গণহত্যা : শেরপুরের জগৎপুর

মোঃ রোকনুজ্জামান বাবুল

৩০ এপ্রিল ১৯৭১, শুক্রবার। সূর্য ওঠার আগেই গ্রামের লোকজন তাদের নিত্যকর্ম শুরু করে। পাশের রাস্তা দিয়ে ভোর থেকেই শরণার্থীরা দলে দলে ভারতের উদ্দেশ্যে চলে যাচ্ছিল। ঘড়িতে সকাল ৮টা। এমন সময় হঠাৎ করেই দক্ষিণ দিক থেকে গাড়ির হর্ণ ও সেই সঙ্গে গুলির শব্দ। নিকটবর্তী কোয়ারী রোড ক্যাম্প ও কুরুয়া ক্যাম্প হতে আসা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ির শংকর ঘোষ গ্রামের দক্ষিণ পাশের গ্রাম রহমতপুর গ্রামে এসে থামে। অনেকের ভাষ্যমতে, শেরপুরে স্থাপিত ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানী বাহিনীর সৈন্যরা এখানে এসেছিল। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী শংকর ঘোষ গ্রাম পেরিয়ে দক্ষিণ দিকের ফসলের মাঠের মধ্য দিয়ে আসতে থাকে জগৎপুরের দিকে। এ সময় পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে কাদির, মকবুল, সিরাজুল, মোহাম্মদ আলী, সেকান্দর, কামরুজ্জামান, আজী রহমান, বেলায়েত, মোফাজ্জল, মজিবর, জালাল উদ্দীনসহ এদেশীয় ১৫-২০ জন পাকিস্তানী সহযোগীও ছিল। শ্মশানের কাছে এসে সৈন্যরা তিন ভাগ হয়ে জগৎপুর গ্রামে আক্রমণ শুরু করে। গুলি করতে করতে গ্রামের মূল অংশের দিকে এগিয়ে আসার পথে মাঠে হালচাষরত অবস্থায় কান্দুলী গ্রামের সফর উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে। তারা পথিমধ্যেই বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শরণার্থী ও এলাকার স্থানীয়দের হত্যা করে।
জগৎপুর গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত বাড়িগুলো ছিল রাঙ্গুনিয়া বিলের দক্ষিণাংশে এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাশে বেশ কিছু বসতবাড়ি ছিল। এ বসতবাড়িগুলোতে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা শরণার্থীরাও অবস্থান করছিল। এ সময় এলাকার লোকসংখ্যা মূল জনসংখ্যার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। মেঘলা আকাশের নিচে গুলির শব্দে সবাই দিশেহারা হয়ে যায়। এলাকার লোকজন কে কী করবে, কিভাবে পালাবে তা নিয়ে আতঙ্কে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতে থাকে। জীবন বাঁচানো ছাড়া তাদের কাছে এ সময় আর কিছুই করার ছিল না। পাকিস্তানী বাহিনীর সেনাদের গ্রামের সামনের অংশে প্রবেশ করার কারণে পালানোর জন্য পূর্ব ও পশ্চিম দিক দিয়ে উত্তরের পথ (ভারতের দিকে) ধরা ছিল কঠিন কিন্তু তার কোন বিকল্প ছিল না। তারপরেও জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষ পরিবার পরিজনকে নিয়ে হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই নিয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতে থাকে। অনেকে শেষ মুহূর্তে গ্রামের উত্তর পাশের প্রশস্ত বিলের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কেননা, ইতোমধ্যেই পাকিস্তানী বাহিনীর সৈন্যরা গুলি করতে করতে গ্রামের ভেতরের অংশে চলে এসেছে।
সৈন্যরা বিভিন্ন বাড়িতে প্রবেশ করতে শুরু করে। বিশেষ করে যুবক ও পুরুষদের যেখানে পেয়েছে সেখানেই তাদের গুলি করে হত্যা করেছে। এলাকার লোকজন, যারা পালিয়ে যাচ্ছিল তাদের মধ্যে অনেকেই সৈন্যদের গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এমন কী পালানোর সময় পাশ থেকে গুলি থেয়ে লুটিয়ে পড়া পাশের লোকটি নিজের প্রাণের ভয়ে তাকে দেখার জন্যও দাঁড়ায়নি। রাস্তা দিয়ে পালানোর মতো যথেষ্ট সময় যারা পায়নি তারা রাঙ্গুনিয়া বিল দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। ঝোপঝাড় পার হয়ে মানুষ বিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাকিস্তানী বাহিনীর সৈন্যরা শরণার্থীদের উপরও গুলিবর্ষণ করতে থাকে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ যুবক কেউ রেহাই পায়নি সেদিন। কেউ নিজেকে প্রশ্ন করার সময় পায়নি যে- সে কেন পালিয়ে যাচ্ছে, কেন তাকে গুলি করে মারা হচ্ছে, কেনই বা এত সব ঘটনা ঘটছে। মায়ের সামনে ছেলেকে, স্বামীকে, বোনের সামনে ভাই, স্বামী-স্ত্রী উভয়কে, কেউ রেহাই পায়নি সেদিন। যেখানে গুলি খেয়েছে সেখানেই মরে পড়ে থাকে লাশগুলো। সবচেয়ে বেশি হতাহতো হয়েছে রাঙ্গুনিয়া বিলের ধারে। এখানে পড়ে থাকা লাশগুলো ডাঙায় পড়ে থাকা লাশগুলোর কোন খোঁজ ছিল না। শরণার্থীদের কয়েকজন সন্ধ্যার দিকে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে নিজ পরিজনকে মাটি চাপা দিয়ে রাতের আঁধারেই গ্রাম ছেড়ে ভারতে চলে যান।
হত্যাকা-ের পরপরই পাকিস্তানী বাহিনীর সৈন্যরা ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। গ্রামের মানুষজন ভয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর যে সমস্ত জিনিস আগুনে পোড়া হয়নি এমন দ্রব্যাদি পাকিস্তানী সহযোগীরা লুট করে করে নিয়ে যায়। প্রায় প্রত্যেকের বসতবাড়ির নগদ টাকা পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, ঘরের টিন, বাসন-কোসন, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ইত্যাদি চুরি হয়ে যায়। শরণার্থীদের ফসলী জমি অন্যেরা নিজের মতো করে চাষাবাদ শুরু করে।
অভিযানের মূল অংশ অর্থাৎ অবিরাম গুলির প্রচণ্ড শব্দ চলে মাত্র আধাঘণ্টা। এরপর থেকে থেমে থেমে চলে গুলির শব্দ। সরেজমিনে এ দিনের নারকীয় গণহত্যায় শহীদ হওয়া নিরীহ ৩০ জন গ্রামবাসীর নাম পাওয়া গেছে। আহত হয় অসংখ্য মানুষ। এলাকাবাসীর ধারণা শহীদদের সংখ্যা ৬০-৭০ জনের বেশি। অনেকেই বলেছেন, এখানে গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। তাদের দাবি, যেদিন জগৎপুর গ্রামে দূর-দূরান্ত থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য এসেছিলেন এমন অনেকেই এদিন হত্যার শিকার হন। বিশেষ করে এমন অনেকে এসেছিলেন যারা স্বল্প পরিচিত ও ভারত যাওয়ার পথে এখানে সাময়িক আশ্রয় নিয়েছিলেন।
যারা নৃশংস হত্যার শিকার হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিল শিশু, নারী, বৃদ্ধ যুবক। এদের প্রায় সব লাশগুলোই বিলের দক্ষিণাংশে ফেলে দেয়া হয়। সেদিনের নিষ্ঠুর গণহত্যায় বেশির ভাগ মানুষ নিহত হয়েছিলেন রাঙ্গুনিয়া বিলের ধারে। সেখান থেকে তাদের লাশগুলো সরানো হয়নি। গণহত্যা ও লুটপাটের পর পাকিস্তানী বাহিনীর চলে যায়। এরপর পাশের গ্রামের মুসলমানরা জগৎপুর এসে পরে মৃতদেহগুলোকে রাঙ্গুনিয়া বিলের ধারে মাটিচাপা দেয়।

লেখক : উপ-পরিচালক, গণহত্যা নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!