ভোর ৫:২০ | বুধবার | ২৭শে মে, ২০২০ ইং | ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জাতীয় কবি নজরুল ॥ বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়কর সাহিত্য প্রতিভা কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবিদের মধ্যে অন্যতম; যিনি বাংলা সাহিত্যের প্রায় সবগুলো ধারাকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম সর্বমানবিক মানসের প্রয়াস, প্রয়োগ ও প্রকাশ ঘটিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে তথা তাঁর কবিতায়, গানে, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে ও অভিভাষণে তিনি সাধারণ মানুষের জয়গান গেয়েছেন; নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের সুখ-দু:খ, বেদনা-হাহাকারের করুণ চিত্র।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক ভাবধারা যেমন অতুলনীয়, তেমনি তাঁর বহুমুখী প্রতিভা যেকোনো সাহিত্যমোদী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত বিস্ময়াবিভুত করে প্রতি মুহূর্তে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন না করেও সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তাঁর লেখায় তিনি শব্দচয়ন এবং ছন্দের যে অপূর্ব গাঁথুনী ও আবহ সৃষ্টি করেছেন অতি উঁচু মাত্রার শিক্ষিত-জ্ঞানী ব্যক্তিরাও তা দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন। আশ্চার্যাম্বিত হয়ে পড়েন তার উচ্চমার্গীয় লেখনীর অপূর্ব প্রকাশভঙ্গি দেখে।
কবি নজরুল বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক বিরল সাহিত্য ব্যক্তিত্ব। মৌলিক কাব্য-প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন বলেই এখনও তিনি যুগ প্রবর্তক কবি হিসেবে স্বীকৃত। বিদ্রোহী কবি বলে সমধিক খ্যাত কবি নজরুলের মরমি কবিতা, অসংখ্য গজল, কাওয়ালী, ইসলামী সঙ্গীত, হাম্দ-না’ত আজও লক্ষ-কোটি পাঠক-শ্রোতাকে সমানভাবে আবেগাপ্লুত করে রাখে। তাঁর বিশাল সাহিত্য ভান্ডারের তুলনা আজো বিরল। এতোসব সাহিত্যযজ্ঞের ¯্রষ্টা হিসেবে তিনি জনারণ্যে খ্যাতি লাভ করেন চেতনা ও গণ-জাগরণের কবি হিসেবে।
কবি নজরুল যে কত বড় মাপের কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। তিনি মূলত একজন কবি হলেও সাহিত্যের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সমান সিদ্ধহস্ত ছিলেন । নজরুল শুধু শিল্পী-সুরকার, গীতিকার, কবি, উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশু-সাহিত্যিক, সম্পাদক ও আপোষহীন সৈনিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেকালের শক্তিশালী একজন বিপ্লবী কলমযোদ্ধা। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে আর্তপীড়িত মানুষের চাওয়া-পাওয়ার আকুতি। কবি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে অন্যায়, যুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। এ কারণেই বাংলা সাহিত্যে কবি নজরুল স্বপ্রতিভায় চির সমুজ্জ্বল। গল্প, উপন্যাস, ছোটগল্প, গান-গজল সব শাখাতেই বিচরণ ছিল প্রতিভাধর কবি কাজী নজরুল ইসলামের। মাত্র ২৩ বছরে তিনি কেবল গানই সৃষ্টি করেছেন ৪ হাজারের কাছাকাছি। এত গান পৃথিবীতে আর কোন কবি-গীতিকার লিখেছেন বলে জানা যায়না। গান ছাড়াও রয়েছে তার অজ¯্র ছড়া-কবিতা। লিখেছেন বেশকিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস। লেখালেখির পাশাপাশি সুর সৃষ্টি ও সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন তিনি। এমনকি চলচ্চিত্র পরিচালক, সূরকার, গায়ক ও অভিনেতা হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। নবযুগ, ধুমকেতু, লাঙল ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও তিনি সাহসিকতার সাথে পালন করেন।
মানব ও মানবিকতার স্বাধীনতা নজরুল চেতনার একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নজরুলকে বিদ্রোহী কবি বলে অনেকেই খাটো করে দেখেন। নজরুল কলম ধরেছিলেন, বিদ্রোহ করেছিলেন ইংরেজদের যুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে নজরুল হলেন মানুষের কবি, মানবতার কবি এবং প্রেমের কবি। নজরুলের সমগ্র অন্তলোক চেতনার জগতে কেবল মানুষের ব্যাপকতা। মানুষকে অনেক বড় করে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ হলো শ্রেষ্ঠ, আশ্রাফুল মাখ্লুকাত। ইসলামের সুমহান বাণীও তিনি স্মরণ করেছেন তার মানবপ্রেমে সিক্ত ‘মানুষ’ কবিতায়- ‘আজ ইসলামী ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান/ নাই বড়-ছোট সকল মানুষ এক সমান/ গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
কিন্তু এই মানুষের ভেতরে যদি মানবিকতা না থাকে, মানুষের ভেতরে যদি মানবতা না থাকে, তাহলে মানুষের মনুষ্যত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই তো মানবতার দাবি নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম দাঁড়িয়েছেন নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের পাশে। মানুষের দু:খে কবির কোমল হৃদয় হয়ে ওঠে ব্যথাতুর। নির্যাতিত মানুষের জন্য পলিমাটির মতো কবির নরম হৃদয় হয় ক্ষতবিক্ষত। উদার আকাশের মতো দুই নয়নে নামে বারিধারা। ‘কুলি মজুর’ কবিতায় কবি বলেন- ‘সেদিন দেখিনু রেলে/ কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিলো নীচে ফেলে।/ চোখ ফেটে এল জল/ এমনি করিয়া জগত জুড়িয়া কি মার খাবে দুর্বল?’
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় স্বাধীনতার যে চেতনা; তার একটা বিশেষ অংশজুড়ে আছে নারী স্বাধীনতা। বর্তমান সময়ে যারা নারী স্বাধীনতার কথা বলেন, তারা মূলত পুরুষবিদ্বেষী। নারীদের বিজ্ঞাপনের পণ্য বানিয়ে তারা সুবিধা লুটে নেন আর মুখে মুখে নারী মুক্তির কথা বলেন। পক্ষান্তরে, নজরুলের নারী স্বাধীনতার মূলমন্ত্রই হলো নারী পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা। নারী মুক্তির নামে পুরুষের বিরুদ্ধে তিনি খড়গ ধরেননি। বরং জাতি গঠনে নারী পুরুষের যে অবদান তা স্বীকার করেছেন অকপটে। তিনি ‘নারী’ কবিতায় উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর/ এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল ফলিয়াছে যত ফল/ নারী দিল তার রূপ রস মধূ গন্ধ সুনির্মল/ কোনকালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি/ প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ¥ী নারী।’
নজরুলের ইসলামি গানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য আমাদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে এবং ধর্মীয় ভাবাবেগে আপ্লুত করে। তার ইসলামি চৈতন্য আমাদের আলোড়িত করে। তিনি তাঁর বিশ্বাসকেই ম-িত করেছেন ইসলামি গানে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)’র জীবন ও কর্মের বাস্তব রূপ দেখা দিয়েছে তার কবিতায়- ‘কত যে রূপে তুমি এলে হযরত এই দুনিয়ায়/ তোমার ভেদ যে জানে আখেরী নবী কয় না তোমায়/ আদমের আগে ছিলে আরশ পাকে তার আগে খোদায়/ আদমের পেশানীতে দেখেছি তব জ্যোতি চমকায়।’
নজরুল যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেন তখন তাতে ধর্মহীনতা থাকে না বরং থাকে ধর্মচিন্তার প্রতিফলন। ¯্রষ্টা যেমন তাঁর আপন সৃষ্টিকে কোনভাবেই অবজ্ঞা করতে পারেন না, এক সৃষ্টি তেমনি অপর সৃষ্টিকে কখনো অবজ্ঞা করতে পারে না বরং পরস্পরের মধ্যে প্রগাঢ় প্রেমের বন্ধন রচনার মাধ্যমে সম্প্রীতি বজায় রাখবে- এটাই স্বাভাবিক। আর এতেই রয়েছে পারস্পরিক অধিকার ও অপরাপর ধর্মের প্রতি সম্মানসূচক মনোভাব। আর সামাজিক ঐক্যসচেতন নজরুল যখন ধর্মীয় বিবাদে লিপ্ত বাস্তবতা দেখেন তখন সেই বিশেষ প্রেক্ষিতের আঙ্গিকে বলে উঠেন,- ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কা-ারী! বল, ডুবিছে সন্তান মোর মার।’
ইসলামি ঐতিহ্য কাজী নজরুল ইসলামকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ইসলামের পুণর্জাগরণ বা মুসলিম ঐতিহ্য নজরুলের কবিতায় বিপুলভাবে সংবর্ধিত হয়েছিল। তিনি সূফিতত্ত্ব বা সূফিবাদ দ্বারাও প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। ইসলামকে নজরুল তার বিশ্বাসে ম-িত করে প্রকাশ করেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম যেমন শোষিত মানুষের কবি, বিদ্রোহের কবি, মানবিকতার কবি, তেমনি ইসলামি আ’কিদা-বিশ্বাস ও ইসলামি সাম্যবাদেরও কবি। ইসলামকে কবি মনে প্রাণে গ্রহণ করেছেন। ‘আবির্ভাব’ ও ‘তিরোভাব’ এই দু’টি কবিতার সমন্বয়ে তিনি রচনা করেন ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদোহম’ কবিতাটি। ইসলামি উদ্দীপনা সঞ্জীবিত রাখার ক্ষেত্রে নজরুল তার কবিতা ও অন্যান্য রচনার মাধ্যমে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছেন। ইসলামের অপরাজেয় নিশানকে নজরুল সবার ঊর্ধ্বে ঠাঁই দিয়েছেন।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় অমর বিশ্বাসী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ফলে ধর্মীয় অহিংসা ছিল নজরুল চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্মীয় সম্প্রীতি হলো একটি জাতি গঠনে এক বিরাট সহায়ক শক্তি। তাই তো ধর্মীয় সম্প্রীতির একজন অকাট্য সাক্ষী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ধর্মীয় সংখ্যালঘু বলে তাঁর কাছে কিছু ছিল না। তার কাছে সকলেই মানুষ এটিই বড় কথা। ধর্মীয় ছোট গোষ্ঠী হিসেবে সমাজে যারা নির্যাতিত তাদেরও তিনি টেনে নিয়েছেন তার আকাশের মতো উদার বুকে। তাইতো ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন- ‘আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মুহাম্মদ/ কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর বিশ্বের সম্পদ/ আমাদেরই এরা পিতা পিতামহ এই আমাদের মাঝে/ তাদেরই রক্ত কম বেশী করে প্রতি ধমনীতে বাজে।’ আবার তিনি ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় লিখেছেন- ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাঁধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান।’
নজরুল তার কবিতায় দেখিয়েছেন যে, ইসলামের যে ধর্মীয় অনুশাসন, সেই অনুশাসনই প্রকৃতপক্ষে মানুষের ধর্ম। নজরুলের কবিতায় যে আত্মোপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে, তাই হচ্ছে আধ্যাত্মবাদের মূল কথা; যা ইসলাম ধর্মের শান্তির উপলব্ধির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। আর তাই ইসলামের অনুশাসনকে তিনি তার যাপিত জীবনের আলো হিসেবে ভেবেছেন। আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার অঙ্গীকার ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বিশ্বাসে, কর্মে তাঁর জীবনে ইসলাম ছিল অবিকল্প। ‘খেয়াপাড়ের তরণী’ কবিতায় নজরুল তাই উচ্চারণ করেন- ‘কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা/দাড়ি মুখে সারি গান লা-শরীক আল্লাহ্।’ আবার ‘মহররম’ কবিতায় নজরুল উচ্চারণ করেন- ‘ফিরে এলো আজ সেই মর্হরম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’
স্বধর্ম ইসলামের প্রতি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের অগাধ বিশ্বাস। তিনি মনে করতেন ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম। আর ইসলামের মূল মন্ত্রণাদাতা দোজাহানের মহান মালিক আল্লাহ্ তায়ালাই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই তো তিনি লিখেছেন- ‘উহারা প্রচার করুক হিংসা-বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ/ আমরা বলিব সাম্য শান্তি, এক আল্লাহ্ জিন্দাবাদ/ উহারা চাহুক সঙ্কীর্ণতা, পায়রার খোপ ডোবার ক্লেদ/ আমরা চাহিব উদার আকাশ নিত্য আলোক প্রেম অভেদ।’
তার মতে, যিনি প্রকৃত মুসলিম তিনি আল্লাহর সৈনিক। তার কোনো মৃত্যুভয় নেই, সে কোনো দাসের জাতি নয়। মুসলিম হলো বীরের জাতি। তারা জীবন দিতে জানে, কিন্তু পরাধীনতা মানতে জানে না। অন্যায় অবিচার আর অনাচারের কাছে মাথা নত করতে জানে না।
মোটকথা, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম সত্যিই এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন এবং সংযোজন করেন অজানা এক সুর, নতুন এক গতি এবং অভূতপূর্ব এক শক্তি। একজন সার্থক ¯্রষ্টার মতোই তিনি বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করেন এক সর্বগ্রাসী আবেদন যা কালের সংকীর্ণতা জয় করে, ক্ষুদ্র গ-ি অতিক্রম করে জীবনকে এক নতুন আলোকে জ্যোতির্ময় করে তোলে। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ জাতির জন্য যেমন তিনি গেয়েছেন মুক্তির গান, হাজারো প্রতিবন্ধকতায় শৃঙ্খলিত জীবনের জন্যও তেমনি তিনি তুলেছেন নতুন নতুন সুরের ব্যঞ্জনা।
পরিশেষে, যদি নজরুলের জীবন ও সাহিত্য থেকে তার আদর্শের বিন্দুমাত্র আমাদের জীবনে গ্রহণ করতে পারি তাহলে আমাদের সমাজ অনেকখানি স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর অবশ্য অবশ্যই নজরুল-সাহিত্যকে বর্তমান প্রজন্ম ও আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা বাঙালি হিসেবে আমাদের উপর অপরিহার্য কর্তব্য; যা কোনোক্রমেই এড়িয়ে যাওয়ার ন্যূনতম সুযোগ নেই।

img-add

লেখক: কবি, গবেষক ও বিসিএস (সা. শি) ক্যাডার কর্মকর্তা। ই-মেইল : dr.alim1978@gmail.com

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» শেরপুরে প্রেমের অভিনয়ে মোবাইল ফোনে স্কুলছাত্রীকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ : ধর্ষকসহ গ্রেফতার ৩

» ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়ার স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের মৃত্যু

» এবার বিয়ে বিতর্কে নোবেল

» ভারত মহাসাগরের টেকটনিক প্লেট ভেঙে দু’টুকরা, ভয়াবহ ভূমিকম্পের আশঙ্কা

» সিরাজগঞ্জে নৌকাডুবি, শিশুসহ ৩ জনের লাশ উদ্ধার, নিখোঁজ ৩০

» মালদ্বীপ থেকে ফিরলেন ১২০০ জন

» ঈদের দিনও বিষোদগার থেকে বেরুতে পারেনি বিএনপি : তথ্যমন্ত্রী

» ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনা আক্রান্ত ১১৬৬, মৃত্যু ২১

» করোনায় নিলুফার মঞ্জুরের মৃত্যু

» ঝিনাইগাতীতে কালবৈশাখীর ছোবলে ঘরবাড়ি ও সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি

» শেরপুরে করোনা পরিস্থিতে মসজিদে মসজিদে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায়

» ভিন্ন এক আবহে অন্যরকম ঈদ উদযাপন

» সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ুক, গড়ে উঠুক সমৃদ্ধ দেশ : রাষ্ট্রপতি

» শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদ পালন করুন : কাদের

» তিনটি জীবন্ত ‘করোনা ভাইরাস’ ছিল উহানের ল্যাবে!

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

  ভোর ৫:২০ | বুধবার | ২৭শে মে, ২০২০ ইং | ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

জাতীয় কবি নজরুল ॥ বিশ্বসাহিত্যে এক অপার বিস্ময়

ড. আবদুল আলীম তালুকদার

বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়কর সাহিত্য প্রতিভা কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কবিদের মধ্যে অন্যতম; যিনি বাংলা সাহিত্যের প্রায় সবগুলো ধারাকে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নতুন মাত্রায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম সর্বমানবিক মানসের প্রয়াস, প্রয়োগ ও প্রকাশ ঘটিয়েছেন বাংলা সাহিত্যে তথা তাঁর কবিতায়, গানে, গল্পে, উপন্যাসে, নাটকে, প্রবন্ধে, চিঠিপত্রে ও অভিভাষণে তিনি সাধারণ মানুষের জয়গান গেয়েছেন; নিপুণ হাতে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের সুখ-দু:খ, বেদনা-হাহাকারের করুণ চিত্র।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক ভাবধারা যেমন অতুলনীয়, তেমনি তাঁর বহুমুখী প্রতিভা যেকোনো সাহিত্যমোদী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত বিস্ময়াবিভুত করে প্রতি মুহূর্তে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন না করেও সাহিত্য ক্ষেত্রে তিনি যে অবদান রেখে গেছেন, তাঁর লেখায় তিনি শব্দচয়ন এবং ছন্দের যে অপূর্ব গাঁথুনী ও আবহ সৃষ্টি করেছেন অতি উঁচু মাত্রার শিক্ষিত-জ্ঞানী ব্যক্তিরাও তা দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন। আশ্চার্যাম্বিত হয়ে পড়েন তার উচ্চমার্গীয় লেখনীর অপূর্ব প্রকাশভঙ্গি দেখে।
কবি নজরুল বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক বিরল সাহিত্য ব্যক্তিত্ব। মৌলিক কাব্য-প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন বলেই এখনও তিনি যুগ প্রবর্তক কবি হিসেবে স্বীকৃত। বিদ্রোহী কবি বলে সমধিক খ্যাত কবি নজরুলের মরমি কবিতা, অসংখ্য গজল, কাওয়ালী, ইসলামী সঙ্গীত, হাম্দ-না’ত আজও লক্ষ-কোটি পাঠক-শ্রোতাকে সমানভাবে আবেগাপ্লুত করে রাখে। তাঁর বিশাল সাহিত্য ভান্ডারের তুলনা আজো বিরল। এতোসব সাহিত্যযজ্ঞের ¯্রষ্টা হিসেবে তিনি জনারণ্যে খ্যাতি লাভ করেন চেতনা ও গণ-জাগরণের কবি হিসেবে।
কবি নজরুল যে কত বড় মাপের কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন তা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। তিনি মূলত একজন কবি হলেও সাহিত্যের প্রায় সকল ক্ষেত্রেই সমান সিদ্ধহস্ত ছিলেন । নজরুল শুধু শিল্পী-সুরকার, গীতিকার, কবি, উপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিশু-সাহিত্যিক, সম্পাদক ও আপোষহীন সৈনিকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন সেকালের শক্তিশালী একজন বিপ্লবী কলমযোদ্ধা। তাঁর লেখনীতে ফুটে উঠেছে আর্তপীড়িত মানুষের চাওয়া-পাওয়ার আকুতি। কবি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে অন্যায়, যুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। এ কারণেই বাংলা সাহিত্যে কবি নজরুল স্বপ্রতিভায় চির সমুজ্জ্বল। গল্প, উপন্যাস, ছোটগল্প, গান-গজল সব শাখাতেই বিচরণ ছিল প্রতিভাধর কবি কাজী নজরুল ইসলামের। মাত্র ২৩ বছরে তিনি কেবল গানই সৃষ্টি করেছেন ৪ হাজারের কাছাকাছি। এত গান পৃথিবীতে আর কোন কবি-গীতিকার লিখেছেন বলে জানা যায়না। গান ছাড়াও রয়েছে তার অজ¯্র ছড়া-কবিতা। লিখেছেন বেশকিছু ছোটগল্প ও উপন্যাস। লেখালেখির পাশাপাশি সুর সৃষ্টি ও সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন তিনি। এমনকি চলচ্চিত্র পরিচালক, সূরকার, গায়ক ও অভিনেতা হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। নবযুগ, ধুমকেতু, লাঙল ইত্যাদি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও তিনি সাহসিকতার সাথে পালন করেন।
মানব ও মানবিকতার স্বাধীনতা নজরুল চেতনার একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। নজরুলকে বিদ্রোহী কবি বলে অনেকেই খাটো করে দেখেন। নজরুল কলম ধরেছিলেন, বিদ্রোহ করেছিলেন ইংরেজদের যুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে নজরুল হলেন মানুষের কবি, মানবতার কবি এবং প্রেমের কবি। নজরুলের সমগ্র অন্তলোক চেতনার জগতে কেবল মানুষের ব্যাপকতা। মানুষকে অনেক বড় করে সৃষ্টি করেছেন সৃষ্টিকর্তা। আঠারো হাজার মাখলুকাতের মধ্যে মানুষ হলো শ্রেষ্ঠ, আশ্রাফুল মাখ্লুকাত। ইসলামের সুমহান বাণীও তিনি স্মরণ করেছেন তার মানবপ্রেমে সিক্ত ‘মানুষ’ কবিতায়- ‘আজ ইসলামী ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান/ নাই বড়-ছোট সকল মানুষ এক সমান/ গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
কিন্তু এই মানুষের ভেতরে যদি মানবিকতা না থাকে, মানুষের ভেতরে যদি মানবতা না থাকে, তাহলে মানুষের মনুষ্যত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাই তো মানবতার দাবি নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম দাঁড়িয়েছেন নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের পাশে। মানুষের দু:খে কবির কোমল হৃদয় হয়ে ওঠে ব্যথাতুর। নির্যাতিত মানুষের জন্য পলিমাটির মতো কবির নরম হৃদয় হয় ক্ষতবিক্ষত। উদার আকাশের মতো দুই নয়নে নামে বারিধারা। ‘কুলি মজুর’ কবিতায় কবি বলেন- ‘সেদিন দেখিনু রেলে/ কুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিলো নীচে ফেলে।/ চোখ ফেটে এল জল/ এমনি করিয়া জগত জুড়িয়া কি মার খাবে দুর্বল?’
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় স্বাধীনতার যে চেতনা; তার একটা বিশেষ অংশজুড়ে আছে নারী স্বাধীনতা। বর্তমান সময়ে যারা নারী স্বাধীনতার কথা বলেন, তারা মূলত পুরুষবিদ্বেষী। নারীদের বিজ্ঞাপনের পণ্য বানিয়ে তারা সুবিধা লুটে নেন আর মুখে মুখে নারী মুক্তির কথা বলেন। পক্ষান্তরে, নজরুলের নারী স্বাধীনতার মূলমন্ত্রই হলো নারী পুরুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা। নারী মুক্তির নামে পুরুষের বিরুদ্ধে তিনি খড়গ ধরেননি। বরং জাতি গঠনে নারী পুরুষের যে অবদান তা স্বীকার করেছেন অকপটে। তিনি ‘নারী’ কবিতায় উচ্চ কণ্ঠে ঘোষণা করেন- ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর/ এ বিশ্বে যত ফুটিয়াছে ফুল ফলিয়াছে যত ফল/ নারী দিল তার রূপ রস মধূ গন্ধ সুনির্মল/ কোনকালে একা হয়নি ক’ জয়ী পুরুষের তরবারি/ প্রেরণা দিয়েছে শক্তি দিয়েছে বিজয় লক্ষ¥ী নারী।’
নজরুলের ইসলামি গানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য আমাদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে এবং ধর্মীয় ভাবাবেগে আপ্লুত করে। তার ইসলামি চৈতন্য আমাদের আলোড়িত করে। তিনি তাঁর বিশ্বাসকেই ম-িত করেছেন ইসলামি গানে। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)’র জীবন ও কর্মের বাস্তব রূপ দেখা দিয়েছে তার কবিতায়- ‘কত যে রূপে তুমি এলে হযরত এই দুনিয়ায়/ তোমার ভেদ যে জানে আখেরী নবী কয় না তোমায়/ আদমের আগে ছিলে আরশ পাকে তার আগে খোদায়/ আদমের পেশানীতে দেখেছি তব জ্যোতি চমকায়।’
নজরুল যখন বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেন তখন তাতে ধর্মহীনতা থাকে না বরং থাকে ধর্মচিন্তার প্রতিফলন। ¯্রষ্টা যেমন তাঁর আপন সৃষ্টিকে কোনভাবেই অবজ্ঞা করতে পারেন না, এক সৃষ্টি তেমনি অপর সৃষ্টিকে কখনো অবজ্ঞা করতে পারে না বরং পরস্পরের মধ্যে প্রগাঢ় প্রেমের বন্ধন রচনার মাধ্যমে সম্প্রীতি বজায় রাখবে- এটাই স্বাভাবিক। আর এতেই রয়েছে পারস্পরিক অধিকার ও অপরাপর ধর্মের প্রতি সম্মানসূচক মনোভাব। আর সামাজিক ঐক্যসচেতন নজরুল যখন ধর্মীয় বিবাদে লিপ্ত বাস্তবতা দেখেন তখন সেই বিশেষ প্রেক্ষিতের আঙ্গিকে বলে উঠেন,- ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?/ কা-ারী! বল, ডুবিছে সন্তান মোর মার।’
ইসলামি ঐতিহ্য কাজী নজরুল ইসলামকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছিল। ইসলামের পুণর্জাগরণ বা মুসলিম ঐতিহ্য নজরুলের কবিতায় বিপুলভাবে সংবর্ধিত হয়েছিল। তিনি সূফিতত্ত্ব বা সূফিবাদ দ্বারাও প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। ইসলামকে নজরুল তার বিশ্বাসে ম-িত করে প্রকাশ করেছেন।
কাজী নজরুল ইসলাম যেমন শোষিত মানুষের কবি, বিদ্রোহের কবি, মানবিকতার কবি, তেমনি ইসলামি আ’কিদা-বিশ্বাস ও ইসলামি সাম্যবাদেরও কবি। ইসলামকে কবি মনে প্রাণে গ্রহণ করেছেন। ‘আবির্ভাব’ ও ‘তিরোভাব’ এই দু’টি কবিতার সমন্বয়ে তিনি রচনা করেন ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদোহম’ কবিতাটি। ইসলামি উদ্দীপনা সঞ্জীবিত রাখার ক্ষেত্রে নজরুল তার কবিতা ও অন্যান্য রচনার মাধ্যমে অভাবনীয় ভূমিকা রেখেছেন। ইসলামের অপরাজেয় নিশানকে নজরুল সবার ঊর্ধ্বে ঠাঁই দিয়েছেন।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় অমর বিশ্বাসী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ফলে ধর্মীয় অহিংসা ছিল নজরুল চেতনার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধর্মীয় সম্প্রীতি হলো একটি জাতি গঠনে এক বিরাট সহায়ক শক্তি। তাই তো ধর্মীয় সম্প্রীতির একজন অকাট্য সাক্ষী ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ধর্মীয় সংখ্যালঘু বলে তাঁর কাছে কিছু ছিল না। তার কাছে সকলেই মানুষ এটিই বড় কথা। ধর্মীয় ছোট গোষ্ঠী হিসেবে সমাজে যারা নির্যাতিত তাদেরও তিনি টেনে নিয়েছেন তার আকাশের মতো উদার বুকে। তাইতো ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন- ‘আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মুহাম্মদ/ কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর বিশ্বের সম্পদ/ আমাদেরই এরা পিতা পিতামহ এই আমাদের মাঝে/ তাদেরই রক্ত কম বেশী করে প্রতি ধমনীতে বাজে।’ আবার তিনি ‘সাম্যবাদী’ কবিতায় লিখেছেন- ‘গাহি সাম্যের গান/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাঁধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান।’
নজরুল তার কবিতায় দেখিয়েছেন যে, ইসলামের যে ধর্মীয় অনুশাসন, সেই অনুশাসনই প্রকৃতপক্ষে মানুষের ধর্ম। নজরুলের কবিতায় যে আত্মোপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে, তাই হচ্ছে আধ্যাত্মবাদের মূল কথা; যা ইসলাম ধর্মের শান্তির উপলব্ধির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে। আর তাই ইসলামের অনুশাসনকে তিনি তার যাপিত জীবনের আলো হিসেবে ভেবেছেন। আল্লাহর নির্দেশিত পথে চলার অঙ্গীকার ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বিশ্বাসে, কর্মে তাঁর জীবনে ইসলাম ছিল অবিকল্প। ‘খেয়াপাড়ের তরণী’ কবিতায় নজরুল তাই উচ্চারণ করেন- ‘কান্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা/দাড়ি মুখে সারি গান লা-শরীক আল্লাহ্।’ আবার ‘মহররম’ কবিতায় নজরুল উচ্চারণ করেন- ‘ফিরে এলো আজ সেই মর্হরম মাহিনা/ ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’
স্বধর্ম ইসলামের প্রতি ছিল কাজী নজরুল ইসলামের অগাধ বিশ্বাস। তিনি মনে করতেন ইসলাম হলো শান্তির ধর্ম। আর ইসলামের মূল মন্ত্রণাদাতা দোজাহানের মহান মালিক আল্লাহ্ তায়ালাই সকল ক্ষমতার উৎস। তাই তো তিনি লিখেছেন- ‘উহারা প্রচার করুক হিংসা-বিদ্বেষ আর নিন্দাবাদ/ আমরা বলিব সাম্য শান্তি, এক আল্লাহ্ জিন্দাবাদ/ উহারা চাহুক সঙ্কীর্ণতা, পায়রার খোপ ডোবার ক্লেদ/ আমরা চাহিব উদার আকাশ নিত্য আলোক প্রেম অভেদ।’
তার মতে, যিনি প্রকৃত মুসলিম তিনি আল্লাহর সৈনিক। তার কোনো মৃত্যুভয় নেই, সে কোনো দাসের জাতি নয়। মুসলিম হলো বীরের জাতি। তারা জীবন দিতে জানে, কিন্তু পরাধীনতা মানতে জানে না। অন্যায় অবিচার আর অনাচারের কাছে মাথা নত করতে জানে না।
মোটকথা, আধুনিক বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম সত্যিই এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন এবং সংযোজন করেন অজানা এক সুর, নতুন এক গতি এবং অভূতপূর্ব এক শক্তি। একজন সার্থক ¯্রষ্টার মতোই তিনি বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করেন এক সর্বগ্রাসী আবেদন যা কালের সংকীর্ণতা জয় করে, ক্ষুদ্র গ-ি অতিক্রম করে জীবনকে এক নতুন আলোকে জ্যোতির্ময় করে তোলে। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ জাতির জন্য যেমন তিনি গেয়েছেন মুক্তির গান, হাজারো প্রতিবন্ধকতায় শৃঙ্খলিত জীবনের জন্যও তেমনি তিনি তুলেছেন নতুন নতুন সুরের ব্যঞ্জনা।
পরিশেষে, যদি নজরুলের জীবন ও সাহিত্য থেকে তার আদর্শের বিন্দুমাত্র আমাদের জীবনে গ্রহণ করতে পারি তাহলে আমাদের সমাজ অনেকখানি স্বচ্ছতার দিকে এগিয়ে যাবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর অবশ্য অবশ্যই নজরুল-সাহিত্যকে বর্তমান প্রজন্ম ও আগামী প্রজন্মের সামনে উপস্থাপন করা বাঙালি হিসেবে আমাদের উপর অপরিহার্য কর্তব্য; যা কোনোক্রমেই এড়িয়ে যাওয়ার ন্যূনতম সুযোগ নেই।

img-add

লেখক: কবি, গবেষক ও বিসিএস (সা. শি) ক্যাডার কর্মকর্তা। ই-মেইল : dr.alim1978@gmail.com

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

error: Content is protected !!