শেরপুর-জামালপুরে সওজ’র ৩৩৫ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ

প্রতিবাদী এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে উল্টো চাঁদা দাবির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতায় শেরপুর-জামালপুর অংশে ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫৮ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন কাজে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতিসহ হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সাব-কনট্র্যাক্টর ও প্রভাবশালী মহল মিলেই ওই হরিলুটে মেতে উঠেছে। এ নিয়ে সচেতন এলাকাবাসী প্রতিবাদ করায় উল্টো তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছে চাঁদা দাবির অভিযোগ। অন্যদিকে বিষয়টি ধামাচাপা দিতে স্থানীয় একটি মধ্যস্বত্বভোগী প্রভাবশালী মহল উঠেপড়ে লেগেছে। বিষয়টি এলাকাসহ খোদ শহরজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করলেও থামেনি কাজের অনিয়ম। সচেতন মহলের মতে, সড়ক প্রশস্তকরণ কাজের মানের দিকে দ্রুত নজরদারী বৃদ্ধি এবং কোটি কোটি টাকা অনিয়মের রহস্য উদঘাটনে দ্রুত তদন্ত কমিটি করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
জানা যায়, জামালপুর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন ২০১৮-১৯ অর্থ বৎসরে ৪টি প্যাকেজে শেরপুর থেকে ধানুয়া-কামালপুর পর্যন্ত সড়কের কাজগুলোর দরপত্র আহবান করা হয়। গত বছরের আগস্ট মাস থেকে শেরপুর-ধানুয়া-কামালপুর সড়কের দু’পাশ প্রশস্তকরণসহ পুরো রাস্তায় কার্পেটিং-এর কাজ শুরু হয়। প্রথম অংশে রাজধানী ঢাকার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এম. এম. বিল্ডার্স এর বিরুদ্ধে ওই সড়কের শেরপুরের নন্দীরবাজার জিরো পয়েন্ট থেকে চরমুচারিয়া হয়ে ১৫ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্তকরণ ও নির্মাণে হরিলুটের অভিযোগ তুলে স্থানীয় চরমুচারিয়া এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে দেয় তারা। কারণ সড়কের দু’পাশের বর্ধিত অংশে নিম্নমানের বালুর সাথে মাটির ব্যবহার, দুই স্তরে পানি না ব্যবহার করে রোলার করে কমপ্যাক্ট করা এবং সাব-বেসে ৬৫% ইটের খোয়া, ৩৫% বালি দেওয়ার বদলে ৩৫% খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় ঠিকাদারের মনোনীত লোকজন শতাধিক এলাকাবাসীর নামে চাদাঁবাজীর অভিযোগ করলে সম্প্রতি ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মানববন্ধনও করে ওই এলাকার লোকজন। মানববন্ধনে তারা সড়কটি যথাযথভাবে সম্প্রসারণ ও অনিয়মের প্রতিকার দাবি জানায়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন ওই সড়ক প্রশস্তকরণ কাজের ঠিকাদারের সাথে সাব-কন্ট্রাক্টে মালামাল ও লেবার সরবরাহ কাজের সাথে যুক্ত হওয়ায় অনিয়মের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে নানা অপতৎপরতা শুরু হয়েছে।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, ওই সড়কের শেরপুর অংশের সদর উপজেলার চরমুচারিয়া এলাকায় নিম্নমানের কাজের চিত্র পুরো সড়কজুড়েই। স্থানীয় চরমুচারিয়া এলাকার বাসিন্দা জুলহাস উদ্দিন, মঞ্জুরুল হক, আব্দুর রাজ্জাক ও শরাফত আলী অভিযোগ করে বলেন, রাস্তার সাব-বেসে ৩ স্তরে পানি দিয়ে কমপেক্সন না করায় যে কাজ হয়েছে, বর্ষায় এই রাস্তা টিকবে বলে মনে হয় না। তাই আমরা ঠিকাদারের লোকজনকে নিয়মমতো, ভালোভাবে কাজ করার জন্য বলেছি। কিন্তু তারা আমাদেরকে উল্টো হুমকি দেয় এবং এলাকার যেসব শ্রমিক কাজ করতো তাদের মজুরী দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এলাকার লোকজন ওইসবের প্রতিবাদে কাজ বন্ধ করে দিলে উল্টো ঠিাকাদারের লোকজন এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে পুলিশের নিকট চাঁদাবাজির অভিযোগ দেয়। পুলিশ তদন্তে এলে আমরা সব তাদের খুলে বলেছি। আমরা এই অনিয়মের প্রতিকার চাই, সড়কের কাজ ভালো হোক, এটা চাই।
এদিকে, স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিক সরেজমিনে পরিদর্শনকালে সড়কটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে সওজ’র দায়িত্বরত কার্য-সহকারির (ওয়ার্ক এসিসস্ট্যান্ট) সামনে গর্ত করে দেখা যায়, খোয়ার পরিবর্তে বালুর পরিমান বেশি। তবে সওজ’র কার্য-সহকারি কানু দাস বিষয়টির সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি উপর মহলে যোগাযোগের কথা বলেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠন এম.এম. বিল্ডার্সের দায়িত্বরত ব্যবস্থাপক সালাহ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, মূলতঃ কাজের সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে ঝামেলা হয়েছে, কাজের মান নিয়ে নয়। ওই ঘটনায় এলাকাবাসীকে এম.এম. বিল্ডার্সের সাব-কন্ট্রাক্টর রিপন নিম্নমানের কাজে বাঁধা দেওয়ার কারনে পিস্তল দেখিয়ে শাসানোর অভিযোগ করে ওই এলাকার সাধারণ মানুষ। তবে সাব-কনট্রাক্টর রিপন পিস্তল দেখানো এবং এলাকার লোকজনকে শাসানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়া এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীর অভিযোগের বিষয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সদর থানার এসআই রবিউল আলম জানান, ঠিকাদারের লোকজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে কিছু ঝামেলা হয়েছিলো। পরিদর্শনকালে ঠিকাদারের লোকজন বলেছে, তারা ভালোভাবে কাজ করবে। আর এলাকাবাসীও কাজে কোন বাঁধা দেবে না। এমনভাবেই দু’পক্ষের সাথে কথা হয়েছে।
এ ব্যাপারে শেরপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান উদ্দিন আহমেদ জানান, কাজটির কিছু অংশ শেরপুরের হলেও পুরো কাজটিই সওজের জামালপুর বিভাগের আওতায় হচ্ছে। তবে যতটুকু শুনেছি, মূল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে স্থানীয়দের সাব-কন্ট্রাক্টের বিষয়াদি নিয়েই ওই সমস্যা হয়েছে। আর সওজের ওই কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি প্রসঙ্গে জামালপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, স্থানীয় সমস্যাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নিয়ম মেনেই বৃহৎ প্রকল্পের কাজটি করা হচ্ছে। যতটুকু দেখা গেছে অনিয়ম পাওয়া যায়নি। তারপরও মানসম্মত কাজ নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়ানো হয়েছে।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!