প্রকাশকাল: 22 সেপ্টেম্বর, 2018

জাতীয় নির্বাচন ভাবনা ॥ বিএনপি কি কংগ্রেসের পথে হাঁটছে ?

-রফিকুল ইসলাম আধার

জাতীয় নির্বাচনের ডামাডোল শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতে। চলতি বছরের (২০১৮) ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ও আগামী বছরের (২০১৯) প্রথম দিকে ভারতে এবারের জাতীয় নির্বাচনের কথা ভাবা হচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দু’দেশের রাজনীতিতেই চলছে নানা সমীকরণ-সমীক্ষা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের সরিয়ে মসনদ করায়ত্ব করতে বিরোধীদের মাঝে যেমন কাজ করছে উদগ্র বাসনা, ঠিক তেমনি নিজেদের অবস্থান ভারী করতে শেষ মুহর্তেও চলছে জোট-মহাজোট গঠন ও তার পরিধি বাড়ানোর নানা তৎপরতা। কেবল তাই নয়, ক্ষমতার পালা বদলাতে বৃহত্তর ঐক্য গঠনের প্রশ্নে বৃহত্তম বিরোধী দলগুলোর মাঝে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারেও প্রস্তুতি চলছে উভয় রাষ্ট্রে।
এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, একটি দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় নির্বাচনই হচ্ছে নেতৃত্ব নির্ধারণের মূখ্য পন্থা। আর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ভোটাধিকার হচ্ছে নাগরিকদের প্রধান অধিকার। তাই কোন দেশের নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, ঠিক তেমনি ওই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলাও সেই রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ওই নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়েই এখন তুমুল বির্তক চলছে এবং তা সরকারবিরোধী প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত, দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশে টানা দু’বারের মতো শাসনভার পরিচালনা করছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। আর প্রধান বিরোধী দলে (সংসদের বাইরে) অবস্থান করছে সেনা ছাউনি থেকে আসা জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত জাতীয়দাবাদী দল (বিএনপি)। অন্যদিকে কেবল প্রতিবেশিসূলভই নয়, বরং অকৃত্রিম বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারত শাসন করছে মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। আর সে দেশের সংসদে প্রধান বিরোধী দলে অবস্থান করছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দল কংগ্রেস।
এ কথা এখন ঐতিহাসিক সত্য যে, স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বাধিক কালো অধ্যায় পচাত্তরের ১৫ আগস্টের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং ওই চক্রান্তের নেপথ্য নায়ক সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা আরোহন ঘটে। পরবর্তীতে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ নামক কালো আইনের মাধ্যমে স্ব-পরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করা হয়। কেবল তাই নয়, অপরাজনীতি-সংস্কৃতির চর্চায় বঙ্গবন্ধু হত্যার নায়কদের রাষ্ট্রের উচ্চ পদে বসানোসহ তাদের বিভিন্নভাবে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। আর বিচারের নামে প্রহসনে সেক্টর কমান্ডার যোদ্ধাহত কর্ণেল তাহেরসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে ঝুলানো হয় ফাঁসিতে। অন্যদিকে অপরাজনীতির কষাঘাতে ভেঙে দেয়া হয় আওয়ামী লীগের মেরুদ-। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির মহোৎসব। অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে থাকে দেশে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। জিয়া সরকারের ক্ষমতার একটি পর্যায়ে পেছন দরজা দিয়ে ক্ষমতায় বসেন আরেক সেনাশাসক হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। ইতোমধ্যে প্রবাসে থাকা বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ তনয়া শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং এক পর্যায়ে দলের সভাপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ফলে ভয়-সংকোচ কাটিয়ে জেগে উঠেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ৯০’র গণআন্দোলনে বিশাল ভূমিকা রাখে আওয়ামী লীগ। ‘স্বৈরাচার’ খ্যাতি পাওয়া এরশাদ শাহীর পতন ঘটে। ১৯৯১’র জাতীয় নির্বাচনে জিয়াপতœী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ক্ষমতায় বসলেও আওয়ামী লীগ সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের আসনে বসে। পরবর্তীতে ৯৬’র নির্বাচনে ক্ষমতা থেকে নির্বাসনে থাকার দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। এরশাদের জাতীয় পার্টি ওই সরকারকে সমর্থন করায় সরকার খ্যাতি পায় ঐক্যমতের সরকার হিসেবে। ওই সরকার মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে যাত্রা শুরু করে। শুরু হয় স্ব-পরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ ৪ জাতীয় নেতা হত্যার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া। সেইসাথে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াসসহ দেশের অগ্রগতির যাত্রা। কিন্তু ২০০১ এ ‘শালসা’ মার্কা জাতীয় নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আবারও ক্ষমতায় ফেরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। আর এ সরকারে যুক্ত হয় স্বাধীনতা বিরোধী চক্র জামায়াত। ফলে সরকার খ্যাতি পায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার হিসেবে। আর এ জোট সরকারের মেয়াদে শরিক জামায়াতের শীর্ষ দু’ নেতার গাড়িতে উঠে স্বাধীন বাংলার পতাকা। ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ হতে থাকে তারেক জিয়ার নেতৃত্বে ‘হাওয়া ভবন’ থেকে। দুর্নীতিতে গলধঃকরণ হয়ে পড়ে দেশ। বেড়ে যায় সংখ্যালঘু নির্যাতনসহ শায়ক আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাইদের জঙ্গি তৎপরতা। অপারেশন ক্লিন হার্টের নামে চলে বিরোধী নিধন ও নির্বিচারে হত্যা। এক্ষেত্রেও বিচারের পথ বন্ধে জারি করা হয় কালো আইন।
পরবর্তীতে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের নামে গভীর ষড়যন্ত্রে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করায় ২০০৬ এর নির্বাচন গড়ায় ২০০৮ এ। আর ওই সময়কালে ‘সাদাকে সাদা ও কালোকে কালো’ না বলে দুর্নীতির বরপুত্রের মা খালেদা জিয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনার নামেও মামলা দিয়ে নির্বাচনের অযোগ্য তথা ‘মাইনাস’ করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র ভেদ করে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এবার মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্যক্রম শুরু করে- দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কার্যক্রম শুরু করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় দফার সরকার। দেশ এগিয়ে যেতে থাকে সামনের দিকে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয় সংসদে এবং ২০১৪ সালে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু হলে যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াতের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়ে যায়। ওই অবস্থায় বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহালের দাবিতে আন্দোলনের নামে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপে গাড়ি পুড়িয়ে মানুষ হত্যাসহ জ্বালাও-পোড়াও, সন্ত্রাস কায়েম করে। আর সরকার সেই দাবি না মেনে নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে। ফলে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াই আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির পাশাপাশি ছোট কয়েকটি দলের অংশগ্রহণে ওই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৃতীয় দফায় সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। বিএনপি-জামায়াত সেই নির্বাচনকে ‘একদলীয়’ বলে অভিযোগ তুললেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় নির্বাচন ও সরকার। শেখ হাসিনার মেধা, সদিচ্ছা, সাহসিকতা ও উদারতায় দেশ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত অবস্থার দিকে অগ্রসর হয়। দেশীয় অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণসহ শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, শিল্প, বিদ্যুৎ ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতসহ সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে খ্যাতি পায়। পরিচিতি পায় উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবেও। আর সরকার পরিচালনায় দক্ষতার বদৌলতে শেখ হাসিনার ললাটে জুটে নানা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রবর্তনসহ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিতর্কের ধুম্রজাল তৈরি করেও যখন তীরে ভিড়তে পারছিল না বিএনপি, ঠিক তখন বিকল্পধারা প্রধান ডাঃ একিউএম বদরুদদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম প্রধান ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট ও ঐক্য প্রক্রিয়ার সাথে মিশে তীরে ভেড়ার চেষ্টা করছে হালে।
এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় সাজার বোঝা এবং একাধিক মামলায় ফেরারী হয়ে প্রবাসে থাকা পুত্র ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার চূড়ান্ত পর্যায়সহ নানা চাপে বিপর্যস্ত খালেদা জিয়ার দল টানা দু’দফায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের শেষ মেয়াদেও সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে মোটেই সফল হতে পারেনি। রাজনৈতিক অবস্থানসহ দেশের সর্বত্র দল ও দলের নেতা-কর্মীদের তৎপরতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ায় এবং আগামী নির্বাচনেও মা-ছেলে দু’জনই অযোগ্য ঘোষিত হতে পারেন, এমন আশঙ্কাও বিরাজ করছে পরিবর্তিত অবস্থায়। আর ওই অবস্থায় নির্বাচনে কতটা সুবিধা করতে পারবে বিএনপি- সেটাই যখন প্রশ্নবিদ্ধ, ঠিক তখন ঐক্য প্রক্রিয়া আর যুক্তফ্রন্টকে সায় দিচ্ছে দলটি।
এ কথা বলার অবকাশ নেই যে, ড. কামাল হোসেন দেশের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে যেমন অন্যতম প্রধান, ঠিক তেমনি একজন প্রখ্যাত আইনজীবী হিসেবে কেবল দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গণেও তার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। অথচ সেই তিনি যার হাতে গড়া সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়কাল থেকে শেখ হাসিনার দলীয় নেতৃত্বের সময়কালে বার বার স্বার্থবিরোধী ও বিতর্কিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এক পর্যায়ে নিজেই সরে গিয়ে গঠন করেছেন গণফোরাম। প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ২৭ বছর পরও যে দল থেকে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার মতন একজন নেতাও এমপি নির্বাচিত হতে পারেননি। আর প্রখ্যাত চিকিৎসক ও পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ডাঃ বি চৌধুরী বিএনপি সরকারের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দলের আজ্ঞাবহ হয়ে চলতে পারেননি বলে তিনিও ছিটকে পড়েন দল থেকে। পরে গঠন করেন বিকল্পধারা। আঞ্চলিকতার প্রশ্নে বিকল্পধারার কিছুটা অবস্থান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে কর্ণেল অলি আহমেদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) স্থানীয় অবস্থান। এদের সাথে প্রথম দিকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ যুক্ত হয়ে পরে আওয়ামী লীগের ডাকের অপেক্ষায় পিছু হটলেও রয়ে গেছেন এরশাদের সংসদে ‘গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা’ হিসেবে পরিচিত আ.স.ম আব্দুর রব, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্যের ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ কয়েকটি সংগঠন। বলা বাহুল্য, ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন গড়ে পাকিস্তানে যেমন দল গঠনের ২৫ বছরের মাথায় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছা সম্ভব হয়েছে সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের, কিংবা দলগঠনের খুবই অল্প সময়ে দুর্নীতি রোধ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকারে দিল্লীর মূখ্যমন্ত্রীর আসনে বসা যেমন সম্ভব হয়েছে তৃণমূল থেকে উঠে যাওয়া কেজরিওয়ালের, এমনকি পেশাগত চিকিৎসক থেকে মাত্র ২০১৩ সালে ভুটানের রাজনীতিতে প্রবেশ করে ২০১৮ সালে ডিএনটি নামে রাজনৈতিক দলের প্রধান মনোনীত হয়েই মাত্র কদিন আগে নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে ডাঃ লুটে শেরিং এর ক্ষেত্রে, ঠিক তেমনটা অবস্থা বাংলাদেশে নেই বা গড়ে তোলাও সম্ভব হয়ে উঠেনি কোন ব্যক্তি বা দলের পক্ষে। ফলে বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতিতে ড. কামাল ও বি চৌধুরীদের সমষ্টিগত অবস্থান যা রয়েছে, তা জামায়াতের অবস্থানের তুলনায় অতি সামান্য। এক্ষেত্রে অবশ্য জামায়াতসহ সকলের সমষ্টিক অবস্থানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে সুশীল সমাজসহ সকল মহলে অন্তত আলোচনায় উঠে এসেছে বৃহত্তর জোট গঠন প্রশ্নে বিএনপির সাথে অন্যদের ঐক্য প্রক্রিয়ার বিষয়টি। ইতোমধ্যে সেই ঐক্য নিয়ে বিএনপির সাথে ৩ দফা শর্ত ও ৭ দফা চুক্তিসহ ভবিষ্যত সরকারের রূপরেখাও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। আর ড. কামাল জামায়াত ছাড়ার প্রশ্নে যতটা সরব, ঠিক ততটাই নীরব বিএনপি বা দলের মুখপাত্ররা। জামায়াত রেজিস্ট্রেশন না থাকায় দলগতভাবে নির্বাচন করতে না পারলে স্বতন্ত্র হয়ে লড়বে এবং সেক্ষেত্রে বিএনপি তাদের ছাড় দেবে- ঐক্য প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এমনটাই ভাবছেন। আর এটা হলে ড. কামাল হোসেন ‘মাছ না খেয়ে সেই মাছের ঝোল খাওয়া’র অবস্থায় পতিত হবেন। তবে বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে যখন ঐক্য প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যত সরকারের রূপরেখায় শোনা যায় যে, প্রথম ৩ বছর সরকার পরিচালিত হবে বি চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন। আর এর যৌক্তিক ইঙ্গিত পাওয়া যায় সম্প্রতি (গত ৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সহযোগী সংগঠনের এক সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে। ওই সভায় তিনি ‘ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বড় রাজনৈতিক ঐক্য গড়তে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিতে প্রস্তুত। বৃহত্তর ঐক্য গড়ার জন্য ত্যাগ স্বীকারের বিকল্প নেই। ছাড় দিয়েই আমাদেরকে একটা না একটা জায়গায় পৌঁছতে হবে। গোটা দেশ এটাই চায়। অন্যান্য যারা আছে তারাও বুঝেন, এটা ছাড়া কোন মুক্তি নেই।’ বিএনপি মহাসচিবের ওই বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে, ক্ষমতা বা মসনদ নয়, বিএনপিও দল এবং দলের দুই কর্ণধার দ-িত মা-ছেলেকে রক্ষায় বৃহত্তর জোট গঠনের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ বা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি পদের লোভ ছাড়তেও প্রস্তুত রয়েছেন। সেলুকাস! ক্ষমতার পালা বদলাতে আজব দেশে কি বিচিত্র ভাবনা, মিথ্যাচারের রাজনীতিতে অভ্যস্ত বিএনপির- যার বিশ্বাসযোগ্যতাই বা কতটুকু?
সমুদ্রে নোঙরবিহীন টালমাটাল জাহাজের মতো দৈন্যদশায় থাকা দল এবং দলের প্রধান দুই ব্যক্তিকে রক্ষায় বিএনপি নেতৃত্বের ওই ভূমিকা বা অবস্থান আমাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রতিবেশি ভারতের রাজনৈতিক অবস্থানের কথা। জামায়াতের মত মৌলবাদী দল হিসেবে খ্যাত নরেন্দ্র মোদীর বিজেপিকে ২০১৯ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ঠেকাতে স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠাতা সংগঠন কংগ্রেসের মত একটি অসাম্প্রদায়িক বৃহত্তম দলও হিমশিম খাচ্ছে। এ জন্য বাংলাদেশে চলমান অবস্থার পূর্ব থেকেই সে দেশটিতে চলছে জোট-মহাজোটের আদলে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার প্রাণান্ত চেষ্টা। আর ওই চেষ্টায় ইতোমধ্যে অগ্রণী ভূমিকা রাখায় দেশটিতে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীদের তালিকায় যখন উঠে আসছেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান ও পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বহুজন সমাজবাদী পার্টি (বিএসপি) প্রধান ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মূখ্যমন্ত্রী মায়াবতী ও ন্যাশনালিষ্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি) প্রধান শারদ পাওয়ারের মতো কয়েকজনের নাম, ঠিক তখন সম্প্রতি দলের ওয়ার্কিং কমিটির এক বৈঠকে কংগ্রেস প্রধান রাহুল গান্ধী এই বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, ‘দিল্লীর মসনদ থেকে নরেন্দ্র মোদীকে হঠানোই এখন মূখ্য উদ্দেশ্য। সে কারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিল্লীর কুর্সি ছাড়তেও রাজি তিনি। রাহুলের ভাষায়, নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি ও আরএসএসকে হারাতে যেকোন রকম স্বার্থ ত্যাগ করতে তিনি রাজী। এমনকি জোট যদি জেতে তাহলে নির্দ্বিধায় প্রধানমন্ত্রীর পদও তিনি মমতা বা মায়াবতীকে ছেড়ে দিতে তৈরি’।
ক্ষমতাসীনদের হঠাতে কংগ্রেস ও বিএনপির সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে সঙ্গত প্রশ্ন জাগে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভাবনায় বিএনপি কি কংগ্রেসের পথে হাঁটছে ? রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, বিশ্বের ঐতিহ্যগত দল কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও দলের প্রধান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর স্ত্রী হয়েও সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রীত্বের পদ ছেড়ে দলের মনমোহন সিংকে সেখানে অধিষ্ঠিত করেন। এছাড়া কংগ্রেসের অনেক নজিরই রয়েছে ত্যাগ স্বীকার প্রশ্নে। তাই কংগ্রেসের ত্যাগ স্বীকারের অঙ্গীকারের বিষয়ে কারও মনে সংশয়ও নেই। কিন্তু ক্ষমতার মথ-মত্ততায় বার বার দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করা বিএনপি ‘ক্রিমিনাল সংগঠন’ জামায়াতের সাথে অন্তর্মিল রেখে বি চৌধুরী ও ড. কামালদের নিয়ে কতটুকু পারবে দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলা দেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে টেক্কা দিতে ? সেই জোটে যদি যুক্ত থাকে ভোটের রাজনীতিতে তৃতীয় অবস্থানে থাকা এরশাদের জাতীয় পার্টি ও বাঘা বাঙালি খ্যাত কাদের সিদ্দিকীর কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগ, মেনন-ইনুর ওয়াকার্স পার্টি ও জাসদসহ ১৪ দল, বিএনপিকে ইস্তফা দেওয়া ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ইসলামী দলগুলো ? যদি থাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ও তথ্য-প্রযুক্তিতে অগ্রসরমান নতুন প্রজন্মের ৬০ ভাগ ভোটারসহ উন্নয়নে উপকারভোগী শান্তিপ্রিয় লোকজন ? আর দেশীয়-আন্তর্জাতিক চক্রান্তে বিএনপি যদি তা পেরেও উঠে, তবে পারবে কি কংগ্রেসের মত সেই সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে ? অত্যাসন্ন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানই নির্ধারণ করবে বিএনপির প্রকৃত চরিত্রের স্বরূপ এবং তখনই খুঁজে পাওয়া যাবে সেই প্রশ্নের উত্তর। সুতরাং অপেক্ষা…।
লেখক : সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিক, শেরপুর। ই-মেইল : press.adhar@gmail.com

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

অবাধে মাছ নিধন অমানবিক নির্যাতনে শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা আহত ইয়াবা উদ্ধার উড়াল সড়ক খুন গাছে বেঁধে নির্যাতন গাছের চারা বিতরণ ঘূর্ণিঝড় 'কোমেন' চাঁদা না পেয়ে স্কুলে হামলা ছিটমহল জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় শোক দিবস জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ ঝিনাইগাতী টেস্ট ড্র ড. গোলাম রহমান রতন পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত প্রত্যেক বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বন্যহাতির তান্ডব বন্যহাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত বাল্যবিয়ের হার ভেঙে গেছে ব্রিজ মতিয়া চৌধুরী মাদারীপুর মির্জা ফখরুলের মেডিকেল রিপোর্ট রিমান্ডে লাশ উদ্ধার শাবলের আঘাতে শিশু খুন শাহ আলম বাবুল শিশু রাহাত হত্যা শেরপুর শেরপুরে অপহরণ শেরপুরে বন্যা শেরপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংঘর্ষে নিহত ৫ স্কুলছাত্র রাহাত হত্যা স্কুলছাত্রী অপহরণ হাতি বন্ধু কর্মশালা হুইপ আতিক হুমকি ২ স্কুলছাত্রী হত্যা
error: Content is protected !!