রাত ১২:০২ | সোমবার | ১লা জুন, ২০২০ ইং | ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনা পরিস্থিতি ॥ শেরপুরে লকডাউন মানছেন না লোকজন; বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

শ্যামলবাংলা ডেস্ক ॥ প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতে শেরপুরে লকডাউন মানছেন না সাধারণ মানুষসহ অনেকেই। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত রাস্তা-ঘাটে যানবাহন চলাচলসহ হাট-বাজারে জনসমাগম চলছে প্রায় আগের মতোই। এতে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে লোকজন অনেকটা অবাধেই চলাফেরা করায় বাড়ছে ঝুঁকি। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। তাদেরসহ সচেতন মহলের অভিমত, একদিকে জনসচেতনতার অভাব, অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয় অবস্থানের কারণেই লকডাউন কার্যকর ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা চলমান থাকলে শেরপুরবাসীকে এক কঠিন ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে প্রশাসন বলছে, অনেক দিকে তাকিয়েই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
জানা যায়, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রথম থেকেই শেরপুরে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করে। মাইকিং-লিফলেট প্রচারণা, সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে বেসিন স্থাপন ও সড়কে সড়কে জীবাণুনাশক স্প্রেসহ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি অনিবার্য কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে নানা কার্যক্রম, বিশেষ করে জেলা শহর ও উপজেলা সদরগুলো এবং হাট-বাজারে অবাধে যানবাহন ও জনযাতায়াত নিয়ন্ত্রণসহ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিশেষ নজরদারী, প্রধান প্রধান মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশের কড়া অবস্থানসহ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিশেষ টহল ছিল লক্ষ্যণীয়। ওই অবস্থায় গত ৫ এপ্রিল জেলায় প্রথম ২ নারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বেড়ে যায় উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। সেইসাথে দিনদিন সংক্রমণের বিস্তৃতি ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলের তরফ থেকে দাবির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ১৫ এপ্রিল শেরপুরকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। ফলে শেরপুরের সাথে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য জেলার এবং জেলা সদরের সাথে উপজেলা সদরগুলোর অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগসহ জনযাতায়াত বারিত করা হয়। ঔষুধের দোকান ও খাদ্যসহ কাঁচামালের দোকানগুলো প্রথমত লকডাউনের আওতামুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে খাদ্যসহ কাঁচামালের দোকানগুলো চালু রাখার সময়সীমা কমিয়ে ভোর ৬ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পুরো লকডাউন ঘোষণার ১৫ দিন না যেতেই এখন সেই লকডাউন মানছেন না সাধারণ মানুষসহ অনেকেই। ফলে লকডাউন ঘোষণার দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে, ততই যেন শিথিল ও স্বাভাবিক হয়ে আসছে পরিবেশ।

img-add

২৭ এপ্রিল রবিবার সকাল ১০টায় শহরের খোয়ারপাড় শাপলা চত্ত্বর মোড়ে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। জেলা সদরের সাথে অন্য চারটি উপজেলার মধ্যে নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীসহ পার্শ্ববতী বকশীগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী অঞ্চলের সড়ক পথে যাতায়াতের মোহনা হিসেবে চিহ্নিত জেলার সর্বাধিক ব্যস্ততম এ এলাকাটি যেন করোনা পরিস্থিতির আগের রূপ ফিরে পেয়েছে। দূরপাল্লার বাস-কোচ ছাড়া সকল উপজেলা সড়কের মুখ পথে সিএনজি ও ইজিবাইকের পাশাপাশি রিক্সা-ভ্যান ও ট্রলির হুড়োহুড়ি। যাত্রী সাধারণসহ কেনাকাটার জন্য জেলা শহরে প্রবেশে উন্মুখ হয়ে থাকা মানুষের হুড়োহুড়ি ও ব্যস্ততাও যেন একই রকম। মোড়ের চারপাশসহ সংলগ্ন উপজেলা সড়কগুলোর দু’পাশে থাকা কাঁচা নয়, যেন পাকা দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই খোলা। আর ওই অবস্থায় তখন পর্যন্ত সেখানে দেখা যায়নি প্রশাসন বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কারও অবস্থান। এরপর সরেজমিনে শহরের নতুন বাসটার্মিনাল, শেরীব্রীজ, অষ্টমীতলা, থানা মোড়, নবীনগর মোড়, শেখহাটি বাজার ও হাসপাতাল সংলগ্নসহ নারায়ণপুর সড়ক, নিউ মার্কেট মোড় ও কলেজ মোড়সহ ডিসি গেইট এলাকা ঘুরে দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। সেই সাথে সর্বত্র দেখা যায়, পায়ে হেঁটে মানুষের অবাধ যাতায়াত।
অন্য দিকে বেলা ১১ টায় শহরের নয়ানী বাজারে গিয়ে দেখা যায় ব্যস্ত ও জমজমাট বাজারের চিত্র। দৈনিক বা রোজার নয়, যেন ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত বাজারে সমাগম শতশত লোকজন। নেই কোন নিয়ন্ত্রণ বা নেই কারো তদারকি। বড় বড় দোকানগুলোতে পুলিশের সচেতনতামূলক ‘মাস্ক নেই যার, বাজার নেই তার’ লেখা খচিত ব্যানার শোভা পেলেও কাঁচাবাজারসহ আলু, পিঁয়াজ, রসুন, মসল্লা ও পান-সুপারির দোকান এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ ফলমূল, শিশু খাদ্য আর গরু-খাসির মাংসের দোকান, মাছ বাজারসহ তেরাবাজার মুরগী হাটি ও সদ্য খোলা গোয়ালপট্টির মিষ্টির দোকানের কোনটাতেই মানছেন না কেউ সামাজিক দূরত্ব। বরং পীড়াপীড়ি হুড়োহুড়িতে যেন তৈরী হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির এক ভিন্ন পরিবেশ। শহরের নবীনগর কাঁচা বাজার, খোয়ারপাড় কাঁচা বাজার, নতুন বাসটার্মিনাল ও শেখহাটি কাঁচা বাজারের চিত্রও প্রায় একই। তবে খরমপুর বউ বাজার ডাঃ সেকান্দর আলী কলেজ মাঠে, সাতানীপাড়া বউ বাজার আফছর আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানান্তরিত হওয়ায় মানুষের ভিড় কমে সামাজিক দূরত্ব কিছুটা রক্ষা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলা সদরের মতো উপজেলা সদরগুলোসহ অভ্যন্তরীণ হাট-বাজারগুলোতেও যেমন একই চিত্র, ঠিক তেমনি ইফতারের পর শহরের বাইরে থাকা চা-পানের দোকানগুলোতে চলছে রীতিমতো আড্ডা। অন্যদিকে সর্বাধিক করোনা সংক্রমিত এলাকা রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে সুকৌশলে পিকাপ ভ্যান বা যাত্রা বিরতি করে হালকা যানে জেলায় প্রবেশ করছে শেরপুরের অধিবাসীসহ আত্মীয়-স্বজনরা।
এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন কার্যকর ব্যাহত হয়ে পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শেরপুরের বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। এ বিষয়ে জেলা মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি রাজিয়া সামাদ ডালিয়া শেরপুরে লকডাউন কার্যকর না হওয়ার বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তা যেন কোনভাবেই লোক দেখানো ও প্রহসনে পরিণত না হয়, সেজন্য প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একইভাবে নবগঠিত জেলা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মিনহাজ উদ্দিন মিনাল বলেন, করোনা পরিস্থিতির প্রথম থেকেই লকডাউন নিয়ে উদাসিনতা লক্ষ্য করা গেছে। আর সেই দুর্বলতায় এখন লকডাউন মানছেন না লোকজন। তার মতে, সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর করা উচিত। তবে নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন কার্যকর করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অর্থনীতির ভিত টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চিহ্নিত করে সেইসব ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লকডাউনের কার্যকারিতা শিথিল করাও যেতে পারে।
লকডাউন প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম পিপিএম শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, কেবল পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষে লকডাউন কার্যকর করা সম্ভব নয়। কোন এলাকায় লকডাউন নিশ্চিত করতে হলে সেই এলাকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হয়। তবেই তা টেকসই ও ফলপ্রসূ হয়। এক্ষেত্রে শেরপুরে লকডাউন কার্যকরে জেলা পুলিশ প্রথম থেকেই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে আসছে। সেইসাথে জেলা প্রশাসনকে দিয়ে আসছে সহযোগিতা। এরপরও পুলিশকে জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা সামাজিক
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, লকডাউন কার্যকরে সমন্বিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। কেবল প্রশাসন বা পুলিশ নয়, যে যে অবস্থানেই আছি না কেন, যার যার অবস্থান থেকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, করোনায় সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে নিয়মিত বাজার মনিটরিংসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। লকডাউন উপেক্ষা করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা, বাজারদরের চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেশী রাখা এবং সামাজিক দূরত্ব ও সংক্রামণ রোগ প্রতিরোধ আইন ভঙ্গের দায়ে মানুষকে দন্ডও দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় পরিবারের ঘরে ঘরে প্রধানমন্ত্রীর উপহার সামগ্রী পেীঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এখন কৃষকের বোরো ধান কাটায় সহায়তা দিতে হচ্ছে। তদুপরি পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা মোতাবেক এখন থেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে শিথিল করা হবে। ইতোমধ্যে ইফতার ও সেহরির সুবিধার্থে শর্তসাপেক্ষে কিছু দোকানসহ দুগ্ধশিল্প ও কৃষকের কথা বিবেচনা করে মিষ্টির দোকান দুপুর পর্যন্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দ্রুতই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আরও কিছু দোকান ভোর ৬টা থেকে ২টার পরিবর্তে ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হবে।
– রফিকুল ইসলাম আধার।

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» ময়মনসিংহে হাজার ছাড়াল করোনায় আক্রান্ত

» করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া হবে না : শিক্ষামন্ত্রী

» খেটে খাওয়া মানুষের কথা ভাবে না বিএনপি : তথ্যমন্ত্রী

» বাস ভাড়া বাড়লো ৬০ শতাংশ

» ব্যাংকগুলোকে ২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার : প্রধানমন্ত্রী

» ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৪০ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ২৫৪৫

» এসএসসি ফলাফল ॥ শেরপুরে সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় শীর্ষে

» এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে এনসিটিএফ শিশু সাংবাদিক তাহিরাহ

» ময়মনসিংহ বোর্ডে এসএসসিতে পাসের হার ৮০.১৩ শতাংশ ॥ পাসের হারে এগিয়ে শেরপুর

» সারাদেশে ভার্চুয়াল আদালতে শুনানী চলবে ১৫ জুন পর্যন্ত

» টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ স্থগিত রাখার সুপারিশ সাঙ্গাকারার

» নৌপথে যাত্রী পারাপার শুরু

» সৌদি আরবে মাস্ক না পরলে জরিমানা, আজ থেকে খুলছে মসজিদ

» এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস ৮২.৮৭%, জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩৫৮৯৮

» শেরপুরে করোনা উপসর্গ নিয়ে ঢাকাফেরত বৃদ্ধের মৃত্যু ॥ নমুনা সংগ্রহ

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

  রাত ১২:০২ | সোমবার | ১লা জুন, ২০২০ ইং | ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

করোনা পরিস্থিতি ॥ শেরপুরে লকডাউন মানছেন না লোকজন; বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি

শ্যামলবাংলা ডেস্ক ॥ প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতে শেরপুরে লকডাউন মানছেন না সাধারণ মানুষসহ অনেকেই। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত রাস্তা-ঘাটে যানবাহন চলাচলসহ হাট-বাজারে জনসমাগম চলছে প্রায় আগের মতোই। এতে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে লোকজন অনেকটা অবাধেই চলাফেরা করায় বাড়ছে ঝুঁকি। এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। তাদেরসহ সচেতন মহলের অভিমত, একদিকে জনসচেতনতার অভাব, অন্যদিকে স্থানীয় প্রশাসনসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয় অবস্থানের কারণেই লকডাউন কার্যকর ব্যাহত হচ্ছে। এ অবস্থা চলমান থাকলে শেরপুরবাসীকে এক কঠিন ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তবে প্রশাসন বলছে, অনেক দিকে তাকিয়েই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
জানা যায়, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রথম থেকেই শেরপুরে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভাসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করে। মাইকিং-লিফলেট প্রচারণা, সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে বেসিন স্থাপন ও সড়কে সড়কে জীবাণুনাশক স্প্রেসহ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি অনিবার্য কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের না হতে নানা কার্যক্রম, বিশেষ করে জেলা শহর ও উপজেলা সদরগুলো এবং হাট-বাজারে অবাধে যানবাহন ও জনযাতায়াত নিয়ন্ত্রণসহ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের বিশেষ নজরদারী, প্রধান প্রধান মোড় ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে পুলিশের কড়া অবস্থানসহ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বিশেষ টহল ছিল লক্ষ্যণীয়। ওই অবস্থায় গত ৫ এপ্রিল জেলায় প্রথম ২ নারী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে বেড়ে যায় উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। সেইসাথে দিনদিন সংক্রমণের বিস্তৃতি ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলে নাগরিক সমাজসহ বিভিন্ন মহলের তরফ থেকে দাবির প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে ১৫ এপ্রিল শেরপুরকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। ফলে শেরপুরের সাথে রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য জেলার এবং জেলা সদরের সাথে উপজেলা সদরগুলোর অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগসহ জনযাতায়াত বারিত করা হয়। ঔষুধের দোকান ও খাদ্যসহ কাঁচামালের দোকানগুলো প্রথমত লকডাউনের আওতামুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে খাদ্যসহ কাঁচামালের দোকানগুলো চালু রাখার সময়সীমা কমিয়ে ভোর ৬ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু পুরো লকডাউন ঘোষণার ১৫ দিন না যেতেই এখন সেই লকডাউন মানছেন না সাধারণ মানুষসহ অনেকেই। ফলে লকডাউন ঘোষণার দিন যতই অতিবাহিত হচ্ছে, ততই যেন শিথিল ও স্বাভাবিক হয়ে আসছে পরিবেশ।

img-add

২৭ এপ্রিল রবিবার সকাল ১০টায় শহরের খোয়ারপাড় শাপলা চত্ত্বর মোড়ে দেখা যায় ভয়াবহ চিত্র। জেলা সদরের সাথে অন্য চারটি উপজেলার মধ্যে নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীসহ পার্শ্ববতী বকশীগঞ্জ এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী অঞ্চলের সড়ক পথে যাতায়াতের মোহনা হিসেবে চিহ্নিত জেলার সর্বাধিক ব্যস্ততম এ এলাকাটি যেন করোনা পরিস্থিতির আগের রূপ ফিরে পেয়েছে। দূরপাল্লার বাস-কোচ ছাড়া সকল উপজেলা সড়কের মুখ পথে সিএনজি ও ইজিবাইকের পাশাপাশি রিক্সা-ভ্যান ও ট্রলির হুড়োহুড়ি। যাত্রী সাধারণসহ কেনাকাটার জন্য জেলা শহরে প্রবেশে উন্মুখ হয়ে থাকা মানুষের হুড়োহুড়ি ও ব্যস্ততাও যেন একই রকম। মোড়ের চারপাশসহ সংলগ্ন উপজেলা সড়কগুলোর দু’পাশে থাকা কাঁচা নয়, যেন পাকা দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই খোলা। আর ওই অবস্থায় তখন পর্যন্ত সেখানে দেখা যায়নি প্রশাসন বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর কারও অবস্থান। এরপর সরেজমিনে শহরের নতুন বাসটার্মিনাল, শেরীব্রীজ, অষ্টমীতলা, থানা মোড়, নবীনগর মোড়, শেখহাটি বাজার ও হাসপাতাল সংলগ্নসহ নারায়ণপুর সড়ক, নিউ মার্কেট মোড় ও কলেজ মোড়সহ ডিসি গেইট এলাকা ঘুরে দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। সেই সাথে সর্বত্র দেখা যায়, পায়ে হেঁটে মানুষের অবাধ যাতায়াত।
অন্য দিকে বেলা ১১ টায় শহরের নয়ানী বাজারে গিয়ে দেখা যায় ব্যস্ত ও জমজমাট বাজারের চিত্র। দৈনিক বা রোজার নয়, যেন ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত বাজারে সমাগম শতশত লোকজন। নেই কোন নিয়ন্ত্রণ বা নেই কারো তদারকি। বড় বড় দোকানগুলোতে পুলিশের সচেতনতামূলক ‘মাস্ক নেই যার, বাজার নেই তার’ লেখা খচিত ব্যানার শোভা পেলেও কাঁচাবাজারসহ আলু, পিঁয়াজ, রসুন, মসল্লা ও পান-সুপারির দোকান এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ ফলমূল, শিশু খাদ্য আর গরু-খাসির মাংসের দোকান, মাছ বাজারসহ তেরাবাজার মুরগী হাটি ও সদ্য খোলা গোয়ালপট্টির মিষ্টির দোকানের কোনটাতেই মানছেন না কেউ সামাজিক দূরত্ব। বরং পীড়াপীড়ি হুড়োহুড়িতে যেন তৈরী হয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকির এক ভিন্ন পরিবেশ। শহরের নবীনগর কাঁচা বাজার, খোয়ারপাড় কাঁচা বাজার, নতুন বাসটার্মিনাল ও শেখহাটি কাঁচা বাজারের চিত্রও প্রায় একই। তবে খরমপুর বউ বাজার ডাঃ সেকান্দর আলী কলেজ মাঠে, সাতানীপাড়া বউ বাজার আফছর আলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানান্তরিত হওয়ায় মানুষের ভিড় কমে সামাজিক দূরত্ব কিছুটা রক্ষা হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলা সদরের মতো উপজেলা সদরগুলোসহ অভ্যন্তরীণ হাট-বাজারগুলোতেও যেমন একই চিত্র, ঠিক তেমনি ইফতারের পর শহরের বাইরে থাকা চা-পানের দোকানগুলোতে চলছে রীতিমতো আড্ডা। অন্যদিকে সর্বাধিক করোনা সংক্রমিত এলাকা রাজধানী ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলা থেকে সুকৌশলে পিকাপ ভ্যান বা যাত্রা বিরতি করে হালকা যানে জেলায় প্রবেশ করছে শেরপুরের অধিবাসীসহ আত্মীয়-স্বজনরা।
এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে লকডাউন কার্যকর ব্যাহত হয়ে পড়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শেরপুরের বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠনের নেতারা। এ বিষয়ে জেলা মানবাধিকার কমিশনের সভাপতি রাজিয়া সামাদ ডালিয়া শেরপুরে লকডাউন কার্যকর না হওয়ার বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তা যেন কোনভাবেই লোক দেখানো ও প্রহসনে পরিণত না হয়, সেজন্য প্রশাসনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল হতে হবে। একইভাবে নবগঠিত জেলা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব মিনহাজ উদ্দিন মিনাল বলেন, করোনা পরিস্থিতির প্রথম থেকেই লকডাউন নিয়ে উদাসিনতা লক্ষ্য করা গেছে। আর সেই দুর্বলতায় এখন লকডাউন মানছেন না লোকজন। তার মতে, সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর করা উচিত। তবে নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদী লকডাউন কার্যকর করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে অর্থনীতির ভিত টিকিয়ে রাখার স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চিহ্নিত করে সেইসব ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লকডাউনের কার্যকারিতা শিথিল করাও যেতে পারে।
লকডাউন প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম পিপিএম শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, কেবল পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষে লকডাউন কার্যকর করা সম্ভব নয়। কোন এলাকায় লকডাউন নিশ্চিত করতে হলে সেই এলাকার সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হয়। তবেই তা টেকসই ও ফলপ্রসূ হয়। এক্ষেত্রে শেরপুরে লকডাউন কার্যকরে জেলা পুলিশ প্রথম থেকেই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে আসছে। সেইসাথে জেলা প্রশাসনকে দিয়ে আসছে সহযোগিতা। এরপরও পুলিশকে জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা সামাজিক
এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, লকডাউন কার্যকরে সমন্বিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। কেবল প্রশাসন বা পুলিশ নয়, যে যে অবস্থানেই আছি না কেন, যার যার অবস্থান থেকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, করোনায় সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে নিয়মিত বাজার মনিটরিংসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। লকডাউন উপেক্ষা করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখা, বাজারদরের চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেশী রাখা এবং সামাজিক দূরত্ব ও সংক্রামণ রোগ প্রতিরোধ আইন ভঙ্গের দায়ে মানুষকে দন্ডও দেয়া হচ্ছে। এছাড়া কর্মহীন হয়ে পড়া অসহায় পরিবারের ঘরে ঘরে প্রধানমন্ত্রীর উপহার সামগ্রী পেীঁছে দেওয়ার পাশাপাশি এখন কৃষকের বোরো ধান কাটায় সহায়তা দিতে হচ্ছে। তদুপরি পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছে পুলিশ ও সেনাবাহিনী। তবে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা মোতাবেক এখন থেকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আস্তে আস্তে শিথিল করা হবে। ইতোমধ্যে ইফতার ও সেহরির সুবিধার্থে শর্তসাপেক্ষে কিছু দোকানসহ দুগ্ধশিল্প ও কৃষকের কথা বিবেচনা করে মিষ্টির দোকান দুপুর পর্যন্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দ্রুতই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আরও কিছু দোকান ভোর ৬টা থেকে ২টার পরিবর্তে ৪টা পর্যন্ত খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হবে।
– রফিকুল ইসলাম আধার।

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

error: Content is protected !!