প্রকাশকাল: 8 জানুয়ারী, 2019

সৈয়দ আশরাফ ॥ এক আদর্শ সংস্কৃতিবান রাজনীতিবিদ

  • নূহ-উল-আলম লেনিন

অকালেই চলে গেলেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। ক্যান্সারাক্রান্ত স্ত্রীর মৃত্যুর শোক না কাটতেই জানা গেল তার শরীরে এই কর্কট রোগ বাসা বেঁধেছে। কোন চিকিৎসাই তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারল না। আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে অপ্রত্যাশিত এক শূন্যতার সৃষ্টি করে চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
সৈয়দ আশরাফ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দু’বারের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ছিলেন সভাপতিমণ্ডলীর এবং মন্ত্রিসভার সদস্য। রাজনৈতিক প্রোফাইলে নিঃসন্দেহে এগুলো বড় মাপের সাফল্যের দ্যোতক। কিন্তু তাকে কী রাজনৈতিক পদাধিকারীর ছকে ফেলে মাপা যথার্থ হবে? আশরাফ তো তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন ‘ক্ষমতার’ চেয়ে ‘ইন্টেলেক্ট’ এবং দাম্ভিকতার চেয়ে বিনয়, সর্বোপরি অর্থবিত্ত-সম্পদের চেয়ে সততার মূল্য কত বেশি। এই গুণগুলো আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে সত্যিই দুর্লভ। আশরাফ আমার চেয়ে বয়সে সামান্য ছোট হলেও তিনি আমাদের প্রজন্মেরই একজন ছিলেন। এ জন্য আমি গর্বিত।
আমাদের প্রজন্মে পোড় খাওয়া অনেক ত্যাগী নেতা ছিলেন। প্রতিভার ঔজ্জ্বল্যও ছিল। কিন্তু ক্রমশ তাদের সংখ্যা কমে আসছে। আর যারা এখনও সক্রিয় আছেন তারাও ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছেন। বাজার রাজনীতির ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তারা কেমন যেন নিষ্প্রভ হয়ে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, তাদের কারও কারও অর্থবিত্ত-সম্পদ বেড়েছে, চোখ ধাঁধানো জৌলুস বেড়েছে, ক্ষমতার দম্ভ তাদের অতীতকে কালো চাদরে ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু আশরাফ ছিলেন এর মধ্যে ব্যতিক্রম। দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, ক্ষমতার দম্ভ, অহঙ্কার এবং নির্বোধের মতো অতিকথনের মালিন্য তাকে স্পর্শ করেনি। সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন তিনি। অর্থবিত্ত-সম্পদের প্রতি নির্লিপ্তি এবং স্বজন পোষণের প্রতি সচেতন ঔদাসীন্য তাকে তার নিকটজনের অনেকের কাছে অপ্রিয় করে তুলেছিল।
উচ্চ শিক্ষিত স্ত্রী শীলা এবং একমাত্র কন্যা রীমা লন্ডনেই চাকরি করতেন। শেষের দিকে শীলা লম্বা সময় নিয়ে বাংলাদেশে এসে থাকতেন। কিন্তু একমাত্র কন্যা কখনই পিতার ‘ক্ষমতা’ দেখা বা তার কাছ থেকে অংশীদারিত্ব নেয়ার জন্য আগ্রহী ছিল না। বরং আশরাফ বেশ তৃপ্তির সঙ্গে বলতেন, আমার মেয়েই আমার ইন্স্যুরেন্স। আমার ভরসা।
সৈয়দ নজরুল ইসলামের যেমন ঢাকায় কোন জমিজমা বা স্থায়ী বাসস্থান ছিল না, তেমনি সৈয়দ আশরাফেরও কোন স্থাবর সম্পত্তি নেই। যখন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী ছিলেন না তখন থাকতেন ছোট ভাইয়ের বাসায়। কখনওবা ভাড়া বাসায়। মন্ত্রীপাড়ার ব্রিটিশ আমলে নির্মিত যে বাসাটিতে থাকতেন সেটিও ছিল একেবারেই সেকেলে, আটপৌরে এবং অতি সাধারণ, সামান্য আসবাবপত্রে সজ্জিত। ছোট বোনটি মাঝে মাঝে এসে বড় ভাইয়ের কাছে থাকতেন। তার জন্য আলাদা কোন কক্ষের ব্যবস্থা ছিল না। দোতলার বসার ঘরটিতেই বোন একটা অস্থায়ী তক্তপোশ ফেলে থাকতেন। আমি অন্য কোন মন্ত্রী বা নেতার যাপিত জীবনে এ ধরনের নজির পাইনি।

দুই.
শেখ হাসিনা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাবা-মা, ভাই ও ভাতৃবধূদের হারিয়ে একেবারে ‘একা’ হয়ে পড়েছিলেন। ছোট্ট বোন রেহানাকে নিয়ে তার দুর্দিনের দিনগুলো কেটেছে। এক পর্যায়ে রেহানাকে বিয়ে দিয়ে তিনি একদিকে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করেন, অন্যদিকে আরও একা হয়ে পড়েন। উদ্বাস্তু জীবনের প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দিয়ে শেখ হাসিনা প্রবাসেই রাজনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। লন্ডনে তখন তার সহায় হয়ে ওঠেন সৈয়দ আশরাফ। আশরাফ উচ্চ শিক্ষার্থে লন্ডনে গিয়েছিলেন আগেই। ইংল্যান্ডে এবং ইউরোপে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারা।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লেবার পার্টির স্যার টমাস উইলিয়ামস, আয়ারল্যান্ডের সাবেক মন্ত্রী ও শান্তিতে নোবেল জয়ী শন ম্যাকব্রাইড এবং ব্রিটিশ এমপি জেফরি টমাস প্রমুখের নেতৃত্বে ইউরোপের কয়েক বিশিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়ে গড়ে তোলা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। লন্ডন ও ইউরোপ প্রবাসী বঙ্গবন্ধুর অনুরাগী বিশিষ্টজনকে এই কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হয়। অর্থাৎ, সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে শেখ হাসিনার সঙ্গী ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। শেখ হাসিনা ও আশরাফের কাছ থেকে সেই দুঃসময়ের অনেক দুঃখ-যন্ত্রণা এবং কষ্টের কথা আমরা অনেকেই কমবেশি শুনেছি। সেই সময় থেকেই ভাইহারা শেখ হাসিনা সৈয়দ আশরাফের মধ্যে তার ভাইকে ফিরে পেয়েছিলেন। দু’জনের এই ভাই-বোনের সম্পর্কে নানা টানাপোড়েন থাকলেও আশরাফের মৃত্যু পর্যন্ত তা অটুট ছিল। ’৭৫-এ ভাই হারানোর পর শেখ হাসিনা আরেকবার তার ভাইকে হারালেন।

তিন.
শেখ হাসিনার প্রেরণায় সৈয়দ আশরাফ লন্ডনের পাট চুকিয়ে নব্বইয়ের দশকে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৯৬-এর নির্বাচনে আশরাফ তার পিতার আসন কিশোরগঞ্জ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০২ সালের কাউন্সিলে তিনি দলের অন্যতম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৯৭ সালে আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করি। ঐ বছরই কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হই। ২০০২ সালে দলের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্ব পাই। আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে কালেভদ্রে আশরাফ বক্তব্য রাখতেন। কিন্তু তার সংক্ষিপ্ত এবং পয়েন্টেড বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম একজন বুদ্ধিদীপ্ত পরিশীলিত সম্ভাবনাময় রাজনীতিবিদকে। একটু একটু করে তার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
বস্তুত ১/১১-এর পরেই সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই সময় থেকে তিনিও জাতীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করেন। ১/১১-এর বৈরী পরিবেশে শেরেবাংলা নগরে আশরাফের সংসদ সদস্য ভবনটি আমাদের কর্মকা-ের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গ্রেফতার হয়ে যান। সৈয়দ আশরাফ ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। জরুরী অবস্থার সুবাদে উচ্চাভিলাষী সামরিক কর্মকর্তাগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ প্রলম্বিত, বিকল্প রাজনৈতিক দল/প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা প্রচার করে প্রধান দুই দলে ভাঙ্গন ধরানোর চেষ্টা প্রভৃতি অপতৎপরতা শুরু করে। ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত করার ষড়যন্ত্র। ২০০৭ সালের প্রথমদিকে শেখ হাসিনা কিছুদিনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। তিনি দেশে ফিরে আসার পথে সরকার ঘোষণা করে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরে আসতে দেয়া হবে না। লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে ঢাকাগামী কোন বিমান তাকে বহন করতে অস্বীকৃতি জানায়। শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যে কোন উপায়েই হোক তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। শেখ হাসিনার অনমনীয় মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে তত্ত্বাবধায়ক প্রশাসনের এই পদক্ষেপের নিন্দার ঝড় ওঠার পর এক পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন।
ইতোমধ্যে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে বিপুলসংখ্যক রাজনীতিবিদকে গ্রেফতার ও নির্যাতন করা হয়। সৈয়দ আশরাফ সেই দুর্দিনে শেখ হাসিনার পাশে দাঁড়ান। কিন্তু দলের মধ্যেই তথাকথিত সংস্কারবাদী নেতারা পৃথক পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে দলে সংস্কারের নামে মাইনাস টু ফর্মুলা কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। শেখ হাসিনা পাল্টা উদ্যোগ নিয়ে নিজেই ‘সংস্কার প্রস্তাব’ দিতে বলেন। শেখ হাসিনার এই উদ্যোগের ফলে সংস্কারবাদী নেতারা প্রমাদ গোনেন।
ঠিক এই সময়টিতেই সামরিক কর্তৃপক্ষ সৈয়দ আশরাফকে ডেকে নিয়ে অবিলম্বে দেশত্যাগ করতে বলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আশরাফ নেত্রীকে সব খুলে বলেন। তিনি সাময়িকভাবে লন্ডনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যাওয়ার আগের রাতে আমার কলাবাগানের বাসায় বসে তাকে ভুল বোঝা হবে ভেবে আশরাফ অঝোরে কেঁদেছিলেন। যাওয়ার আগে বলেছিলেন লেনিন ভাই, আমি স্থায়ীভাবে যাচ্ছি না। আমি শীঘ্রই ফিরে আসব।
সৈয়দ আশরাফের অনুপস্থিতিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুকুল বোস ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। সংস্কারবাদীরা এতে উৎসাহিত হন। পরিস্থিতি কিছুটা নাজুক হয়ে ওঠে। এই পটভূমিতেই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়। দলে সৃষ্টি হয় নেতৃত্বের শূন্যতা। ইতোমধ্যে বিএনপিতেও সঙ্কট ঘনীভূত হয়। শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করার কিছুদিন পর খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হয়। বিএনপির সংস্কারবাদীরা দলের মহাসচিব মান্নান ভূঞার নেতৃত্বে আলাদা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। বিএনপি কার্যত ভাগ হয়ে যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। শেখ হাসিনাকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করায় দেশবাসীর মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। নেতাকর্মীর মধ্যে সৃষ্টি হয় গভীর আবেগ। ফলে সংস্কারবাদী বলে কথিত নেতাদের ওপর সামরিক কর্তৃপক্ষের চাপ থাকলেও তাদের দিয়ে দলে আনুষ্ঠানিক ভাঙ্গন সৃষ্টি করতে তারা ব্যর্থ হয়। বিচার প্রহসনের বিরুদ্ধে কর্মীদের সাহসী ভূমিকা এবং আন্দোলনে প্রবল জনমত গড়ে উঠতে সহায়তা করে। সরকার আকস্মিকভাবেই রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। চলবে…
লেখক : আওয়ামী লীগ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!