প্রকাশকাল: 7 মে, 2019

স্বাগতম মাহে রমযান

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

বছর ঘুরে আবারও মুসলিম উম্মাহ্’র মাঝে ফিরে এলো রহমত, বরকত ও মাগ্ফিরাতের মাস পবিত্র রমযানুল করীম। স্বাগতম রমযান করীম। এ মাসটি এতো ফযিলতপূর্ণ যে তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। হিজরী চান্দ্রবর্ষের ১২টি মাসের মধ্যে শুধুমাত্র একটি মাসের নাম পবিত্র কুরআনুল কারীমে উল্লেখ রয়েছে আর সে মাসটি হলো রমযান; এজন্য এ মাসটি এতো তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমাময়।
‘রমযান’ শব্দটি আরবি ভাষা থেকে উৎকলিত। যার আভিধানিক অর্থ হলো- অতিরিক্ত গরম, তৃষ্ণা, কঠোর সূর্যতাপ, গলে যাওয়া, দহন এবং জ্বলন ইত্যাদি। রমযান মাসে যেহেতু ইবাদত-বন্দেগী তথা নেক আ’মলের কারণে বিগত গুণাহ্রাশি বিমোচিত হয়ে যায় কিংবা গলে গলে নি:শেষ হয়ে যায় সেজন্যেই এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে রমযান।
ইসলামের ৫টি মৌলিক স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সাওম বা রোযা প্রতিপালনের বিধান। তবে এ বিধানটি কেবল আমাদের জন্যই নয় বরং আমাদের পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের উম্মতগণের জন্যেও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র কুরআনুল কারীমে ইরশাদ ফরমান,- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের প্রতি রোযা ফরয করা হয়েছে যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের প্রতি ফরয করা হয়েছিল; যাতে তোমরা পরহেয্গারিতা অবলম্বন করতে পারো।’ (সূরা বাক্বারা:১৮৩)
এ সূরার অন্যত্র আল্লাহ্ জাল্লা শানু ইরশাদ করেন- ‘ রমযান মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সুপথ প্রাপ্তির সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাসে (স্বস্থানে) উপস্থিত থাকবে সে যেন সাওম পালন করে।’ (সূরা বাক্বারা: ১৮৫)
তাফসীরকারদের মতে, হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর সহীফা রমযানের প্রথম রাতে, হযরত মূসা (আ.) এর তাওরাত এ মাসের ৬ষ্ঠ রাতে, হযরত ঈসা (আ.) এর ইঞ্জিল এ মাসের ত্রয়োদশ রাতে এবং হযরত দাউদ (আ.) এর যাবুর এ মাসের অষ্টাদশ রাতে নাযিল হয়েছে। (কুরতুবী: ২/২৯৮) অর্থাৎ সমস্ত ঐশী কিতাব নাযিল হওয়ার জন্য বিখ্যাত মাস রমযান।
মুসলমান তথা উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য সর্বোত্তম মাস হলো রমযান। হাদীস শরীফে রয়েছে, নবী করীম (স.) ফরমান, মুসলমানদের জন্যে রমযানের চেয়ে উত্তম আর কোনো মাস নেই আর মুনাফিকদের জন্যে রমযানের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর মাসও আর নেই। কারণ মু’মীনগণ রমযানে গোটা বছরের ইবাদতের শক্তি ও পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মুনাফিকরা তাতে মানুষের অলসতা ও দোষ অন্বেষণ করে। এ মাস মু’মীনের জন্য গণিমত স্বরূপ। (ইবনে খুজাইমা: ১৮৮৪) এ কারণে মুসলমানরা এ মাসের আগমনে অত্যধিক খুশী হন, আনন্দে উদ্বেলিত হন। ১১টি মাস এ মাসের আগমনের প্রত্যাশায় থাকেন। রাসূলে করীম (স.) বলেছেন, ‘তোমরা রমযানের খাতিরে শা’বানের চাঁদের হিসেব রেখো।’ (জামে তিরমিযী : ৬৮৭)
বান্দাদের জন্য মহান আল্লাহ্ পাকের দানকৃত অসংখ্য নিয়ামতরাজির মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামত হলো কুরআন মজীদ। আর এই পবিত্র কুরআনুল কারীম এ মাসেই নাযিল হয়েছে। এ মাসেই রয়েছে এমন একটি রাত যা হাজার মাসের রাত্রের চেয়েও উত্তম। মহান আল্লাহ্ পাক এ মর্মে ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আমি একে (কুরআনকে) লাইলাতুল ক্বদরে (যা রমযানে) নাযিল করেছি। ক্বদরের রাত হাজার মাসের রাতের চেয়েও উত্তম (সূরা ক্বদর:১-২)
রমযান মাস এতই ফযিলতের যে, এ মাসের নফল ইবাদতে অন্য সময়ের ফরয ইবাদতের সমান সওয়াব পাওয়া যায় এবং এ মাসে একটি ফরয ইবাদতে অন্য সময়ের করা ৭০টি ফরয ইবাদতের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। এ মাসের সম্মানে এবং এ মাসে মহান আল্লাহ্র জন্য সিয়াম পালনকারীদের সম্মানে মহান আল্লাহ্ পাক জান্নাতকে বিশেষভাবে সজ্জিত করেন। জান্নাতি হুর-গেলমান মাহে রমযানের আগমনের অপেক্ষায় থাকে। রাসূলুল্লাহ্ (স.) বলেছেন, মাহে রমযানের সম্মানে বছরের শুরু থেকে পরবর্তী বছর পর্যন্ত জান্নাতকে সজ্জিত করা হয়। অত:পর রমযানের প্রথম দিনের আগমনে আরশের তলদেশ থেকে জান্নাতি পত্র-পল্লব আন্দোলিত করে বায়ু প্রবাহিত হতে থাকে। এ বায়ু যখন হুর-গিলমানকে স্পর্শ করে তখন তারা বলতে থাকে, হে আমার প্রতিপালক! আপনার যেসব বান্দার সম্মানে এ জমকালো আয়োজন তাদের আপনি আমাদের সাথী করে দেবেন, তাদের পেয়ে আমাদের নয়ন জুড়াবে, চক্ষু সুশীতল হবে এবং আমাদের পেয়ে তারা খুব খুশী হবেন।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বিনা কারণে ইচ্ছাপূর্বক রমযানের একটি রোযা ভঙ্গ করেছে, অন্য সময়ের সারা জীবনের রোযা তার সমকক্ষ হবে না। আল্লাহ্ তায়ালা অসুস্থ, সফরকারীসহ অনেককেই রমযানের রোযা না রাখার ব্যাপারে ঘোষনা করেছেন। কিন্তু বিনা কারণে কেউ যদি রমযানের রোযা না রাখে তার পরিণাম হবে ভয়াবহ। আর ফরয রোযা ছেড়ে দেয়া মারাত্মক অপরাধও বটে। কারণ ফরয রোযা ছেড়ে দেয়ার অর্থই হলো আল্লাহর নির্দেশের অমান্য করা। যদি কেউ রোযাকে ফরয হিসেবে অস্বীকার করে বা ইবাদত হিসেবে অস্বীকার করে তবে সে ব্যক্তি মুরতাদ তথা ইসলামকে অস্বীকার করে বসে। ফরয রোযা অস্বীকারকারী ব্যক্তি মারা গেলে তাকে গোসল দেয়া, কাফন পরানো এবং জানাযা সম্পাদন করা এমনকি মুসলিমদের কবরস্থানেও তাকে দাফন করা নাজায়িজ।
রমযানের রোযা ফরয হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। যেমন: ১। মুসলমান হওয়া। অর্থাৎ মুসলিম ব্যক্তির জন্য রোযা রাখা ফরয। আর অমুসলিমদের জন্য ফরয নয়। ২। বালেগ হওয়া অর্থাৎ নাবালেগের ওপর রোযা ফরয নয়। ৩। সুস্থ ব্যক্তি হওয়া অর্থাৎ শারীরিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রোযা রাখার বিধান নেই। তবে সাধারণ অসুখ-বিসুখ হলে যদি সে রোযা রাখার উপযোগী হয় তবে সে রোযা রাখতে পারবে। ৪। সুস্থ মস্তিস্কের অধিকারী হওয়া। অর্থাৎ পাগলের ওপর রোযা ফরয নয়। ৫। স্বাধীন হওয়া। পরাধীন নয় এমন ব্যক্তি হওয়া। ৬। সজ্ঞান হওয়া। অর্থাৎ যিনি রোযা পালন করবেন তিনি নিজ জ্ঞানে বা সেচ্ছায় আল্লাহর হুকুম পালন করবেন। ৭। মুকিম হওয়া অর্থাৎ স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া। মুসাফিরের ওপর রোযা ফরয হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। ৮। ত্বাহিরা অর্থাৎ পবিত্র অবস্থায় থাকা। অর্থাৎ রোযা পালন করতে হলে মহিলাদের হায়েজ-নেফাজ মুক্ত হতে হবে।
মাহে রমযানের রোযার গুরুত্ব যে কত বেশি নবী করীম (স)’র নি¤েœর হাদীসটিই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মহানবী (স.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা হাদীসে কুদ্সীতে বলেন, রোযা আমার জন্য আর আমিই এ প্রতিদান দেব। অন্য এক হাদীসে আছে, ‘আমিই এর প্রতিদান।’ রোযাকে আল্লাহ্ পাকের সাথে সম্পর্কিত করার কারণ হলো এই যে, রোযাই একমাত্র ইবাদত যার মধ্যে লোক দেখানোর সম্ভাবনা থাকে না। রোযা রাখলে অন্যেরা বুঝতে পারে না। আর না রাখলেও যদি কেউ বলে আমি রোযা রেখেছি তা হলেও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না যে, সে রোযা রাখেনি। মানুষ তখনই বুঝতে পারে, যখন সে লোকসম্মুখে পানাহার করে। কাজেই রোযা একমাত্র আল্লাহ্ পাককে ভয় করেই রাখা হয়।
রোযাই একমাত্র ইবাদত যার সওয়াব এবং ফযিলতও নির্ধারণ করা হয় নাই। যেমন: অন্যান্য ইবাদতের বেলায় আল্লাহ্ পাক বলেছেন, যে একটি সৎকর্ম করবে সে তার দশ গুণ সওয়াব পাবে এবং যে একটি মন্দ কাজ করবে সে তার সমান শাস্তিই পাবে।বস্তুত তাদের উপর যুলুম করা হবে না। (সূরা আনআম:১৬)।
নবী করীম (স.) বলেন, তোমাদের প্রতিপালক অত্যন্ত দয়ালু। কারণ যে ব্যক্তি কোন সৎ কাজের শুধু ইচ্ছে করে, তার জন্য একটি নেকী লেখা হয়, ইচ্ছাকে কর্মে পরিণত করুক বা না করুক। অত:পর যখন সে সৎ কাজটি সম্পাদন করে, তখন তার আমল নামায় দশটি নেকী লেখা হয়। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি কোন পাপ কাজের ইচ্ছে করে অত:পর যদি সে ইচ্ছেকে কর্মে পরিণত করে, তবে একটি গুণাহ্ লেখা হয়, এহেন দয়া ও অনুকম্পা সত্ত্বেও আল্লাহর দরবারে ঐ ব্যক্তিই ধ্বংস হতে পারে, যে ধ্বংস হতেই দৃঢ়সংকল্প ( বুখারী, মুসলিম ও নাসায়ী)।
উপরোক্ত হাদীসে কারীমা দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয় যে, সৎকাজের প্রতিদান দশগুণ দেয়া হবে এবং এটা সর্বনি¤œ। আল্লাহ্ পাক স্বীয় কৃপায় আরো বেশি দিতে পারেন এবং দেবেনও। অন্যান্য হাদীস দ্বারা সত্তরগুণ বা সাতশতগুণ পর্যন্ত প্রমাণিত রয়েছে। কিন্তু রোযার বেলায় তার ফযিলত নির্ধারণ হয় নাইা। আল্লাহ্ পাক তার নিজ হাতে এর প্রতিদান দেবেন। আল্লাহ্ তায়ালা প্রত্যেক মু’মীন-মুসলমানগকে রমযানুল মুবারকের ত্রিশটি রোযা সঠিকভাবে পালন করার তৌফিক দান করুন। আমীন!
লেখক: কবি, গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!