প্রকাশকাল: 11 মে, 2019

শীতল সরকারের সাফল্যের ষোলকলা পূর্ণ করো হে লক্ষ্মী

রফিকুল ইসলাম আধার

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় কেবল মানসিক বিকারগ্রস্ত ব্যক্তিকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করা হলেও আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় বহুমাত্রিক পাগলের সন্ধান মেলে, যাদের রয়েছে অনেক রকমফের। যে কারণে মজ্জাগত নেশা বা ভিমরতি বা অভ্যাসগত কারণেও অনেকেই পাগল হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে থাকেন। এমন পাগলদের মধ্যে বিয়ে পাগল, বউ পাগল, প্রেম পাগল, বৃক্ষপ্রেমী বা পাগল, খাদক বা ভুড়িভোজনে অভ্যস্ত খাবার পাগল, ভ্রমণ পাগল, অর্থ পাগল, ভোট বা নির্বাচন পাগল উল্লেখযোগ্য। ওই ধরনের সব পাগল নিয়ে নয়, কেবল একজন ভোট বা নির্বাচন পাগল সম্পর্কে আলোকপাত করাই আজকের নিবন্ধের উপজীব্য।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত ‘ছক্কা ছয়ফুর’ নামে এক ব্যক্তি নির্বাচন পাগল হিসেবে সমধিক পরিচিত। তবে হালে এমন এক নির্বাচন পাগলের সন্ধান পাওয়া গেছে, তিনি হচ্ছেন সদ্য সমাপ্ত ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ৯নং ওয়ার্ডে টানা সপ্তম দফায় অংশ নিয়ে ৬ বারই অকৃতকার্য হলেও শেষ দফায় বিজয়ের স্বাদ পাওয়া নবনির্বাচিত কাউন্সিলর শীতল সরকার। এলাকায় শীতলবাবু নামেই সমধিক পরিচিত নরম ও শান্ত স্বভাবের এ নির্বাচন পাগল ব্যক্তিটি এখন ময়মনসিংহ মহানগরীর সর্বাধিক আলোচিত এক নাম। এখন ৬৫ বছর বয়সী শীতলবাবু জনপ্রতিনিধি হওয়ার প্রত্যাশায় সেই নির্বাচনে নেমেছিলেন ২৭ বছর বয়সে এবং ৩৮ বছর আগে। আর ওই নির্বাচন করতে গিয়ে তিনি কেবল অর্থ-সম্পদের দিক দিয়েই সর্বশান্ত হননি, হারিয়েছেন নিজের স্ত্রী লক্ষ্মী সরকারসহ একমাত্র সন্তানকেও। শীতলবাবুর হৃদয় মন থেকে যখন সরছিল না ভোটের ভাবনা, ঠিক তখন একদিন তার প্রতি রাগ ও অভিমানে তাকে ছেড়ে জামালপুরের সরিষাবাড়ির শিমলা গ্রামের বাবার বাড়িতে চলে যান অন্তঃস্বত্ত্বা লক্ষ্মী। সেই সন্তান এখন এইচএসসির শিক্ষার্থী হলেও রয়েছে মার সাথেই। সান্নিধ্য দূরে থাক, যোগাযোগও নেই হতভাগ্য পিতা শীতলবাবুর সাথে। তবে স্ত্রী লক্ষ্মী চলে যাবার সময় বলে যাওয়া ‘যদি কখনও পাস করতে পারো, আমাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো’ কথায় এতদিন শীতলবাবুর আশায় কেটেছে বহু বছর। অবশেষে নির্বাচনে বিজয়ের লক্ষ্মী ধরা দিয়েছে শীতলবাবুকে। কিন্তু এখনও ফেরা হয়নি সন্তানসহ জীবনসঙ্গী লক্ষ্মীর।
নির্বাচন পাগল শীতলবাবুর অন্যরকম গল্প শুনে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বার বার তথা টানা ৬ দফা নির্বাচনে অকৃতকার্য হলেও ধৈর্য, ইচ্ছাশক্তি ও সাহসিকতার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন অবিচল। অন্য ১০ জনের মতো হতাশা তাকে পেয়ে বসেনি। খায়নি কুঁড়ে কুঁড়ে। বরং আশায় বুক বেঁধে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ছুটেছেন অবিরত। অন্যদিকে জীবনের ৩৮ বছর ওই নির্বাচন করতে গিয়ে কেবল অর্থবিত্তই নয়, স্ত্রী, সন্তান ঘর ছাড়লেও বা হারালেও বিচ্ছেদ ঘটাননি সেই স্ত্রীর সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের, বা জৈবিক সুখের আশায় লক্ষ্মীর জায়গায় অন্য কাউকে ভাবেননি বা ঘরে তুলেননি দ্বিতীয় কাউকে। বরং কখনও পাস করতে পারলে নিয়ে এসো, চলে যাবার সময় স্ত্রীর দেয়া এমন বেদনাবিধুর প্রতিশ্রুতি নিয়ে বেঁচে থাকার পাশাপাশি ভোটের লড়াইয়ে বিজয়ের ইচ্ছায় ছুটেছেন অনেকটা পথ, অনেকটা সময়। শীতলবাবুর জীবনে এখানেই ব্যতিক্রম। এখানেই নিহিত তার স্বাতন্ত্র্যবোধ।
কিন্তু আমরা যখন শুনি শীতলবাবুর ওই ঘটনায় ময়মনসিংহে আলোড়ন চললেও এখনও বরফ গলেনি ঘরছাড়া লক্ষ্মীর বা ঘরে ফিরেননি কাক্সিক্ষত জীবনের লক্ষ্মী, তখন শীতলবাবুর প্রতি কষ্ট হয়। কষ্ট বাড়ে তার ভক্তসহ হাজারও হৃদয়ের।
আর ওই অবস্থায় নির্বাচন পাগলদের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ঘুরেফিরেই চলে আসে আমাদের দেশে নির্বাচন পাগলদের হিরো ছক্কা ছয়ফুরের কথা। যিনি যেখানে নির্বাচন, সেখানেই প্রার্থী বনে গেছেন। ইউপি সদস্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচনেও অবতীর্ণ হয়েছেন বার বার। কিন্তু তার জীবনে অভিমানে স্ত্রী-সন্তান চলে যাবার মতো ঘটনা শোনা যায়নি। কেবল তাই নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাক্রমশালী নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণের পর স্কুলশিক্ষিকা স্ত্রী যশোদা বেনের পরিচয় বেরিয়ে এলেও এবং সঙ্গত কারণেতার ভাগ্যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাজনিত সুযোগ-সুবিধা জুটলেও বরফ গলেনি সেই মোদীর বা স্বামী মোদিকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়নি যশোদা বেনের। ফলে গুজরাটের মেহসানা জেলার নিভৃত পল্লীতে পূজা অর্চ্চনার মধ্য দিয়েই কাটছে তার একাকীত্ব জীবন। আর জীবন-যৌবনের ৩২টি বছর অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে কাটানো যে কৃষ্ণাঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সফল নায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির আন্দোলনে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন স্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলা, সেই নেলসন ম্যান্ডেলা প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হওয়ার পর সেই উইনি ম্যান্ডেলাকে দুঃসহ অবজ্ঞায় কাটাতে হয়েছে শেষের জীবন। সেলুকাসের নিদ্রিত ধাঁধাঁয় এমন কঠিন বাস্তবতার নজির আরও কতই না খুঁজে পাওয়া যায়।
সুতরাং একজন যশোদা বেন ও উইনি ম্যান্ডেলার জীবন ট্র্যাজেডির কথা স্মরণে নিলে প্রেমহীন পাষ- মোদি আর উদাসিন ম্যান্ডেলার তুলনায় ভাগ্যবিড়ম্বিত শীতল সরকারকে যেমন সেরকম ভাবা যায় না। আমাদের বিশ্বাস, চলে যাবার পরও স্ত্রী লক্ষ্মী পৌরাণিক মতের ধনসম্পদ, আধ্যাতিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী লক্ষ্মী বা মহালক্ষ্মী স্বামী বিষ্ণুর শক্তির উৎসের মতোই উৎসাহ ও শক্তি যুগিয়েছেন শীতলবাবুকে। ফলে তিনি সব হারিয়ে পুনঃপুন নির্বাচনে অংশ নিয়ে কেবল বিজয়ের স্বাদ গ্রহণই নয়, বরং স্ত্রী-সন্তানকে ফিরে পাবার প্রত্যাশায় টিকেছিলেন মানুষকে নিয়ে, বিচরণ করেছেন মানুষ থেকে মানুষের মাঝে। আমাদের প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় যার নজির নেই বললেই চলে। এ ধরনের নজির আমাদের শিক্ষা দেয়। সুতরাং সেই আলোচিত ও আলোকিত শীতলবাবুর সংসারে আরাধনার লক্ষ্মী এখন অনিবার্য। তার জীবনে চটজলদি ফিরে আসুক সেই লক্ষ্মী। আর ষোলকলা পূর্ণ হোক সাফল্যের। স্বীকৃতি পাক একজন শীতলবাবুর ধৈর্য, ইচ্ছাশক্তি ও সাহসিকতার- এ প্রত্যাশা আমাদের। জয়তু; শীতল সরকার, জয়তু; আরাধনা, জয়তু; লক্ষ্মী।

লেখক : সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিক, শেরপুর, ই-মেইল-press.adhar@gmail.com

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!