প্রকাশকাল: 5 সেপ্টেম্বর, 2015

আলীকদমে হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের ঐতিহ্য

SAMSUNG

SAMSUNG

হাসান মাহমুদ, আলীকদম (বান্দরবান) : ‘ওয়াহ্ আম্যাহ্ খাহ্তে। তৌংমা ইয়াংগা পোঁইং ক্রীং মিহিংব্যা। জিহ্মা ওয়ানা লৌহ্চ ওয়াইং আম্যা মহ্চোয়াইংব্যা। ঙো‏েরামাহ্ আগুহ্ লৌচারি মিহিংব্যা। ইঙ্গো থিংপো মোনইংব্যা’। মার্মা ভাষায় বলা এই কথাগুলোর অর্থ হচ্ছে, বাঁশের দাম বেশি। পাহাড়ে আগের মত বেত নেই। বাজারে জিনিস পত্রের চাহিদা নেই। আমরা এখন বেকার হয়ে গেছি। সংসার চালাতে পারিনা। কথাগুলো বলছিলেন আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া গ্রামের বিধবা গৃহীনি হ্লাচিংউ মার্মা। একসময় আলীকদম উপজেলার মার্মা পাড়াগুলোতে ঢুকলে প্রায় পতিটি বাড়িতেই দেখা মিলতো বাঁশ আর বেত শিল্পের নিপুন কারুকার্য খচিত নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সব দ্রব্যাদি। কিন্তু এখন আর নেই সেসব কাজের বালাই। বাঁশ-বেত নির্ভর নৃ-গোষ্ঠির মানুষগুলো এখন বেকার। জীবনের প্রয়োজনে অনেকেই বেছে নিয়েছে ভিন্ন পেশা। কিন্তু বাপদাদার ঐতিহ্যকে ভুলতে পেরেছে কজন? এখনো এদের অনেকেই তাদের বাপদাদার ঐতিহ্যবাহী সেই পেশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে ব্যাকুল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে তাদের সেই ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্প এখন অনেকটাই বিলুপ্ত প্রায়। সরকারের উদাসিনতা এবং বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখন তা আলেয়া হয়েই বেঁচে আছে। বাপ-দাদাদের সেই পুরানো পেষাকে আঁকড়ে ধরে আছে নামমাত্র ক’টি পরিবার।
আলীকদম ২নং চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের নয়াপাড়ায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এক সময় যারা সম্পূর্ণ বাঁশ-বেত নির্ভর ছিলো, আজ তারা প্রায় সকলেই অন্যান্য পেষায় জড়িয়ে পড়েছে। এ গ্রামে প্রায় এক’শ ষোলটি পরিবার রয়েছে যার প্রাতিটি পরিবারই এক সময় বাঁশ-বেত শিল্প নির্ভর ছিলো। কিন্তু বর্তমানে কাঁচামালের সংকট ও প্রতিকুল বাজার মূল্যের সাথে প্রতিযোগীতা দিয়ে টিকে থাকতে না পেরে আস্তে আস্তে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছে একসময়কার এই পেষায় নির্ভর অনেকগুলো পরিবার। নামমাত্র দুএকটি পরিবার দেখা গেছে, যেখানে শুধু মাত্র বাঁশের তৈরি চাটাই তৈরি করতে দেখা গেছে। কথা বলেছিলাম সেই দুএকটি পরিবারের গৃহ কর্তাদের সাথে। মার্মা ভাষায় তাদের বলা কথাগুলো অর্থ দাড়ায় এমন, এক সময় আমাদের তৈরীকৃত তলই, চাটাই, মোড়া, ডালা, কুলা, চালুন, খাঁচি, ও অন্যান্য বাঁশ-বেতের তৈরি করা জিনিস পত্র বহুল প্রচলন ছিলো। কিন্তু সরকারের উদাশীনতার কারনে আজ তা বিলুপ্ত হতে চলেছে। সরকারী বা বেসরকারী উদ্ধ্যোক্তাদের এসব বিষয় নিয়ে কোন প্রকার মাথা ব্যথা নেই। এই জনগোষ্ঠর জন্য সহজ শর্তে কোন ঋণের সুবিধা নেই। এসব কারণে আমরা এই শিল্পের প্রষার ঘটাতে পারিনা। এখন শুধু আমরা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অন্যান্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে কিছু কিছু জিনিসপত্র তৈরি করে থাকি। আমরা যেসব জিনিসপত্র তৈরি করি বর্তমান বাজারের প্রযুক্তিগতভাবে উদ্ভাবিত জিনিস পত্রের কাছে সেসব জিনিস মূল্যহীন। বাজারে নিয়ে গেলে কেউ দর করেনা। তছাড়া বাঁশের দাম আগের তুলনায় আনেকগুন বেশি এবং পাহাড়ে আগের মত বেত পাওয়া য়ায় না। তাই কোন উপায় না পেয়ে জীবন বাঁচাতে অন্য কাজ বেছে নিচ্ছে সবাই।
এবিষয়ে কথা বলেছিলাম আলীকদম উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান শিরিন আক্তার রোকসানার সাথে। তিনি জানান, বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসপত্রগুলোতো আসলে আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয়। তাছাড়া এসবের মধ্যে লুকায়িত রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের লোক ঐতিহ্য। এগুলোকে আরো বেশী সরকারী ও বেসরকারী সহযোগিতা করা প্রয়োজন। সরকারী-বেসরকারী উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা পেলে এই শিল্প পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আমি আশা করি। তিনি ব্যাংক ও সরকারী কর্মকর্তাদের এই শিল্পগুলোর প্রতি আরো বেশী সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
উপজেলা শিক্ষা তত্ত্ববধায়ক উইলিয়াম মার্মা বলেন, বাঁশ-বেত শিল্প একটি নান্দনিকতার বহিঃপ্রকাশ। তাছাড়া এই শিল্পটা বেঁচে থাকলে কিছু মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে এবং হারিয়ে যাওয়া শিল্পটা আবার পূণরোজ্জীবিত হবে। নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সমুন্নত হবে। সুতরাং এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিশেষ করে বেসরকারী উদ্যোক্তাদেরকে এগিয়ে আসার জন্য আমি অনুরোধ করব।
অন্যদিকে উপজেলার বাবুপাড়ার কারবারী আবুমং মার্মা জানান, এজনগোষ্ঠীর পুরুষরা বাহিরের কাজ করে। আর নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি গৃহ¯া’লির সকল কাজের পাশাপাশি বাঁশ-বেতের কাজ করে পরিবারকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু পুরুষদের যে আয় তাতে সংসার চালিয়ে নারীদেরকে বাঁশ-বেতের কাজ করার খরচ যোগান দেয়া কষ্টসাধ্য ব্যপার। পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক পরিবারই এ পেশা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পরেছে। তাই আমি মনে করি, সরকারী ও বেসরকারী উদ্ধ্যোক্তাদের এবিষয়ে সু-নজর দেয়া উচিৎ।
নৈশগ্রীগক সৌন্দর্যের লীলাভুমি, পর্বতরাজি পরিবেষ্টিত পার্বত্য জনপদের এ আলীকদম উপজেলা সম্ভাবনাময় পর্যটন নগরী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। তাই নৃ-গোষ্ঠীর বাঁশ-বেত শিল্পের উন্নয়ন হলে উৎপাদিত বাঁশ-বেতের জিনিসপত্র দেশী ও বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে বলে বিশিষ্ট জনদের অভিমত এবং এখাত থেকে প্রচুর পরিমানে সরকারের রাজস্ব ও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও অনেকে ধারণা করেন।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!