প্রকাশকাল: 13 জুলাই, 2019

মাথা নিয়ে মাতামাতি ও আমার শৈশব

আমার বয়স তখন পাঁচ কিংবা ছয়, বাবার চাকরির সুবাদে আমরা তখন ঢাকাতে থাকি। হঠাৎ একদিন গ্রাম থেকে খবর আসলো আমার দাদী অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী । মনে আছে দাদীর সেই অসুস্থতার খবর পেয়ে বাবা তার ‌স্ত্রী-সন্তানকে’ অসুস্থ মায়ের পাশে রাখার জন্যে আমাদের ঢাকা থেকে গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন।
আমি আর মা গ্রামে চলে আসলাম। সেবার গ্রামে আসার আগে গ্রাম কেমন হয় তা আমি জানতাম না। কারণ চোখ ফোটার পর থেকেই আমি দেখেছি চারটি দেয়াল, একটি মোটা ফ্রেমের শক্ত কাঠের দরজা, যার সাথে লাগানো সাপের মত আঁকাবাঁকা একটি সিড়ি। শহরের সেই দৃশ্যপট চোখে নিয়ে গ্রামে এসে উচ্ছাস-উদ্দীপনায় আমি প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। কোন বাড়ির সাথে এতবড় মাঠ থাকতে পারে তা আমার জানা ছিলো না, কয়েকদিন পরে জানলাম আমি যেটাকে মাঠ ভেবেছিলাম সেটা আসলে আমাদের বাড়ির উঠোন।
সাপের মত লম্বা টিনের সেই বিশাল বাড়ি দেখে ভেবেছিলাম কত মানুষই না এখানে থাকে। পরে দেখলাম সবগুলো ঘর মানুষ থাকার জন্য না। সেখানে ধান রাখার ঘর আছে, বিচার শালিশ করার জন্য কাচারী ঘর আছে, পাঞ্জেগানা নামাজ পড়ার জায়গাও আছে ।আসলে ঢাকার সংর্কীণ জীবন-যাপনে সেই শৈশবেই আমার হৃদয়ের জমিটি এতটাই সংকীর্ণতম হয়েছিলো যে, গ্রামের সামান্যতম বিশালতাও আমার কাছে ধরা দিয়েছিলো বিশাল এক বিশালতায় ।
একদিকে ধীরে ধীরে গ্রামের সাথে মানিয়ে উঠছি, অন্যদিকে আমার বিচরণের জায়গাও ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। মোটমুটি ছয়মাসের মধ্যে আমি দু’একটা পাড়ার রাস্তাঘাট চিনে গেলাম। সাথে কিছু বন্ধুর জোগাড়ও করে ফেললাম।
তারপর অনেকগুলো দিন কেটে গেলো। এর মাঝে আমি গ্রামের এক প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলাম। বাবা ট্রান্সফার হয়ে জেলা সদরে চলে আসলেন। বাবা ঢাকা থেকে ট্রান্সফার হয়ে আসার কিছুদিনের মধ্যে আমাদের দাদী ইন্তেকাল করলেন । বাবা ট্রান্সফার হয়ে না আসলে দাদী মারা যাবার পর হয়ত আমরা আবার ঢাকা ফেরত যেতাম। কিন্তু যেহেতু বাবা একেবারে চলে এসেছে সেহেতু আমরা গ্রামেই থেকে গেলাম ।
ক্লাশ থ্রী বা ফোরে পড়ছি, আমার বাউন্ডুলেপনার শুরু মনে হয় সেখান থেকেই। সারাদিন এ-পাড়া ও-পাড়ায় দৌড়াদৌড়ি কিংবা চাচাতো জ্যাঠাতো ভাই বা গ্রামের যেকোন পরিচিত মানুষের সাথে বিলের পানিতে মাছ ধরতে যাওয়ার মত ঘটনা ছিলো নিত্য নৈমত্যিক বিষয়। এর মাঝে বাউন্ডুলেপনার সূচীতে যোগ হলো নতুন এক ঘটনা। হঠাৎ শুনলাম পাশের পাড়ার দু’জন কোহকাফনগর থেকে নাকি যাদু শিখে এসেছে, আর সেসব যাদু তারা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিদিনই গ্রামের কোথাও না কোথাও তারা ৩/৪টা শো করছে ।
গ্রামে এই যাদুকরদ্বয়ের উদ্ভবের পর তাদের শো আমরা খুব বেশী একটা মিস করেছি বলে মনে পড়ে না। এমনও হয়েছে স্কুল বাদ দিয়েও এ-গ্রাম থেকে ও-গ্রাম তাদের পিছু পিছু দৌড়েছি। অবস্থা এমন হলো যে, এই দুই যাদুকরের যাদুর টানে এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের সারাদিন আর বাড়িতে পাওয়া যায় না। এমনকি তাদের খাওয়া-দাওয়ারও কোন ঠিক-ঠিকানা থাকে না ।
এই সমস্যা সমাধানে একবার সম্ভবত বিচার শালিসও করা হয়েছিলো। সেই শালিসে কি সিদ্ধান্ত হয়েছিলো তা ঠিক এই মুহূর্তে মনে আসছে না, তবে সেই শালিসের কারণে যে আমাদের যাদু দেখা একটুও কমেনি তা স্পষ্ট মনে আছে । খুব সুখে যাচ্ছিলো আমাদের দিন। বন্ধুরা মিলে যাদুকরদের কিছু যাদু আয়ত্ব করার সামান্য চেষ্টাও করে যাচ্ছিলাম। প্রায় যাদুকর বনে যাবো যাবো অবস্থা, সেই সময় শুনলাম এক ভয়াবহ সংবাদ।
আমাদের এলাকার পাশে ভাঙ্গা নামক একটি জায়গা আছে। নামের সাথে জায়গাটির যথার্থতা রয়েছে বৈকী। কারণ দুই রাস্তার মাঝে একটি খাল বয়ে যাওয়ায় বর্ষায় এটুকু জায়গা নৌকা দিয়ে পার হতে হতো। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে হেটেই পার হওয়া যেতো। যাতায়াতের বিশেষ কোন সমস্যা না হওয়া সত্বেও শুনলাম সেই ভাঙ্গার উপর ব্রিজ করা হবে ।
ভাঙ্গার উপর ব্রিজ হবে এই সংবাদ যতদ্রুত না ছড়ালো, তার চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে ছড়ালো ব্রিজ তৈরিতে মানুষের কাল্লা (মাথা) লাগার রটনা।
একেক জনের মুখে একেকরকম গল্প শোনা যেতে লাগলো। এক মুরুব্বি বললো, ব্রিজ তৈরির আগেই পানিকে শান্ত করার জন্য কাল্লা দিতে হবে। আরেকজন বললো; ব্রিজের খাম্বা বসানোর সময় খাম্বার নিচে দিতে হবে, তা না হলে খাম্বা পাতালে চলে যাবে । আবার একদল বললো, ব্রিজের দু’পাশ যখন সংযুক্ত করা হবে তখন মানুষের মাথা দিতে হবে, তা না হলে দুপাশ একসাথে জোড়া লাগবে না।
কখন কোথায় কিভাবে কাল্লা দিতে হবে এটা যেমন শোনা গেলো ঠিক এইসব কাল্লা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হবে তারও একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গেলো তাদের মুখ থেকেই। কেউ কেউ বললো যে এলাকার ব্রিজ, সে এলাকার পোলাপানেরই কাল্লা লাগবে!! আর তা সংগ্রহে; ব্রিজ যারা বানাবে তারাই পোলাপান ধরে কাল্লা কেটে নেবে।
আবার অনেকে বললো এই কাল্লা কাটার কাজে কিছু মহিলাকে নিযুক্ত করা হবে যারা পোলাপানকে বিভিন্ন লোভের বস্তু দিয়ে লোভ দেখিয়ে আড়ালে নিয়ে কাল্লা কেটে নেবে ।
ভয়াবহ এইসব গল্প শুনে এমনিতেই যখন আমরা ভয়ে কাতর, ঠিক তখনই আমাদের বাবা মা এটাকে আমাদের দুরন্তপনাকে একরকম কন্ট্রোল করার অস্ত্র হিসেবে সহি ব্যবহার করলেন ।
বাবা রাতে এই কাল্লাকাটা নিয়ে এমন সব গল্প বলতে শুরু করলেন, যা শুনে আমার জ্বর উঠে যাওয়ার মত অবস্থা হতো। এমনকি আম্মা একদিন দুপুরে এক মহিলাকে দেখিয়ে বললো ‌‌‌‘ঐযে ঐ মহিলাকে দেখতেছস, ঐ মহিলা হচ্ছে কাল্লাকাটা মহিলা, আর যারা কাল্লা কাটে তারা দুপুরে কাল্লা কাটতে আসে তাই দুপুরে খাওয়া দাওয়া করে ঘুমায়া পর। বিকালে কাল্লাকাটারা থাকে না তাই খেলাধূলা যা করার বিকালে করি।’
এই কথা শোনার পর কতদিন যে আমি অসহ্য গরমের মধ্যেও দুপুরে বৃথা ঘুমানোর চেষ্টা করেছি তার কোন হিসাব নেই। আর বিকালে খেলতে যাবো, কাদের সাথে খেলতে যাবো? আমার মা যেমন আমাকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলো দুপুরে কাল্লাকাটা আসে। অন্যদের মায়েরা তাদের বুঝিয়েছিলো বিকালে কাল্লাকাটা আসে, তাই না পেতাম কাউকে দুপুরে না বিকালে।
প্রায় একটা বছর আমরা কাল্লাকাটা বিষয়ক নানা গল্পের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। ততদিনে ব্রিজ তৈরি হয়েছে। ব্রিজ সম্পন্ন হওয়ার পর লোকমুখে শুনেছি সেই ব্রিজে যতবার খাম্বা বসানোর চেষ্টা করা হয়েছে, ততবারই নাকি সেই খাম্বা পাতালে হারিয়ে গিয়েছে। সারাদিন কাজ করে শ্রমিকেরা খাম্বা পুতে যেতো। পরদিন সকালে এসেই দেখতো খাম্বা গায়েব । তারপর সেই সমস্যা সমাধোনে নাকি পাতাল দেবতাকে খুশি করার জন্য ৭টি মাথা দিতে হয়েছে, সাত দিনে সাতটি মাথা।
মাথা দিয়েই হোক বা না দিয়েই হোক সেই ব্রিজটি অবশেষে নির্মান সম্পন্ন হয়েছিলো। ব্রিজ তৈরি হয়ে যাওয়ার পর পর যখন আমরা বন্ধুরা সবাই আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠছিলাম, ঠিক তখনই বাবা আমাদের নিয়ে শহরে চলে আসলেন । শহরের স্কুলে ভর্তি হলাম, স্কুল শেষ করে কলেজ, তারপর ভার্সিটি। এরপর কত শত রাতে শৈশবের সেই ভয়ে ঘেরা ব্রিজে বসে শৈশবের সেই বন্ধুদের নিয়েই নির্ভয়ে আড্ডা দিয়েছি তার কোন হিসাব নেই।
ততদিনে ভুলেই গিয়েছিলাম ব্রিজ তৈরিতে কল্লা লাগার মত অযাচিত সেই প্রথাটির কথা।
গত কয়েকদিন আগে অফিসে বসে পদ্মা সেতুতে মানুষের কল্লা লাগছে এ জাতীয় একটি আলোচনা শুনে শৈশবের সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে নষ্টালজিক হয়ে গিয়েছলাম । খুব ভালো লাগছিলো নিজের সেই বোকামী মাখা দিনগুলো স্বরণ করতে , চোখ ভিজিয়ে সেদিন স্বরন করলাম সেই দিনগুলো ।
পরদিন দ্বিতীয়বার অফিসে যাওয়ার সময় লেগুনায় শুনলাম পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা লাগার ব্যাপারটা। দেখলাম ব্যাপারটাতে সবাই খুব সিরিয়াস। বেশভূষায় শিক্ষিত ও ভদ্র সমাজ এমন ‘সিলি’ একটি বিষয়ে বিশ্বাসী চোখে আলোচনা হচ্ছে দেখে আমি অবাক হলাম ।
রাতে বাসায় ফিরে অনলাইন নিউজপোর্টালগুলোতে ঢু মেরে দেখলাম গুজবএতটাই ভয়াবহ হয়েছে যে, সেতু কর্তৃপক্ষকে সাধারন জনগণকে আশ্বস্ত করতে নোটিশ পর্যন্ত করতে হয়েছে ।পত্রিকা পড়ে ফেইসবুকে ঢুকে দেখি সৌদিতে শিরচ্ছেদ করা মাথার ছবি দিয়ে একজন লিখেছেন ‘আর কত রক্ত চায় পদ্মা সেতু’। ইউটিউবে ঢুকে দেখি সেখানেও ‘লাখো মানেুষের মাথার বিনিময়ে পদ্মা সেতু চাইনা’ শিরোনামে একটি ভিডিও ট্রেডিং হয়ে আছে ।
এইসব দেখে আমার চোখ কপালে উঠে গেলো, বলা যায় একরকম ইতস্তত: হয়েই রুমমেটকে বললাম; ‘ভাই কি অদ্ভুত বিষয় দেখেছেন? এই যুগেও মানুষে এসব বিশ্বাস করে, আমরা না আধুনিক যুগে পা রেখেছি!! ডিজিটাল হচ্ছি সব ক্ষেত্রে ? তারপরও এসবে আমরা বিশ্বাস রেখেছি ? নাকি ‘ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’ প্রবাদেরই উদাহরণ হিসেবে ডিজিটাল স্ক্রিনে দেখছি এ জাতির ধান ভানা?
মজার ব্যাপার আমার রুমমেটও সেতুতে মানুষের মাথা বিসর্জনের প্রথাতে অন্ধভাবেই বিশ্বাস করে।
যাইহোক, আমি অবাক হই যখন দেখি আমরা প্রাইমারীতে পড়া অবস্থায় যে মিথ নিয়ে বসবাস করতাম তা আজ প্রচলিত পড়াশোনা শেষ করেও কিছূ মানুষ সেই মিথের মধ্যে বসবাস করে। সত্যি কিছু মানুষের বিকাশ সেই প্রাইমারীতেই আটকে গেছে, প্রাইমারীর পর আর তাদের কোন বিকাশ হয়নি । তারা আলো পায়নি, তারা বৃষ্টি পায়নি। তারা থেমে আছে বনসাই হয়ে। দিনের আলো যেমন লুকানো রয়েছে বাদুড়ের কাছে ঠিক তেমনি পৃথিবীর সকল সংস্কার লুকানো রয়েছে তাদের কাছ থেকে ।
লক্ষ কেটে ফেলা মাথা নিয়ে মাতামাতি না করে কিছুটা নিজের মাথা নিয়ে মাতামাতি করলেও হয়ত তারা অনুধাবন করতে পারতো একটি সেতুতে রড সিমেন্ট লাগে, মানুষের মাথা না ।
লেখক : মো: মাহুমুদুর রহমান সুজয়, বেসরকারী কর্মকর্তা।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!