৃষ্টিকর্তার প্রতি উপবাস ও প্রার্থনা করেছি যাতে তিনি আমাদের দেশ ও বিশ্বকে মহামারি থেকে মুক্তি দেন। সৃষ্টিকর্তা জবাব দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি এবং আমি নিশ্চিত বহু তানজানিয়ান বিশ্বাস করেন যে, সৃষ্টিকর্তা করোনাভাইরাস নির্মূল করেছেন।’

প্রেসিডেন্ট ম্যাগুফুলি তার বক্তব্যে পুরোহিত ও উপাসকদের গ্লাভস ও মাস্ক না পরার জন্য প্রশংসা করেন।

সামাজিক মাধ্যমে তানজানিয়ার নাগরিকরা তাদের প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণার প্রতি সাধুবাদ ও প্রশংসা জানিয়েছেন। এই হলো করোনা মুক্তির তানজানিয়া মডেল! এই মডেলের সুবিধা হলো, পরিস্থিতি যাই হোক, ঈশ্বরের ওপর সব দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার পথ খোলা রাখা হয়েছে। ওই যে, আমাদের দেশে আল্লার মাল আল্লাহ নিয়ে যাওয়ার মতো!

৪.
এই প্রেক্ষাপটেই দুনিয়া থেকে করোনাভাইরাস শেষ হতে ঢের বাকি আছে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসি। কোভিড-১৯ রোগকে তিনি সবচেয়ে খারাপ দুঃস্বপ্ন বলে আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, গত চার মাস সময়ে এই ভাইরাসটি পুরো বিশ্বে বিপর্যয় নিয়ে এসেছে। জৈবপ্রযুক্তি উদ্ভাবন সংস্থার একটি সম্মেলনে নির্বাহীদের সামনে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, রোগটি এখনো শেষ হয়ে যায়নি।

ডা. ফাউসি বলেন, লাখ লাখ লোক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে রোগটি ঘনীভূত হয়েছে। তার মতে, ইবোলা ভীতিজনক ছিল, তবে রোগটি সহজে সংক্রামিত হতে পারে না। ইবোলার প্রাদুর্ভাব সবসময় একেবারেই স্থানীয় হয়। এইচআইভিকে গুরুত্ব দিয়েও ফাউসি জানান, অনেকেই এইডসকে হুমকি মনে করে না। কারণ এটা নির্ভর করে ‘আপনি কে, আপনি কোথায় আছেন এবং আপনি কোথায় থাকেন’-এ বিষয়গুলোর ওপর। কিন্তু করোনা পুরো গ্রহকে ছাপিয়ে গেছে।

৫.
কোভিড নিয়ে বাংলাদেশের গা ছাড়া ভাব কতটা ভয়াবহ, একটু স্মরণ করিয়ে দিই। মার্চের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশে করোনা আঘাত হানে। তার একমাস পরে ৩ এপ্রিল-স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলছেন, বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়। করোনা ভাইরাস নিয়ে এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এর মধ্যে ৬৫ ভাগ বিভিন্ন অসংক্রামক ব্যাধিতে মারা যান, ২৪ ভাগ মানুষ মারা যান বার্ধক্যজনিত কারণে।

তিনি বলেন, করোনার কারণে এই মৃত্যুর হার বাড়েনি বরং বাংলাদেশে যে স্বাভাবিক মৃত্যু আছে সেটাই বজায় রয়েছে। পরে তিনি নিজেও করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্যই প্রমাণ করে, আমরা বিষয়টির গুরুত্বই শুরুতে বুঝতে পারিনি। পরতে পরতে আমাদের গা ছাড়া ভাব, সমন্বয়হীনতাসহ নানা অব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র দেখেছি ও দেখছি।

৬.
এই রকম একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়িয়ে? যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখান থেকে কোথায়, কিভাবে যাব তা নিয়ে ভাবনা শুধু নয়, কার্যকর উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

আমাদের সামনে দুইটি উদাহরণ। নিউজিল্যান্ড ও আরও ছোট আটটি দেশ। যারা বিজ্ঞানসম্মত নানা উদ্যোগ আর কঠোর ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে নিজেরা করোনামুক্ত হয়েছে। আর তানজানিয়া – যারা মনে করে প্রার্থনা করেই ‘করোনা শয়তান’কে দূর করা গেছে।

৭.
করোনামুক্ত নিউজিল্যান্ডবাসীদের দেখে নিভৃত জীবন যাপনে গৃহবন্দী আমরা যতই হিংসা করি, আমরা যদি বাঁচতে চাই তাদের কঠোর ব্যবস্থাপনার পথ ধরেই আমাদের এগুতে হবে। শুধু প্রার্থনা করে শয়তান দূর হয় না, শয়তান দূর করতে অন্য ব্যবস্থাও লাগে। নিউজিল্যান্ড তাই করেছে। তাই হিংসার সাথে সাথে তাদের অনুসরণ করাটাই জরুরি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, এডিটর ইন চিফ, টিভি টুডে।

Print Friendly, PDF & Email
এ সংক্রান্ত আরও খবর

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

error: Content is protected !!