সন্ধ্যা ৭:৪৪ | শনিবার | ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্রসঙ্গ; জঙ্গলে মানসিক ভারসাম্যহীন মা,কারাগারে এক বৃদ্ধ পিতা : মানবিক বিপর্যয়ের এপিঠ-ওপিঠ

-রফিকুল ইসলাম আধার

‘টাঙ্গাইলের সখীপুর জঙ্গলে করোনা সন্দেহে মাকে ফেলে গেছে সন্তানরা’- এমন একটি খবর গত ১৪ এপ্রিল কয়েকটি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশিত ওই খবরে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রকাশিত ওই খবরে বলা হয়, সোমবার রাত দেড়টার দিকে ওই জঙ্গলে চিৎকার শুনে ওই নারীকে উদ্ধার করে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ। পরে তার সর্দি-কাশি ও জ্বর থাকায় রাতেই তাকে এ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। যদিও পরের দিন নমুনা পরীক্ষায় তার শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। তবে প্রকাশিত ওই খবরটি সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয় বিদারক হওয়ায় তা নিয়ে ধিক্কারের ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, প্রকাশিত ওই খবরে পরিবেশিত তথ্যের প্রেক্ষিতে ধিক্কারের ঝড় ওঠাটাই স্বাভাবিক। কারণ চীন থেকে প্রায় আড়াই মাস আগে শুরু হওয়া মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে ইতোমধ্যে যখন বিশ্বের আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ২১০টিতে দাঁড়িয়েছে এবং প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ ও আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২১ লাখ ছাড়িয়েছে। সেই সাথে প্রায় দেড় মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশে মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ১শর কাছাকাছি মানুষ, ঠিক তখন পরিবারের কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তিনি কেবল সুস্থ হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত আইসোলেশনে ভর্তি, চিকিৎসা ও মৃত্যুর পর কাফন-দাফন পর্যন্ত তাকে আর একনজর দেখার সুযোগটা পর্যন্ত হচ্ছে না। করোনা ভয়ে আত্মীয়-স্বজন দূরে থাক, সন্তান যাচ্ছে না বা যেতে দেওয়া হচ্ছে না পিতার লাশ বহন ও তার দাফন-কাফনে, কিংবা পিতা যাচ্ছে না বা যেতে দেওয়া হচ্ছে না সন্তানের লাশ বহন ও তার দাফন-কাফনে। ঢাকা বা করোনা ভাইরাস সংক্রমিত এলাকা ফেরত স্বামীকে ঘরে তুলছে না স্ত্রী-এমনি অবস্থায় পরিবেশিত খবরের লোমহর্ষক তথ্যের প্রেক্ষিতে ওই ধিক্কারের ঝড় ওড়াটা কোনমতেই অস্বাভাবিক নয়। বরং তা মানবিকবোধ সম্পন্ন প্রতিটি পাঠক-নাগরিকের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ হলেও তা অমূলক হবে না।
কিন্তু প্রকাশিত ও বহুল আলোচিত ওই খবরের প্রেক্ষিতে পরদিন (১৫ এপ্রিল) জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠের অনলাইন ভার্সন ও অনলাইন নিউজপোর্টাল শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’ এবং ১৬ এপ্রিল ইনডিপেনডেন্ট টিভি ও ১৭ এপ্রিল দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মিলে ভিন্ন তথ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে ওই নারী মানসিক ভারসাম্যহীন এবং তিনি ঘটনার ২৪ দিন আগে থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাকে তার সন্তানরা সেখানে ফেলে রেখে আসেনি। বরং গত ২১ মার্চ তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর খুঁজাখুজি করে না পেয়ে এলাকায় এলাকায় মাইকিং, ছবিসহ পোস্টারিং ও ফেসবুৃকে স্ট্যাটাস দিয়ে সন্ধান প্রার্থনা করা হয়েছে,- যার সত্যতা স্বীকার করেছেন এলাকার থানা পুলিশের ওসি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও। তাই পরিবারের লোকজন সেইসব প্রমাণপত্র প্রদর্শন করে প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি যদি সুস্থই থাকতেন, তাহলে নিজ নাম-ঠিকানা সঠিকভাবে বলতে পারতেন। তাদের মতে, ওই নারী হয়তো নিখোঁজের পর পথ ভুলে অন্য পথে যেতে যেতে সেখানে চলে গেছেন। কাজেই ওই খবরে পরিবেশিত তথ্য অতিরঞ্জিত, অনুমাননির্ভর ও আবেগী বলেই তাদের মতামত প্রকাশ করা হয় ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। সুতরাং প্রকাশিত খবরের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের যৌক্তিকতা মেনে নিতে হয় এ জন্যই যে, ওই নারীকে উদ্ধারের পর স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও’র মতামতেই যেহেতু বলা হয়েছে, তিনি অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন এবং যেহেতু তার নাম-ঠিকানা বলতে পারেননি (যদিও ওই খবরে নালিতাবাড়ীর কথা বলা হয়েছে), সেহেতু দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বড়জোর এভাবে ধারণা করা যেতে পারতো যে, মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারী হয়তো পথ ভুলে সেখানে চলে এসেছে। অথবা শরীরে করোনা ভাইরাস উপসর্গের কারণে স্বজনরা হয়তো ভয়ে তাকে ফেলে রেখে গেছে বা যেতে পারে। কিন্তু ওই খবরে সরাসরি যা বলা হয়েছে তা আদৌ মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারীর দ্বারা বলা সম্ভব নয় বিধায় তা অনুমাননির্ভর, অতিরঞ্জিত ও আবেগী বলেই প্রতীয়মান হয় বৈকি। যার প্রেক্ষিতে সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই নারীর সন্তান-সন্ততি ও পরিবার। আর সেই নিরেট লোকগুলোর প্রতিবাদের ভাষাও নেই বলে চলছে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। যে ক্ষরণে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে বিদগ্ধজন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। কিন্তু এ ধরনের খবরে সস্তা জনপ্রিয়তা বা বাহবা যতোটা পাওয়া যায়, গভীর অনুসন্ধানে তা অন্তঃসারশূন্য প্রমাণিত হলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অপলাপ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। সেইসাথে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের মর্যাদাও হয় খাটো ও ক্ষুন্ন।

img-add

অবশ্য অতিরঞ্জিত, একতরফা ও আবেগী খবর হরহামেশাই আমাদের অনেক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। যেমন স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজছাত্রী অপহরণ- এমন খবরগুলোর পেছনের খবর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় ৮০ ভাগ ঘটনাই প্রেমঘটিত। ৭/৮ বছর আগে নালিতাবাড়ীতে ‘ম’ আদ্যোক্ষরের এক স্কুলছাত্রী অপহরণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তাকে হত্যাচেষ্টা চালিয়েছে বখাটে যুবক-সেরকমই একটি খবর তোলপাড় সৃষ্টি করলে তা খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত গড়ায়। ফলে তার চিকিৎসার দায়ভার গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কিন্তু আইন পেশা ও সাংবাদিকতার দু’ক্ষেত্র থেকেই তার শেষটা পর্যন্ত দেখার সুযোগ হলে দেখেছি যে, তা প্রকৃতই প্রেমঘটিত ছিলো। পারিপার্শ্বিক অবস্থায় প্রভাবিত স্কুল ছাত্রীর অভিভাবকের কারণেই ততোটা রূপ নিয়েছিল। পরবর্তীতে আইন-আদালতে তা প্রমাণিত হওয়ায় সেই স্কুলছাত্রী কথিত অপহরণকারীকে নিয়েই সংসার করছে। এখন সে ২ সন্তানের জননী। অথচ সেই ঘটনায় গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন একতরফা ও আবেগী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও তার ভেতরের খবর তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়নি। সমাজে একই ধরণের ঘটনা যেমন এখনও ঘটছে, ঠিক তেমনই একই ধাচের খবর বা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়ে আসছে। সঙ্গত কারণে দুঃখজনক হলেও আমাদের অনেক গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয়ের একটি অপ্রকাশিত ঘটনা প্রকাশ করলে দু’টি ঘটনার পাশাপাশি অবস্থানে বোঝা যাবে বাস্তব অর্থে কোনটায় মানবিক বিপর্যয় কিংবা হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বা দহন কতটুকু। ঘটনাটি প্রায় ৮৫ বছর বয়স্ক এক অশীতিপর বৃদ্ধ পিতার। মোঃ ময়দান আলী নামে ওই পিতা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের অধিবাসী হলেও তার দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ঘটে শেরপুরের শ্রীবরদী ও শেষটায় জেলা কারাগারে। গত ১৯ ফেব্রæয়ারি শ্রীবরদীর মামদামারী এলাকা থেকে সেই বৃদ্ধকে অসংলগ্ন ঘুরাফেরা অবস্থায় এলাকাবাসীর সন্দেহের মুখে আটক করে স্থানীয় থানা পুলিশ। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কেবল নিজের নামটা ছাড়া ঠিকানাদি বলতে না পারায় পিতাসহ ঠিকানা অজ্ঞাতনামা উল্লেখে তাকে আদালতে সোপর্দ করে নিরাপদ হেফাজতে রাখার আবেদন করা হলে সেদিনই আদালত তাকে জেলা কারাগারের নিরাপদ হেফাজতে পাঠায়। তবে আদালত দ্রæত অনুসন্ধান সাপেক্ষে ঠিকানা সংগ্রহপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলেও নির্দেশ দেয়। কিন্তু তার প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় এবং স্বজনরা নিতে না আসায় সেই থেকে তিনি কারাগারেই পার করছিলেন বন্দি জীবন। ওই অবস্থায় গত ১০ এপ্রিল জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে ইউনিটের উপ-পরিচালক হায়দার আলীর সাথে কারাগারে আটক ২ ভারতীয় নাগরিককে কাপড়-চোপড়সহ কিছু সামগ্রী দিতে গেলে নবাগত জেলার তরিকুল ইসলাম বিষয়টির অবতারণা করে আমার সহযোগিতা কামনা করেন। ওইসময় তিনি আরও জানান, আইনগত সহায়তার জন্য বিষয়টি জেলা লিগ্যাল এইড দপ্তরেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কিছু জটিলতাসহ সেই অফিস এখন বন্ধ থাকায় ওই অসুস্থ বৃদ্ধকে নিয়ে কারাগারে রাতদিন বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। তার কথা শুনে আমি বিষয়টি নিয়ে খবর করতে তথ্য-উপাত্তসহ তার সহযোগিতা চাই। কিন্তু খবর না করে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তির সহযোগিতার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। অতঃপর তিনি কিছু তথ্য-উপাত্ত, সংগৃহীত ঠিকানা (সাং-টাকিমারী, থানা ও জেলা-শেরপুর) ও ওই বৃদ্ধের বাড়ির একটি মোবাইল নাম্বার দেন,- যে মোবাইলে ফোন দেওয়ার পর কারাগারের লোক জানার পর আর কথা না বলে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। পরদিনই দফায় দফায় ওই মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলতে আমিও ব্যর্থ হয়ে জেলারের দেওয়া ঠিকানায় আব্দুল আজিজ নামে আমার এক পরিচিত ব্যক্তিকে কাজে লাগাই। তার পরদিন খবর পাই যে, সদর উপজেলার টাকিমারী গ্রামে ওই নামে কোন লোক নেই। তবে পার্শ্ববর্তী জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় টাকিমারী নামে আরও একটি গ্রাম রয়েছে। এরপর ফের চেষ্টা করি ওই মোবাইলে। এবার সৌভাগ্যক্রমে পেয়ে যাই এক মহিলাকে। পরিচয়ে জানা যায়, তিনি ওই বৃদ্ধের পুত্রবধূ ও দ্বিতীয় পুত্র ফারুকের স্ত্রী। তার সাথে কৌশলে আলাপচারিতায় তথ্য মেলে, ওই বৃদ্ধের কোন মেয়ে সন্তান নেই। ৩ ছেলে মধ্যে প্রথম শফিকুল ও তৃতীয় শাহীন। ছয়তন নেছা নামে বৃদ্ধের বৃদ্ধা স্ত্রীও রয়েছেন ঘরে। সংসারের অবস্থা খুব একটা ভালো না হলেও নেহায়েত খারাপ নয়। তবে বাবা একটু মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে। ইতোপূর্বে আরও কয়েকদফা তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। খুজে নিয়ে আসার পরও বারবার বাড়ি ত্যাগ করেন বলে সন্তানরা তাকে আর খুঁজতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ততক্ষণে নরম সুরে বুজিয়ে তার স্বামী বা সন্তানরা এগিয়ে এলে বিনামূল্যে আইনগত সহযোগিতা দিয়ে তাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানালেও তিনি বলেন, ‘তারা আর যাবে না, আন্নেরা তারে পাডাই দেন। বাড়িত আইলে হয়ত হেরা খেদাইব না।’ এরপর আবার বোঝানোর চেষ্টা করতেই মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো গৃহকর্তা বা তার স্বামী এসে গিয়ে জেলখানার লোক মনে করেই ঝামেলা এড়াতে তা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও হাল না ছেড়ে দেওয়ানগঞ্জ থানার মাধ্যমে স্থানীয় চিকাজানী ইউপি চেয়ারম্যান মমতাজ উদ্দিনের স্মরণাপন্ন হলে তিনি জানান, ওই গ্রামটি মূলতঃ টাকিমারী নয়, পাশের চুনিয়াপাড়া গ্রাম- যা দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত। আর ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হচ্ছেন সোলায়মান কবির। কিন্তু তার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করে বন্ধ থাকায় ব্যর্থ হই। পরে ইউপি চেয়ারম্যান মমতাজ উদ্দিন নিজেই ওই পরিবারের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব নেন এবং বুঝিয়ে তাদের প্রতিনিধি পাঠাতেও আশ্বস্ত করেন। ততক্ষণে আমার খেয়ালে আসে দেওয়ানগঞ্জে শিপন নামে আমার এক নিকটতম আত্মীয় রয়েছেন, তিনি পারিবারিক ও রাজনৈতিক কারণে এলাকাতেও খুবই পরিচিত মুখ। সাথে সাথে তার সহযোগিতা চাইলে তিনি শেরপুরে অবস্থান করলেও অকপটে সহযোগিতা দিতে স্থানীয় কাউন্সিলরকে তিনিও মোবাইলে না পেয়ে জুয়েল নামে পাশের ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকে দায়িত্ব দেন। ইত্যকার চেষ্টার পাশাপাশি আমি কোর্ট পুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি করোনা পরিস্থিতিজনিত ছুটিকালীন বিশেষ দায়িত্বে থাকা বিজ্ঞ বিচারককে (সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ হুমায়ুন কবির) জ্ঞাত করাই। সেইসুত্রে তার সাথে কথা বলেন জেলারও। অবশেষে তিনি (বিজ্ঞ বিচারক) ঠিকানাসমেত থানা পুলিশের প্রতিবেদন কিংবা জেল সুপারের মাধ্যমে আবেদনের পরামর্শ দিলে সে মোতাবেক ১৪ এপ্রিল জেলার দ্রæত আবেদন পাঠানোর ব্যবস্থা করলে সেদিনই বৃদ্ধের ‘রিলিজ অর্ডার’ পৌঁছায় কারাগারে। অতঃপর সময়স্বল্পতায় সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় পরদিন সকালে তার মুক্তি মেলে এবং দায়িত্বশীল জেলার তার মানবিকতার শেষ সাক্ষর রাখতে কারাগারের গাড়িযোগে দু’জন কারারক্ষীকে দায়িত্ব দিয়ে তাকে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেন। এই হলো মানবিক বিপর্যয়ের অপ্রকাশিত ঘটনাটি,- যে অনাকাঙ্খিত ঘটনায় দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিকসহ সাংবাদিকতা বা আইনপেশার উর্ধ্বে থেকে মানবিকতার তাগিদে বার বার চেষ্টা করেও তার সন্তানদের ফেরানো যায়নি। তাদের এগিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি কারাগারে আটক থাকা অসুস্থ বৃদ্ধ অসহায় পিতাকে নিয়ে যেতে।
সুতরাং বর্ণিত অবস্থায় এখনও কি এমন প্রশ্নের উদ্রেক ঘটানোর প্রয়োজন আছে যে, একটি প্রকাশিত ঘটনা বা খবর এবং অপর একটি অপ্রকাশিত ঘটনার তুলনামূলক চিত্রে আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বা দহন কোনটায় সমধিক? যে মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে নিখোঁজের পর হন্যে হয়ে খুঁজে না পাওয়ায় ২৪ দিন পর এক জঙ্গল থেকে উদ্ধারের পর সন্তানদের ফেলে যাওয়ার অনুমাননির্ভর খবর ? না বসতবাড়ি আর সন্তান-সন্ততি থাকার পরও অশীতিপর বৃদ্ধ পিতা কারাগারের প্রকোষ্ঠে আটকের খবর পাবার পরও যে সন্তানরা তাকে নিতে এগিয়ে যায়নি, মুক্তি মিলেছে এক মানবিক জেলারের চেষ্টা ও বদান্যতায়,- সেই অপ্রকাশিত ঘটনা ? মানবিক বিপর্যয়ের জ্বলন্ত বা প্রকৃষ্ট উদাহরণই বা কোনটি ? ধিক! সন্তান!, ধিক! মানবিক হও, মানুষ হও- পিতা-মাতার প্রতি অমানবিক আচরণে অভ্যস্থ, নির্দয় ও বে-খেয়ালী সন্তানদের প্রতি করোনায় বিপর্যস্ত জাতির কঠিন সময়ে এই প্রত্যাশা আমাদের।
তারিখ : ১৭/০৪/২০২০ ইং।

লেখক : সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিক, শেরপুর, ই-মেইল- press.adhar@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email
এ সংক্রান্ত আরও খবর

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» শ্রীবরদীতে শিশু গৃহকর্মীকে বর্বরোচিত নির্যাতন ॥ গৃহকর্ত্রী গ্রেফতার

» অতিরিক্ত সচিব হলেন ৯৮ কর্মকর্তা

» জাতীয় সংসদের হুইপ, শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য আতিক করোনা আক্রান্ত

» নকলায় ট্রাক-সিএনজিচালিত অটোরিক্সার মুখোমুখি সংঘর্ষে যুবক নিহত, আহত ৪

» ঝিনাইগাতীতে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে আদিবাসী কৃষকের মৃত্যু

» শেরপুরে শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে পূজা উদযাপন পরিষদের মতবিনিময় সভা

» ঝিনাইগাতীতে এপি’র সমাপনী ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠিত

» শেরপুরে পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসী ভার্চুয়াল কনফারেন্স অনুষ্ঠিত

» শেরপুরে বিশিষ্ট সমাজসেবী ডালিয়ার ৭৮তম জন্মদিনে রক্তসৈনিকের পক্ষ থেকে সম্মাননা স্মারক প্রদান

» নালিতাবাড়ীতে বালু ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

» নদী ভাঙন রোধ ও নদী শাসনে পরিকল্পিত কাজ করে যাচ্ছে সরকার ॥ ময়মনসিংহে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

» শেরপুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের খনন বিষয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

» স্বর্ণের দাম ভরিতে কমলো ২৪৫০ টাকা

» কক্সবাজারের ৩৪ পুলিশ পরিদর্শককে একযোগে বদলি

» দেশে করোনায় আরও ২৮ মৃত্যু, শনাক্ত ১৫৪০

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

  সন্ধ্যা ৭:৪৪ | শনিবার | ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

প্রসঙ্গ; জঙ্গলে মানসিক ভারসাম্যহীন মা,কারাগারে এক বৃদ্ধ পিতা : মানবিক বিপর্যয়ের এপিঠ-ওপিঠ

-রফিকুল ইসলাম আধার

‘টাঙ্গাইলের সখীপুর জঙ্গলে করোনা সন্দেহে মাকে ফেলে গেছে সন্তানরা’- এমন একটি খবর গত ১৪ এপ্রিল কয়েকটি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এবং প্রকাশিত ওই খবরে সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। প্রকাশিত ওই খবরে বলা হয়, সোমবার রাত দেড়টার দিকে ওই জঙ্গলে চিৎকার শুনে ওই নারীকে উদ্ধার করে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ। পরে তার সর্দি-কাশি ও জ্বর থাকায় রাতেই তাকে এ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। যদিও পরের দিন নমুনা পরীক্ষায় তার শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। তবে প্রকাশিত ওই খবরটি সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত অমানবিক ও হৃদয় বিদারক হওয়ায় তা নিয়ে ধিক্কারের ঝড় উঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, প্রকাশিত ওই খবরে পরিবেশিত তথ্যের প্রেক্ষিতে ধিক্কারের ঝড় ওঠাটাই স্বাভাবিক। কারণ চীন থেকে প্রায় আড়াই মাস আগে শুরু হওয়া মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে ইতোমধ্যে যখন বিশ্বের আক্রান্ত দেশের সংখ্যা ২১০টিতে দাঁড়িয়েছে এবং প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ ও আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ২১ লাখ ছাড়িয়েছে। সেই সাথে প্রায় দেড় মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশে মৃত্যুবরণ করেছে প্রায় ১শর কাছাকাছি মানুষ, ঠিক তখন পরিবারের কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তিনি কেবল সুস্থ হয়ে ফিরে না আসা পর্যন্ত আইসোলেশনে ভর্তি, চিকিৎসা ও মৃত্যুর পর কাফন-দাফন পর্যন্ত তাকে আর একনজর দেখার সুযোগটা পর্যন্ত হচ্ছে না। করোনা ভয়ে আত্মীয়-স্বজন দূরে থাক, সন্তান যাচ্ছে না বা যেতে দেওয়া হচ্ছে না পিতার লাশ বহন ও তার দাফন-কাফনে, কিংবা পিতা যাচ্ছে না বা যেতে দেওয়া হচ্ছে না সন্তানের লাশ বহন ও তার দাফন-কাফনে। ঢাকা বা করোনা ভাইরাস সংক্রমিত এলাকা ফেরত স্বামীকে ঘরে তুলছে না স্ত্রী-এমনি অবস্থায় পরিবেশিত খবরের লোমহর্ষক তথ্যের প্রেক্ষিতে ওই ধিক্কারের ঝড় ওড়াটা কোনমতেই অস্বাভাবিক নয়। বরং তা মানবিকবোধ সম্পন্ন প্রতিটি পাঠক-নাগরিকের হৃদয়ের রক্তক্ষরণের কারণ হলেও তা অমূলক হবে না।
কিন্তু প্রকাশিত ও বহুল আলোচিত ওই খবরের প্রেক্ষিতে পরদিন (১৫ এপ্রিল) জাতীয় দৈনিক জনকণ্ঠের অনলাইন ভার্সন ও অনলাইন নিউজপোর্টাল শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’ এবং ১৬ এপ্রিল ইনডিপেনডেন্ট টিভি ও ১৭ এপ্রিল দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মিলে ভিন্ন তথ্য। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে ওই নারী মানসিক ভারসাম্যহীন এবং তিনি ঘটনার ২৪ দিন আগে থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাকে তার সন্তানরা সেখানে ফেলে রেখে আসেনি। বরং গত ২১ মার্চ তিনি নিখোঁজ হওয়ার পর খুঁজাখুজি করে না পেয়ে এলাকায় এলাকায় মাইকিং, ছবিসহ পোস্টারিং ও ফেসবুৃকে স্ট্যাটাস দিয়ে সন্ধান প্রার্থনা করা হয়েছে,- যার সত্যতা স্বীকার করেছেন এলাকার থানা পুলিশের ওসি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও। তাই পরিবারের লোকজন সেইসব প্রমাণপত্র প্রদর্শন করে প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি যদি সুস্থই থাকতেন, তাহলে নিজ নাম-ঠিকানা সঠিকভাবে বলতে পারতেন। তাদের মতে, ওই নারী হয়তো নিখোঁজের পর পথ ভুলে অন্য পথে যেতে যেতে সেখানে চলে গেছেন। কাজেই ওই খবরে পরিবেশিত তথ্য অতিরঞ্জিত, অনুমাননির্ভর ও আবেগী বলেই তাদের মতামত প্রকাশ করা হয় ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। সুতরাং প্রকাশিত খবরের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের যৌক্তিকতা মেনে নিতে হয় এ জন্যই যে, ওই নারীকে উদ্ধারের পর স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও’র মতামতেই যেহেতু বলা হয়েছে, তিনি অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন এবং যেহেতু তার নাম-ঠিকানা বলতে পারেননি (যদিও ওই খবরে নালিতাবাড়ীর কথা বলা হয়েছে), সেহেতু দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বড়জোর এভাবে ধারণা করা যেতে পারতো যে, মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারী হয়তো পথ ভুলে সেখানে চলে এসেছে। অথবা শরীরে করোনা ভাইরাস উপসর্গের কারণে স্বজনরা হয়তো ভয়ে তাকে ফেলে রেখে গেছে বা যেতে পারে। কিন্তু ওই খবরে সরাসরি যা বলা হয়েছে তা আদৌ মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারীর দ্বারা বলা সম্ভব নয় বিধায় তা অনুমাননির্ভর, অতিরঞ্জিত ও আবেগী বলেই প্রতীয়মান হয় বৈকি। যার প্রেক্ষিতে সামাজিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই নারীর সন্তান-সন্ততি ও পরিবার। আর সেই নিরেট লোকগুলোর প্রতিবাদের ভাষাও নেই বলে চলছে তাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। যে ক্ষরণে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে বিদগ্ধজন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা। কিন্তু এ ধরনের খবরে সস্তা জনপ্রিয়তা বা বাহবা যতোটা পাওয়া যায়, গভীর অনুসন্ধানে তা অন্তঃসারশূন্য প্রমাণিত হলে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অপলাপ হিসেবে আখ্যায়িত হয়। সেইসাথে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের মর্যাদাও হয় খাটো ও ক্ষুন্ন।

img-add

অবশ্য অতিরঞ্জিত, একতরফা ও আবেগী খবর হরহামেশাই আমাদের অনেক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। যেমন স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজছাত্রী অপহরণ- এমন খবরগুলোর পেছনের খবর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় ৮০ ভাগ ঘটনাই প্রেমঘটিত। ৭/৮ বছর আগে নালিতাবাড়ীতে ‘ম’ আদ্যোক্ষরের এক স্কুলছাত্রী অপহরণের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে তাকে হত্যাচেষ্টা চালিয়েছে বখাটে যুবক-সেরকমই একটি খবর তোলপাড় সৃষ্টি করলে তা খোদ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত গড়ায়। ফলে তার চিকিৎসার দায়ভার গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। কিন্তু আইন পেশা ও সাংবাদিকতার দু’ক্ষেত্র থেকেই তার শেষটা পর্যন্ত দেখার সুযোগ হলে দেখেছি যে, তা প্রকৃতই প্রেমঘটিত ছিলো। পারিপার্শ্বিক অবস্থায় প্রভাবিত স্কুল ছাত্রীর অভিভাবকের কারণেই ততোটা রূপ নিয়েছিল। পরবর্তীতে আইন-আদালতে তা প্রমাণিত হওয়ায় সেই স্কুলছাত্রী কথিত অপহরণকারীকে নিয়েই সংসার করছে। এখন সে ২ সন্তানের জননী। অথচ সেই ঘটনায় গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন একতরফা ও আবেগী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও তার ভেতরের খবর তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়নি। সমাজে একই ধরণের ঘটনা যেমন এখনও ঘটছে, ঠিক তেমনই একই ধাচের খবর বা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়ে আসছে। সঙ্গত কারণে দুঃখজনক হলেও আমাদের অনেক গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধই থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে মানবিক বিপর্যয়ের একটি অপ্রকাশিত ঘটনা প্রকাশ করলে দু’টি ঘটনার পাশাপাশি অবস্থানে বোঝা যাবে বাস্তব অর্থে কোনটায় মানবিক বিপর্যয় কিংবা হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বা দহন কতটুকু। ঘটনাটি প্রায় ৮৫ বছর বয়স্ক এক অশীতিপর বৃদ্ধ পিতার। মোঃ ময়দান আলী নামে ওই পিতা জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের অধিবাসী হলেও তার দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি ঘটে শেরপুরের শ্রীবরদী ও শেষটায় জেলা কারাগারে। গত ১৯ ফেব্রæয়ারি শ্রীবরদীর মামদামারী এলাকা থেকে সেই বৃদ্ধকে অসংলগ্ন ঘুরাফেরা অবস্থায় এলাকাবাসীর সন্দেহের মুখে আটক করে স্থানীয় থানা পুলিশ। আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কেবল নিজের নামটা ছাড়া ঠিকানাদি বলতে না পারায় পিতাসহ ঠিকানা অজ্ঞাতনামা উল্লেখে তাকে আদালতে সোপর্দ করে নিরাপদ হেফাজতে রাখার আবেদন করা হলে সেদিনই আদালত তাকে জেলা কারাগারের নিরাপদ হেফাজতে পাঠায়। তবে আদালত দ্রæত অনুসন্ধান সাপেক্ষে ঠিকানা সংগ্রহপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলেও নির্দেশ দেয়। কিন্তু তার প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় এবং স্বজনরা নিতে না আসায় সেই থেকে তিনি কারাগারেই পার করছিলেন বন্দি জীবন। ওই অবস্থায় গত ১০ এপ্রিল জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে ইউনিটের উপ-পরিচালক হায়দার আলীর সাথে কারাগারে আটক ২ ভারতীয় নাগরিককে কাপড়-চোপড়সহ কিছু সামগ্রী দিতে গেলে নবাগত জেলার তরিকুল ইসলাম বিষয়টির অবতারণা করে আমার সহযোগিতা কামনা করেন। ওইসময় তিনি আরও জানান, আইনগত সহায়তার জন্য বিষয়টি জেলা লিগ্যাল এইড দপ্তরেও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু কিছু জটিলতাসহ সেই অফিস এখন বন্ধ থাকায় ওই অসুস্থ বৃদ্ধকে নিয়ে কারাগারে রাতদিন বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। তার কথা শুনে আমি বিষয়টি নিয়ে খবর করতে তথ্য-উপাত্তসহ তার সহযোগিতা চাই। কিন্তু খবর না করে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তির সহযোগিতার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। অতঃপর তিনি কিছু তথ্য-উপাত্ত, সংগৃহীত ঠিকানা (সাং-টাকিমারী, থানা ও জেলা-শেরপুর) ও ওই বৃদ্ধের বাড়ির একটি মোবাইল নাম্বার দেন,- যে মোবাইলে ফোন দেওয়ার পর কারাগারের লোক জানার পর আর কথা না বলে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। পরদিনই দফায় দফায় ওই মোবাইল নম্বরে ফোন দিয়ে কথা বলতে আমিও ব্যর্থ হয়ে জেলারের দেওয়া ঠিকানায় আব্দুল আজিজ নামে আমার এক পরিচিত ব্যক্তিকে কাজে লাগাই। তার পরদিন খবর পাই যে, সদর উপজেলার টাকিমারী গ্রামে ওই নামে কোন লোক নেই। তবে পার্শ্ববর্তী জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় টাকিমারী নামে আরও একটি গ্রাম রয়েছে। এরপর ফের চেষ্টা করি ওই মোবাইলে। এবার সৌভাগ্যক্রমে পেয়ে যাই এক মহিলাকে। পরিচয়ে জানা যায়, তিনি ওই বৃদ্ধের পুত্রবধূ ও দ্বিতীয় পুত্র ফারুকের স্ত্রী। তার সাথে কৌশলে আলাপচারিতায় তথ্য মেলে, ওই বৃদ্ধের কোন মেয়ে সন্তান নেই। ৩ ছেলে মধ্যে প্রথম শফিকুল ও তৃতীয় শাহীন। ছয়তন নেছা নামে বৃদ্ধের বৃদ্ধা স্ত্রীও রয়েছেন ঘরে। সংসারের অবস্থা খুব একটা ভালো না হলেও নেহায়েত খারাপ নয়। তবে বাবা একটু মানসিক ভারসাম্যহীন ও ভবঘুরে। ইতোপূর্বে আরও কয়েকদফা তিনি নিখোঁজ হয়েছিলেন। খুজে নিয়ে আসার পরও বারবার বাড়ি ত্যাগ করেন বলে সন্তানরা তাকে আর খুঁজতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। ততক্ষণে নরম সুরে বুজিয়ে তার স্বামী বা সন্তানরা এগিয়ে এলে বিনামূল্যে আইনগত সহযোগিতা দিয়ে তাকে মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে জানালেও তিনি বলেন, ‘তারা আর যাবে না, আন্নেরা তারে পাডাই দেন। বাড়িত আইলে হয়ত হেরা খেদাইব না।’ এরপর আবার বোঝানোর চেষ্টা করতেই মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো গৃহকর্তা বা তার স্বামী এসে গিয়ে জেলখানার লোক মনে করেই ঝামেলা এড়াতে তা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু তারপরও হাল না ছেড়ে দেওয়ানগঞ্জ থানার মাধ্যমে স্থানীয় চিকাজানী ইউপি চেয়ারম্যান মমতাজ উদ্দিনের স্মরণাপন্ন হলে তিনি জানান, ওই গ্রামটি মূলতঃ টাকিমারী নয়, পাশের চুনিয়াপাড়া গ্রাম- যা দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার ২ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত। আর ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হচ্ছেন সোলায়মান কবির। কিন্তু তার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করে বন্ধ থাকায় ব্যর্থ হই। পরে ইউপি চেয়ারম্যান মমতাজ উদ্দিন নিজেই ওই পরিবারের সাথে যোগাযোগের দায়িত্ব নেন এবং বুঝিয়ে তাদের প্রতিনিধি পাঠাতেও আশ্বস্ত করেন। ততক্ষণে আমার খেয়ালে আসে দেওয়ানগঞ্জে শিপন নামে আমার এক নিকটতম আত্মীয় রয়েছেন, তিনি পারিবারিক ও রাজনৈতিক কারণে এলাকাতেও খুবই পরিচিত মুখ। সাথে সাথে তার সহযোগিতা চাইলে তিনি শেরপুরে অবস্থান করলেও অকপটে সহযোগিতা দিতে স্থানীয় কাউন্সিলরকে তিনিও মোবাইলে না পেয়ে জুয়েল নামে পাশের ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকে দায়িত্ব দেন। ইত্যকার চেষ্টার পাশাপাশি আমি কোর্ট পুলিশের মাধ্যমে বিষয়টি করোনা পরিস্থিতিজনিত ছুটিকালীন বিশেষ দায়িত্বে থাকা বিজ্ঞ বিচারককে (সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ হুমায়ুন কবির) জ্ঞাত করাই। সেইসুত্রে তার সাথে কথা বলেন জেলারও। অবশেষে তিনি (বিজ্ঞ বিচারক) ঠিকানাসমেত থানা পুলিশের প্রতিবেদন কিংবা জেল সুপারের মাধ্যমে আবেদনের পরামর্শ দিলে সে মোতাবেক ১৪ এপ্রিল জেলার দ্রæত আবেদন পাঠানোর ব্যবস্থা করলে সেদিনই বৃদ্ধের ‘রিলিজ অর্ডার’ পৌঁছায় কারাগারে। অতঃপর সময়স্বল্পতায় সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় পরদিন সকালে তার মুক্তি মেলে এবং দায়িত্বশীল জেলার তার মানবিকতার শেষ সাক্ষর রাখতে কারাগারের গাড়িযোগে দু’জন কারারক্ষীকে দায়িত্ব দিয়ে তাকে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দেন। এই হলো মানবিক বিপর্যয়ের অপ্রকাশিত ঘটনাটি,- যে অনাকাঙ্খিত ঘটনায় দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সচেতন নাগরিকসহ সাংবাদিকতা বা আইনপেশার উর্ধ্বে থেকে মানবিকতার তাগিদে বার বার চেষ্টা করেও তার সন্তানদের ফেরানো যায়নি। তাদের এগিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি কারাগারে আটক থাকা অসুস্থ বৃদ্ধ অসহায় পিতাকে নিয়ে যেতে।
সুতরাং বর্ণিত অবস্থায় এখনও কি এমন প্রশ্নের উদ্রেক ঘটানোর প্রয়োজন আছে যে, একটি প্রকাশিত ঘটনা বা খবর এবং অপর একটি অপ্রকাশিত ঘটনার তুলনামূলক চিত্রে আমাদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ বা দহন কোনটায় সমধিক? যে মানসিক ভারসাম্যহীন মাকে নিখোঁজের পর হন্যে হয়ে খুঁজে না পাওয়ায় ২৪ দিন পর এক জঙ্গল থেকে উদ্ধারের পর সন্তানদের ফেলে যাওয়ার অনুমাননির্ভর খবর ? না বসতবাড়ি আর সন্তান-সন্ততি থাকার পরও অশীতিপর বৃদ্ধ পিতা কারাগারের প্রকোষ্ঠে আটকের খবর পাবার পরও যে সন্তানরা তাকে নিতে এগিয়ে যায়নি, মুক্তি মিলেছে এক মানবিক জেলারের চেষ্টা ও বদান্যতায়,- সেই অপ্রকাশিত ঘটনা ? মানবিক বিপর্যয়ের জ্বলন্ত বা প্রকৃষ্ট উদাহরণই বা কোনটি ? ধিক! সন্তান!, ধিক! মানবিক হও, মানুষ হও- পিতা-মাতার প্রতি অমানবিক আচরণে অভ্যস্থ, নির্দয় ও বে-খেয়ালী সন্তানদের প্রতি করোনায় বিপর্যস্ত জাতির কঠিন সময়ে এই প্রত্যাশা আমাদের।
তারিখ : ১৭/০৪/২০২০ ইং।

লেখক : সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিক, শেরপুর, ই-মেইল- press.adhar@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email
এ সংক্রান্ত আরও খবর

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

error: Content is protected !!