[bangla_time] | [bangla_day] | [english_date] | [bangla_date]

কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক রফিক মজিদ’র গল্পগুচ্ছ

মানবতার ছাতা
লেখক : রফিক মজিদ

বর্ষাকাল তাই বাইরে এই রোদ এই বৃষ্টি। কখন যে হুট করে বৃষ্টি নেমে পড়ে ঠিক নেই। তবুও আজ বাইরে বের হওয়ার সময় ছাতাটা হাতে নেওয়ার মনে ছিল না। বাসা থেকে পায়ে হেঁটে দু’মিনিটের মধ্যেই প্রধান সড়কের মাথায় যাওয়া যায়। বৃষ্টির দিন, তাই রিক্সা পেতে ওই প্রধান সড়কের মাথায় যেতে হবে।
বাসা থেকে বের হয়ে দু’কদম হাঁটতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। আশপাশে কোন ছাউনি বা গাছ নেই যে আশ্রয় নিব। কী আর করা, হাঁটার গতি বাড়াতেই পেছন থেকে কে যেন আমার মাথার উপর ছাতা ধরলো।
পাশে চেয়ে দেখি অচেনা মুখের এক তরুণী। তার সাথে ব্যাগ এবং পোশাক দেখে মনে হলো মেয়েটি কলেজ পড়ুয়া। মাথার উপর ছাতা ধরেই বলেন, ‘চলুন আপনাকে রাস্তার মোড়ে পৌঁছে দিই’। হুট করেই যেমন বৃষ্টি, তেমনি হুট করেই মাথার উপর ছাতা। কোন চিন্তা করতে পারছি না, মেয়েটা কে ? চেনা-জানা না হলে কি আমার মাথায় ছাতা ধরবে ! জিজ্ঞেস করবো কী না, কে তুমি ? এসব নানা কথা ভাবছি আর পথ চলছি।
মেয়েটিকে লক্ষ্য করছি, সে নিজে ভিজে আমাকে ভিজতে দিচ্ছে না। এদিকে বৃষ্টি’র গতিও কমতে শুরু করেছে। এভাবে এক কদম, দুই কদম হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম প্রধান সড়কের মোড়ে। এরইমধ্যে বৃষ্টিও থেমে গেছে।
এসময় মেয়েটি ছাতাটা নামিয়ে বললো, ‘আঙ্কেল চলি, ভাল থাকবেন।’ একথা বলেই রিক্সায় চড়ে বসে মেয়েটি। এসময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আঙ্কেল ডাকলে অথচ চিনলাম না !’ তখন মেয়েটি বললো, ‘আপনার মনে নেই, কিন্তু আমার ঠিক মনে আছে, প্রায় ৫/৬ বছর আগে হসপিটালে আমার মা আর আমি ছোট বোনকে নিয়ে ডাক্তারের জন্য চিৎকার-ছুটাছুটি করছিলাম। তখন আপনি হাসপাতালে কোন রিপোটিং-এ এসে আমাদের অসহায় অবস্থায় দেখে দ্রুত ডাক্তার দেখানো এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আমাদের যে উপকার করেছিলেন, তা ভুলি নাই। সেদিন আপনি আমাদের মাথার উপর যে মানবতার ছাতা ধরে ছিলেন, সে তুলনায় আজ আপনার মাথায় বৃষ্টি ফেরাতে ছাতা ধরাটা সামান্য বিষয়। সেদিন আমি নবম শ্রেণিতে পড়তাম, এখন অনার্স ফাস্ট ইয়ারে। ওকে, খোদা হাফেজ, ভাল থাকবেন…। (৩০৮ শব্দ)
……………………………………………………………………..

মানিব্যাগ
লেখক : রফিক মজিদ
মাসুম রেজা ৬ মাস আগে একটি আইটি ফার্ম-এ চাকুরি নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন। কাল বিয়ে, তাই আজ গায়ে হলুদ শেষে সন্ধ্যায় বেড়িয়েছে শেষ মুহূর্তের জরুরী কিছু কেনাকাটা করতে। বাড়ির কাছেই সপিংমলে গিয়ে কেনাকাটা শেষ করে বাসর রাতের নববধূকে গিফ্ট দেয়ার জন্য একটি হিরের আংটি কিনে রিং বক্সটি ফেলে তার মানি ব্যাগের এক কোনে কাগজে মুড়ে রাখেন।
রাতে বাসায় গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখেন মানি ব্যাগটি নেই। মাসুম রেজার মাথায় যেন বাজ পড়লো। রাতব্যাপী খোঁজাখুঁজি, থানা-পুলিশ আর জিডি করে মধ্যরাতে ভগ্নহৃদয়ে যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মতো বাড়ি ফিরেন। আত্মীয় আর বন্ধুরা সান্ত¦না দেয় যা হায়িয়েছে তা খুঁজে কোন লাভ নেই, কাল বরযাত্রার আগে অন্য কোন কিছু কেনার পরামর্শ দেন তারা। কিন্তু মাসুম রেজার চিন্তা, মানিব্যাগে শুধু হিরের আংটি আর টাকাই ছিল না, ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ এটিএম কার্ড আর কাগজপত্র। এতে তার লাখ টাকার চেয়েও বেশী ক্ষতি হলো।
কিন্তু কী আর করা, কপাল মন্দ থাকলে যা হয়, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে বর সেজে বিয়ে করে রাতে বাড়ি ফিরেও অস্থির আর দুঃশ্চিন্তাময় তার মুখের দিকে তাকানো যায় না। নববধূর জন্য হিরের আংটি না হয় আরো একটা কেনা যাবে, কিন্তু তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কোথায় পাবো ! মনটা এতোটাই খারাপ ছিল যে সারাদিন বিয়ে বাড়ি, আর কনে উঠিয়ে আনা পর্যন্ত তার কোনো অনুভূতিই ছিল না।
মানিব্যাগ হারানোর চিন্তায় নববধূর জন্য বিকল্প কিছু কিনতেও ভুলে গিয়েছিল মাসুম রেজা। ভারাক্রান্ত মনে বাসর ঘরে ঢুকতেই নববধূ তার মুখখানি দেখে মুচকি হাসি দিয়ে বলেন, ‘কী হলো স্যার, মানিব্যাগ এর খবর কী ? চমকে উঠলেন মাসুম রেজা। তার মানিব্যাগের খবর জানলো কীভাবে !
এদিকে নববধূ তার মানিব্যাগটা বের করে বললো, নাও হিরের আংটিটা পরিয়ে দাও। অনেকটা ভ্যাবাচেকা হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কিছুই তো বুঝতে পারছি না, তোমার কাছে মানিব্যাগ আসলো কীভাবে ? নববধূর উত্তর-আমার এসআই ভাইটি গতকাল রাতে এক পকেটমারকে ধরে এ ব্যাগটি পেয়ে খুলে দেখেন তোমার। তাই সে একটু মজা করার জন্য রাতেই আমার হাতে তুলে দেন। (৩১০ শব্দ)
……………………………………………………………………..

ঠিকানা
লেখক : রফিক মজিদ
ঘড়িতে সময় সকাল সাতটা দশ। রিক্সাওয়ালাকে বল্লাম ভাই একটু জোড়ে চল, সাড়ে সাতটায় ট্রেন, ধরতে না পারলে টিকেট মার। তখনও গুলিস্থানে। হাতে সময় মাত্র কুড়ি মিনিট। পৌছতে পারবো কি ? দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতেই কমলাপুর ষ্টেশনে পৌছলাম। সেইসাথে ট্রেনের হুইসেল পড়ছে। রিকসা ভাড়া দিয়ে ব্যাগটা নিয়ে দৌড়ে কোন রকমে ট্রেনের পেছনের বগিতে উঠে পড়ি। এরপর টিকেট বের করে কোচ নাম্বার দেখে দেখে সিট নাম্বার মিলিয়ে বসি জানালার পাশে। আমার সামনে ও পাশে পুরোটাই সিট খালি ছিল। তবে পাশের লাইলেন সিটে একটি মেয়ে জানালা ঘেষে বসে আছে, সাথে ছোাট্ট একটা ছেলে। সম্ভবত মেয়েটির ভাই। মেয়েটি হয়তো কলেজ পড়–য়া আর ছেলেটা ফোর কিম্বা ফাইভ এ পড়ে। তাদের সাথে কাউকে দেখতে পেলাম না।
কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে প্রকৃতিকে দেখলাম। ঘন কুয়াসা আকাশের নীল হনন করছে। ধানের শীষে শিশির বিন্দুতে রোদ এসে আঁছড়ে পড়ছে। কৃষক সবে মাত্র হাল ধরেছে। হঠাৎ দেখি গাছেল ডালে জোড়া শালিক। পাশের মেয়েটির দিকে তাকাই। ঠোঁট দু’টি হালকা কুয়াসা এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। কি নাম, কোথায় বাড়ি, কি করে কিছুই জানি না !
‘চা নাস্তা দেব’ হঠাৎ ট্রেনের খাবার গাড়ির বেয়ারার ভাষ্য। বল্লাম, নাস্তা না, শুধু চা। এরপর বেয়ারা মেয়েটিকে বলে, আপা চা-নাস্তা লাগবে। মেয়েটি মাথা নেড়ে না বোধন উত্তর দেওয়ায় বেয়ারা চলে গেলেন। মৃদু স্বরে বল্লাম, এসময় চা হলে ভালো লাগতো। এ কথা শুনে মেয়েটি বিরবির করে কি যেন বল্ল বোঝা গেলো না।
সময় পেরুচ্ছে ট্রেন ছুটছে। কিছুক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ট্রেন ছুটছে শাল-গজারির বনের ভিতর দিয়ে দ্রুত গতিতে। আর আমার পাশে উড়ছে বিসৃত চুল, ফিন ফিনে উড়না। হাতে তার সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘আগামী’ আর আমার হাতে ‘এ শতাব্দির প্রেমের কবিতা’।
চা নিয়ে এলো বেয়ারা। এদিকে মেয়েটার ভাই বায়না ধরছে নাস্তা খাবে। মেয়েটি বোঝানোর চেষ্টা করছে এসব নাস্তা ভালো না। কিন্তু মানছে না ছেলেটি। চা শেষ করে বিলটা দিয়ে দিলাম। এসময় বেয়ারাকে বল্লাম ওখানে একটা নাস্তা দাও। কথাটা শুনে মেয়েটা রেগে মুখখানা হিং¤্র দানবের মতো করে বেয়ারার উদ্যেশে বল্ল, ‘লাগবে না বল্লাম’, একথা বলেই কি যেন একটু চিন্তা করে আবার বল্ল, ‘ঠিক আছে শুধু নাস্তা দাও’।
এরপর মেয়েটি আমার দিকে অগ্নিমুর্তি হয়ে তাকালো। তার তাকানো দেখে আমার চোখের পলক পড়ছে না দেখে লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নেয়। এসময় আমার চোখে ছিল সন্ধির প্রস্তার আর তার চোখে ছিল লজ্জার আভাস। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি ময়মনসিংহ জং লেখা। মনে মনে ভাবছিলাম এখানে যদি নেমে যায় নামটা অজানা থাকবে। সরাসরি জিজ্ঞেস করবো, না থাক দেখি কোথায় নামে, এসব কথা ভাবতেই দেখি ট্রেন ছেড়ে দিল। নাহ্ এখানে নামবে না। হয়তো সামনে কোথাও নামবে।
এরমধ্যে বেয়ারা এলো বিল নিতে। আমি বিল দিতে পকেটে হাত দিতেই, মেয়েটি বেয়ারাকে ডেকে বলে, ‘এই এদিকে, বিল আমি দিব’, সেই সাথে আমার উদ্যেশে বল্ল, ‘ধন্যবাদ আমার কাছে টাকা আছে’। কিছু মনে করলাম না। কিছুক্ষণ পিনপতন নিরবতা।
ঝিক ঝিক ট্রেনের শব্দ আর দোলায় মেয়েটির চোখ বুজে যাচ্ছিল একটু পর পর। হয়তো ঘুম পেয়েছে। আমার চোখে ঘুম থাকলেও মেয়েটির চাওনি দেখে তা কেটে গেছে। এবার চোখ বুঝতেই ছেলেটিকে ইশারায় কাছে ডাকলাম। ছেলেটি কাছে আসতেই বল্লাম, ‘তোমার আপুর নাম কি ?’ সবে মাত্র ছেলেটি ক’ বলেছে, অমনি চিলের মতো ছো’ মেরে ছেলেটির মুখ চেপে ধরে তার পাশে বসিয়ে দিল।
ক’ দিয়ে হতে পারে কলি বা কল্পনা, নামটা জানা হলে ক্ষতি কি, সামনেই তো নেমে যাবো। কথাটা বলেই ফেল্লাম সাহস করে। কিন্তু কোন উত্তর নেই। অনেকটা পেছন ফিরে ছেলেটিকে ধরে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো। কি আর করা। শুধু গন্তব্যে শেষ ঠিকানায় পৌছার অপেক্ষা করা ছাড়া করার কিছুই করার নেই আমার।
আমার গন্তব্য জামালপুর। সক্ষিপ্ত পথ। তাও মনে হয় চলে এসেছে। কিন্তু তার আগে যদি নেমে যায় ! ঠিকানা না পেলেও দু:খ নেই অন্তত নামটা জানতে পারলেও হতো। এসব নানা কথা চিন্তা করতেই আবারও জানালা দিয়ে দেখি জামালপুর জং লেখা। মনটা এবার ডুকরে উঠলো। এখন আমরা পাশাপাশি, একটু পর দু’জনের দু’রাস্তা। তাও আবার অজানা। মনটা ভিষন পীড়া দিয়ে উঠলো।
ট্রেনের গতি থামছে, আর আমার হৃদয়ের হার্ট বিট ক্রমেই বাড়ছে। ব্যাগ নিয়ে মেয়েটি উঠে দাড়ালো। আমারও উঠতে হবে। শরীর টা যেন পাথরের মতো ভারি হয়ে গেছে। উঠতে কষ্ট হচ্ছে। এবার গেইট দিয়ে মেয়েটি সোজা নেমে গেলো। হৃদয়ে বড় ছ্যাকা দিয়ে চলে গেলো কসাই মেয়েটি।
এ কথা ভাবতে ভাবতে সিট থেকে উঠতেই চোখ পড়লো মেয়েটির সিটের উপর একটি চিরকুট। বিদ্যুতের গতিতে তুলে নিয়ে পড়তে লাগলাম। ওতে লেখা,‘ আমি কলি বা কল্পনা কোনটাই নই। আমি কবিতা, ফোন-০১৭…..। সরকারী আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর।

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» মোহাম্মদ রবিউল আলম (টুকু)’র পদ্য ‘হায় রে পিঁয়াজ!’

» মইনুল হোসেন প্লাবন’র পদ্য ‘অনন্য পৃথিবী’

» ওষুধের মতো কাজ করে যেসব শাক-সবজি

» সুরের পাখি ‘রুনা লায়লা’র ৬৭তম জন্মদিন আজ

» চট্টগ্রামে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নিহত ৭

» বিপিএলের নিলাম আজ সন্ধ্যায় : প্লেয়ার্স ড্রাফটে ২১ দেশের ৪৩৯ ক্রিকেটার

» বিপিএলের নিলামে জার্মানির ক্রিকেটার!

» সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবসরের বয়স ৬০

» নতুন সড়ক পরিবহন আইন আজ থেকে কার্যকর : কাদের

» শ্রীলংকার নয়া প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে

» শেরপুরে সাবেক ফারমার্স ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতির প্রতিবাদে ঋণগ্রহীতাদের সংবাদ সম্মেলন

» মিসর থেকে কার্গো বিমানে পেঁয়াজের প্রথম চালান আসছে মঙ্গলবার

» প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষা শুরু

» ঢাকাস্থ ‘শেরপুর জেলা সমিতি’র নয়া সভাপতি নজরুল, মহাসচিব রাজ্জাক

» মওলানা ভাসানীর ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

কারিগরি সহযোগিতায় BD iT Zone

,

কবি ও সিনিয়র সাংবাদিক রফিক মজিদ’র গল্পগুচ্ছ

মানবতার ছাতা
লেখক : রফিক মজিদ

বর্ষাকাল তাই বাইরে এই রোদ এই বৃষ্টি। কখন যে হুট করে বৃষ্টি নেমে পড়ে ঠিক নেই। তবুও আজ বাইরে বের হওয়ার সময় ছাতাটা হাতে নেওয়ার মনে ছিল না। বাসা থেকে পায়ে হেঁটে দু’মিনিটের মধ্যেই প্রধান সড়কের মাথায় যাওয়া যায়। বৃষ্টির দিন, তাই রিক্সা পেতে ওই প্রধান সড়কের মাথায় যেতে হবে।
বাসা থেকে বের হয়ে দু’কদম হাঁটতেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। আশপাশে কোন ছাউনি বা গাছ নেই যে আশ্রয় নিব। কী আর করা, হাঁটার গতি বাড়াতেই পেছন থেকে কে যেন আমার মাথার উপর ছাতা ধরলো।
পাশে চেয়ে দেখি অচেনা মুখের এক তরুণী। তার সাথে ব্যাগ এবং পোশাক দেখে মনে হলো মেয়েটি কলেজ পড়ুয়া। মাথার উপর ছাতা ধরেই বলেন, ‘চলুন আপনাকে রাস্তার মোড়ে পৌঁছে দিই’। হুট করেই যেমন বৃষ্টি, তেমনি হুট করেই মাথার উপর ছাতা। কোন চিন্তা করতে পারছি না, মেয়েটা কে ? চেনা-জানা না হলে কি আমার মাথায় ছাতা ধরবে ! জিজ্ঞেস করবো কী না, কে তুমি ? এসব নানা কথা ভাবছি আর পথ চলছি।
মেয়েটিকে লক্ষ্য করছি, সে নিজে ভিজে আমাকে ভিজতে দিচ্ছে না। এদিকে বৃষ্টি’র গতিও কমতে শুরু করেছে। এভাবে এক কদম, দুই কদম হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম প্রধান সড়কের মোড়ে। এরইমধ্যে বৃষ্টিও থেমে গেছে।
এসময় মেয়েটি ছাতাটা নামিয়ে বললো, ‘আঙ্কেল চলি, ভাল থাকবেন।’ একথা বলেই রিক্সায় চড়ে বসে মেয়েটি। এসময় আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আঙ্কেল ডাকলে অথচ চিনলাম না !’ তখন মেয়েটি বললো, ‘আপনার মনে নেই, কিন্তু আমার ঠিক মনে আছে, প্রায় ৫/৬ বছর আগে হসপিটালে আমার মা আর আমি ছোট বোনকে নিয়ে ডাক্তারের জন্য চিৎকার-ছুটাছুটি করছিলাম। তখন আপনি হাসপাতালে কোন রিপোটিং-এ এসে আমাদের অসহায় অবস্থায় দেখে দ্রুত ডাক্তার দেখানো এবং বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আমাদের যে উপকার করেছিলেন, তা ভুলি নাই। সেদিন আপনি আমাদের মাথার উপর যে মানবতার ছাতা ধরে ছিলেন, সে তুলনায় আজ আপনার মাথায় বৃষ্টি ফেরাতে ছাতা ধরাটা সামান্য বিষয়। সেদিন আমি নবম শ্রেণিতে পড়তাম, এখন অনার্স ফাস্ট ইয়ারে। ওকে, খোদা হাফেজ, ভাল থাকবেন…। (৩০৮ শব্দ)
……………………………………………………………………..

মানিব্যাগ
লেখক : রফিক মজিদ
মাসুম রেজা ৬ মাস আগে একটি আইটি ফার্ম-এ চাকুরি নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন। কাল বিয়ে, তাই আজ গায়ে হলুদ শেষে সন্ধ্যায় বেড়িয়েছে শেষ মুহূর্তের জরুরী কিছু কেনাকাটা করতে। বাড়ির কাছেই সপিংমলে গিয়ে কেনাকাটা শেষ করে বাসর রাতের নববধূকে গিফ্ট দেয়ার জন্য একটি হিরের আংটি কিনে রিং বক্সটি ফেলে তার মানি ব্যাগের এক কোনে কাগজে মুড়ে রাখেন।
রাতে বাসায় গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখেন মানি ব্যাগটি নেই। মাসুম রেজার মাথায় যেন বাজ পড়লো। রাতব্যাপী খোঁজাখুঁজি, থানা-পুলিশ আর জিডি করে মধ্যরাতে ভগ্নহৃদয়ে যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের মতো বাড়ি ফিরেন। আত্মীয় আর বন্ধুরা সান্ত¦না দেয় যা হায়িয়েছে তা খুঁজে কোন লাভ নেই, কাল বরযাত্রার আগে অন্য কোন কিছু কেনার পরামর্শ দেন তারা। কিন্তু মাসুম রেজার চিন্তা, মানিব্যাগে শুধু হিরের আংটি আর টাকাই ছিল না, ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ এটিএম কার্ড আর কাগজপত্র। এতে তার লাখ টাকার চেয়েও বেশী ক্ষতি হলো।
কিন্তু কী আর করা, কপাল মন্দ থাকলে যা হয়, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে বর সেজে বিয়ে করে রাতে বাড়ি ফিরেও অস্থির আর দুঃশ্চিন্তাময় তার মুখের দিকে তাকানো যায় না। নববধূর জন্য হিরের আংটি না হয় আরো একটা কেনা যাবে, কিন্তু তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কোথায় পাবো ! মনটা এতোটাই খারাপ ছিল যে সারাদিন বিয়ে বাড়ি, আর কনে উঠিয়ে আনা পর্যন্ত তার কোনো অনুভূতিই ছিল না।
মানিব্যাগ হারানোর চিন্তায় নববধূর জন্য বিকল্প কিছু কিনতেও ভুলে গিয়েছিল মাসুম রেজা। ভারাক্রান্ত মনে বাসর ঘরে ঢুকতেই নববধূ তার মুখখানি দেখে মুচকি হাসি দিয়ে বলেন, ‘কী হলো স্যার, মানিব্যাগ এর খবর কী ? চমকে উঠলেন মাসুম রেজা। তার মানিব্যাগের খবর জানলো কীভাবে !
এদিকে নববধূ তার মানিব্যাগটা বের করে বললো, নাও হিরের আংটিটা পরিয়ে দাও। অনেকটা ভ্যাবাচেকা হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কিছুই তো বুঝতে পারছি না, তোমার কাছে মানিব্যাগ আসলো কীভাবে ? নববধূর উত্তর-আমার এসআই ভাইটি গতকাল রাতে এক পকেটমারকে ধরে এ ব্যাগটি পেয়ে খুলে দেখেন তোমার। তাই সে একটু মজা করার জন্য রাতেই আমার হাতে তুলে দেন। (৩১০ শব্দ)
……………………………………………………………………..

ঠিকানা
লেখক : রফিক মজিদ
ঘড়িতে সময় সকাল সাতটা দশ। রিক্সাওয়ালাকে বল্লাম ভাই একটু জোড়ে চল, সাড়ে সাতটায় ট্রেন, ধরতে না পারলে টিকেট মার। তখনও গুলিস্থানে। হাতে সময় মাত্র কুড়ি মিনিট। পৌছতে পারবো কি ? দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতেই কমলাপুর ষ্টেশনে পৌছলাম। সেইসাথে ট্রেনের হুইসেল পড়ছে। রিকসা ভাড়া দিয়ে ব্যাগটা নিয়ে দৌড়ে কোন রকমে ট্রেনের পেছনের বগিতে উঠে পড়ি। এরপর টিকেট বের করে কোচ নাম্বার দেখে দেখে সিট নাম্বার মিলিয়ে বসি জানালার পাশে। আমার সামনে ও পাশে পুরোটাই সিট খালি ছিল। তবে পাশের লাইলেন সিটে একটি মেয়ে জানালা ঘেষে বসে আছে, সাথে ছোাট্ট একটা ছেলে। সম্ভবত মেয়েটির ভাই। মেয়েটি হয়তো কলেজ পড়–য়া আর ছেলেটা ফোর কিম্বা ফাইভ এ পড়ে। তাদের সাথে কাউকে দেখতে পেলাম না।
কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে প্রকৃতিকে দেখলাম। ঘন কুয়াসা আকাশের নীল হনন করছে। ধানের শীষে শিশির বিন্দুতে রোদ এসে আঁছড়ে পড়ছে। কৃষক সবে মাত্র হাল ধরেছে। হঠাৎ দেখি গাছেল ডালে জোড়া শালিক। পাশের মেয়েটির দিকে তাকাই। ঠোঁট দু’টি হালকা কুয়াসা এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। কি নাম, কোথায় বাড়ি, কি করে কিছুই জানি না !
‘চা নাস্তা দেব’ হঠাৎ ট্রেনের খাবার গাড়ির বেয়ারার ভাষ্য। বল্লাম, নাস্তা না, শুধু চা। এরপর বেয়ারা মেয়েটিকে বলে, আপা চা-নাস্তা লাগবে। মেয়েটি মাথা নেড়ে না বোধন উত্তর দেওয়ায় বেয়ারা চলে গেলেন। মৃদু স্বরে বল্লাম, এসময় চা হলে ভালো লাগতো। এ কথা শুনে মেয়েটি বিরবির করে কি যেন বল্ল বোঝা গেলো না।
সময় পেরুচ্ছে ট্রেন ছুটছে। কিছুক্ষণ জানালার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ট্রেন ছুটছে শাল-গজারির বনের ভিতর দিয়ে দ্রুত গতিতে। আর আমার পাশে উড়ছে বিসৃত চুল, ফিন ফিনে উড়না। হাতে তার সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘আগামী’ আর আমার হাতে ‘এ শতাব্দির প্রেমের কবিতা’।
চা নিয়ে এলো বেয়ারা। এদিকে মেয়েটার ভাই বায়না ধরছে নাস্তা খাবে। মেয়েটি বোঝানোর চেষ্টা করছে এসব নাস্তা ভালো না। কিন্তু মানছে না ছেলেটি। চা শেষ করে বিলটা দিয়ে দিলাম। এসময় বেয়ারাকে বল্লাম ওখানে একটা নাস্তা দাও। কথাটা শুনে মেয়েটা রেগে মুখখানা হিং¤্র দানবের মতো করে বেয়ারার উদ্যেশে বল্ল, ‘লাগবে না বল্লাম’, একথা বলেই কি যেন একটু চিন্তা করে আবার বল্ল, ‘ঠিক আছে শুধু নাস্তা দাও’।
এরপর মেয়েটি আমার দিকে অগ্নিমুর্তি হয়ে তাকালো। তার তাকানো দেখে আমার চোখের পলক পড়ছে না দেখে লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নেয়। এসময় আমার চোখে ছিল সন্ধির প্রস্তার আর তার চোখে ছিল লজ্জার আভাস। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি ময়মনসিংহ জং লেখা। মনে মনে ভাবছিলাম এখানে যদি নেমে যায় নামটা অজানা থাকবে। সরাসরি জিজ্ঞেস করবো, না থাক দেখি কোথায় নামে, এসব কথা ভাবতেই দেখি ট্রেন ছেড়ে দিল। নাহ্ এখানে নামবে না। হয়তো সামনে কোথাও নামবে।
এরমধ্যে বেয়ারা এলো বিল নিতে। আমি বিল দিতে পকেটে হাত দিতেই, মেয়েটি বেয়ারাকে ডেকে বলে, ‘এই এদিকে, বিল আমি দিব’, সেই সাথে আমার উদ্যেশে বল্ল, ‘ধন্যবাদ আমার কাছে টাকা আছে’। কিছু মনে করলাম না। কিছুক্ষণ পিনপতন নিরবতা।
ঝিক ঝিক ট্রেনের শব্দ আর দোলায় মেয়েটির চোখ বুজে যাচ্ছিল একটু পর পর। হয়তো ঘুম পেয়েছে। আমার চোখে ঘুম থাকলেও মেয়েটির চাওনি দেখে তা কেটে গেছে। এবার চোখ বুঝতেই ছেলেটিকে ইশারায় কাছে ডাকলাম। ছেলেটি কাছে আসতেই বল্লাম, ‘তোমার আপুর নাম কি ?’ সবে মাত্র ছেলেটি ক’ বলেছে, অমনি চিলের মতো ছো’ মেরে ছেলেটির মুখ চেপে ধরে তার পাশে বসিয়ে দিল।
ক’ দিয়ে হতে পারে কলি বা কল্পনা, নামটা জানা হলে ক্ষতি কি, সামনেই তো নেমে যাবো। কথাটা বলেই ফেল্লাম সাহস করে। কিন্তু কোন উত্তর নেই। অনেকটা পেছন ফিরে ছেলেটিকে ধরে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো। কি আর করা। শুধু গন্তব্যে শেষ ঠিকানায় পৌছার অপেক্ষা করা ছাড়া করার কিছুই করার নেই আমার।
আমার গন্তব্য জামালপুর। সক্ষিপ্ত পথ। তাও মনে হয় চলে এসেছে। কিন্তু তার আগে যদি নেমে যায় ! ঠিকানা না পেলেও দু:খ নেই অন্তত নামটা জানতে পারলেও হতো। এসব নানা কথা চিন্তা করতেই আবারও জানালা দিয়ে দেখি জামালপুর জং লেখা। মনটা এবার ডুকরে উঠলো। এখন আমরা পাশাপাশি, একটু পর দু’জনের দু’রাস্তা। তাও আবার অজানা। মনটা ভিষন পীড়া দিয়ে উঠলো।
ট্রেনের গতি থামছে, আর আমার হৃদয়ের হার্ট বিট ক্রমেই বাড়ছে। ব্যাগ নিয়ে মেয়েটি উঠে দাড়ালো। আমারও উঠতে হবে। শরীর টা যেন পাথরের মতো ভারি হয়ে গেছে। উঠতে কষ্ট হচ্ছে। এবার গেইট দিয়ে মেয়েটি সোজা নেমে গেলো। হৃদয়ে বড় ছ্যাকা দিয়ে চলে গেলো কসাই মেয়েটি।
এ কথা ভাবতে ভাবতে সিট থেকে উঠতেই চোখ পড়লো মেয়েটির সিটের উপর একটি চিরকুট। বিদ্যুতের গতিতে তুলে নিয়ে পড়তে লাগলাম। ওতে লেখা,‘ আমি কলি বা কল্পনা কোনটাই নই। আমি কবিতা, ফোন-০১৭…..। সরকারী আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর।

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

কারিগরি সহযোগিতায় BD iT Zone

error: Content is protected !!