প্রকাশকাল: 19 সেপ্টেম্বর, 2018

পবিত্র আশুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য ॥ ড. আবদুল আলীম তালুকদার

চান্দ্রবর্ষের চার সম্মানিত মাস তথা র্আবাআতুন্ হুরুম্ (মুর্হারম, রজব, যিলক্বদ ও যিলহজ্ব) এর মধ্যে প্রথম মাস মুর্হারম; যাকে আরবের অন্ধকার যুগেও বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার চোখে দেখা হতো। আবার হিজরী সনের প্রথম মাসও মুর্হারম। শরীয়তের দৃষ্টিতে যেমন এ মাসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনি এই মাসে সংঘটিত ঐতিহাসিক ঘটনার বিবরণও অনেক সুদূর প্রসারী। আমাদের কাছে সুস্পষ্ট যে, ইতিহাসের এক জ্বলন্ত সাক্ষী এই মুর্হারম মাস। ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার সূত্রপাত হয় এই মাসে। শুধু উম্মতে মুহাম্মদীই নয় বরং পূর্ববর্তী প্রায় সকল উম্মত ও নবী-রাসূলদের অবিস্মরণীয় ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল এই মাসে।
ইসলামের ইতিহাসে বিষাদময় কারবালাসহ নানা ঘটনার স্মরণে আরবি সনের হিজরী বছরের প্রথম মাস মুর্হারমের ১০ তারিখ পবিত্র আশুরা পালিত হয়। তাই ইসলাম ধর্মের সুন্নিদের কাছে এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, তবে শিয়া মতাবলম্বীদের কাছে এটি বিষাদের দিন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) এই দিনে ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে নির্মমভাবে শাহাদত বরণ করেন। শোকের প্রতীক হিসেবে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে মুসলমান সম্প্রদায় বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে থাকেন।
‘মুর্হারম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ- মর্যাদাপূর্ণ, তাৎপর্যপূর্ণ। যেহেতু অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য ও রহস্যময় তাৎপর্য নিহিত রয়েছে এ মাসকে ঘিরে; তৎসঙ্গে এ মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ছিল, এসব কারণেই এ মাসটি মর্যাদাপূর্ণ। তাই এ মাসের নামকরণ করা হয়েছে মুর্হারম বা মর্যাদাপূর্ণ মাস। পবিত্র মুর্হারম মাস সম্পর্কে পাক কুরআনের সূরা তওবার ৩৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাসের সংখ্যা ১২। যেদিন থেকে তিনি সব আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। তন্মধ্যে ৪টি হলো সম্মানিত মাস; এটিই হলো সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং তোমরা এ মাস গুলোর সম্মান বিনষ্ট করে নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।’
মুহাররম মাস সম্মানিত হওয়ার মধ্যে বিশেষ একটি কারণ হচ্ছে আশুরা( মুর্হারম মাসের ১০ তারিখ)। এই পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকে আশুরার দিনে সংঘটিত হয়েছে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ও হৃদয়বিদারক কাহিনী। আশুরার ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ঘটনা হচ্ছে- এই দিনটি একটি পবিত্র দিন কেননা ১০ মুর্হারম তারিখে আসমান ও যমিন সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে আল্লাহ্ পাক নবীদেরকে স্ব স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন। নূহ্ (আ.) এর কিস্তি ঝড়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছিলো এবং তিনি জুডি পর্বত শৃঙ্গে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। এই দিনে দাউদ (আ.) এর তাওবা কবুল হয়েছিল, নমরুদের অগ্নিকু- থেকে ইব্রাহিম (আ.) উদ্ধার পেয়েছিলেন, হযরত আইয়ুব (আ.) দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন, এই দিনে আল্লাহ্ তায়ালা হযরত ঈসা (আ.)-কে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন, ফিরআউনের অত্যাচার থেকে হজরত মুসা (আ.) নিষ্কৃতি লাভ করেছিলেন এই দিনেই। এই ১০ মুর্হারম তারিখে মহান আল্লাহ্ তায়ালা চিরকালের জন্য লোহিত সাগরে ডুবিয়ে শিক্ষা দিয়েছিলেন নিজেকে সৃষ্টিকর্তা দাবীদার ফিরআউন ও তার বিশাল বাহিনীকে।
আমরা বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ পাঠে জানতে পারি যে, ফারাও শাসক ফিরআউন নীল নদে ডুবে মারা গিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী এই ধারণা ভুল; বরং তাকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরে বিশ্ববাসীকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। হাদীসে বর্ণিত আছে যে এই তারিখেই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
পবিত্র আশুরা সম্পর্কে ইমাম বুখারী (র.) এর এই হাদীসটি প্রণিধানযোগ্য- ‘হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (স.) যখন হিজরত করে মদীনায় পৌঁছেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন যে মদীনার ইহুদি সম্প্রদায় আশুরার দিনে সাওম তথা রোযা পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আশুরার দিনে তোমরা রোযা পালন করছো কেন ? তারা উত্তর দিলো, এই দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ্ তায়ালা মুসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে ফিরআউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন আর ফিরআউন ও তার বাহিনী কিব্তী সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে হত্যা করেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হজরত মুসা (আ.) রোযা পালন করতেন, তাই আমরাও রোযা পালন করে থাকি। তাদের উত্তর শুনে নবী করীম (স.) ইরশাদ করেন, হজরত মুসা (আ.) এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে অধিক হকদার। অত:পর তিনি নিজে আশুরার রোযা পালন করেন এবং তার উম্মতকে তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।’
পবিত্র আশুরার ঐতিহ্য আবহমানকাল থেকে চলে আসছে একথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। অনেকেই না বুঝে অথবা ভ্রান্ত প্ররোচনায় পড়ে আশুরার ঐতিহ্য বলতে রাসূল (স.) এর প্রিয়তম দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর শাহাদাতবরণ এবং নবী পরিবারের বেশ কয়েকজন সম্মানিত সদস্যের রক্তে রঞ্জিত কারবালার ইতিহাসকেই বুঝে থাকে। তাদের অবস্থা ও কার্যাদি অবলোকন করে মনে হয়, কারবালার ইতিহাসকে ঘিরেই আশুরার সব ঐতিহ্য, এতেই রয়েছে আশুরার সব রহস্য। উপরিউক্ত হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হয়, আসলে বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং আশুরার ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে প্রাচীনকাল থেকেই। হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) এর মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনার অনেক আগে থেকেই আশুরা অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ও রহস্যঘেরা দিন। কারণ কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয় ৬১ হিজরীর ১০ মুর্হারম তারিখে। আর আশুরার রোযার প্রচলন চলে আসছে ইসলাম আর্বিভাবেরও বহুকাল আগে থেকে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে আবহমানকাল থেকে আশুরার দিনে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা যেমন অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি হিজরী ৬১ সনে আশুরার দিন কারবালার ময়দানের হৃদয়বিদারক ঘটনাও মুসলিম জাতির জন্য অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনাদায়ক। প্রতিবছর আশুরা আমাদের এই দুঃখজনক ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এও বাস্তব যে এ ঘটনাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে না পেরে আজ অনেকেই ভ্রষ্টতা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে নিমজ্জিত। যারা কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে ব্যথাভরা অন্তরে স্মরণ করে থাকেন, তারা কোনো দিনও চিন্তা করেছেন কী কারণে হযরত হুসাইন (রা.) কারবালার প্রান্তরে অকাতরে নিজের মূল্যবান জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন? তাই তো অনেকেই মনে করেন যে কারবালার ঘটনা নিয়ে রচিত জারি গান, মর্সিয়া, তাজিয়া মিছিল, রাস্তায় উল্লাস করে ধারালো চাবুক দিয়ে দেহ রক্তাক্তকরণ, আহাজারী করার মধ্যেই কারবালার তাৎপর্য নিহীত রয়েছে। আসলে হজরত হুসাইন (রা.) এর উদ্দেশ্য ও আদর্শ বাস্তব জীবনে অনুসরণ করাই হবে এ ঘটনার সঠিক মর্ম অনুধাবনের বহি:প্রকাশ।
আশুরা যেহেতু একটি পবিত্রতম দিন তাই এ দিনে কিছু নেক আমল করা মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য। মুর্হারম মাসে রোযা রাখা সম্পর্কে অনেক বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হযরত যাবের (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ্ (স.) আমাদের আশুরার রোযা রাখার নির্দেশ দিতেন এবং এর প্রতি উৎসাহিত করতেন। (মুসলিম শরীফ-১১২৮)
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন,- রাসূল (স.) আশুরা ও রমজানের রোযা সম্পর্কে যেরূপ গুরুত্ব প্রদান করতেন, অন্য কোনো রোযা সম্পর্কে সেরূপ গুরুত্বারোপ করতেন না। (বুখারী ও মুসলিম)
হযরত হাফসা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (স.) ৪টি কাজ কখনো ছেড়ে দিতেন না। তার মধ্যে একটি আশুরার রোযা। (নাসায়ী শরীফ)
হযরত আলী (রা.)কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ্ (স.) এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (স.) বললেন, রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুর্হারম মাসে রাখো। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ্ তায়ালা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন। (জামে তিরমিযী-১/১৫৭)
হজরত আবু কাতাদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসূল (স.)-কে আশুরার রোযার ফযিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,- এই রোযা বিগত বছরের গুণাহ্ সমূহ মুছে দেয়। (মুসলিম-১১৬২)। রাসূল (স.) বলেন, রমযান মাসের রোযার পর সর্বোত্তম রোযা আল্লাহর মাস মুর্হারমের আশুরার রোযা। (সুনানে কুবরা-৪২১০)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী করীম (স.) ইরশাদ করেছেন,- যে ব্যক্তি আশুরার দিনে আপন পরিবার পরিজনের মধ্যে পর্যাপ্ত ও ভালো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করবে, আল্লাহ্ পাক পুরো বছরে তার রিযিকে বরকত দান করবেন।(তাবরানি-৯৩০৩)
রাসূলুল্লাহ্ (স.) আশুরার রোযা নিজে পালন করেছেন এবং উম্মতকে পালন করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তাই এসব নেক আমলের পূর্ণ অনুসরণ ও আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে উম্মতের কল্যাণ।
মোদ্দাকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলো হলো- বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল করা। সব ধরণের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন-সুন্নাহ্ মুতাবেক জীবন পরিচালিত করাই প্রতিটি মুসলমানের একান্ত কর্তব্য।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ ও পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো, ঢা.বি। ই-মেইল : dr.alim1978@gmail.com  

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

অবাধে মাছ নিধন অমানবিক নির্যাতনে শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা আহত ইয়াবা উদ্ধার উড়াল সড়ক খুন গাছের চারা বিতরণ ঘূর্ণিঝড় 'কোমেন' চাঁদা না পেয়ে স্কুলে হামলা ছিটমহল জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় শোক দিবস জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ ঝিনাইগাতী টেস্ট ড্র ড. গোলাম রহমান রতন পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত প্রত্যেক বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বন্যহাতির তান্ডব বন্যহাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত বাল্যবিয়ের হার ভেঙে গেছে ব্রিজ মতিয়া চৌধুরী মাদারীপুর মির্জা ফখরুলের মেডিকেল রিপোর্ট রিমান্ডে লাশ উদ্ধার শাবলের আঘাতে শিশু খুন শাহ আলম বাবুল শিশু রাহাত হত্যা শেরপুর শেরপুরে অপহরণ শেরপুরে বন্যা শেরপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শ্রীবরদী সংঘর্ষে নিহত ৫ স্কুলছাত্র রাহাত হত্যা স্কুলছাত্রী অপহরণ হাতি বন্ধু কর্মশালা হুইপ আতিক হুমকি ২ স্কুলছাত্রী হত্যা
error: Content is protected !!