প্রকাশকাল: 3 এপ্রিল, 2019

শবে মি’রাজের তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা : ড. আবদুল আলীম তালুকদার

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স.)এর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী মি’রাজ গমনের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে।‘মি’রাজ’ এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে- সিঁড়ি, সোপান, আরোহণ, ঊর্ধ্বগমণ, বাহন ইত্যাদি। আবার অন্য অর্থে ঊর্ধ্বপানে আরোহণ বা রবের সাথে মহামিলন যা নবী করীম (স.)’র অন্যতম শ্রেষ্ঠ মু’জিযা এবং মহান আল্লাহ্ পাকের কুদরতের মহানিদর্শন। নবী-রাসূলগণের মধ্যে একমাত্র শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)কে আল্লাহ্ পাক এই অতুলস্পর্শী মর্যাদা প্রদান করে সম্মানিত করেন।
যদিও পবিত্র কুরআনুল কারীম-এ ‘মি’রাজ’ শব্দটির সরাসরি উল্লেখ লক্ষ্য করা যায় না, কিন্তু যখন কাফিরগণ নবী মুহাম্মদের নবুয়্যতের বা ঐশ্বরিক বাণীর প্রমাণস্বরূপ স্বর্গে আরোহণকরত: প্রমাণ আনতে বলেন, তখন সেখানে উল্লিখিত শব্দ ছিল ‘তারকা ফিস্ সামা-য়ী’ অর্থাৎ ঊর্ধ্বে আরোহণ করো। কেউ কেউ বলেন, ‘তারকা’ অর্থ আরোহণ করো; যা ‘রাকিয়া’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘সে আরোহণ করেছিল’। আর আরবি ‘মি’রাজ’ শব্দটি ‘আরাজা’ থেকে গৃহীত, যার অর্থ সে আরোহণ করেছিল। তারা আরো বলেন, এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো ‘রাকিয়া’ দ্বারা দৈহিক আরোহণ বোঝায়, আর ‘আরজা’ দ্বারা আত্মিক আরোহণ বোঝায়। তাই তাদের মতে, মি‘রাজ হল ‘আত্মিক আরোহণ’। কিন্তু আহলুস্ সুন্নাহ্ ওয়াল জামায়াতের আলিমদের মতে, মি’রাজ স্বশরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় সংগঠিত হয়েছিল। কারণ সকল সাহাবা, তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ীরা এটাই বিশ্বাস করতেন।
ইসলামী ধর্মবেত্তাদের মতে, লাইলাতুল মি’রাজ বা মি’রাজের রাত, যা সচারাচর শবে মি’রাজ হিসেবে আখ্যায়িত হয়, যে রজনীতে ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ঐশ্বরিক উপায়ে ঊর্ধ্বাকাশে আরোহণ করেছিলেন এবং মহান প্রভূর সাথে সাক্ষাৎ করেন। এই মি’রাজের মাধ্যমেই ইসলাম ধর্মের পঞ্চস্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ অর্থাৎ নামায, মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক (ফরয) করা হয় এবং এই রাতেই দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামায মুসলমানদের জন্য হাদীয়া স্বরূপ নিয়ে আসেন নবী মুহাম্মদ (স.)।
ইসলামের ইতিহাস ও হাদীস পর্যালোচনায় জানা যায়, হযরত মুহাম্মদ (স.)এর নবুয়তের ১০ম বর্ষে তথা ৬২০ খ্রি. ২৬ রজব দিবাগত রাতে মি’রাজের বিষ্ময়কর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ওই রাতে মুহাম্মদ (স.) আবু তালিবের মেয়ে হিন্দার বাড়িতে ছিলেন। আবার অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ঐ রাতে মুহাম্মদ (স.) কাবা গৃহে ঘুমাতে যান এবং তিনি কাবার ঐ অংশে ঘুমান, যেখানে কোনো ছাদ ছিল না (হাতীম)। হিন্দার বিবরণ থেকে জানা যায়, ঐ রাতে মুহাম্মদ (স.) রাতের প্রার্থনা সেরে যথারীতি ঘুমাতে যান। খুব ভোরে মুহাম্মদ (স.) ঘুম থেকে উঠে সবাইকে জাগালেন এবং নামায আদায় করলেন। হিন্দাও তাঁর সাথে নামায আদায় করলেন। অপর এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, ওই রাতে নবী (স.) কা’বা শরীফের হাতীমে (ক্যাম্পাসে) মতান্তরে হযরত উম্মে হানীর গৃহে শায়িত ও নিদ্রিত অবস্থায় ছিলেন।
এমন সময় দেবদূত জিব্রাঈল আমীন (আ.) সেখানে এসে তাঁকে ঘুম থেকে জাগালেন, পবিত্রতা অর্জন করানোর পর বক্ষ বির্দীর্ণ করলেন এবং স্বর্গীয় হাউজে কাউসারের পানি দিয়ে ক্বালব ধৌত করে দিলেন। তারপর স্বর্গীয় বাহন বুরাকে আরোহণ করিয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে জেরুজালেমে অবস্থিত বাইতুল মুকাদ্দাসে নিয়ে গেলেন। সেখানে নবী করীম (স.) নবীকূলের সর্দার হিসেবে সব নবী-রাসূলদের সঙ্গে নিয়ে তাঁর ইমামতিত্বে দুই রাকাত নফল নামায আদায় করেন। এরপর তিনি আবার বুরাক নামক বাহনে আরোহণ করে এক এক করে সাত আসমান পরিদর্শন করলেন। প্রথম আসমানে হযরত আদম (আ.) এর সাথে, দ্বিতীয় আসমানে হযরত ঈসা (আ.) এর সাথে, তৃতীয় আসমানে হযরত ইউসুফ (আ.) এর সাথে, চতুর্থ আসমানে হযরত ইদ্রিস (আ.) এর সাথে, পঞ্চম আসমানে হযরত হারুন (আ.) এর সাথে, ষষ্ঠ আসমানে হযরত মুসা (আ.) এর সাথে এবং সপ্ত আসমানে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। সেখান থেকে সপ্ত আকাশের উপরে অবস্থিত ‘সিদ্রাতুল মুন্তাহা’ নামক স্থানে পৌঁছালেন, যেখানে হযরত জিব্রাঈল (আ.) থেমে গেলেন এবং রাসূলে পাক (স.) একাকী আরো দ্রুতগামী স্বর্গীয় বাহন ‘রফ্রফে” আরোহণ করে ‘বাইতুল মামুর’- এ উপনীত হলেন। পথিমধ্যে অবশ্য হাউজে কাউসার অতিক্রম করেন। এরপর নবী (স.) আবারো ‘রফ্রফ্’ এ আরোহণ করে মহান আল্লাহ্ পাকের একান্ত সান্নিধ্যে উপস্থিত হন; তখন নবী (স.) এবং আল্লাহ্ পাকের মাঝখানে শুধুমাত্র একটি পাতলা পর্দা ছিল। আল্লাহ্ পাকের সাথে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে তিনি নবী (স.) কে সমগ্র সৃষ্টিজগতের নিগূঢ় রহস্য সম্পর্কে অবগত করালেন। তারপর স্বশরীরে বেহেশ্তে থাকা সকল প্রকার নিয়ামত সমূহ স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেন; যা কোনো চর্মচক্ষু আজ পর্যন্ত দেখেনি, কোনো কান শুনেনি, কোনো মানুষের কল্পনা শক্তিও সে পর্যন্ত পৌঁছেনি। এরপর তিনি দোযখ পরিদর্শন করলেন; যা ছিল আযাব-গযবে ভরপুর। তাতে তিনি একদল লোককে দেখলেন যারা মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষন করছে। নবী (স.) প্রশ্ন করলেন, এরা কারা? উত্তরে জিব্রাঈল (আ.) বললেন, এরা আপনার উম্মতের সেসব লোক যারা দুনিয়াতে অন্যের গী’বত করতো। সবশেষে তিনি সে রাতে প্রভাতের আগেই মহান আল্লাহ্ পাকের কাছ থেকে তাঁর উম্মতের জন্য ৫ ওয়াক্ত ফরয নামাযের বিধান নিয়ে দ্রুতগামী ঐশীবাহনে আরোহণ করে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর জমিনে প্রত্যাবর্তন করলেন।
প্রথমে আল্লাহ্ পাকের পক্ষ থেকে হযরত মুহাম্মদ (স.) এর উম্মতকে ৫০ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয়। কিন্তু উম্মতের কা-ারী নবী (স.) এর আর্জিতে তা ৫ ওয়াক্তে নামিয়ে আনা হয়। তাই মুসলমানদেরকে দৈনিক পাঁচটি আলাদা আলাদা সময় নামাযে দন্ডায়মান হতে হয়। অর্থাৎ মি’রাজ থেকে মুহাম্মদ (স.) তাঁর উম্মতদের জন্য নামাযের আদেশ নিয়ে এসেছিলেন এবং তিনি এই ধরাধামে প্রত্যাবর্তন করেই প্রথম ফযরের নামায হযরত জিব্রাঈল আমিনের নির্দেশনা অনুসারে আদায় করেছিলেন। কুরআনে পাকের সূরা বনী ইসরাঈলের ১ম আয়াতে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন, ‘পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের আধাঁরে নিয়ে গিয়েছেন মাস্জিদুল হারাম থেকে মাস্জিদুল আক্সা পর্যন্ত, যার আশেপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি; তিনিই সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা।’
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাস্উদ (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে, মি’রাজের রজনীতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী করীম (স.) এবং তাঁর উম্মতের জন্য বেশ কয়েকটি হাদীয়া প্রদান করা হয়- প্রথমত: পাঁচ ওয়াক্ত নামায যা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত: তাঁর উম্মতের যে সব ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, আল্লাহ্ তাঁর পাপরাশি ক্ষমা করে দেবেন। তৃতীয়ত: সূরা আল বাক্বারার শেষাংশ। চতুর্থত: সূরা বনী ইসরাঈলের ১৩ দফা নির্দেশনা: ১. একাগ্রতার সাথে আল্লাহ্ পাকের উপাসনা করা আর তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা। ২. মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করা। ৩. আত্মীয়স্বজন, ইয়াতীম ও মুসাফিরের হক নষ্ট না করা। ৪. অযথা অপচয় ও আড়ম্বরিতা পরিহার করা। ৫. অভাবগ্রস্ত ও সাহায্য প্রার্থীকে বঞ্চিত না করা। ৬. সাধ্যমত দান-সাদকাহ্ করা। ৭. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা। ৮. দারীদ্র্যের ভয়ে সন্তানকে হত্যা না করা। ৯. যিনা-ব্যভিচার থেকে দূরে থাকা। ১০. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তা অনুসন্ধান করা। ১১. ওজনে কম না দেয়া। ১২. অঙ্গীকার রক্ষা করা। ১৩. দুনিয়াতে দম্ভ-অহঙ্কারে না চলা।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ রাসূল হযরত মুহাম্মদ (স.) এর অন্যতম মু’জিযা হচ্ছে মি’রাজ। এটা প্রিয় নবীর জীবনে এবং ইসলামের ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোন মানুষ এমনকি অন্য কোন নবী-রাসূলের জীবনে এ ধরণের ঘটনা সংঘটিত হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্তও সংঘটিত হবে না।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও ইসলামী গবেষক। ই-মেইল :dr.alim1978@gmail.com

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!