প্রকাশকাল: 28 মার্চ, 2019

নালিতাবাড়ীতে রাজনীতির অগ্নিগর্ভ থেকে উঠে এলেন লেবু

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ঘটনা পরস্পরায় ‘রাজনীতির অগ্নিগর্ভ’ হিসেবে খ্যাত শেরপুরের নালিতাবাড়ী থেকে অবশেষে সংশপ্তকের মতোই বীরদর্পে উঠে এসেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোকছেদুর রহমান লেবু। ২৪ মার্চ তৃতীয় দফায় অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়েও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটাধিক্যে নির্বাচিত হয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। আর এর মধ্য দিয়ে তিনি জানান দিলেন নিজের অস্তিত্ব ও অবস্থান সম্পর্কে। যে কারণে নালিতাবাড়ীতে তিক্ত, ঝড়-ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে লড়াই করে টিকে থাকা ও বিজয়ের নায়ক হিসেবে মোকছেদুর রহমান লেবুর নাম এখন স্থানীয় জনতার মুখে মুখে।
২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র অনুসন্ধানে উঠে আসে নালিতাবাড়ী উপজেলার ছালুয়াতলা গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা পিতা শাহাব উদ্দিনের ঘরে জন্ম নেওয়া ও স্থানীয় গড়কান্দা কাচারীপাড়া মহল্লায় বসবাসকারী আওয়ামী লীগ নেতা মোকছেদুর রহমান লেবুর রাজনৈতিক উত্থান-পতনসহ নানা কথোকতা। পৈত্রিক সূত্রেই লেবু ব্যবসায়ী ও সহায়-সম্পত্তির দিক দিয়েও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। তার স্ত্রী শামীমা সুলতানা শিমু শিক্ষিতা হয়েও গৃহিণী। আর ২ সন্তান মাহির ফয়সাল শিশির নবম শ্রেণিতে ও ফাহিম ফয়সাল শ্রাবণ তারাগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
মোকছেদুর রহমান লেবু স্কুল জীবন থেকেই সাহসী ও স্বাধীনচেতা। বয়সে দুরন্তপনাও ছিল প্রচুর। তাই বলে তাতে ছিল না কোন উচ্ছৃঙ্খলতা। তিনি ১৯৮৪ সালে উপজেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৯৯১ সনে শহীদ নাজমুল স্মৃতি কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ সমর্থিত প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত হন এবং পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে উপজেলা জাতীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দল ও কর্মীবান্ধব নেতা লেবু নিজেকে একজন পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছেন। যে কারণে আওয়ামী লীগের ১৯৯৬ ও ২০০৮ মেয়াদের সরকারের সময়কালে দলের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য, কৃষিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরীর খুব কাছের ও আস্থাভাজন থাকার পরও ক্ষমতার কোন প্রভাবজনিত বদনাম স্পর্শ করেনি তাকে। বরং ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হরতাল চলাকালে নালিতাবাড়ী শহরে তৎকালীন এক ছাত্রনেতার বাসার সামনে এক পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় তাকে প্রধান আসামী করে হত্যা মামলা এবং পরবর্তীতে তার বসতবাড়ি-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো নানা ঘটনায় উপুর্যপরি হয়রানী হতে হয়। অবশ্য লেবু ও আব্দুল হালিম উকিলসহ প্রায় অর্ধশতাধিক দলীয় নেতা-কর্মী ওই মামলা থেকে রক্ষা পেয়ে যান বেগম মতিয়া চৌধুরীর প্রচেষ্টায়।
এদিকে তিনি ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটে দলের মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী হন। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি, সাবেক মেয়র আব্দুল হালিম উকিল বিদ্রোহী প্রার্থী হলে ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যান অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রার্থী বিএনপির একেএম মোখলেসুর রহমান রিপন। তারপও যে স্বল্পতম ভোটের ব্যবধানে তাকে হারতে হয়েছে ক্ষমতার প্রভাবকে কাজে লাগালে সেই ব্যবধান কাটিয়ে উঠাটা মোটেই অসম্ভব ছিল না।
রাজনৈতিক সূত্রমতে, ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনকালীন সময়ে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর প্রধান প্রতিপক্ষ হওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় কৃষক লীগ নেতা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা ছিলেন ভিন্নতর ভূমিকায়। আর হেরে গিয়ে আব্দুল হালিম উকিল ও মোকছেদুর রহমান লেবুও বেগম মতিয়া চৌধুরীর কাছ থেকে নিজেদের অনেকটা গুটিয়ে রাখতে থাকেন। ওই অবস্থার কিছুদিন পরই ইকোপার্ক এলাকায় স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে মামলা ও তাকে গ্রেফতারের ঘটনায় লেবু আন্দোলনে নামলে সম্পর্কের অবনতি দীর্ঘস্থায়ী হয়। এক পর্যায়ে পরবর্তী সম্মেলনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসিন হন সাবেক ছাত্রনেতা ফজলুল হক। উপজেলা আওয়ামী লীগে নির্বাহী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হলেও জেলা আওয়ামী লীগে স্থান হয়নি তার।
সেই থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৃতীয় দফার সরকারের পুরো মেয়াদকালেই লেবু ছিলেন নিজের মতোই। তবে নিজেকে গুটিয়ে নয়, দেশরতœ ঐক্যপরিষদ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করিয়ে সেই সংগঠনের মাধ্যমে নিজের অনুসারী নেতা-কর্মী ও ভক্তদের আগলে রেখেছেন এবং বিপদে আপদে তাদের পাশে থেকেছেন। ফলে উপজেলা সদর থেকে তৃণমূল পর্যন্ত গড়ে উঠেছিল তার নিজস্ব সুসংহত অবস্থান। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীও হয়েছিলেন। মনোনয়ন না পেয়ে দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে না নামলেও ছিলেন না বিরোধিতায়।
এমনি অবস্থায় এবারের উপজেলা নির্বাচনে তৃণমূলে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। কিন্তু জনগণের ভালোবাসা আর বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের শিথিলতার কারণে হয়ে যান বিদ্রোহী প্রার্থী। দলের মনোনীত প্রার্থী তরুণ শিল্পপতি হাজী মোঃ মোশারফ হোসেনের পক্ষে কাজ করেন গত নির্বাচনে লেবুর প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল হালিম উকিলসহ দলের নেতা-কর্মীরা। তার বিপরীতে অপর বিদ্রোহী প্রার্থী, প্রয়াত সাবেক এমএনএ আব্দুল হাকিমের পুত্র সরকার গোলাম ফারুকের পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নামেন কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা। যে কারণে সবচেয়ে বেশি উত্তাপ তৈরি হয় এ উপজেলার নির্বাচনে। তারপরও একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লেবু আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও অপর বিদ্রোহী প্রার্থী সরকার গোলাম ফারুকের প্রাপ্ত ভোটের প্রায় সমপরিমাণ ভোটে নির্বাচিত হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। হিরোদের চতুর্মুখী দ্বন্দ্বে অগ্নিগর্ভ হওয়া ক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে এসেছেন। গড়ে তুলেছেন নিজের ভবিষ্যত রাজনীতির মজবুত ভিত্তি।
২৮ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বিজয়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান মোকছেদুর রহমান লেবু বলেন, নালিতাবাড়ী একদিকে আন্দোলন-সংগ্রামের সুতিকাগার। অন্যদিকে হিংসা-বিদ্বেষের রাজনীতিতেও অন্যতম। আর সেই হিংসা-বিদ্বেষ ও চড়াই-উৎড়াইয়ের রাজনীতির শিকার হলেও দলের ত্যাগী নেতা-কর্মী ও সাধারণ লোকজনকে ছেড়ে থাকতে পারিনি। এলাকা ও তাদেরকে নিয়েই ভেবেছি সবসময়। যে কারণে নানা প্রতিবন্ধকতার পরও তারা অনেক ত্যাগ স্বীকার করে আমার পাশে থেকেছেন বলেই নির্বাচনে আমার বিজয় অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এ অর্জনকে জনগণের অর্জন ও জনগণের ভবিষ্যত মজবুত ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের প্রতি আস্থাশীল এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ডিজিটাল বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ রূপায়নে অবিচল থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

Displaying 1 Comments
Have Your Say

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!