তথ্য অধিকার : সংস্কৃতি চর্চার নতুন মাত্রা ॥ অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান

মানব অস্তিত্ত্ব টিকে আছে যোগাযোগের মাধ্যমে। আর যোগাযোগের অন্যতম উপকরণ হচ্ছে তথ্য। তথ্যবিহীন সমাজ চিন্তা করা যায় না। মানুষ প্রতিনিয়ত অধিকতর যোগাযোগে ব্যস্ত। প্রতিদিন তথ্যের ব্যবহার বাড়ছে। তথ্যের যোগান দেওয়ার কাজও তাই বৃদ্ধি পাচ্ছে সংখ্যা ও গুণগত দিক দিয়ে।
বিশ্বের তথ্য প্রবাহর অসমতা ও ভারসাম্যহীনতা লক্ষ্য করা গেছে গত ৭০-এর দশক থেকে। তাই নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো ১৯ তম সাধারণ অধিবেশনে (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৭৬) সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, “….it was generally agreed that “ the highest priority should be given to measure aiming at reducing the communication gap existing between the developed and the developing countries and at achieving a freer and more balanced international flow of information” and that “a review should be undertaken of the totality of the problems of communication in moderm society” (Many Voices, One World (Report by the International Commission for the Study of Communication Problems), Unesco, New Delhi : Oxford & IBH Publishing Co., 1982, p. 295) অত:পর ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে (Sean MacBride Nobel Peace Prize awarded in 1974) এর নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের একটি কমিশন গঠিত হয়। কমিশনের রিপোর্টে বলা হয় যে, প্রযুক্তির উদ্ভাবনের কারণেই শুধু উন্নয়ন ঘটে না, বরং সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক সচেতনতা ও প্রয়োজনীতার কারণে তা ঘটে থাকে। সংখ্যালঘিষ্ঠ গোষ্ঠি, যারা যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে এবং জনগণ, যাদের উপর যোগাযোগের প্রভাব পড়ে- এই দুই ধরনের লোকের মধ্যে দূরত্ব বেড়েই চলছে। যে কারণে রাষ্ট্র এবং সমাজের মধ্যে সম্পর্কের গুরুত্ব এবং জনগণের ব্যক্তিজগতে, সরকারি সংস্থা ও গণমাধ্যমের হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এই প্রেক্ষাপটে শুধু আন্তর্জাতিক তথ্য প্রবাহই বিঘ্নিত হচ্ছে না বরং অঞ্চল থেকে অঞ্চলে, প্রতিষ্ঠান থেকে জনগণের তথ্য প্রবাহ এবং জনগণের মধ্যে তথ্য অভিগম্যতা অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আশির দশক থেকে নতুন বিশ্বে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা (New World Information and Commnicatio Order) নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারপর কেটেছে অনেকটা সময়।
বাংলাদেশসহ বেশিরভাগ উন্নয়নশীল দেশেই এই অবস্থা বিরাজমান ছিল। কোন কোন ক্ষেত্রে জনগণকে ক্ষমতায়িত করার কোন প্রচেষ্টাই প্রকৃত অর্থে নেওয়া হয়নি এবং রাষ্ট্রযন্ত্রও জনগণের পারস্পরিক অবস্থান দুই মেরুতে অবস্থান করেছে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের মহান ঐতিহ্যে লালিত একটি ক্রমউন্নয়নশীল দেশ। দেশের জনগণ প্রকৃতঅর্থে প্রগতিশীল, সমাজ সচেতন ও শান্তিপ্রিয়। ঐতিহ্যগতভাবে দেশে যে আইন কানুন প্রচলিত আছে প্রগতির ধারায় তার অনেক সংস্কার হচ্ছে, চালু হচ্ছে নতুন আইন। দেশে জবাবদিহি ও সুশাসনের লক্ষ্যে এবং জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ চালু হয়েছে। দেশে প্রায় ১১০০ আইন বলবৎ রয়েছে। বেশিরভাগ আইন চালু আছে জনগণের উপর প্রয়োগ করার জন্য আর তথ্য অধিকার আইন হলো এমন একটি আইন যা জনগণ কর্তৃপক্ষের ওপর প্রয়োগ করে থাকে।
আমরা জানি, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য শুধু অবকাঠামোগত কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই শেষ কথা নয়। সেই দেশের উন্নয়নের জন্য আয়ুষ্কাল, শিক্ষা এবং মাথাপিছু আয় অন্যতম সূচক। এগুলো অর্জন করতে গেলে লক্ষ্য করা হয় দীর্ঘতর আয়ুষ্কাল, শিক্ষার উচ্চতর স্তর, উচ্চতর আয়, শিশু জন্মহার হ্রাস এবং নি¤œতর মুদ্রাস্ফীতি। এই সূচকগুলোর মানের উপর একট দেশের মানব উন্নয়ন সূচক নির্ধারিত হয়। এখন দেখা যাক জীবনমানের উন্নয়নের বিষয়টি কিভাবে আমরা দেখবো। দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে এবং জনগণের ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি করতে হলে প্রশাসনের জবাবাদিহি বৃদ্ধি ও দুর্নীতি হ্রাস করার কথা ঘুরে ফিরে আসবে। তথ্য অধিকার আইন সমাজের জন্য, জনগণের জন্য এক ধরণের রক্ষাকবচ। যদি প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠান, কার্যালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, বিভাগ, কার্যালয় ও মন্ত্রণালয়-এর কর্মকান্ড, পরিকল্পনা, সেবা ইত্যাদি সম্পর্কে কোন নাগরিক কিছু জানতে চায় তাহলে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় সে সেই চাহিত তথ্য পেতে পারে। নিয়ম অনুযায়ী তথ্য প্রাপ্তির অধিকার ভোগ করার জন্য নামমাত্র মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে একজন নাগরিক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা পেয়ে থাকে। তাতে করে পুরো প্রশাসনযন্ত্র পুরো জবাবদিহির মধ্যে চলে আসছে। যেকোন সময় যেকোন নাগরিক যেকোন অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য চাইতে পারে এবং পেতে পারে। তাতে করে তথ্য লুকানোর সংস্কৃতি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারছি, তথ্যের অংশীদারিত্বে নতুন সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারছি। দীর্ঘকাল মনে করা হতো কোন অফিসের তথ্য হয়তো গোপনীয়, তথ্য যে নাগরিকদের জন্যই ব্যবহার করা হয়, তথ্য জেনে নাগরিকের জীবনমান যে পরিবর্তন করা সম্ভব এই সুযোগই ছিল না। তথ্য অধিকার আইন চালু হওয়ার পর জনগণের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, সংবিধানের ৭(১)-এ রয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ একটি মাইলফলক ঘটনা। তথ্য কব্্জা করে তা অপ্রকাশ্য রাখার যে অবস্থা ছিল তা থেকে মানবকল্যাণে তথ্যের ব্যবহার করার আইনি ব্যবস্থা দেশের মানুষকে একটি নতুন সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ করে দিয়েছে। সেই সাথে তথ্য যোগান দেওয়ার জন্য প্রায় ২৫ হাজার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন দেশের সরকারি ও বেসরকারি কার্যালয় ও সংস্থাগুলোতে।
স্বচ্ছ প্রশাসন ও স্বচ্ছ সমাজগড়ার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইনের ব্যবহার দেশের জনগণকে একটি নতুনতর অবস্থায় নিয়ে যেতে সাহায্য করছে। মানব উন্নয়নের অন্যান্য সূচকগুলো যথার্থভাবে কার্যকর করতে হলে এবং দেশের জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন করতে গেলে এই আইনের সর্ব্বোচ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করার এবং সেইসাথে দুর্নীতি হ্রাস করার জন্য অনেক বেশি মানুষকে তৎপর হতে হবে। সারাদেশের মানুষকে তথ্য চাহিদায় অংশ নিতে হবে। শুধু জনা কয়েকের প্রচেষ্টায় এই সুবিধা সর্বসাধারণের জন্য নিশ্চিত করা যাবে না। ঘরে ঘরে তথ্য প্রাপ্তির চাহিদা সৃষ্টি করতে হবে। তথ্য ব্যবহারের পর্যাপ্ততা সুশাসনের নিয়ন্তা হতে পারে। এতে করে তথ্যের আদান-প্রদান যেমন বৃদ্ধি পাবে সাথে সাথে সৃষ্টি হবে জনগণে পারস্পরিক আস্থার। এখানেই সমাজের এবং প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। সৃষ্টি হবে নতুন সাংস্কৃতিক বলয়ের। তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর ব্যবহার সাংস্কৃতিক জাগরণে সহায়ক এবং সহগ হিসেবে কাজ করছে।
মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হবে, সরকারি ও বেসরকারি সেবা কিংবা উপকরণ সম্পর্কে তথ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে, বৃদ্ধি পাবে সেবা এবং প্রাপ্তব্য উপকরণের ব্যবহারও। অতএব, তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সাংস্কৃতিক জাগরণের ইঈিত লক্ষ্য করা যায়। সমাজ সচেতনতায় জনগণের মধ্যে তথ্যের প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক কার্যক্রম এই সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডকে গতিশীল করবে। নানা পেশার মানুষের মধ্যে তথ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পেলে সমাজে ‘সমভার চাপ’ (Equilibrium of Pressure) তৈরি হবে। সমাজে এই একক সৃষ্ট চাপ এক ধরনের সাধারণিকরণ এজেন্ডার প্রভাব সৃষ্টি করবে যা সমাজ প্রবৃদ্ধিতে এবং মানবসূচক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।
যেহেতু মানব উন্নয়ন একটি গুণগত বিষয়। কোন দেশের জনগোষ্ঠির জীবনমানের উন্নয়নই এখানে প্রধান। তাই মানুষেরর সার্বিক উন্নয়ন বিবেচনায় রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার তথ্যে জনগণের অভিগম্যতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে হবে। সংস্কৃতিগত ভাবধারায় তথ্যে অভিগম্যতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা শুধু বোধগম্য করে তোলাই শেষ কথা নয়। বোধগম্যতার পাশাপাশি তথ্য প্রাপ্তির জন্য সক্রিয় ভূমিকা তৈরিতে সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। তথ্য প্রদানে নিয়োজিত জনশক্তিকে তথ্যে অংশীদারত্বের ভূমিকা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। এই পরিবর্তন সমাজের জন্য অন্যতম সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ তথ্য প্রদানের মনো-জাগতিক যে কর্মকান্ড তা আমাদের সকলের শিক্ষনীয়। শিক্ষা ও প্রয়োগ সমভিব্যবহার করতে পারলে সমাজ গ্রগতির ধারা তরান্বিত হবে।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রদান করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে প্রতিটি সংস্থার জন্য। এমন অনেক তথ্য রয়েছে যা প্রায় সব সময় অনেকের প্রয়োজন হয়। সেই সকল তথ্য বিশেষ করে ঐ সকল সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তাদের কার্যক্রম, সেবা ইত্যাদি সম্পর্কে জনগণকে জানানোর জন্য তৈরি করে রাখতে পারে। সংস্থা/প্রতিষ্ঠান তথ্য অবমুক্ত করার নীতিমালা অনুসরণ করে সেই সকল তথ্য ওয়েবসাইট, পুস্তিকা, ফোল্ডার, লিফলেট ইত্যাদি আকারে প্রকাশ করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের স্বউদ্যোগে প্রণীত তথ্য ব্যবহারের এই সকল কাজ সংস্কৃতিতে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করছে। এই নতুনত্ব ধারণ করার দায়িত্ব এই সমাজেরই। সরকারি/বেসরকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠান সমাজবিচ্ছিন্ন কোন দ্বীপ নয়। এই সকল সরকারি/বেসরকারি সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের কাজকর্ম ও তথ্যের ব্যবহার জনমুখি- জনগণই তার সর্বশেষ ব্যবহারকারী। জনগণকে আমরা সবাই উদ্বুদ্ধ করি- তথ্য গ্রহণ করি।

লেখক : সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার, তথ্য কমিশন, বাংলাদেশ।

Displaying 1 Comments
Have Your Say
  1. Mofazzol বলেছেন:

    খুবই প্রয়োজনীয়।অনেক তথ্যবহুল।।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!