বনানী অগ্নিকাণ্ডের সেই স্পাইডারম্যান জসিম শেরপুরে সংবর্ধিত

‘জসিমের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমাদেরকে মানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে ॥ জেলা প্রশাসক

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রাজধানী ঢাকার বনানীর এফআর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডে নিজের জীবনের পরোয়া না করে মানুষের জীবন বাঁচাতে স্পাইডারম্যানের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মানবতার অনন্য সাক্ষর রাখা সেই জসিম উদ্দিনকে (৩১) তার নিজ এলাকা শেরপুরে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। ১৫ এপ্রিল সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে তাকে ওই সংবর্ধনা দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষ রজনীগন্ধায় আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জসিমকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নিয়ে তার হাতে নগদ ১০ হাজার টাকা ও উপহার তুলে দেন প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব। ওইসময় তিনি বলেন, বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিজের জীবন বাজি রেখে জসিম মানবতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এ ধরনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমাদেরকে ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এমন সুরকে ধারণ করে মানবকল্যাণে কাজ করতে হবে। সেইসাথে ওই ধরনের ভয়াবহ ঘটনার সময়কালে আমাদের নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক (উপ-সচিব) এটিএম জিয়াউল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (উপ-সচিব) সাইয়েদ এজেড মোরশেদ আলী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জন কেনেডি জাম্বিল, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আধার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ আল মামুন, নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুর রহমান, নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুর রহমান, ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রুবেল মাহমুদ, শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেজুতি ধর, এনডিসি মেজবাউল আলম ভুইয়া, সহকারী কমিশনার (আইসিটি) মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী কমিশনার অহনা জিন্নাত, প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক মেরাজ উদ্দিন, লছমনপুর ইউপি চেয়ারম্যান সেলিম মিয়া, সংবর্ধিত জসিমের আত্মীয়-স্বজনসহ স্থানীয় সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের সময়কালে জসিমের সহায়তায় মৃত্যুর কোল থেকে এক তরুণীকে উদ্ধারের ভাইরাল ভিডিওটি দেখানো হয়।
সংবর্ধনার জবাবে জসিম তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ঢাকার কড়াইল বস্তি এলাকায় বসবাসের সুবাদে এ পর্যন্ত বনানীর এফআর টাওয়ারের পাশাপাশি হোটেল তারকা ও ডমিনো ডেভেলপার কোম্পানীসহ ১০/১২টি অগ্নিকাণ্ডে সহায়তার চেষ্টা করেছি। ওইসব অগ্নিকাণ্ড হাজার হাজার মানুষ কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলেও এবং অনেকেই মোবাইলে সেলফি তোলা ও ভিডিও করার কাজে ব্যস্ত থাকলেও সহায়তায় এগিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত খুবই কম। এ বিষয়টি আমাকে অনেক আগে থেকেই পীড়া দেয়। তাই আমি ওই ধরনের ভয়াবহতায় বসে থাকতে পারি না। তিনি আরও বলেন, সেদিন নিজের তরফ থেকে আরও মানুষকে বাঁচাতে পারলে তার আনন্দ হতো। কিন্তু অনেক মানুষ মারা যাওয়ায় সেই দিনটি তার কাছে একটি শোকের দিন। সাহায্য-সহযোগিতার চেয়ে মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই তার বড় প্রাপ্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানবতার সেবায় যেন নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারি-এটিই আমার প্রতিজ্ঞা।
জানা যায়, শেরপুর সদর উপজেলার বলাইয়েচর ইউনিয়নের দুসরা ছনকান্দা গ্রামের মৃত ওমর আলী ও মাজেদা বেগমের ৩ পুত্র, এক কন্যার মধ্যে জসিম দ্বিতীয়। হতদরিদ্র পরিবারের জসিম মাত্র ৯ বছর বয়সেই পিতাকে হারান। তখন তিনি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী হলেও আর পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। জীবিকার তাগিদে ছুটোছুটির এক পর্যায়ে ২০০৯ সালে ঢাকার কড়াইল বস্তিতে উঠে জসিমের পরিবার। সেই থেকে জীবন যুদ্ধের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে ওই এলাকায় পরিচিত হয়ে উঠেন জসিম। বিয়ে করে সংসার জীবনে হয়েছেন ২ পুত্র সন্তানের জনক। এখন তিনি বনানীর হাওয়া ভবন মাঠে পুরোনো আসবাবপত্র কেনাবেচার ব্যবসা করেন। পাশাপাশি সেই মাঠের সোয়াট ক্লাবের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও পালন করেন। তার তার বড় ভাই আব্দুল কাদের ওই মাঠের পাশে একটি চায়ের দোকান আর ছোট ভাই আজিম একটি বিকাশ, মোবাইল রিচার্জের দোকান চালান।
উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের সময় মানুষের জীবন বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন জসিম। ওইসময় তার চোখে পড়ে প্রাণে বাঁচতে ভবনের ৯ তলা থেকে তার বেয়ে নামার চেষ্টা করছেন এক তরুণী। ওই দৃশ্য দেখে তাঁকে থামতে বলেন জসিম। ওইসময় জীবনের পরোয়া না করে স্পাইডারম্যানের মতো দ্রুত দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে ওই তরুণীকে একতলা নিচে নামিয়ে নিরাপদে পাশের ভবনে উঠিয়ে দেন। এতে প্রাণে বেঁচে যান ওই তরুণী। কেবল তাই নয়, উপর থেকে তার বেয়ে নামতে গিয়ে এক ব্যক্তি উপুড় হয়ে ঝুলে পড়লে চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে না পারলেও এক শ্রীলঙ্কান নাগরিকসহ আরও ৪ জনকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন জসিম। এরপর উদ্ধার কাজে তার সহায়তা সব ঘটনা না হলেও ওই তরুণীর জীবন বাঁচানোর ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!