প্রকাশকাল: 2 ফেব্রুয়ারী, 2019

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাজার পাহাড়

হতে পারে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র

রেজাউল করিম বকুল, শ্রীবরদী (শেরপুর) ॥ পাহাড় আর নদী ঘেরা অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি ‘রাজার পাহাড়’ এখন ক্রমেই হয়ে উঠছে সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী মেঘালয় ঘেঁষা অবারিত সবুজের সমারোহে রাজার পাহাড়ের অবস্থান। এখানে ছোট বড় অসংখ্য টিলা। কত যে মনোমুগ্ধকর না দেখলে হয়তোবা বিশ্বাস হবে না। যারা একবার দৃশ্যগুলো অবলোক করেছেন তারাই অনুভব করেছেন। এটি গারো পাহাড়ের অন্যতম আকর্ষনীয় সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র রাজার পাহাড়। একবার এলে বার বার আসতে মনকে নাড়া দেবে। প্রায় দেড়শ ফুট উচুঁ টিলা। সেখান থেকে দেখা যায় মেঘালয়ের অনেক কিছু। প্রতিদিন এখানে ভ্রমণপিপাসু শতশত মানুষের সমাগম ঘটে। জমে ওঠে রাজার পাহাড়। শেরপুর জেলা ব্র্যান্ড ‘তুলসিমালার সুগন্ধে পর্যটনের আনন্দে’। এ ব্র্যান্ডের নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে রাজার পাহাড়।
সেখানকার বাসিন্দারা জানান, এ পাহাড় নিয়ে রয়েছে কিংবদন্তি। প্রাচীনকালে সম্ভ্রান্ত রাজবংশের জনৈক এক রাজার অবস্থান ছিল এখানে। তার নামেই এখানকার নাম হয় রাজার পাহাড়। রাজার পাহাড়ের আগের সৌন্দর্য নেই। তবে এর বৈশিষ্ট আলাদা। প্রতিবেশি পাহাড়গুলোর তুলনায় ব্যতিক্রমী। এখানে অনেক পাহাড়ের মধ্যে রাজার পাহাড়ের উচ্চতা সবচেয়ে বেশি। এর চূড়ায় শতাধিক হেক্টর ভূমি সমতল। সবুজ আর নীলের সংমিশ্রণ। যেন মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মনে হবে আকাশ ছোঁয়া বিশাল পাহাড়। এর নৈসর্গিক দৃশ্য মনকে করে আবেগ তাড়িত। প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠেছে এ পাহাড়। শীতকালে প্রতিদিন ভিড় হয় শতশত মানুষের। পরিবেশ হয়ে ওঠে কোলাহলপূর্ণ। এটি পর্যটন কেন্দ্র হলে ভ্রমণপিপাসুদের চাহিদা পূরণে যোগ হবে নতুন মাত্রা। দেশের পর্যটন শিল্প উন্নয়নের তালিকায় আসবে রাজার পাহাড়। এখান থেকে আয় হবে বছরে লাখ লাখ টাকা। প্রতিবেশি গ্রামের বেকারদের জন্যে হবে কর্ম সংস্থানের নতুন পথ। দেশি বিদেশী পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হবে রাজার পাহাড়। সম্প্রতি সরেজমিন গেলে কথা হয় এলাকাবাসী, ভ্রমণ পিপাসু, পর্যটক, স্থানীয় জনপ্রনিধি ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন সূত্রের সাথে। তারা তুলে ধরেন এমনই চিত্র।
বইছে ফাল্গুনী হাওয়া। মনটাও যেন উরু উরু। চলোনা ঘুরে আসি। কোথায়? রাজার পাহাড়ে। এমনটা যারা ভাবছেন, তারা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসতে পারেন নির্জনে। মেটাতে পারেন ভ্রমন পিপাসা। অনেক উৎসুক মানুষ আসেন। এটি শেরপুরের শ্রীবরদী পৌর শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে রাজার পাহাড়। এটি মানুষের জন্য বিনোদন স্পট হিসেবে পরিচিত। শীত এলেই শহর থেকে রাজার পাহাড়ের নির্মল পরিবেশে বেড়াতে আসে অনেকে। পাশে আদিবাসী জনপদ বাবেলাকোনা। যেন অসংখ্য উঁচু টিলায় ঘেরা অন্যবদ্য গ্রাম। প্রাচীন কাল থেকে এখানে গড়ে ওঠেছে জনবসতি। ঝোঁপ-জঙ্গঁলে আবৃত্ত গ্রামটি কালের আবর্তনে পরিচিত। আজ প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত সবার কাছে পরিচিত রাজার পাহাড়। ১৯৮০ সালে পাগলা দারোগা নামে জনৈক এক ব্যক্তি রাজার পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করেন। তিনি মারা গেছেন। তার ছেলে মেয়েরা রয়েছে এখানেই্। টিলার এক কোনায় গড়ে তুলেন কাঠাল , লিচু ও কলার বাগান। অপূর্ব সৌন্দর্যম-িত রাজার পাহাড়ের চারিদিকে আছে হরেক রকম প্রজাতির গাছ গাছালি। এর চূড়ায় বিশাল সমতল ভূমি। এখানে যেতে সরু পথ আর অদ্ভুত নির্জন পরিবেশ। যাওয়ার আগেই আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
রাজার পাহাড়ের পাশেই চান্দাপাড়া ও বাবেলাকোনা গ্রাম। এখানে গারো, হাজং, কোচ অধ্যুষিত আদিবাসীদের বসবাস। এদের সংস্কৃতির ভিন্নমাত্রায় বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনধারা। প্রাকৃতিক বিরূপতা। জংঙ্গল আর জন্তু-জানোয়ারের মিতালী। যেন এ জনপদের চলমান জীবন সংগ্রামের বিরল দৃশ্য। আদিবাসীদের সংস্কৃতি, সংরক্ষন ও চর্চার কেন্দ্র বাবেলাকোনা কালচারাল একাডেমি, যাদুঘর, লাইব্রেরী, গবেষনা বিভাগ ও মিলনায়তন এর নিদর্শন। উপজাতিদের কারুকার্য মন্ডিত ধর্মীয় গীর্জা, মন্দির, উপাসনালয় ও অসংখ্য প্রাকৃতিক নির্দশনের সমাহার। এখান থেকে আদিবাসীদের সম্পর্কে জানা যায় অনেক কিছুই। মিশনারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় হচ্ছে এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আদিবাসী সম্প্রদায়ের চালচলন, কথাবার্তা, ও জীবন প্রণালী দর্শনার্থীদের আরও আকৃষ্ট করে। ওদের সংস্কৃতিতে রয়েছে ভিন্নতা। জীবন যেন প্রবাহিত ভিন্ন এক ধারায়। বর্ষাকালে কর্ণঝোড়া ঢেউফা নদীর জোয়ারে কানায় কানায় ভরে ওঠে। কিন্তু দিনের শেষে ভাটা পড়ে শুকিয়ে যায় নদীর পানি। এর বুক জুড়ে রয়েছে বিশাল বালুচর। যেটি নির্মাণ কাজে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শহরে। এটি যেন পাহাড়ের কুল ঘেঁষা বিকল্প সমুদ্র সৈকত। এ পাহাড়ের পাশে রয়েছে বিডিআর ক্যাম্প, বিট অফিস, কারিতাস ও রাবার বাগান। রাজার পাহাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখতে এসে আদিবাসীদের জীবন যাত্রার নানা দিক জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন অনেকেই। ওইসব জানতে পেরে ভ্রমণের চাওয়ার চেয়ে আরও বেশি পেয়ে যান বলে মন্তব্য করেন পর্যটকরা।
রাজার পাহাড়ের পাশেই লাউচাপড়া অবসর কেন্দ্র। রয়েছে বনফুল নামে আরেকটি ব্যক্তি মালিকানা পর্যটন কেন্দ্র। বনফুলে রয়েছে আবাসিক। রাজার পাহাড় আর গারো পাহাড়ের মনোমুগ্ধকর স্থানগুলো অবলোকনের যেন অপূর্ব সুযোগ। যা মনে আলাদাভাবে স্থান করে নিবে ভ্রমন পিপাসুদের। এখানে যেকোনা যান বাহনে আসা যায়। তাহলে আর দেরি নয়। এবারের ফাল্গুনে ঘুরে আসুন রাজার পাহাড়।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

error: Content is protected !!