রাত ৮:৫৯ | শনিবার | ৩০শে মে, ২০২০ ইং | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন : নাগরিক ভাবনা

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

img-add

‘সাত স্তম্ভ সপ্তবীরের

স্মৃতি আলেখ্যে গড়া

মহাকাল যায় ইতিহাস রচে

শহীদের রক্তক্ষরা।’

অগণিত শহীদের সাগরসম রক্ত ক্ষরণের ফলশ্রুতিতে পাওয়া লাল সবুজের এই দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এই দেশ কারো দয়া বা করুণায় পাওয়া নয়; বরং যার জন্য উৎসর্গিত হতে হয়েছে ৩০ লাখ বীর বাঙালি আর নির্যাতিত নিপীড়িত বাস্তুহারা হতে হয়েছিল অসংখ্য নর-নারীকে। আর অব্যাহত রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোলামী থেকে পরিত্রাণের জন্যই পরিচালিত হয়েছিল এদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সোজা কথায় বলতে গেলে মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টত:ই উল্লেখ রয়েছে শোষণ ও বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। বাংলার মুক্তিকামী মানুষেরা এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও সুবিচার সুনিশ্চিত হবে।

কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রাক্কালে মহান সংবিধানের প্রস্তাবনায় করা অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সফলতা নিয়ে যদি আমরা হিসেব-নিকেষ কষতে যাই তাহলে আমাদের হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর দেখছি না। কারণ বিগত দীর্ঘ ৪৮ বছর এদেশে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা এদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোন ক্ষেত্রেই সর্বাংশে সুশাসন, সাম্য, স্বাধীনতা, সুবিচার, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেননি।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গন এক কথায় দুর্বৃত্তায়নের কারখানায় পরিণত হয়েছে বলে বিদগ্ধজনদের অভিমত। বিশেষ করে যারা ছাত্র ও যুব সংগঠনের সাথে জড়িত তারা এমন ক্ষমতাবান হয়ে গেছে যে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাদের লাগাম টেনে ধরার সাহস মনে হয় সংশ্লিষ্ট দলের কারো নেই। তার সাথে বর্তমানে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রীয় সেবাদানের নিমিত্তে নিয়োগপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্তাব্যক্তির রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তায়ন আর জনগণের করের টাকায় ঘর সংসার চালানো গণ-কর্মচারীরা রাষ্ট্রকে সেবাদানের পরিবর্তে কী করে দলদাসে পরিণত হয় এবং উচ্চ পদ-পদবির আশায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পদলেহন করেÑ তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তো দেখা দিয়েছেই, তাছাড়া এ নিয়ে গোটা জাতি আজ রীতিমতো শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।

বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অতি উৎসাহী শিক্ষক প্রশাসনের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আশায় পছন্দসই দলের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন জাতিকে হতাশই করেনি বরং রীতিমত শিক্ষক সমাজকে কলংকিত করেছে; যা সদ্য অনুষ্ঠিতব্য ডাকসু নির্বাচনে জাতি লক্ষ্য করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে আমিও ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রিয় ঢাবি’র সম্মানিত শিক্ষক মহোদয়দের কাছে এহেন পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রত্যাশা করিনি। আর এখন আর একটি কথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখে হর-হামেশা শোনা যাচ্ছে তাহলো, বর্তমানে এদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে, এখন বাংলাদেশ ‘নিশুতি রাতের নির্বাচনের দেশ’-এ পরিণত হয়েছে।

তাছাড়া বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্য ও স্বাধীনতার এতো ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, ইতোপূর্বে এরকম পরিস্থিতি কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। আর এখানে সততা, নিষ্ঠা, যোগ্যতা, নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর পরিবর্তে অর্থায়ন, তোষণ, স্বজনপ্রীতি, পেশীশক্তিকে বেশী প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে নতুন করে দেশের সৎ, যোগ্য মানুষগুলো রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারেন না। আবার যারা রাজনীতিতে যুক্ত আছেন তাদের মধ্যেও সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। সৎ, নিষ্ঠাবান ও দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্যায়ন এদেশে হয় না বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলীয় রাজনীতিতে সৎ, যোগ্য, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা তুলি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে, বিগত বছরগুলোতে আমাদের অর্জন একেবারে অপ্রতুল না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পিছনে আমাদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যহীন সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও আমাদের দেশের গণতন্ত্র আজ নড়বড়ে অবস্থায়ই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আমরা প্রতিনিয়ত জনগণের গণতন্ত্র রেখে উন্নয়নের গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছি যা আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। ইদানিং সহনশীলতা, ধৈর্য্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ রাষ্ট্রের কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সংঘাত-সহিংসতার রাজনীতি থেকে এখনও আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। জনগণ এখনও রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-শঙ্কা প্রকাশ করেন। ইতোপূর্বে যে কোনো নির্বাচন উপলক্ষ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি জাতি যে উৎসবের আমেজ উপভোগ করতো সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে তারা অনেকাংশেই সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং জনগণের মাঝে এক রকম নির্বাচন বিমুখ মনোভাব তৈরি হয়েছে। এটা সঠিক গণতন্ত্র চর্চার জন্য একটি রীতিমত বড় রকমের ধাক্কা।

গত ১১ মার্চ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের একটি নির্বাচনী কেন্দ্রের চিত্র দেখলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে- উল্লেখিত ঐ কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২৫৯১ জন আর নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন ২২ জন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৪ জন সদস্য মিলে মোট ভোট গ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন ৩৬ জন লোক এবং ঐ কেন্দ্রে সারাদিনে ভোট পড়েছে মাত্র ৬৭ টি। এটা কোন্ ধরনের গণতন্ত্র চর্চার পূর্বাভাস তা সচেতন মহল ওয়াকিফ্হাল নয়।

‘স্বাধীনতা’ শব্দটির তাৎপর্য গভীর ও ব্যাপক। স্বাধীনতা মানে নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন নয়; স্বাধীনতা হলো স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার আয়োজন। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছার স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, মতামত প্রদানের স্বাধীনতা, চলা ফেরার স্বাধীনতা, রাজনীতির স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ইত্যাদিকে বোঝায়। একটি দেশের স্বাধীনতা সেদিনই সার্থক হয় যেদিন দেশের আপামর জনগণ প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশে নিজেদের নাগরিক অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ক্ষমতা অর্জন করে।

স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কঠিন তার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো বেশি কঠিন; যার জন্য বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা, সহনশীলতা, সংগ্রাম, সততা ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দেশপ্রেম, প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য, ন্যায়বোধ, সমতা। এছাড়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, বুদ্ধি, সুশিক্ষা ও সৎ চিন্তাকে কাজে লাগানো একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে, অতিমাত্রায় সচেতন ও সংঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, সঠিকভাবে মর্যাদা দিতে হয়। তাই সুনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার আসল মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।

মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল জাতীয় ঐক্য, সাম্যবাদ, ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্র; স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালিদের মনষ্কামনা ছিল সকল নাগরিকের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, বৈষম্যের মূলোৎপাটন করা। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক হতে চললো এরপরও আমরা সেই পথে বেশি দূর এগোতে পারিনি। যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে মুক্তিকামী দেশপ্রেমিক জনতা লড়াই করেছিল স্বাধীনতার ৪৮ বছরে আমরা সেই লক্ষ্য ও আদর্শ কতটা অর্জন করতে পেরেছি তার জবাব ভূক্তভোগী জনতাই ভাল দিতে পারবেন। সত্য, ন্যায়, কল্যাণকামী ও আদর্শের চেতনায় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ দূর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাক্ এই প্রত্যাশা নিরন্তর।

লেখক : কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক। E-mail: dr.alim1978@gmail.com 

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» শেরপুরে করোনা উপসর্গ নিয়ে ঢাকাফেরত বৃদ্ধের মৃত্যু ॥ নমুনা সংগ্রহ

» এফবিসিসিআই সভাপতির দেয়া সুরক্ষা সামগ্রী মমেক মাইক্রোয়োলজি বিভাগে হস্তান্তর

» করোনা জয় করলেন নকলা ইউএনও অফিসের নৈশ প্রহরী

» ভার্চুয়াল কোর্ট পরিচালনায় জটিলতা-সাফল্য ॥ প্রেক্ষিত শেরপুর সিজেএম মডেল

» ‘ভার্চুয়াল কোর্ট : সম্ভাবনা ও প্রায়োগিক সমস্যা’ শীর্ষক অনলাইন টকশো অনুষ্ঠিত

» শেরপুরে প্রধানমন্ত্রীর অনুদান পেল ৩ হাজার ৪ মসজিদ

» অনলাইন নিউজ পোর্টাল : নিবন্ধন পেতে থাকতে হবে ৪ যোগ্যতা

» সাবরিনা সাবার শত জনমের প্রেম

» দেশে করোনায় আরও ২৮ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৭৬৪ জন

» ময়মনসিংহ শহররক্ষা বাঁধের বিভিন্ন অংশে ভাঙ্গন ॥ হুমকীর মূখে নগরীর দৃষ্টিনন্দন জয়নুল উদ্যান

» ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক পরিবর্তন

» দৃশ্যমান হলো পদ্মাসেতুর সাড়ে ৪ কিলোমিটার

» ঝিনাইগাতীতে ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে বৃদ্ধ গ্রেফতার

» মাস্ক কখন পরবেন, কখন পরবেন না

» করোনায় মৃত্যুতে স্পেনকে ছাড়িয়ে ব্রাজিল এখন পঞ্চম

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

  রাত ৮:৫৯ | শনিবার | ৩০শে মে, ২০২০ ইং | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন : নাগরিক ভাবনা

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

img-add

‘সাত স্তম্ভ সপ্তবীরের

স্মৃতি আলেখ্যে গড়া

মহাকাল যায় ইতিহাস রচে

শহীদের রক্তক্ষরা।’

অগণিত শহীদের সাগরসম রক্ত ক্ষরণের ফলশ্রুতিতে পাওয়া লাল সবুজের এই দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এই দেশ কারো দয়া বা করুণায় পাওয়া নয়; বরং যার জন্য উৎসর্গিত হতে হয়েছে ৩০ লাখ বীর বাঙালি আর নির্যাতিত নিপীড়িত বাস্তুহারা হতে হয়েছিল অসংখ্য নর-নারীকে। আর অব্যাহত রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোলামী থেকে পরিত্রাণের জন্যই পরিচালিত হয়েছিল এদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সোজা কথায় বলতে গেলে মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টত:ই উল্লেখ রয়েছে শোষণ ও বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। বাংলার মুক্তিকামী মানুষেরা এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও সুবিচার সুনিশ্চিত হবে।

কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রাক্কালে মহান সংবিধানের প্রস্তাবনায় করা অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সফলতা নিয়ে যদি আমরা হিসেব-নিকেষ কষতে যাই তাহলে আমাদের হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর দেখছি না। কারণ বিগত দীর্ঘ ৪৮ বছর এদেশে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা এদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোন ক্ষেত্রেই সর্বাংশে সুশাসন, সাম্য, স্বাধীনতা, সুবিচার, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেননি।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গন এক কথায় দুর্বৃত্তায়নের কারখানায় পরিণত হয়েছে বলে বিদগ্ধজনদের অভিমত। বিশেষ করে যারা ছাত্র ও যুব সংগঠনের সাথে জড়িত তারা এমন ক্ষমতাবান হয়ে গেছে যে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাদের লাগাম টেনে ধরার সাহস মনে হয় সংশ্লিষ্ট দলের কারো নেই। তার সাথে বর্তমানে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রীয় সেবাদানের নিমিত্তে নিয়োগপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্তাব্যক্তির রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তায়ন আর জনগণের করের টাকায় ঘর সংসার চালানো গণ-কর্মচারীরা রাষ্ট্রকে সেবাদানের পরিবর্তে কী করে দলদাসে পরিণত হয় এবং উচ্চ পদ-পদবির আশায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পদলেহন করেÑ তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তো দেখা দিয়েছেই, তাছাড়া এ নিয়ে গোটা জাতি আজ রীতিমতো শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।

বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অতি উৎসাহী শিক্ষক প্রশাসনের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আশায় পছন্দসই দলের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন জাতিকে হতাশই করেনি বরং রীতিমত শিক্ষক সমাজকে কলংকিত করেছে; যা সদ্য অনুষ্ঠিতব্য ডাকসু নির্বাচনে জাতি লক্ষ্য করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে আমিও ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রিয় ঢাবি’র সম্মানিত শিক্ষক মহোদয়দের কাছে এহেন পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রত্যাশা করিনি। আর এখন আর একটি কথা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখে হর-হামেশা শোনা যাচ্ছে তাহলো, বর্তমানে এদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে, এখন বাংলাদেশ ‘নিশুতি রাতের নির্বাচনের দেশ’-এ পরিণত হয়েছে।

তাছাড়া বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্য ও স্বাধীনতার এতো ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, ইতোপূর্বে এরকম পরিস্থিতি কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। আর এখানে সততা, নিষ্ঠা, যোগ্যতা, নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর পরিবর্তে অর্থায়ন, তোষণ, স্বজনপ্রীতি, পেশীশক্তিকে বেশী প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে নতুন করে দেশের সৎ, যোগ্য মানুষগুলো রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারেন না। আবার যারা রাজনীতিতে যুক্ত আছেন তাদের মধ্যেও সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। সৎ, নিষ্ঠাবান ও দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্যায়ন এদেশে হয় না বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলীয় রাজনীতিতে সৎ, যোগ্য, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা তুলি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে, বিগত বছরগুলোতে আমাদের অর্জন একেবারে অপ্রতুল না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পিছনে আমাদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যহীন সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও আমাদের দেশের গণতন্ত্র আজ নড়বড়ে অবস্থায়ই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আমরা প্রতিনিয়ত জনগণের গণতন্ত্র রেখে উন্নয়নের গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছি যা আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। ইদানিং সহনশীলতা, ধৈর্য্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ রাষ্ট্রের কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সংঘাত-সহিংসতার রাজনীতি থেকে এখনও আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। জনগণ এখনও রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-শঙ্কা প্রকাশ করেন। ইতোপূর্বে যে কোনো নির্বাচন উপলক্ষ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি জাতি যে উৎসবের আমেজ উপভোগ করতো সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে তারা অনেকাংশেই সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং জনগণের মাঝে এক রকম নির্বাচন বিমুখ মনোভাব তৈরি হয়েছে। এটা সঠিক গণতন্ত্র চর্চার জন্য একটি রীতিমত বড় রকমের ধাক্কা।

গত ১১ মার্চ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রথম ধাপের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের একটি নির্বাচনী কেন্দ্রের চিত্র দেখলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে- উল্লেখিত ঐ কেন্দ্রে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ২৫৯১ জন আর নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন ২২ জন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৪ জন সদস্য মিলে মোট ভোট গ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন ৩৬ জন লোক এবং ঐ কেন্দ্রে সারাদিনে ভোট পড়েছে মাত্র ৬৭ টি। এটা কোন্ ধরনের গণতন্ত্র চর্চার পূর্বাভাস তা সচেতন মহল ওয়াকিফ্হাল নয়।

‘স্বাধীনতা’ শব্দটির তাৎপর্য গভীর ও ব্যাপক। স্বাধীনতা মানে নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন নয়; স্বাধীনতা হলো স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার আয়োজন। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছার স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, মতামত প্রদানের স্বাধীনতা, চলা ফেরার স্বাধীনতা, রাজনীতির স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ইত্যাদিকে বোঝায়। একটি দেশের স্বাধীনতা সেদিনই সার্থক হয় যেদিন দেশের আপামর জনগণ প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশে নিজেদের নাগরিক অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ক্ষমতা অর্জন করে।

স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কঠিন তার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো বেশি কঠিন; যার জন্য বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা, সহনশীলতা, সংগ্রাম, সততা ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দেশপ্রেম, প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য, ন্যায়বোধ, সমতা। এছাড়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, বুদ্ধি, সুশিক্ষা ও সৎ চিন্তাকে কাজে লাগানো একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে, অতিমাত্রায় সচেতন ও সংঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, সঠিকভাবে মর্যাদা দিতে হয়। তাই সুনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার আসল মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।

মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল জাতীয় ঐক্য, সাম্যবাদ, ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্র; স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালিদের মনষ্কামনা ছিল সকল নাগরিকের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, বৈষম্যের মূলোৎপাটন করা। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক হতে চললো এরপরও আমরা সেই পথে বেশি দূর এগোতে পারিনি। যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে মুক্তিকামী দেশপ্রেমিক জনতা লড়াই করেছিল স্বাধীনতার ৪৮ বছরে আমরা সেই লক্ষ্য ও আদর্শ কতটা অর্জন করতে পেরেছি তার জবাব ভূক্তভোগী জনতাই ভাল দিতে পারবেন। সত্য, ন্যায়, কল্যাণকামী ও আদর্শের চেতনায় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ দূর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাক্ এই প্রত্যাশা নিরন্তর।

লেখক : কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক। E-mail: dr.alim1978@gmail.com 

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

error: Content is protected !!