শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছে শেরপুরের মেয়ে মিশু

 

মইনুল হোসেন প্লাবন :যতো দিন যাচ্ছে, ততো আমার আয়ু কমছে, অসুস্থত্বা ঘিরে ধরেছে আমাকে, বাঁচতে দেয় না সুস্থ ভাবে।’ 

দশ মাস দশ দিন পেটে ধরে জন্ম দিলো মাতা, খুরা বলে ফেলে দিলো আমার দাদা। নিষ্পাপ শিশু বিনা দোষে দোষী হলো, দুই রাত এক দিন বারান্দায় রইলো- শীতের কনকনে রাতে।

আমি টোকাই, তাতে কি বা আসা যায়! আমিও তো তোমাদের মতোই মানুষ, রক্ত মাংসে গড়া। 

হ্যা।জান্নাতুল ফেরদৌসী মিশুর লেখা  কিছু কবিতারই অংশ এগুলো।

পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন যারা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে পৌঁছে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। কর্মই তাদের গোটা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। শারীরিক ভাবে অক্ষম হয়েও একজন মানুষ সফল হতে পারে সেটা দেখিয়েছেন তারা। এসব বিখ্যাত মানুষ শত প্রতিকূলতা পার হয়েও নিজেকে বিখ্যাত করেছেন সবার কাছে। নিজ আলোয় উজ্জল করেছেন গোটা বিশ্বকে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো তাদের আটকে রাখতে পারেনি। ওইসব বিখ্যাত ব্যক্তি প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তি মানুষকে বড় করে তোলে।
ওইসব বিখ্যাতদের সাথে মিল রেখে অদম্য ইচ্ছা শক্তিকে আকড়ে ধরে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও লেখাপড়ার পাশাপাশি সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছে শেরপুরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসী মিশু। ২০০৩ সালের ১৫ই জানুয়ারি সোমবার শেরপুর শহরের নবীনগর গ্রামের সম্ম্ভন্ত এক মুসলিম পরিবারের জন্ম তার। পিতা:মোফাজ্জল হোসেন ও মাতা: নুরেজা বেগমর একমাএ কন্যা সন্তান মিশু। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও সে পিছিয়ে নেয়। নবীনগর আদর্শ বিদ্যাপীঠ স্কুল থেকে প্রাইমারি ও ম্যাধমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে বর্তমানে তিনি শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ এ দ্বাদশ শ্রেণিতে ব্যবসা শিক্ষা নিয়ে অধ্যয়নত। ঘর বন্ধী জীবন তবু লেখালেখির প্রতি তার আগ্রহ আকাশচুম্বি ।চিৎসাকালীন থাকা আবস্থায় লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ছোটগল্প, বড়গল্প, কবিতা ও ছড়া লিখে যাচ্ছেন।

জান্নাতুল ফেরদৌসী মিশুর কিছু কবিতা:

**রুগ্রতা আমি**
যতো দিন যাচ্ছে
ততো আমার আয়ু কমছে,
অসুস্থত্বা ঘিরে ধরেছে আমাকে
বাঁচতে দেয় না সুস্থ ভাবে।
জন্ম থেকেই পা’য়ে সমস্যা
তিন বছর ধরে এক নাগাড়ে ঠান্ডা,
কত ঔষুধ খেয়েছি-
দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায়ছি
কিছুই তে কিছু হয় না,
এখন আমি কী করি?
ঠান্ডা আমার লেগেই থাকে সারাক্ষণ
জ্বর আসে না ভুলে ও,
ঠান্ডা থেকে গলা ব্যথা
মাথা ব্যথা ও ভীষণ।
দেহের ভিতর হাজার রোগের বাস,
এই পৃথিবীতে নাই তো আর অস্থিমানের আশ্বাস।
এতো রুগ্রতা আমি
সব্দিবেচক বাঁচার কি উপায়!

***জীবন কাহীনি***

দশ মাস দশ দিন পেটে ধরে জন্ম দিলো মাতা,
খুরা বলে ফেলে দিলো আমার দাদা।
নিষ্পাপ শিশু বিনা দোষে দোষী হলো
দুই রাত এক দিন বারান্দায় রইলো-
শীতের কন কনে রাতে।
ছোট বলে খেতে শুধু মাতার বুকের দুধ,
ভাগ্য দোষে হয় নিই তার খাবার খাওয়া
না খেয়ে কেটেছে তার কত বেলা!
বাবা ছিলো তার আদিম পাগলা,
ঘর ছেড়ে ছিলো সে বন্ধুর পালায় পাইরা।
দাদাই বলেছিলো,খুরা বলে তার ছেলে
ঘর ছেড়েছে এই বসয়ে!
তাই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে
নিষ্পাপ শিশু ও তার মা কে।
চার দিন পর ঘরের ছেলে ফিরলো ঘরে,
ফিরলো না তো আর সে শিশুটি-
যাকে তোমরা করলে দোষী।
মস্ত বড় হোটেল দাদার হলো অনেক লজ
শিশুটি ছিলো না বলে এমন গজব;
বলেছিলো তার দাদী!
ফিরলো শিশু ফিরলো মা সুখের সংসার-
করলো তারা তিনজনা।
সুখ বুঝি ছিলো না শিশুর ভাগ্য বুঝে হলো তার নাম মিশু!
খুরা বলে শুনতে হতো মানুষের কানা-ঠুসা
ছয় শত টাকা দিলো না তার দাদা,
হলো না প্লাষ্টার ঢাকা।
জিত উঠে যায় মা’য়ের মনে,করবে মেয়ে কে খারা!
এই সময় দেখা পেলো কবিরাজের মন ভুলানো কথায়-
চৈত্র মাসের রোদে রাখতো মাঠে,
মাঘ মাসেতে মাটির নিচে পুতা!
সয্য হলো না আর এমন কষ্ট নাতীর
তাই দিতো বাধা নানী-দাদী!
নানী রয়ে গেলো দাদী মারা গেলো,
24 দিনের দিন পা ভেঙ্গে গেলো!
ইশশ,কী ব্যাথা।
নানীর চিৎকার এলাকা জুড়ে পরলো কান্নার ধুম
বৃদ্ধ বেডা দিলো টান একুশ দিনে পা সোজা!
একদিন হলো বিশাল ঝগড়া-
থাকতে পারবে না কী তারা ইটের নিচে পাক্কা ঘরে,
জমি-জমা বেচে,করলো বাসা নিচে
খুরা বলে কষ্ট দিতো যারা,তাদের কে-
দেখিয়ে নিয়ে গেলো আবার ঢাকা।
চিকীৎসা হলো সুস্থ হবো একা একা হাটতে পারলো!
ছয় বৎসর পর পেলো প্বলেমের ইশারা।
নিশ্ব এবার জমি জমা বেচে-
তিন তিন বার মেয়েকে চিকিৎসা করিয়ে!
হাত পাতলো সমাজ সেবকদের কাছে
পেলো টাকা গেলো তারা নাম না জানা দেশে।
দেখলো ডাক্তার বললো তাদের হয়েছে ভুল চিকিৎসা!
অপারেশন হবে,হবে না কত দৌড়দৌড়া,
অবশেষে হলো জন্ম মাসে ডেট ফাইনাল!
মা বলিলো,এই মাস ছাড়া তোর হবে না অপারেশন!
জানতাম আমি আগের মতোন।
মুচকী হেসে আমি পড়লাম অপারেশনের ড্রেস
যাবার আগে এবার পেয়ে ছিলাম অনেক ভয়!
ছিলো আমার একজন বুঝে না সে আমায় তেমন,
ইচ্ছা ছিলো খুবি দেখি তারে একটি নজর!
অপারেশন শেষে ফিরলো বেডে,ফিরলো না তার জ্ঞান
সাত ঘন্টার পর ফিরলো জ্ঞান মা পেলো জীবন।
ধীরে ধীরে সুস্থ হলো ডাক্তার দিলো রডের ব্রেস,
গুটি গুটি পেয়ে আবার হাটলো নতুন করে
ফিরলো এবার তারা দেশে।
আবার যাবে তারা নাম না জানা দেশে
আশা করা হয় এবার সে সুস্থ হবে পূর্ণ।
সবার দোয়ায় সবার মতো থাকবে আজীবন
শুনতে তো হবে না তার খুরা শব্দ!
বলবে এবার আমিও পারি তোমাদের মতো।
এই টুকো জীবনে এতো কিছু বাকী জীবনে কী,
তবু ভয় পায় না আমি মা যদি হয় আমার সাথী!

**টোকাই**

আমি টোকাই,তাতে কি বা আসা যায়!
আমিও তো তোমাদের মতোই মানুষ,
রক্ত মাংসের গড়া।
আমারো একটা মন আছে
স্বচ্ছ কাচের দ্বারা।
হয়তো জন্ম আমার রাস্তার কোনো ডাস্টবিনে,
নয়তো বেচে আছি পিতৃহীন পরিচয়ে!
তাতে আমার কি যায় আসে
আমি তো বেঁচে আছি এই পৃথিবীর বুকে,
কোনো মায়ের আশার আলো হয়ে।
টোকাই হয়েছি কপাল দোষে
হয় নিই তো চোর নিজের কারণে,
সমাজে বদনাম করে।
রাস্তার ময়লা ত তুলি,
তাতে কি ক্ষতি করছি আমি
নোংরা বলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দাও কেন আমায়,
আমি টোকাই বলে
নাই কি সমাজে ভালো ভাবে বাচবার অধিকার।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!