শিশু শিক্ষার খাছিলত বদলাতে হবে : তালাত মাহমুদ

কোন প্রকার জবাবদিহিতা না থাকায় বাংলাদেশে শিশু শিক্ষা নিয়ে তুঘলকি কান্ড ঘটেই চলেছে। রাষ্ট্রীয় মৌলিক চাহিদা অনুযায়ী প্রত্যেক শিশুর যেমন শিক্ষা লাভের অধিকার রয়েছে তেমনি শিশু শিক্ষার উৎকর্ষ সাধনে সমাজ ও সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষা অর্জন করা প্রত্যেক শিশুর মৌলিক অধিকার। আপাতঃ দৃষ্টিতে ৪-৫ বছর বয়েসী শিশুরাই এখন স্কুলগামী। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব শিশু কোন্ স্কুলে কি অবস্থায় কি রকম পরিবেশে কেমন শিক্ষকের কাছে লেখাপড়া করছে তার সঠিক তথ্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না। একমাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিশু শিক্ষার্থীর সঠিক হিসেব পাওয়া গেলেও শিশু শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠন ব্যতীত যতগুলো প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কত সংখ্যক শিশু লেখাপড়া করছে তার সঠিক তথ্য কোথাও নেই। শিশু বলতে আমরা জানি, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
এনসিটিবি কর্তৃক বিনামূল্যে পাঠ্যবই সরবরহের জন্য সরকারি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে কতসেট বই বরাদ্দ করা হবে তার সঠিক হিসেব কিন্ডার গার্টেন স্কুল কেন্দ্রীক যেসব এসোসিয়েশন রয়েছে তাদের নিকট থেকে প্রকৃত তথ্য পাওয়া যায়নি। পক্ষান্তরে কেজি স্কুল কেন্দ্রীক কোন কোন এসোসিয়েশনের মতে সারাদেশে কেজি স্কুলের সংখ্যা ৩০ হাজার আবার কোন কোন এসোসিয়েশনের মতে ৪০ হাজার বলে জানা গেছে। (সূত্র:দৈনিক ইনকিলাব, ৮ নভেম্বর,২০০৫)।
বিভিন্ন স্তর বা মান ভেদে শিশুদের লেখাপড়ার জন্য সরকার স্বীকৃত ১১ প্রকারের প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এগুলো হলো- (ক) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, (খ) রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় (সম্প্রতি জাতীয়করণ হয়েছে), (গ) আন-রেজিস্ট্রার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, (ঘ) পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়, (ঙ) স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, (চ) কিন্ডার গার্টেন স্কুল, (ছ) এনজিও বিদ্যালয়, (জ) কমিউনিটি বিদ্যালয়, (ঝ) স্যাটেলাইট বিদ্যালয় (১ম ও ২য় শ্রেণি), (ঞ) উচ্চ মাধ্যমিক সংলগ্ন ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, (ট) উচ্চ মাধ্যমিক সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ইত্যাদি।
বাংলাদেশে প্রচলিত প্রাইভেট (কিন্ডার গার্টেন) স্কুল গুলোতে যে সব সমস্যা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ পাচ্ছে তা হলো- ক) এসব প্রতিষ্ঠান পরিবেশ সম্মত নয় এবং যত্রতত্র অস্বাস্থ্যকর ও প্রতিকুল স্থানে প্রতিষ্ঠান চালু করা। খ) শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে উচ্চহারে ভর্তি ফি ও বেতন আদায় করা। গ) অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অদক্ষ ও স্বল্প শিক্ষিত শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করানো। ঘ) ইংরেজী শিক্ষার উপর অধিক চাপ প্রয়োগ করা। ঙ) একদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালের পাঠ্যপুস্তক অন্যদিকে কেজি স্কুলের পাঠ্য পুস্তক সহ শিশু শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত পুস্তকের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া। চ) শিশুর মস্তিস্কের ধারণ ক্ষমতার বাইরে জোরপূর্বক মুখস্ত বিদ্যা সর্বস্ব করে তোলা। যে শিক্ষা পরবর্তীতে শিশুরা ভুলে যায়। (সূত্র ঃ শিক্ষা ভাবনা : তৃণমূল হতে, সরকার আবুল হোসেন প্রণীত গবেষণা গ্রন্থ, সম্পাদনা- তালাত মাহমুদ)।
যে দেশে এখনো ঝরেপড়া শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক স্থানে রয়েছে। কেজিসহ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ঝরেপড়া এসব শিশুর অধিকাংশই গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে। শিক্ষাব্যয় সামর্থের বাইরে চলে যাওয়ায় সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের অধিকাংশ সন্তান প্রাথমিক ও কেজি স্কুলে অধ্যয়ন করলেও অস্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া সাঙ্গ করে এসব শিশু কোন না কোন কোম্পানির কাজে যোগদান করে থাকে। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি, ওয়ার্কশপ, হোটেল, দোকান, গ্যারেজ, পরিবহণ ও বিভিন্ন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধির কাজে এরা যোগদান করে থাকে।
সারদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো কেজি স্কুলের ছড়াছড়ি থাকলেও সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোন নীতিমালা গ্রহণ না করায় এবং কতৃপক্ষীয় কোন কার্যক্রম পরিচালনা না করায় অধিকাংশ কেজি স্কুলের মালিকদের কাছে শিশু শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। পঁচিশ টাকার বই কিনতে হয় দেড়শ’/দু’শ’ টাকা দিয়ে! ২০/২৫ টাকার ডায়েরী কিনতে হয় একশ’ বিশ টাকায়। স্কুলের মনোগ্রাম সম্বলিত তৈরী খাতা ক্রয় করা বাধ্যতামুলক। নির্ধারিত কাপড়ের দোকান থেকে স্কুল ড্রেসের কাপড় কিনতে হবে এবং নির্ধারিত দর্জিকে দিয়ে স্কুল ড্রেস বানাতে হবে। শহরের নামিদামি কেজি স্কুলে পড়ালেখা করলেও শিক্ষার্থীদের পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা দিতে হয়- অজপাড়াগাঁর কোন অখ্যাত বিদ্যালয় থেকে। পুথি সর্বস্ব শিক্ষাদানের কারণে জিপিএ-৫ পাওয়া ৯৫% শিক্ষার্থী টেক্সস্টাইল কলেজ, মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি এমন কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি হতে পারে না।
এমনটি যাতে আর না হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেদিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে। আমরা কখনোই চাইবো না, আমাদের শিশুরা শিক্ষা প্রতিবন্ধী হয়ে বেড়ে উঠুক। শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধূলা, সাহিত্য চর্চা, সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড তথা আবৃত্তি, বিতর্ক, উপস্থিত বক্তৃতা, সংগীত ও চারুকলা ইত্যাদি ব্যাপারে দিক নিদের্শনামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। বনভোজন বা শিক্ষা সফরের ব্যবস্থা করতে হবে। বিতর্ক এবং উপস্থিত বক্তৃতার ব্যবস্থা থাকা জরুরী। কারণ শিক্ষার্থী যত মেধাবীই হোক না কেন- তার বক্তব্য উপস্থাপনায় জড়তা থাকলে ইন্টাাভিউ বোর্ডে গিয়ে প্রশ্নকর্তার প্রশ্নের জবাব জানা থাকলেও জবাব দিতে সে নার্ভাস ফিল করবে। ফলে তার ইন্টারভিউ ভাল হবে না।
কেজি স্কুলগুলোতে কম বেতনের শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। শিশু বান্ধব শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের জড়তা দূর করতে হবে। এজন্য বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতার পাশাপাশি নাটকে অভিনয় এবং আবৃত্তি ও গান গাওয়ার অভ্যাস করাতে হবে। বৃক্ষরোপণ ও বাগান করতে, বাগানের পরিচর্চা করতে শিক্ষার্থীদের মাঝে আগ্রহের সৃষ্টি করতে হবে। জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে জীব-বৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তুলতে হবে। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, আদব-কায়দা এবং সৌজন্যবোধ শিখাতে হবে। শিশুদের ভুল সংশোধন বা দোষ ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে বিবেচনা করতে হবে। তাতে যেন ইতিবাচক দিকটিই প্রাধান্য পায়। ‘জ্ঞান অর্জনের জন্য এসো, কল্যাণের জন্য বেরিয়ে যাও’- শিশুদের এমটিই শোনাতে হবে, ভাবাতে হবে।
অনেক নামিদামি কেজি স্কুলে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অধিক মেধা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয়। এতে পরীক্ষায় শতভাগ উত্তীর্ণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যায়। অথচ এসব মেধাবী শিক্ষার্থীরা যেকোন গ্রামীণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করলেও উত্তম ফলাফল লাভ করতে পারবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করা এবং সাধারণ ঘরের শিক্ষার্থীদের অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে, ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সস্টাইল ও মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করছে, এমনকি বিসিএস পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হচ্ছে।
অথচ অধিক মুনাফালোভী শিক্ষা-ব্যবসায়ীদের নির্মম আধিপত্য, স্বেচ্ছাচার আর অধিক মাত্রায় ভর্তি ফি, বেতন এবং কোচিং ফি আদায় করার ফলে শিশু শিক্ষা এখন একটি লাভজনক পন্য হিসেবে গণ্য হয়েছে। বছরের শুরুতে কেজি স্কুলে ভর্তির আহবান জানিয়ে শিক্ষার্থীদের অথবা অভিভাবকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শহরে-নগরে রঙিন পোস্টারে ছেয়ে ফেলা হয়। কেজি স্কুলের বিভিন্ন প্রকারের গুণ-কীর্ত্তণ সংবলিত লিফলেট শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাতে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। নানা রকম প্রলোভন দিয়ে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই শিশু শিক্ষার্থীরা আকৃষ্ট হয়ে প্রচার সর্বস্ব কেজি স্কুলে ভর্তি হবার জন্য বাবা-মার কাছে বায়না ধরে। ফলে ফ্রোয়েবল প্রবর্তিত শিক্ষা পদ্ধতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। এতে শিশু শিক্ষার্থীরাও প্রতারিত হয়। এটা কোনভাবেই কাম্য নয়।
১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শিশু শিক্ষার পদ্ধতি নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে গবেষণা চলেছে- তারই অন্যতম স্বার্থক পদ্ধতির নাম Kindergarten System of Education, কিন্ডার গার্টেন একটি জার্মান শব্দ। আর এর অর্থ হলো শিশু উদ্যান বা শিশু কানন। এটা ছিল দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও শিশু মনস্তত্ববিদ ফেড্রিক ফ্রোয়েবল (Fradrich Froable) এর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম। ফ্রোয়েবল ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে এ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন জার্মানীতে। তিনি শিশুদের শিক্ষা জগতকে বিদ্যালয়ের চার দেওয়ালের ঘেরাটোপ থেকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। আর এ জন্যই Kindergarten বা শিশু কানন থেকে বিদ্যালয় শব্দটি সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। ফ্রোয়েবলের শিক্ষা পদ্ধতিতে শিশুরা স্বাধীন ও আনন্দময় পরিবেশে দৈহিক ও মানসিক বিকাশ লাভ করবে। তাঁর মতে, শিশুরা হলো বাগানের ফুলের চারার মতো- তাই তাদের ফুলের মতো করেই লালন করতে হবে।
আমরা আরও জানতে পারি যে, ইতালীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মারিয়া মন্তেসরি (Maria Montessori) প্রবর্তিত ও তার নামানুসারে প্রচলিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সীমিত সংখ্যক প্রতিষ্ঠিত হলেও তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই বিশ্বব্যাপী ফ্রোয়েবলের শিক্ষা পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৯৮০’র দশকে ফ্রোয়েবলের শিক্ষা পদ্ধতিটি বাংলাদেশে ধীরে ধীরে চালু হতে থাকে এবং বর্তমানে এ শিক্ষা পদ্ধতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।
বাংলাদেশের নগর-মহানগর, জেলা-উপজেলা, পৌরসভা-ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলে-মহল্লায় অধূনা ফ্রোয়েবল প্রবর্তিত অসংখ্য কেজি স্কুলের প্রসার লাভ করেছে। তবে অতীতে এদেশের বুদ্ধিজীবীরা বিজ্ঞান সম্মত এ শিক্ষা পদ্ধতির পক্ষে মত দেননি। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেছিলেন, দারিদ্র্যপীড়িত এ দেশে এত অর্থ ব্যয়ে শিশুদের শিক্ষিত করে তোলা সব অভিভাবকের পক্ষে সম্ভব হবেনা- তখন এই পদ্ধতির শিক্ষা চালু হলে শিক্ষার হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন।
আর এখন তো রিক্সাঅলা, কুলী, মজুর, শ্রমিক, জেলে, তাঁতী থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের মানুষসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের সন্তানদের কেজি স্কুলে ভর্তি করে থাকেন। এইজন্য যে, যাতে তাদের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার ভিতটি শক্তিশালী হয়। অতীতে অভিভাবকরা আজকের মত এতটা সচেতন ছিলেন না। তাদের সন্তানরা নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে কি যাচ্ছেনা, ঠিকমত লেখাপড়া করছে কি’না- তারা খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনই মনে করতেন না। এখন প্লে-নার্সারী ক্লাশের শিশু শিক্ষার্থীদের সাথে তাদের মায়েরা পর্যন্ত স্কুলে চলে যান।
মহাকবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থ বলেছেন-ÔPygmy in size giant in thought’ অর্থাৎ ‘আকৃতিতে ক্ষুদে কিন্তু চিন্তায় দৈত্য’। শিশু সম্পর্কে এই মনস্তাত্বিক তথ্যটি আমাদের সকলেরই থাকা দরকার। এছাড়াও তাদের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, মনযোগ ও সহজাত প্রবৃত্তির উপরও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দৃষ্টি রাখতে হবে। পশ্চিমা দুনিয়ায় স্কুলে কিংবা বাসায় অভিভাবকরা শিশুদের খেলনা বিমান, খেলনা বন্দুক, বাদ্যযন্ত্র, খাতা-কলম, খেলার বল, রঙিন ছবি বা অন্যান্য খেলনা সামগ্রী দেওয়া হয়। এসব খেলার সামগ্রীর মাঝে যেটি তার বেশি ভাল লাগেÑযে খেলনার প্রতি সে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট বা মনযোগী হয়, সে বিষয়ে তাকে তার শৈশব থেকেই রপ্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া হয়। ফলশ্রুতিতে সে শিশুটি ভবিষ্যতে বড় হয়ে তার পছন্দের পেশা বেছে নিতে সক্ষম হয়। সে তার জীবনে সাফল্য লাভ করে। কাজেই আমাদের শিশুদের নিয়েও ভাবতে হবে। তাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তার ভালমন্দ, পছন্দ-অপছন্দ, মনযোগ আর তার দৃষ্টিভঙ্গিকে মূল্যায়ণ করতে হবে।
আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকরা অনেক সময় শিশুদের রূঢ় আচরণ করে থাকেন; এতে শিশুর সুকোমল সূক্ষ্ম সুকুমার হৃদয় আহত হয়। শিশুর মনে নতুন নতুন বিষাক্ত প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন হয়। যে কারণে সে শিশু তার শিক্ষক বা তার অভিভাবকের (পিতা-মাতা) প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে উঠে। তার মাঝে এক ধরণের ঘৃণাবোধ জন্ম নেয় অথবা তাৎক্ষণিক অবহেলা, অনাদর আর ভীতির কারণে সে শিশুটির মাঝে চিত্তবৈকল্যতা দেখা দিতে পারে। সে অমনযোগী হয়ে উঠতে পারে। মানুষের জীবনে মানসিক সমস্যা একটি জটিল উপসর্গ। এই উপসর্গ কোন না কোন মানসিক আঘাত থেকেই সৃষ্টি হয়। শিশু যতবড় ভুল বা অপরাধই করুক না কেন; তাকে শিশুসুলভ শাসনই করতে হবে। শিশুর সাপথে মার্জিত ভাষায় আদর সোহাগ মিশ্রিত আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবেÑ ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুদের অন্তরে’।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন তার পুত্রের স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেনÑ যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিক মর্যাদা লাভ করে। চিঠিটি নিম্নরূপ ছিলÑ
মাননীয় মহাশয়,
আমার পুত্রকে জ্ঞানার্জনের জন্য আপনার কাছে প্রেরণ করলাম। তাকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন, এটাই আপনার কাছে আমার বিশেষ দাবি।
আমার পুত্রকে অবশ্যই শেখাবেনÑ সব মানুষই ন্যায়পরায়ণ নয়, সব মানুষই সত্যনিষ্ঠ নয়। তাকে এও শেখাবেন, প্রত্যেক বদমায়েসের মাঝেও একজন বীর থাকতে পারে, প্রত্যেক স্বার্থপর রাজনীতিকের মাঝেও একজন নিঃস্বার্থ নেতা থাকে। তাকে শেখাবেন, পাঁচটি ডলার কুড়িয়ে পাওয়ার চেয়ে একটি উপার্জিত ডলার অধিক মুল্যবান। এও তাকে শেখাবেন, কিভাবে পরাজয়কে মেনে নিতে হয় এবং কিভাবে বিজয়োল্লাস উপভোগ করতে হয়। হিংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষাও তাকে দেবেন। যদি পারেন নীরব হাসির গোপন সৌন্দর্য তাকে শেখাবেন। সে যেন আগে ভাগেই এ কথা বুঝতে শেখে- যারা পীড়নকারী তাদেরকেই সহজে কাবু করা যায়। বইয়ের মাঝে কি রহস্য লুকিয়ে আছে, তাও তাকে বুঝতে শেখাবেন।
আমার পুত্রকে শেখাবেন, বিদ্যালয়ে নকল করার চেয়ে অকৃতকার্য হওয়া অনেক বেশি সম্মানজনক। নিজের উপর তার যেন সুমহান আস্থা থাকে, এমনকি সবাই যদি সেটাকে ভুলও মনে করে। তাকে শেখাবেন, ভদ্র-লোকের প্রতি ভদ্র আচরণ করতে, কঠোরদের প্রতি কঠোর হতে। আমার পুত্র যেন এ শক্তি পায়Ñহুজুগে মাতাল জনতার পদাঙ্ক অনুসরণ না করার। সে যেন সবার কথা শোনে এবং তা সত্যের পর্দায় ছেঁকে যেন ভালোটাই শুধু গ্রহণ করে Ñ এ শিক্ষাও তাকে দেবেন।
সে যেন শিখে দুঃখের মাঝে কিভাবে হাসতে হয়। আবার কান্নার মাঝে লজ্জা নেই, এ কথা তাকে বুঝতে শেখাবেন। যারা নির্মম তাদেরকে যেন ঘৃণা করতে শেখে আর অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ থেকে সাবধান থাকে।
আমার পুত্রের প্রতি সদয় আচরণ করবেন কিন্তু সোহাগ করবেন না; কেননা আগুনে পুড়েই ইস্পাত খাঁটি হয়। আমার সন্তানের যেন অধৈর্য হওয়ার সাহস না থাকে, থাকে যেন সাহসী হওয়ার ধৈর্য। তাকে এ শিক্ষাও দেবেনÑ নিজের প্রতি তার যেন সুমহান আস্থা থাকে আর তখনই তার সুমহান আস্থা থাকবে মানব জাতির প্রতি।
ইতি
আপনার বিশ্বস্ত
আব্রাহাম লিঙ্কন।
সন্মানিত শিক্ষকবৃন্দের মাঝে যারা আব্রাহাম লিঙ্কনের এই চিঠিটি এখনও পড়েননিÑ তাদেরকে পড়তে অনুরোধ করছি। শুধু পড়তে নয়, চিঠিটি মুখস্ত, ঠোঁটস্থ ও কণ্ঠস্থ করতেও অনুরোধ জানাচ্ছি। কারণ শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর এই মেরুদণ্ড নির্মাতা আপনারা। ভবিষ্যতে বিশ্ববাসী বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত দেশ হিসেবে দেখতে চায়। এখন তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। উন্নয়নের পূর্বশর্তই হচ্ছে শিক্ষা। জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব আপনাদের। শিক্ষার্থীদের মুখস্ত বিদ্যা শিখিয়ে জিপিএ-৫ পাইয়ে দিলে যে সেটাকে শিক্ষিত বলা যায় নাÑ সেটা তো আপনারা ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ইংরেজিতে অনার্স ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল দেখেই বুঝেছেন। হাজার হাজার জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি অনার্স ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাত্র ২জন উত্তীর্ণ হয়েছে। বাকিরা সবাই ফেল।
শিক্ষার্থীদের মাঝে তিন শ্রেণীর শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা খুবই মেধাবী এবং পরিশ্রমী। কিন্তু চন্দ্র-সূর্যের সাথেও তাদের সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বুদ্ধিমান। তবে লেখপড়ার পাশাপাশি বাইরের সমস্যাও তাদের আকৃষ্ট করে। এদেরকেই আদর্শ ছাত্র বলা হয়। আর তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা বোকাটে প্রকৃতির হয়ে থাকে। এরা কোন বিষয়ে সঠিক ধারণা বা জ্ঞান লাভ করতে পারে না। আর এরাই আমাদের সামাজিক সমস্যা। এদের পিছনে শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশী সময় দেওয়া উচিত। কিন্তু ভাল স্কুলগুলোতে এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগই দেওয়া হয় না। অভিভাবকরাও এদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশায় ভোগেন।
প্রতিটি মানব শিশু জ্ঞান অর্জনের জন্য সহজাত প্রবৃত্তি নিয়েই জন্ম গ্রহণ করে। পারিবারিকভাবে এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষক তার সে সহজাত সুপ্ত সুকুমার বৃত্তিকে বিকশিত করে থাকেন। গ্রীক দার্শনিক প্লেটো এবং এরিষ্টটল শিশু শিক্ষা বিষয়ে যে মতামত ব্যক্ত করেছেন, আজ পর্যন্ত সে ধারণার পুনঃআবিস্কার ও পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। প্লেটোর মতে, শিশুরা শিক্ষা গ্রহণের জন্য জন্মগত মেধা নিয়েই জন্মায়। সমাজের কর্তব্য হচ্ছে সে প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা। এরিষ্টটল শিশুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করার উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বর্তমানে আধুনিক শিক্ষা বিজ্ঞানীরাও প্লেটো ও এরিষ্টটলের সে ম্যাথগুলোর উপর নির্ভর করেই গবেষণা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
পাশ্চাত্যের মনোবিজ্ঞানীরা ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে গবেষণা চালিয়ে তাদের (প্লেটো ও এরিষ্টটল) গবেষণায় অর্জিত ফলাফলের অনুসারী হয়ে উন্নত শিক্ষা পদ্ধতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের অনেক দেশই কাঙ্খিত ফলাফল অর্জনে সক্ষম হয়েছে। শিশু মনোবিজ্ঞানী প্যাস্টালোজী, সিসমুন্ড, ফ্রোয়েড, কার্ল জং, জ্যাপিয়াজে, মারিয়া মন্তেসরি ও ফ্রোয়েবল’ এর প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম ও শিক্ষা পদ্ধতি বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করে; ঔপনিবেশিক আমলের সনাতন পদ্ধতির শিক্ষা ব্যবস্থা পরিহারের মধ্য দিয়েই কেবল সম্ভব শিক্ষার সাফল্য অর্জন করা।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

অবাধে মাছ নিধন অমানবিক নির্যাতনে শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা আহত ইয়াবা উদ্ধার উড়াল সড়ক খুন গাছে বেঁধে নির্যাতন গাছের চারা বিতরণ ঘূর্ণিঝড় 'কোমেন' চাঁদা না পেয়ে স্কুলে হামলা ছিটমহল জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় শোক দিবস জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ ঝিনাইগাতী টেস্ট ড্র ড. গোলাম রহমান রতন পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত প্রত্যেক বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বন্যহাতির তান্ডব বন্যহাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত বাল্যবিয়ের হার ভেঙে গেছে ব্রিজ মতিয়া চৌধুরী মাদারীপুর মির্জা ফখরুলের মেডিকেল রিপোর্ট রিমান্ডে লাশ উদ্ধার শাবলের আঘাতে শিশু খুন শাহ আলম বাবুল শিশু রাহাত হত্যা শেরপুর শেরপুরে অপহরণ শেরপুরে বন্যা শেরপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংঘর্ষে নিহত ৫ স্কুলছাত্র রাহাত হত্যা স্কুলছাত্রী অপহরণ হাতি বন্ধু কর্মশালা হুইপ আতিক হুমকি ২ স্কুলছাত্রী হত্যা
error: Content is protected !!