রাত ১২:২৬ | মঙ্গলবার | ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

অস্তিত্ব সংকটে শেরপুরের ‘বর্মন পল্লীর’ বাসিন্দারা

মোঃ হাসানুল বান্না সিফাত, শেরপুর ॥ ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সীমান্তবর্তী ক্ষুদে জেলা শেরপুর। এরই অর্ন্তগত শ্রীবরদী উপজেলার রাণীশিমুল ইউনিয়নের ছায়া-সুনিবির একটি প্রত্যন্ত গ্রাম মধ্য রাণীশিমুল বা ‘বর্মন পল্লী’। এখানেই অনাদিকাল ধরে বর্মন বা রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে আসছে। আর এ কারণেই এর বিশেষ পরিচিতি ‘বর্মন পল্লী’ হিসেবে। তবে নানামাত্রিক কারণে অন্যসব সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেক বেশি পিছিয়ে রয়েছে এ সম্প্রদায়। আধুনিকতার ছোঁয়া তাদের স্পর্শ করেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের এ যুগেও পশ্চাদপৎ।
বৃহত্তর জনগোষ্ঠির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব সারাদেশে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই ছিলো, বর্তমানেও রয়েছে। এরা এর ব্যতিক্রম নয়। বর্মনরা সনাতন ধর্মের অনুসারী হলেও অন্যান্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অনেকাংশে রয়েছে মতপার্থক্য। তেমনি রয়েছে তাদের আলাদা-আলাদা কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক ব্যবস্থা, নিয়ম-কানুন ও রীতি-নীতির। কিন্তু তাদের জনসংখ্যা ও বাসভূমির পরিধি এতই কম যে বর্তমানে ‘বর্মন গোত্র’ বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।

img-add

খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী অর্থাৎ বৃটিশ শাসনামল বা তারপর অবিভক্ত ভারতের সময়ে এ অঞ্চল ছিলো সনাতন ধর্মাবলম্বী ‘বর্মন সম্প্রদায়’ অধ্যুষিত। কালের আবর্তে নানাবিধ সমস্যার বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে ধীরে ধীরে সুবিধামতো জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ায় এখানে অবশিষ্ট মাত্র ৩৩১টি ‘বর্মন’ পরিবার। তাদের লোক সংখ্যা মাত্র ১১’শ। জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত এই মানুষগুলোর রয়েছে নানা সমস্যা ও অভাবনীয় দুর্ভোগ। ফলে কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি-ঐতিহ্য। বলা যায়, বর্মন সংস্কৃতি বর্তমানে সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রমের পাশাপাশি চরম সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় শংকিত।
প্রাচীন কাল থেকেই বর্মন বা রাজবংশীরা বংশানুক্রমে কৃষিভিত্তিক ও গ্রামকেন্দ্রিক। কৃষিই তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ হিসেবে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের রক্ত চক্ষু, বৈরী আচরণ, শোষণ-বঞ্চনা ও জীবনের নানা ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। আর ওইসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে না পেরে দিন-দিন তাদের সংখ্যা কমে আসছে। দারিদ্র্যতা, অশিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় বাপ-দাদার ভিটা-মাটি অতি অল্প মূল্যে বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই সর্বশান্ত হয়ে দারিদ্রতাকে সাথে নিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্যে শহর মুখে চলে যাচ্ছে। আর যারা এখনও কৃষি ক্ষেত্রে জড়িত, তারাও প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা কারণে ক্রমাগত ক্ষেতের ফসল নষ্ট হওয়ায় ধীরে ধীরে ক্ষতির দিকে যাচ্ছে। তবুও তাদের লড়াই বেঁচে থাকার। তারপরও থেমে নেই নিরন্তর পথ চলা। ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র জাতিসত্বার বর্মনরা পান না কোন সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা। ফলে দরিদ্র বর্মনরা বঞ্চিত হচ্ছে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে।
বর্তমান সরকারের ‘সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা’ ব্যবস্থার আজও প্রতিফলন ঘটেনি বর্মন পল্লীতে। ‘বর্মন পল্লী’র আশেপাশে নেই কোন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের লেখাপড়ার জন্য যেতে হয় অনেক দূরপথ হেটে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে দূরের পথ হেটে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যাওয়া অনেকটাই কষ্টসাধ্য। ফলে স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যেতে চায় না। আর এভাবেই ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের অনিহা দিন দিন বাড়তে থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোতে পারছে না তারা। প্রাথমিক শিক্ষায় ঝড়ে পড়ার কারণে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বর্মন সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা। শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকায় চাকুরি-বাকুরিতেও পিছিয়ে রয়েছে তারা। শিক্ষা সুবিধাবঞ্চিত এ জনগোষ্ঠির একদিকে যেমন দারিদ্রতা অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বাল্যবিয়ে একদিকে যেমন শিশু-কিশোরদের মানবাধিকার লঙ্ঘন তেমনি সুন্দর শৈশব-কৈশোরের সমাপ্তি ঘটাচ্ছে। প্রতিনিয়ত হরণ হচ্ছে তাদের নিজস্ব পছন্দ ও স্বাধীনতা। পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিকাশের অধিকার ও সুযোগ খর্ব হচ্ছে।
অল্প বয়সে বিয়ে ও অপ্রাপ্ত গর্ভধারণের ফলে মা ও শিশু উভয়ই অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া দাম্পত্য জীবনেও ঘটছে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা। বর্মন পল্লীতে আজও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা আজও শতভাগ নিশ্চিত না হওয়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে গোটা বর্মন পরিবারগুলো। তাদের মৌলিক মানবিক চাহিদা পুরণের ব্যবস্থা খুব সামান্য বলা যায়। সরকারি সাহায্য সহযোগিতার বেলায় তারা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। বর্মন পল্লীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, পঙ্গু ভাতা ও মাতৃকালিন ভাতা কোন প্রকার সহযোগিতা মিলছে না তাদের। একটা কার্ডের জন্য জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও টাকা পয়সা ছাড়া মিলছে না কার্ড। এ বিষয়ে বর্মন পল্লীর বাসিন্দা দিগেন্দ্র চন্দ্র বর্মন (৯০) সুভাস গোস্বামী বর্মন (৮৯), সৃষ্টিরাণী বর্মন (৮২) জানান, আমরা ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠির মানুষ হওয়ায় আমাদের তেমন খোঁজ-খবর রাখেন না কেউ। আমাদের স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা অভাব ও সুপেয় খাবার পানির সংকট প্রায় সারা বছর লেগেই থাকে।
বর্মন পল্লীতে সরকারের নানা সুবিধা প্রদানে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে রানীশিমুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা জানান, এসব আমার জানা ছিলো না। যারা বয়স্ক-বিধবা ভাতার কার্ড পায়নি তাদের শিগগিরই কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা করব।
এদিকে কয়েক বছর আগে বর্মন পল্লীর নিতাই বর্মনের বড় ছেলে প্রদীপ বর্মন (১৫) হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের প্রায় বছরখানেক পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান বের করতে পারেনি তার। ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বর্মন পল্লীর বাসিন্দারা। এতে সামাজিকভাবেও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছেন তারা। দারিদ্র্যতার কষাঘাতে নিষ্পেষিত বর্মন পল্লীতে কোন শ্মশান ঘাট না থাকায় কেউ মারা গেলে তার লাশ সৎকার করা কঠিন হয়ে পড়ে। পোহাতে হয় ভোগান্তি। তাই ভুক্তভোগী বর্মন সম্প্রদায়ের দাবি, তাদের প্রতি বৈষম্য নিরসনের পাশাপাশি সরকারিভাবে যেন একখণ্ড জমি শ্মশানের জন্য দ্রুত বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা হয়।
এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতি ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এডভোকেট রফিকুল ইসলাম আধার বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গঠনের ক্ষেত্রে সকল জাতিসত্তার সার্বিক উন্নয়নে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু স্থানীয় দায়িত্বশীলদের উদাসিনতায় সেসকল বাস্তবমুখী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ছোঁয়া লাগেনি অবহেলিত এ অঞ্চলের বর্মন পল্লীতে। তাই বর্মনদের অধিকার আদায়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের সার্বিক উন্নয়নে সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। এছাড়া বর্মনদের অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্বের বিকাশ, শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নিতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা আক্তার জানান, আমি কিছুদিন আগে শ্রীবরদীর দায়িত্ব নিয়েছি। আমি এ বিষয়ে তেমন অবগত ছিলাম না। আমি ওই ইউনিয়নের ‘বর্মন পল্লী’ পরিদর্শন করে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবো।

Print Friendly, PDF & Email
এ সংক্রান্ত আরও খবর

অন্যান্য সংবাদ



সর্বশেষ খবর



» শেরপুরে পাসপোর্ট ভবনের জমি অধিগ্রহণের চেক বিতরণ ও দখল হস্তান্তর অনুষ্ঠিত

» নালিতাবাড়ীতে শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন পালিত

» শেরপুরে শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে জেলা যুব মহিলা লীগের দোয়া ও আলোচনা

» শেরপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে শহর আওয়ামী লীগের দোয়া ও আলোচনা

» শেরপুরে শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া, মিলাদ ও আলোচনা সভা

» হুইপ আতিকের রোগমুক্তি কামনায় শেরপুর প্রেসক্লাবে দোয়া মাহফিল

» শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি বৈঠক ডিসেম্বরে

» শ্রীবরদীতে আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস পালিত

» দেশে করোনায় আরও ৩২ জনের মৃত্যু

» শেরপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলক্ষে দোয়া ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

» শ্রীবরদীতে নির্যাতিত গৃহকর্মীর পাশে উপজেলা প্রশাসন

» নকলায় আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস উদযাপন উপলক্ষে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা

» প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৪তম জন্মদিন আজ

» ৪ গোলের মালা পরিয়ে বার্সায় শুরু কোমানের

» শেরপুরে শৌচাগারে ধর্ষকদের ছবি লাগিয়ে ছাত্রলীগের প্রতিবাদ

সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

  রাত ১২:২৬ | মঙ্গলবার | ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

অস্তিত্ব সংকটে শেরপুরের ‘বর্মন পল্লীর’ বাসিন্দারা

মোঃ হাসানুল বান্না সিফাত, শেরপুর ॥ ইতিহাস-ঐতিহ্যের লীলাভূমি সীমান্তবর্তী ক্ষুদে জেলা শেরপুর। এরই অর্ন্তগত শ্রীবরদী উপজেলার রাণীশিমুল ইউনিয়নের ছায়া-সুনিবির একটি প্রত্যন্ত গ্রাম মধ্য রাণীশিমুল বা ‘বর্মন পল্লী’। এখানেই অনাদিকাল ধরে বর্মন বা রাজবংশী সম্প্রদায়ের লোকজন বসবাস করে আসছে। আর এ কারণেই এর বিশেষ পরিচিতি ‘বর্মন পল্লী’ হিসেবে। তবে নানামাত্রিক কারণে অন্যসব সম্প্রদায়ের তুলনায় অনেক বেশি পিছিয়ে রয়েছে এ সম্প্রদায়। আধুনিকতার ছোঁয়া তাদের স্পর্শ করেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও তারা জ্ঞান-বিজ্ঞানের এ যুগেও পশ্চাদপৎ।
বৃহত্তর জনগোষ্ঠির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব সারাদেশে সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই ছিলো, বর্তমানেও রয়েছে। এরা এর ব্যতিক্রম নয়। বর্মনরা সনাতন ধর্মের অনুসারী হলেও অন্যান্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে অনেকাংশে রয়েছে মতপার্থক্য। তেমনি রয়েছে তাদের আলাদা-আলাদা কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ভাষা, বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক ব্যবস্থা, নিয়ম-কানুন ও রীতি-নীতির। কিন্তু তাদের জনসংখ্যা ও বাসভূমির পরিধি এতই কম যে বর্তমানে ‘বর্মন গোত্র’ বা সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব হুমকির মুখে।

img-add

খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী অর্থাৎ বৃটিশ শাসনামল বা তারপর অবিভক্ত ভারতের সময়ে এ অঞ্চল ছিলো সনাতন ধর্মাবলম্বী ‘বর্মন সম্প্রদায়’ অধ্যুষিত। কালের আবর্তে নানাবিধ সমস্যার বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে ধীরে ধীরে সুবিধামতো জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ায় এখানে অবশিষ্ট মাত্র ৩৩১টি ‘বর্মন’ পরিবার। তাদের লোক সংখ্যা মাত্র ১১’শ। জীবন সংগ্রামে পর্যুদস্ত এই মানুষগুলোর রয়েছে নানা সমস্যা ও অভাবনীয় দুর্ভোগ। ফলে কালের আবর্তে হারিয়ে গেছে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি-ঐতিহ্য। বলা যায়, বর্মন সংস্কৃতি বর্তমানে সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রমের পাশাপাশি চরম সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় শংকিত।
প্রাচীন কাল থেকেই বর্মন বা রাজবংশীরা বংশানুক্রমে কৃষিভিত্তিক ও গ্রামকেন্দ্রিক। কৃষিই তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পথ। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ হিসেবে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের রক্ত চক্ষু, বৈরী আচরণ, শোষণ-বঞ্চনা ও জীবনের নানা ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। আর ওইসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে না পেরে দিন-দিন তাদের সংখ্যা কমে আসছে। দারিদ্র্যতা, অশিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় বাপ-দাদার ভিটা-মাটি অতি অল্প মূল্যে বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অনেকেই সর্বশান্ত হয়ে দারিদ্রতাকে সাথে নিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্যে শহর মুখে চলে যাচ্ছে। আর যারা এখনও কৃষি ক্ষেত্রে জড়িত, তারাও প্রাকৃতিক বিপর্যয়সহ নানা কারণে ক্রমাগত ক্ষেতের ফসল নষ্ট হওয়ায় ধীরে ধীরে ক্ষতির দিকে যাচ্ছে। তবুও তাদের লড়াই বেঁচে থাকার। তারপরও থেমে নেই নিরন্তর পথ চলা। ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র জাতিসত্বার বর্মনরা পান না কোন সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা। ফলে দরিদ্র বর্মনরা বঞ্চিত হচ্ছে সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে।
বর্তমান সরকারের ‘সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা’ ব্যবস্থার আজও প্রতিফলন ঘটেনি বর্মন পল্লীতে। ‘বর্মন পল্লী’র আশেপাশে নেই কোন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়। কোমলমতি শিশু-কিশোরদের লেখাপড়ার জন্য যেতে হয় অনেক দূরপথ হেটে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে দূরের পথ হেটে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যাওয়া অনেকটাই কষ্টসাধ্য। ফলে স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যেতে চায় না। আর এভাবেই ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের অনিহা দিন দিন বাড়তে থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোতে পারছে না তারা। প্রাথমিক শিক্ষায় ঝড়ে পড়ার কারণে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বর্মন সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা। শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে থাকায় চাকুরি-বাকুরিতেও পিছিয়ে রয়েছে তারা। শিক্ষা সুবিধাবঞ্চিত এ জনগোষ্ঠির একদিকে যেমন দারিদ্রতা অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে বাল্যবিয়ে একদিকে যেমন শিশু-কিশোরদের মানবাধিকার লঙ্ঘন তেমনি সুন্দর শৈশব-কৈশোরের সমাপ্তি ঘটাচ্ছে। প্রতিনিয়ত হরণ হচ্ছে তাদের নিজস্ব পছন্দ ও স্বাধীনতা। পুষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিকাশের অধিকার ও সুযোগ খর্ব হচ্ছে।
অল্প বয়সে বিয়ে ও অপ্রাপ্ত গর্ভধারণের ফলে মা ও শিশু উভয়ই অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। এছাড়া দাম্পত্য জীবনেও ঘটছে নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা। বর্মন পল্লীতে আজও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা আজও শতভাগ নিশ্চিত না হওয়ায় স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে গোটা বর্মন পরিবারগুলো। তাদের মৌলিক মানবিক চাহিদা পুরণের ব্যবস্থা খুব সামান্য বলা যায়। সরকারি সাহায্য সহযোগিতার বেলায় তারা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। বর্মন পল্লীর বাসিন্দাদের অভিযোগ, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, পঙ্গু ভাতা ও মাতৃকালিন ভাতা কোন প্রকার সহযোগিতা মিলছে না তাদের। একটা কার্ডের জন্য জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও টাকা পয়সা ছাড়া মিলছে না কার্ড। এ বিষয়ে বর্মন পল্লীর বাসিন্দা দিগেন্দ্র চন্দ্র বর্মন (৯০) সুভাস গোস্বামী বর্মন (৮৯), সৃষ্টিরাণী বর্মন (৮২) জানান, আমরা ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠির মানুষ হওয়ায় আমাদের তেমন খোঁজ-খবর রাখেন না কেউ। আমাদের স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা অভাব ও সুপেয় খাবার পানির সংকট প্রায় সারা বছর লেগেই থাকে।
বর্মন পল্লীতে সরকারের নানা সুবিধা প্রদানে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে রানীশিমুল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাসুদ রানা জানান, এসব আমার জানা ছিলো না। যারা বয়স্ক-বিধবা ভাতার কার্ড পায়নি তাদের শিগগিরই কার্ড প্রদানের ব্যবস্থা করব।
এদিকে কয়েক বছর আগে বর্মন পল্লীর নিতাই বর্মনের বড় ছেলে প্রদীপ বর্মন (১৫) হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের প্রায় বছরখানেক পেরিয়ে গেলেও তার সন্ধান বের করতে পারেনি তার। ওই ঘটনার পর থেকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বর্মন পল্লীর বাসিন্দারা। এতে সামাজিকভাবেও সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছেন তারা। দারিদ্র্যতার কষাঘাতে নিষ্পেষিত বর্মন পল্লীতে কোন শ্মশান ঘাট না থাকায় কেউ মারা গেলে তার লাশ সৎকার করা কঠিন হয়ে পড়ে। পোহাতে হয় ভোগান্তি। তাই ভুক্তভোগী বর্মন সম্প্রদায়ের দাবি, তাদের প্রতি বৈষম্য নিরসনের পাশাপাশি সরকারিভাবে যেন একখণ্ড জমি শ্মশানের জন্য দ্রুত বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা হয়।
এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতি ও প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এডভোকেট রফিকুল ইসলাম আধার বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গঠনের ক্ষেত্রে সকল জাতিসত্তার সার্বিক উন্নয়নে নানামুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু স্থানীয় দায়িত্বশীলদের উদাসিনতায় সেসকল বাস্তবমুখী উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ছোঁয়া লাগেনি অবহেলিত এ অঞ্চলের বর্মন পল্লীতে। তাই বর্মনদের অধিকার আদায়ে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের সার্বিক উন্নয়নে সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণ অপরিহার্য। এছাড়া বর্মনদের অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা, নেতৃত্বের বিকাশ, শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে নিতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা আক্তার জানান, আমি কিছুদিন আগে শ্রীবরদীর দায়িত্ব নিয়েছি। আমি এ বিষয়ে তেমন অবগত ছিলাম না। আমি ওই ইউনিয়নের ‘বর্মন পল্লী’ পরিদর্শন করে এসব বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেবো।

Print Friendly, PDF & Email
এ সংক্রান্ত আরও খবর

সর্বশেষ খবর



অন্যান্য খবর



সম্পাদক-প্রকাশক : রফিকুল ইসলাম আধার
উপদেষ্টা সম্পাদক : সোলায়মান খাঁন মজনু
নির্বাহী সম্পাদক : মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১ : ফারহানা পারভীন মুন্নী
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : আলমগীর কিবরিয়া কামরুল
বার্তা সম্পাদক-১ : রেজাউল করিম বকুল
বার্তা সম্পাদক-২ : মোঃ ফরিদুজ্জামান।
যোগাযোগ : সম্পাদক : ০১৭২০০৭৯৪০৯
নির্বাহী সম্পাদক : ০১৯১২০৪৯৯৪৬
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-১: ০১৭১৬৪৬২২৫৫
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক-২ : ০১৭১৪২৬১৩৫০
বার্তা সম্পাদক-১ : ০১৭১৩৫৬৪২২৫
বার্তা সম্পাদক -২ : ০১৯২১-৯৫৫৯০৬
বিজ্ঞাপন : ০১৭১২৮৫৩৩০৩
ইমেইল : shamolbangla2013@gmail.com.

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত । ওয়েবসাইট তৈরি করেছে- BD iT Zone

error: Content is protected !!