রাত ৮:২০ | শনিবার | ২৮শে মার্চ, ২০২০ ইং | ১৪ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতা দিবসে নাগরিক ভাবনা

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

img-add

এমন এক সময় মহান জাতীয় ও স্বাধীনতা দিবস আমাদের দোর গোড়ায় এসে উপস্থিত হলো যখন বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীবাসী কোভিড-১৯ তথা নভেল করোনা ভাইরাস আতঙ্ক নিয়ে দিবারাত্র পাড় করছে তখন সুনাগরিকদের ভাবনা ক্রমশ: বেড়েই চলছে। খবরে প্রকাশ, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ১৭৭টি দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মহামারী আকার ধারণ করে ১৩০৪৯ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে এবং সারা বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এহেন পরিস্থিতিতে আমি নিজেও বিশ্ববাসীর ন্যায় মহা আতঙ্কিত অবস্থায় থেকেও মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস নিয়ে আমার এই ছোট্ট প্রয়াস।
অগণিত শহীদের সাগরসম রক্তক্ষরণের ফলশ্রুতিতে পাওয়া লাল সবুজের এই দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এই দেশ কারো দয়া বা করুণায় পাওয়া নয়; বরং যার জন্য উৎসর্গিত হতে হয়েছে ৩০ লাখ বীর বাঙালি আর নির্যাতিত নিপীড়িত বাস্তুহারা হতে হয়েছিল অসংখ্য নর-নারীকে। আর অব্যাহত রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোলামী থেকে পরিত্রাণের জন্যই পরিচালিত হয়েছিল এদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সোজা কথায় বলতে গেলে মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টত:ই উল্লেখ রয়েছে শোষণ ও বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। বাংলার মুক্তিকামী মানুষেরা এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও সুবিচার সুনিশ্চিত হবে।
কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রাক্কালে মহান সংবিধানের প্রস্তাবনায় করা অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সফলতা নিয়ে যদি আমরা হিসেব-নিকেষ কষতে যাই তাহলে আমাদের হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর দেখছি না। কারণ বিগত দীর্ঘ ৪৯ বছর এদেশে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা এদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোন ক্ষেত্রেই সর্বাংশে সুশাসন, সাম্য, স্বাধীনতা, সুবিচার, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেননি।
পরাধীনতা যে কোনো জাতির জন্যই অভিশাপ স্বরূপ। এ থেকে মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত একটি জাতি কোনক্রমেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তেমনি মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর ক্রমান্বয়ে যখন সে বুঝতে শিখে তখন তার প্রাপ্য নানান অধিকারের পাশাপাশি অন্যতম প্রধান অধিকার হচ্ছে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করা; যা তার জন্মগত অধিকার। মানব শিশু তথা মানবগোষ্ঠীকে এ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কেউ সংরক্ষণ করেন না। আমরা সাধারণত: স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বলতে বুঝি পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে সার্বভৌম আত্মমর্যাদা নিয়ে দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রাকে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও যে কথাটি নির্মম সত্য তা হলো স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন দুষ্কর তেমনি তা রক্ষা করা আরো বেশি দুষ্কর। তাই স্বাধীনতা প্রত্যেক জাতির জন্য এক মহামূল্যবান সম্পদ। যে জাতি যেদিন স্বাধীনতা লাভ করে সেদিনটি সেই জাতির জাতীয় জীবনে যেমন গৌরবের তেমনি আনন্দ, পবিত্রতম ও তাৎপর্যময় দিন।
বাঙালির ইতিহাস পরাধীনতা আর বঞ্চনার ইতিহাস। অপরদিকে, প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের ঐতিহ্যের ইতিহাস হলো সংগ্রাম, সাহস, বীরত্ব আর বিদ্রোহের। সৃষ্টির আদি থেকেই প্রকৃতি তার অকৃপণ হাতে আমাদের ভূমিকে নানা সম্পদ-প্রাচুর্যে পূর্ণ করে রেখেছেন। আর যার ফলে রূপসী ও ঐশ্বর্যশালী বাংলার উপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোভী মানুষদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে বার বার। প্রায় দু’শত বছরের ইংরেজ শাসনে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি নানাভাবে; সেটা ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে। তাদের চক্রান্তের জালে আবদ্ধ হয়ে আমরা বার বার দ্বিধা-বিভক্ত হয়েছি। এক পর্যায়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ তাদের শাসনদন্ডের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিদ্রোহী হয়ে উঠে; তারা গড়ে তোলে সশস্র সংগ্রাম। যার ফলে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি আলাদা রাষ্ট্র। আমরা পূর্ববাংলার মানুষ অর্ন্তভূক্ত হলাম পাকিস্তান নামক দূররাষ্ট্রে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার জনগণের সাথে করতে থাকলো বিমাতাসুলভ আচরণ। এদেশ স্বাধীন হলো কিন্তু আমরা রয়ে গেলাম পরাধীন। পাকিস্তানি শাসকদের একরোখা শাসননীতির ফলে আমরা হতে লাগলাম শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আমরা বঞ্চনার শিকার হতে থাকলাম। আমাদের শক্তিহীন করে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ওরা বেছে নেয় মুখের ভাষাকে। কারণ, কুচক্রি শাসকগোষ্ঠী ঠিকই বুঝেছিল কোনো একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে হয়। আমাদের দেশের আপামর জনগণ পাকিস্তানিদের এসব অনৈতিক কার্যকলাপ কখনই মেনে নেয়নি; বরং তারা বারবার এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে, বিদ্রোহ করেছে ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিশ্বের স¦াধীনতা অর্জনের ইতিহাসে একটি প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো জাতিকেই জন্মভূমির জন্য এমনভাবে আত্মত্যাগ করতে হয়নি, ঝরাতে হয়নি সাগরসম রক্ত। সে সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়ে, অর্থ দিয়ে, সম্পদ দিয়ে, সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকা পৎ পৎ করে এ দেশের মুক্ত আকাশে উড়াতে সক্ষম হয়েছিল। এজন্যে এ দেশের মানুষকে অস্ত্রহীন, সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় দীর্ঘ নয় মাস সংগ্রাম করতে হয়েছিল এক শক্তিশালী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে। বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আর বাংলার ভূমিকে প্রতিষ্ঠা করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র হিসেবে।
আমাদের জাতীয় জীবনে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। আর এ দিবসটির প্রধান তাৎপর্য হচ্ছে, এ দিনটি সমগ্র দেশবাসীর বহুকাল লালিত মুক্তি ও সংগ্রামের অঙ্গীকারে ভাস্বর। এ দিনটি আমাদের আত্মপরিচয়ের গৌরবে উজ্জ্বল, ত্যাগে ও বেদনায় মহীয়ান। প্রতি বছর গৌরবময় এ দিনটি পালন করতে গিয়ে আমাদের কর্তব্য হয়ে ওঠে স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সাধ আমরা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি, জাতীয় জীবনে আমাদের অর্জন কতটুকু আর বহির্বিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায় এর হিসেব-নিকেষ পর্যালোচনা করা।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গন এক কথায় দুর্বৃত্তায়নের কারখানায় পরিণত হয়েছে বলে বিদগ্ধজনদের অভিমত। বিশেষ করে যারা ছাত্র ও যুব সংগঠনের সাথে জড়িত তারা এমন ক্ষমতাবান হয়ে গেছেন যে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাদের লাগাম টেনে ধরার সাহস মনে হয় সংশ্লিষ্ট দলের কারো নেই। তার সাথে বর্তমানে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রীয় সেবাদানের নিমিত্তে নিয়োগপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্তাব্যক্তির রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তায়ন আর জনগণের করের টাকায় ঘর সংসার চালানো গণ-কর্মচারীরা রাষ্ট্রকে সেবাদানের পরিবর্তে কী করে দলদাস, লাঠিয়াল ও দুর্বৃত্তে পরিণত হয় তা কুড়িগ্রামে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়াও এহেন সরকারি কর্মকর্তারা উচ্চ পদ-পদবি ও লোভনীয় কর্মস্থলে পদায়ন পাওয়ার আশায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পদলেহন করেÑ তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তো দেখা দিয়েছেই, তাছাড়া এ নিয়ে গোটা জাতি আজ রীতিমতো শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।
বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অতি উৎসাহী শিক্ষক প্রশাসনের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আশায় পছন্দসই দলের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন জাতিকে হতাশই করেনি বরং রীতিমত শিক্ষক সমাজকে কলংকিত করেছে; যা গত বছর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে জাতি অসহায়ের মতো লক্ষ্য করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে আমি নিজেও আমার প্রিয় ঢাবি’র সম্মানিত শিক্ষক মহোদয়দের কাছে এহেন পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রত্যাশা করিনি। আরেকটি কথা এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখে হর-হামেশা শোনা যাচ্ছে তাহলো, বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে, এখন এদেশে সাজানো নির্বাচনের নামে ‘নির্বাচনের জন্য নির্বাচন’ প্রথা কায়েম হয়েছে।
তাছাড়া বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্য ও স্বাধীনতার এতো ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, ইতোপূর্বে এরকম পরিস্থিতি কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। আর এখানে সততা, নিষ্ঠা, যোগ্যতা, নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর পরিবর্তে অর্থায়ন, তোষণ, স্বজনপ্রীতি, পেশীশক্তিকে বেশী প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে নতুন করে দেশের সৎ, যোগ্য ও নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন মানুষগুলো রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারছেন না। আবার যারা রাজনীতিতে যুক্ত আছেন তাদের মধ্যেও সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। সৎ, নিষ্ঠাবান ও দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্যায়ন এদেশে হয় না বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলীয় রাজনীতিতে সৎ, যোগ্য, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা তুলি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে, বিগত বছরগুলোতে আমাদের অর্জন একেবারে অপ্রতুল না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পিছনে আমাদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যহীন সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও আমাদের দেশের গণতন্ত্র আজ নড়বড়ে অবস্থায়ই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আমরা প্রতিনিয়ত জনগণের গণতন্ত্র রেখে উন্নয়নের গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছি যা আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। ইদানিং সহনশীলতা, ধৈর্য্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ রাষ্ট্রের কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সংঘাত-সহিংসতার রাজনীতি থেকে এখনও আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। জনগণ এখনও রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-শঙ্কা প্রকাশ করেন। ইতোপূর্বে যে কোনো নির্বাচন উপলক্ষ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি জাতি যে উৎসবের আমেজ উপভোগ করতো সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে তারা অনেকাংশেই সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং জনগণের মাঝে এক রকম নির্বাচন বিমুখ মনোভাব তৈরি হয়েছে। তার মাঝে এখন আমাদের বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবীতে চলছে করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক। এহেন পরিস্থিতিতে গত ২১ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল শতকরা পাঁচ ভাগ। সার্বিক দিক বিবেচনায় এটা সঠিক গণতন্ত্র চর্চার জন্য একটি রীতিমত বড় রকমের ধাক্কা।
‘স্বাধীনতা’ শব্দটির তাৎপর্য গভীর ও ব্যাপক। স্বাধীনতা মানে নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন নয়; স্বাধীনতা হলো স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার আয়োজন। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছার স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, মতামত প্রদানের স্বাধীনতা, চলা ফেরার স্বাধীনতা, রাজনীতির স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ইত্যাদিকে বোঝায়। একটি দেশের স্বাধীনতা সেদিনই সার্থক হয় যেদিন দেশের আপামর জনগণ প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশে নিজেদের নাগরিক অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ক্ষমতা অর্জন করে।
স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কঠিন তার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো বেশি কঠিন; যার জন্য বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা, সহনশীলতা, সংগ্রাম, সততা ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দেশপ্রেম, প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য, ন্যায়বোধ, সমতা। এছাড়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, বুদ্ধি, সুশিক্ষা ও সৎ চিন্তাকে কাজে লাগানো একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে, অতিমাত্রায় সচেতন ও সংঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, সঠিকভাবে মর্যাদা দিতে হয়। তাই সুনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার আসল মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল জাতীয় ঐক্য, সাম্যবাদ, ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্র; স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালিদের মনষ্কামনা ছিল সকল নাগরিকের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, বৈষম্যের মূলোৎপাটন করা। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক হতে চললো এরপরও আমরা সেই পথে বেশি দূর এগোতে পারিনি। যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে মুক্তিকামী দেশপ্রেমিক জনতা লড়াই করেছিল স্বাধীনতার ৪৯ বছরে আমরা সেই লক্ষ্য ও আদর্শ কতটা অর্জন করতে পেরেছি তার জবাব ভূক্তভোগী জনতাই ভাল দিতে পারবেন। সত্য, ন্যায়, কল্যাণকামী ও আদর্শের চেতনায় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ দূর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাক্ এই প্রত্যাশা নিরন্তর।
আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, সমগ্র দেশবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, আকাঙ্খা, দৃঢ় মনোবল ও আত্মত্যাগের ফলেই এই স্বাধীনতা লাভ সম্ভব হয়েছিল যা কোনো একক গোষ্ঠী, দল বা ব্যক্তির প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়নি। আমাদের এই স্বাধীনতা অর্জন আমাদেরকে দারিদ্র্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে। এ আদর্শগুলোর প্রকৃত রুপায়ণই আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আজ আমাদের দায়িত্ব, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারীদ্রমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণকর, সুখী-সমৃদ্ধ, শান্তিময় একটি দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এই কষ্টার্জিত স্বাধীনতা যাতে কারো ব্যক্তিগত বা একক দলগত চোরাবালিতে পথ না হারায় সেই প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় আমাদের সদা জাগ্রত থাকতে হবে। আজ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তজুড়ে উন্নয়ন-উৎকর্ষ সাধনের প্রতিযোগিতা চলছে জোরেশোরে। এক্ষেত্রে সকল নাগরিকগণ সরকারি কর্মকান্ডের সাথে যুগপৎভাবে অংশগ্রহণ করে অব্যাহত রাখতে হবে উন্নয়নের ধারা প্রবাহ। দেশ গড়ার কাজে আজ প্রয়োজন সকল ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে নতুন করে দিন বদলের শপথ গ্রহণ করার। আর সবশেষে প্রত্যাশা একটাই, সর্বপ্রকার হিংসা-হানাহানি, ব্যক্তিগত আক্রোশ, স্বার্থপরতা-পরশ্রীকাতরতা-স্বৈরাচারী ভাবাপন্ন মনোভাব থেকে দেশকে মুক্ত করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠতে হবে সকল বাঙালিকে; তবেই না গড়ে তোলা সম্ভব সুখী-সমৃদ্ধ-ঐশ্বর্যশালী সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : কবি, গবেষক ও সহকারি অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» করোনা প্রতিরোধে শেরপুর জেলায় ১শ টন চাল ও ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ

» শেরপুরে করোনা সংক্রমণ রোধে নিজ উদ্যোগে জীবাণুনাশক স্প্রে করছেন স্থানীয়রা

» করোনা পরিস্থিতি : বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ভাবনা : আবুল কালাম আজাদ

» মুক্ত করো হে সবার সঙ্গে যুক্ত করো হে বন্ধ : শিবশঙ্কর কারুয়া শিবু

» জেনে নিন মানসিক চাপ কমানোর উপায়

» করোনা মোকাবেলায় ৫ শ্রেণির মানুষকে মাশরাফির কৃতজ্ঞতা

» দৃশ্যমান হলাে পদ্মা সেতুর ৪০৫০ মিটার

» করোনা প্রতিরোধে নকলা পৌরসভার উদ্যোগে জীবাণুনাশক স্প্রে কার্যক্রম শুরু

» করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে শেরপুরে মাস্ক ও সাবান বিতরণ

» শেরপুরে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে পুলিশের বিশেষ কর্মসূচি

» কোয়ারেন্টিন শেষে সন্তানদের কাছে শাওন

» করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্রিটেনের রানী ২য় এলিজাবেথ

» করোনা মোকাবিলায় তহবিলে ৫০ লাখ রুপি দিলেন শচীন

» দেশে করোনায় নতুন শনাক্ত নেই, সুস্থ আরও ৪ জন

» বৃদ্ধদের কান ধরিয়ে ছবি তোলা সেই এসিল্যান্ড প্রত্যাহার

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

  রাত ৮:২০ | শনিবার | ২৮শে মার্চ, ২০২০ ইং | ১৪ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

স্বাধীনতা দিবসে নাগরিক ভাবনা

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

img-add

এমন এক সময় মহান জাতীয় ও স্বাধীনতা দিবস আমাদের দোর গোড়ায় এসে উপস্থিত হলো যখন বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীবাসী কোভিড-১৯ তথা নভেল করোনা ভাইরাস আতঙ্ক নিয়ে দিবারাত্র পাড় করছে তখন সুনাগরিকদের ভাবনা ক্রমশ: বেড়েই চলছে। খবরে প্রকাশ, এখন পর্যন্ত পৃথিবীর ১৭৭টি দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মহামারী আকার ধারণ করে ১৩০৪৯ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে এবং সারা বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা সাড়ে তিন লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এহেন পরিস্থিতিতে আমি নিজেও বিশ্ববাসীর ন্যায় মহা আতঙ্কিত অবস্থায় থেকেও মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস নিয়ে আমার এই ছোট্ট প্রয়াস।
অগণিত শহীদের সাগরসম রক্তক্ষরণের ফলশ্রুতিতে পাওয়া লাল সবুজের এই দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। এই দেশ কারো দয়া বা করুণায় পাওয়া নয়; বরং যার জন্য উৎসর্গিত হতে হয়েছে ৩০ লাখ বীর বাঙালি আর নির্যাতিত নিপীড়িত বাস্তুহারা হতে হয়েছিল অসংখ্য নর-নারীকে। আর অব্যাহত রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গোলামী থেকে পরিত্রাণের জন্যই পরিচালিত হয়েছিল এদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সোজা কথায় বলতে গেলে মানুষে মানুষে বৈষম্য দূর করাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। কেননা বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টত:ই উল্লেখ রয়েছে শোষণ ও বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা। বাংলার মুক্তিকামী মানুষেরা এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যে রাষ্ট্রে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং স্বাধীনতা ও সুবিচার সুনিশ্চিত হবে।
কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রাক্কালে মহান সংবিধানের প্রস্তাবনায় করা অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সফলতা নিয়ে যদি আমরা হিসেব-নিকেষ কষতে যাই তাহলে আমাদের হতাশ হওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর দেখছি না। কারণ বিগত দীর্ঘ ৪৯ বছর এদেশে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন তারা এদেশে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কোন ক্ষেত্রেই সর্বাংশে সুশাসন, সাম্য, স্বাধীনতা, সুবিচার, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারেননি।
পরাধীনতা যে কোনো জাতির জন্যই অভিশাপ স্বরূপ। এ থেকে মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত একটি জাতি কোনক্রমেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তেমনি মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর ক্রমান্বয়ে যখন সে বুঝতে শিখে তখন তার প্রাপ্য নানান অধিকারের পাশাপাশি অন্যতম প্রধান অধিকার হচ্ছে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করা; যা তার জন্মগত অধিকার। মানব শিশু তথা মানবগোষ্ঠীকে এ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কেউ সংরক্ষণ করেন না। আমরা সাধারণত: স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বলতে বুঝি পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে সার্বভৌম আত্মমর্যাদা নিয়ে দেশ ও জাতির অগ্রযাত্রাকে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও যে কথাটি নির্মম সত্য তা হলো স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন দুষ্কর তেমনি তা রক্ষা করা আরো বেশি দুষ্কর। তাই স্বাধীনতা প্রত্যেক জাতির জন্য এক মহামূল্যবান সম্পদ। যে জাতি যেদিন স্বাধীনতা লাভ করে সেদিনটি সেই জাতির জাতীয় জীবনে যেমন গৌরবের তেমনি আনন্দ, পবিত্রতম ও তাৎপর্যময় দিন।
বাঙালির ইতিহাস পরাধীনতা আর বঞ্চনার ইতিহাস। অপরদিকে, প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের ঐতিহ্যের ইতিহাস হলো সংগ্রাম, সাহস, বীরত্ব আর বিদ্রোহের। সৃষ্টির আদি থেকেই প্রকৃতি তার অকৃপণ হাতে আমাদের ভূমিকে নানা সম্পদ-প্রাচুর্যে পূর্ণ করে রেখেছেন। আর যার ফলে রূপসী ও ঐশ্বর্যশালী বাংলার উপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোভী মানুষদের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে বার বার। প্রায় দু’শত বছরের ইংরেজ শাসনে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি নানাভাবে; সেটা ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় দিক থেকে। তাদের চক্রান্তের জালে আবদ্ধ হয়ে আমরা বার বার দ্বিধা-বিভক্ত হয়েছি। এক পর্যায়ে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ তাদের শাসনদন্ডের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিদ্রোহী হয়ে উঠে; তারা গড়ে তোলে সশস্র সংগ্রাম। যার ফলে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি আলাদা রাষ্ট্র। আমরা পূর্ববাংলার মানুষ অর্ন্তভূক্ত হলাম পাকিস্তান নামক দূররাষ্ট্রে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার জনগণের সাথে করতে থাকলো বিমাতাসুলভ আচরণ। এদেশ স্বাধীন হলো কিন্তু আমরা রয়ে গেলাম পরাধীন। পাকিস্তানি শাসকদের একরোখা শাসননীতির ফলে আমরা হতে লাগলাম শোষিত, বঞ্চিত ও অবহেলিত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে আমরা বঞ্চনার শিকার হতে থাকলাম। আমাদের শক্তিহীন করে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ওরা বেছে নেয় মুখের ভাষাকে। কারণ, কুচক্রি শাসকগোষ্ঠী ঠিকই বুঝেছিল কোনো একটি জাতিকে ধ্বংস করতে হলে প্রথমে তার শিক্ষা ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধ্বংস করতে হয়। আমাদের দেশের আপামর জনগণ পাকিস্তানিদের এসব অনৈতিক কার্যকলাপ কখনই মেনে নেয়নি; বরং তারা বারবার এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে, বিদ্রোহ করেছে ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিশ্বের স¦াধীনতা অর্জনের ইতিহাসে একটি প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো জাতিকেই জন্মভূমির জন্য এমনভাবে আত্মত্যাগ করতে হয়নি, ঝরাতে হয়নি সাগরসম রক্ত। সে সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়ে, অর্থ দিয়ে, সম্পদ দিয়ে, সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকা পৎ পৎ করে এ দেশের মুক্ত আকাশে উড়াতে সক্ষম হয়েছিল। এজন্যে এ দেশের মানুষকে অস্ত্রহীন, সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় দীর্ঘ নয় মাস সংগ্রাম করতে হয়েছিল এক শক্তিশালী আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে। বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা করেছে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আর বাংলার ভূমিকে প্রতিষ্ঠা করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র হিসেবে।
আমাদের জাতীয় জীবনে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। আর এ দিবসটির প্রধান তাৎপর্য হচ্ছে, এ দিনটি সমগ্র দেশবাসীর বহুকাল লালিত মুক্তি ও সংগ্রামের অঙ্গীকারে ভাস্বর। এ দিনটি আমাদের আত্মপরিচয়ের গৌরবে উজ্জ্বল, ত্যাগে ও বেদনায় মহীয়ান। প্রতি বছর গৌরবময় এ দিনটি পালন করতে গিয়ে আমাদের কর্তব্য হয়ে ওঠে স্বাধীনতার স্বপ্ন ও সাধ আমরা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছি, জাতীয় জীবনে আমাদের অর্জন কতটুকু আর বহির্বিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায় এর হিসেব-নিকেষ পর্যালোচনা করা।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গন এক কথায় দুর্বৃত্তায়নের কারখানায় পরিণত হয়েছে বলে বিদগ্ধজনদের অভিমত। বিশেষ করে যারা ছাত্র ও যুব সংগঠনের সাথে জড়িত তারা এমন ক্ষমতাবান হয়ে গেছেন যে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাদের লাগাম টেনে ধরার সাহস মনে হয় সংশ্লিষ্ট দলের কারো নেই। তার সাথে বর্তমানে যোগ হয়েছে রাষ্ট্রীয় সেবাদানের নিমিত্তে নিয়োগপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীর কতিপয় উচ্চাভিলাষী কর্তাব্যক্তির রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তায়ন আর জনগণের করের টাকায় ঘর সংসার চালানো গণ-কর্মচারীরা রাষ্ট্রকে সেবাদানের পরিবর্তে কী করে দলদাস, লাঠিয়াল ও দুর্বৃত্তে পরিণত হয় তা কুড়িগ্রামে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এছাড়াও এহেন সরকারি কর্মকর্তারা উচ্চ পদ-পদবি ও লোভনীয় কর্মস্থলে পদায়ন পাওয়ার আশায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পদলেহন করেÑ তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তো দেখা দিয়েছেই, তাছাড়া এ নিয়ে গোটা জাতি আজ রীতিমতো শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন।
বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অতি উৎসাহী শিক্ষক প্রশাসনের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আশায় পছন্দসই দলের লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন জাতিকে হতাশই করেনি বরং রীতিমত শিক্ষক সমাজকে কলংকিত করেছে; যা গত বছর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে জাতি অসহায়ের মতো লক্ষ্য করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র হিসেবে আমি নিজেও আমার প্রিয় ঢাবি’র সম্মানিত শিক্ষক মহোদয়দের কাছে এহেন পক্ষপাতমূলক আচরণ প্রত্যাশা করিনি। আরেকটি কথা এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মুখে হর-হামেশা শোনা যাচ্ছে তাহলো, বর্তমানে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে চলে এসেছে যে, এখন এদেশে সাজানো নির্বাচনের নামে ‘নির্বাচনের জন্য নির্বাচন’ প্রথা কায়েম হয়েছে।
তাছাড়া বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্য ও স্বাধীনতার এতো ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, ইতোপূর্বে এরকম পরিস্থিতি কখনো লক্ষ্য করা যায়নি। আর এখানে সততা, নিষ্ঠা, যোগ্যতা, নিবেদিতপ্রাণ কর্মীর পরিবর্তে অর্থায়ন, তোষণ, স্বজনপ্রীতি, পেশীশক্তিকে বেশী প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে নতুন করে দেশের সৎ, যোগ্য ও নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন মানুষগুলো রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার কথা চিন্তাই করতে পারছেন না। আবার যারা রাজনীতিতে যুক্ত আছেন তাদের মধ্যেও সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত হচ্ছে না। সৎ, নিষ্ঠাবান ও দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্যায়ন এদেশে হয় না বললেই চলে। যার ফলশ্রুতিতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলীয় রাজনীতিতে সৎ, যোগ্য, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে আমরা যদি আমাদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা তুলি তাহলে আমরা দেখতে পাবো যে, বিগত বছরগুলোতে আমাদের অর্জন একেবারে অপ্রতুল না হলেও যতটা হওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল ততটা অর্জিত হয়নি। স্বাধীনতা সংগ্রামের পিছনে আমাদের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা এবং বৈষম্যহীন সমাজ, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন সক্রিয় ছিল। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হলেও আমাদের দেশের গণতন্ত্র আজ নড়বড়ে অবস্থায়ই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আমরা প্রতিনিয়ত জনগণের গণতন্ত্র রেখে উন্নয়নের গণতন্ত্রের বুলি আওড়াচ্ছি যা আধুনিক গণতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক। ইদানিং সহনশীলতা, ধৈর্য্যশীলতা, সবার জন্য আইনের সমপ্রয়োগ রাষ্ট্রের কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সংঘাত-সহিংসতার রাজনীতি থেকে এখনও আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি। জনগণ এখনও রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-শঙ্কা প্রকাশ করেন। ইতোপূর্বে যে কোনো নির্বাচন উপলক্ষ্যে ঐতিহ্যগতভাবে বাঙালি জাতি যে উৎসবের আমেজ উপভোগ করতো সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে তারা অনেকাংশেই সেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং জনগণের মাঝে এক রকম নির্বাচন বিমুখ মনোভাব তৈরি হয়েছে। তার মাঝে এখন আমাদের বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবীতে চলছে করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক। এহেন পরিস্থিতিতে গত ২১ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল শতকরা পাঁচ ভাগ। সার্বিক দিক বিবেচনায় এটা সঠিক গণতন্ত্র চর্চার জন্য একটি রীতিমত বড় রকমের ধাক্কা।
‘স্বাধীনতা’ শব্দটির তাৎপর্য গভীর ও ব্যাপক। স্বাধীনতা মানে নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আয়োজন নয়; স্বাধীনতা হলো স্বাধীন রাষ্ট্রে সার্বভৌম জাতি হিসেবে টিকে থাকার আয়োজন। স্বাধীনতা মানে ইচ্ছার স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, মতামত প্রদানের স্বাধীনতা, চলা ফেরার স্বাধীনতা, রাজনীতির স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তি ইত্যাদিকে বোঝায়। একটি দেশের স্বাধীনতা সেদিনই সার্থক হয় যেদিন দেশের আপামর জনগণ প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশে নিজেদের নাগরিক অধিকার নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ক্ষমতা অর্জন করে।
স্বাধীনতা অর্জন করা যেমন কঠিন তার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা আরো বেশি কঠিন; যার জন্য বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা, সহনশীলতা, সংগ্রাম, সততা ও শক্তির। আর স্বাধীনতাকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দেশপ্রেম, প্রযুক্তি, কৌশল, ঐক্য, ন্যায়বোধ, সমতা। এছাড়া স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, বুদ্ধি, সুশিক্ষা ও সৎ চিন্তাকে কাজে লাগানো একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ করে, অতিমাত্রায় সচেতন ও সংঘবদ্ধ না হলে স্বাধীনতাকে রক্ষা করা যায় না। স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে হয়, সঠিকভাবে মর্যাদা দিতে হয়। তাই সুনাগরিক হিসেবে স্বাধীনতার আসল মর্ম উপলব্ধি করে একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল জাতীয় ঐক্য, সাম্যবাদ, ন্যায় বিচার ও গণতন্ত্র; স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালিদের মনষ্কামনা ছিল সকল নাগরিকের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায়, অবিচার, বৈষম্যের মূলোৎপাটন করা। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক হতে চললো এরপরও আমরা সেই পথে বেশি দূর এগোতে পারিনি। যে লক্ষ্য ও আদর্শকে সামনে রেখে মুক্তিকামী দেশপ্রেমিক জনতা লড়াই করেছিল স্বাধীনতার ৪৯ বছরে আমরা সেই লক্ষ্য ও আদর্শ কতটা অর্জন করতে পেরেছি তার জবাব ভূক্তভোগী জনতাই ভাল দিতে পারবেন। সত্য, ন্যায়, কল্যাণকামী ও আদর্শের চেতনায় আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ দূর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যাক্ এই প্রত্যাশা নিরন্তর।
আমাদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, সমগ্র দেশবাসীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, আকাঙ্খা, দৃঢ় মনোবল ও আত্মত্যাগের ফলেই এই স্বাধীনতা লাভ সম্ভব হয়েছিল যা কোনো একক গোষ্ঠী, দল বা ব্যক্তির প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়নি। আমাদের এই স্বাধীনতা অর্জন আমাদেরকে দারিদ্র্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে। এ আদর্শগুলোর প্রকৃত রুপায়ণই আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষের প্রাণের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আজ আমাদের দায়িত্ব, আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে ক্ষুধা-দারীদ্রমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, কল্যাণকর, সুখী-সমৃদ্ধ, শান্তিময় একটি দেশ হিসেবে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করা। আর এই কষ্টার্জিত স্বাধীনতা যাতে কারো ব্যক্তিগত বা একক দলগত চোরাবালিতে পথ না হারায় সেই প্রতিরোধ প্রচেষ্টায় অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় আমাদের সদা জাগ্রত থাকতে হবে। আজ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তজুড়ে উন্নয়ন-উৎকর্ষ সাধনের প্রতিযোগিতা চলছে জোরেশোরে। এক্ষেত্রে সকল নাগরিকগণ সরকারি কর্মকান্ডের সাথে যুগপৎভাবে অংশগ্রহণ করে অব্যাহত রাখতে হবে উন্নয়নের ধারা প্রবাহ। দেশ গড়ার কাজে আজ প্রয়োজন সকল ভেদাভেদ ভুলে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে নতুন করে দিন বদলের শপথ গ্রহণ করার। আর সবশেষে প্রত্যাশা একটাই, সর্বপ্রকার হিংসা-হানাহানি, ব্যক্তিগত আক্রোশ, স্বার্থপরতা-পরশ্রীকাতরতা-স্বৈরাচারী ভাবাপন্ন মনোভাব থেকে দেশকে মুক্ত করে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠতে হবে সকল বাঙালিকে; তবেই না গড়ে তোলা সম্ভব সুখী-সমৃদ্ধ-ঐশ্বর্যশালী সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : কবি, গবেষক ও সহকারি অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

error: Content is protected !!