প্রকাশকাল: 12 জুন, 2018

পূণ্যময় রজনী শবে ক্বদর : ড. আবদুল আলীম তালুকদার

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও আমাদের দ্বার প্রান্তে সমাগত পবিত্র রজনী শবে ক্বদর; যা পবিত্র রমজানুল কারীমের শেষ ১০ দিনের যে কোনো দিন রাতে সংঘটিত হয়ে থাকে। শবে ক্বদর শব্দটি মূলত ফারসি শব্দ থেকে উৎকলিত। আর আরবিতে বলা হয় লাইলাতুল ক্বদর। ‘শব’ অর্থ রাত, আর আরবি ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থও রাত বা রজনী। ক্বদর অর্থ অতিশয় সম্মানিত, মহিমান্বিত। সুতরাং লাইলাতুল ক্বদরের অর্থ সম্মানিত রজনী বা মহিমান্বিত রজনী।
কয়েক শতাব্দী মুঘল শাসন এবং এ উপমহাদেশে ফারসি রাজকীয় ভাষার প্রচলন থাকার কারণে ধর্ম, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিচার-আচারের কার্যে ব্যবহৃত বহু ফারসি শব্দ আমাদের সংস্কৃতির সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। ‘সালাতে’র পরিবর্তে নামায, ‘সাওমে’র পরিবর্তে রোযার মতো ‘লাইলাতুল ক্বদর’ এর ফারসি পরিভাষা ‘শবে ক্বদর’ সাধারণ মানুষের কাছে তাই বেশি পরিচিতি লাভ করেছে।
পবিত্র কুরআন ও সহীহ্ হাদীস দ্বারা লাইলাতুল ক্বদরের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘শবে বরাত’ নিয়ে এবং ‘শবে বরাতে’র হাদীসগুলোর বর্ণনা নিয়ে হাদীস বিশেষজ্ঞ ও ফকীহ্দের মধ্যে যে সংশয় রয়েছে, লাইলাতুল ক্বদরের ব্যাপারে তার কোন বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। পবিত্র কুরআন, নির্ভরযোগ্য হাদীস এবং রাসূলুল্লাহ্ (স.)’র লাইলাতুল ক্বদরের জন্য গৃহীত কর্মতৎপরতা লাইলাতুল ক্বদরের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পূর্ববর্তী নবী এবং তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করার কারণে বহু বছর আল্লাহর ইবাদাত করার সুযোগ পেতেন। কিন্তু মহানবী (স.) এবং তাঁর উম্মতের আয়ু অনেক কম হওয়ায় তাদের পক্ষে আল্লাহর ইবাদত করে পূর্ববর্তীদের সমকক্ষ হওয়া কিছুতেই সম্ভবপর নয়। সাহাবায়ে কিরামগণের এ আক্ষেপের প্রেক্ষিতে তাদের চিন্তা দূর করার জন্য আল্লাহ্ পাক সূরা ক্বদর নাযিল করেন।
এ সম্মানিত রজনীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ পাক সূরা ক্বদরে ইরশাদ করেন, ‘আমি এ (কুরআনকে) ক্বদরের রাতে নাযিল করেছি। তুমি কী জান, ক্বদরের রাত কি? ক্বদরের রাত হাজার মাস হতেও উত্তম-কল্যাণময়’। এ রাতটি কোন মাসে? এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ্ তায়ালা সূরা বাক্বারায় বলেন,‘রমযান এমন মাস যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে’। এ রাতটি রমযানের কোন তারিখে? রাসূলুল্লাহ্ (স.) একটি রহস্যময় কারণে তারিখটি সুনির্দিষ্ট করেননি। ইমাম বুখারী (র.), ইমাম মুসলিম (র.), ইমাম আহমদ (র.) ও ইমাম তিরমিযী (র.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা.) বলেছেন, ক্বদরের রাতকে রমযানের শেষ ১০ রাতের কোনো বেজোড় রাতে খোঁজ কর’। অবশ্য কোনো কোনো ইসলামী মনীষী নিজস্ব ইজতিহাদ, গবেষণা, গাণিতিক বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যমে রমযানের ২৭ তারিখের রাতে (অর্থ্যাৎ ২৬ রোযার দিবাগত রাতে) শবে ক্বদর সংঘটিত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (স.) এটাকে সুনির্দিষ্ট করেননি বরং কষ্ট করে খুঁজে নিতে বলেছেন।
এ রাতের অন্যতম প্রধান গুরুত্ব হলো, এ পবিত্র রাতেই কুরআন নাযিল হয়েছে। আর এ কুরআনের সাথেই মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে। এ জন্য ক্বদরের আর একটি অর্থ হলো- ভাগ্য। তাহলে লাইলাতুল ক্বদরের অর্থ হয় ভাগ্য রজনী। যে মানুষ, যে সমাজ, যে জাতি কুরআনকে বাস্তব জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করবে তাঁরা পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে সম্মানিত হবে। এ রাতে নাযিলকৃত কুরআনকে যারা অবহেলা করবে তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এ রাতেই মানব কল্যাণে আল্লাহ্ মানুষের জন্য চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত ফেরেশ্তাদের জানান। মহান আল্লাহ্ পাক সূরা দু’খানে ইরশাদ করেন, ‘এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুদৃঢ় ফয়সালা জারি করা হয়।’ মহান আল্লাহ পাক সূরা ক্বদরে আরও বলেন, ‘ফেরেশতারা ও রূহ্ (জিব্রাইল আ.) এ রাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে সব হুকুম নিয়ে অবতীর্ণ হয়, যে রাত পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার; যা ফযর উদয় হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকে।’
মুসনাদে আহমদ গ্রন্থে হযরত ওবায়দা ইবনে সামিত (রা.) হতে বর্ণিত হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে- ‘নবী করীম (স.) বলেছেন, ক্বদরের রাত রমযান মাসের শেষ ১০ রাতে রয়েছে। যে ব্যক্তি উহার শুভ ফল লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, আল্লাহ্ পাক তার আগের পিছনের গুণাহ্ সমূহ মাফ করে দিবেন।
নবী করীম (স.) রমযানের শেষ ১০ দিন মসজিদে ই’তিকাফে থাকতেন এবং ইবাদতে গভীর মনোনিবেশ করতেন। কাজেই আমরা কোনো একটি বিশেষ রাতকে নির্দিষ্ট না করে হাদীস অনুযায়ী অন্তত রমযানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল ক্বদরের সৌভাগ্য লাভের আশায় ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হই। রাসূল (স.) বলেন,- ‘যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত হতে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না (মিশকাত)।
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর বর্ণনা মতে, শবে বরাতে আল্লাহ্ এক বছরের জন্য বান্দার রুজি-রিযিক, হায়াত-মউত ও অন্যান্য তক্দীরি ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন। আর শবে ক্বদরে সে সকল সিদ্ধান্তের প্রয়োগ ও রুজি-রিযিক প্রভৃতি সরবরাহের দায়িত্ব আল্লাহ্ ফেরেশতাদের দিয়ে দেন (কুরতুবী)।
মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতেম (র.) ইমাম মুজাহিদ (র.) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (স.) একদিন সাহাবায়ে কিরামদের বৈঠকে বনী ঈসরাইলের এক মুজাহিদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি এক হাজার মাস নিরবিচ্ছিন্নভাবে আল্লাহর সাধনায় লিপ্ত ছিলেন। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কিরামের আফ্সোস হয় যে, এক হাজার মাস অর্থাৎ তিরাশি বছর চার মাস তো এ যুগের অনেকে জীবনও পায় না। তাই হযরত মুসা (আ.) এর উম্মত বনী ঈসরাইলের মতো এতো অধিক সাওয়াব লাভের অবকাশও উম্মতে মুহাম্মদী (স.) এর নেই। সাহাবায়ে কিরামের এ আফ্সোস-অনুশোচনাকালে হযরত জিব্রাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ হতে কুরআন মজীদের সূরা ক্বদর নিয়ে রাসূল (স.) এর কাছে আগমন করেন।
ইসলামী শরীয়াহ্ অনুযায়ী শবে ক্বদরের রাতে ফেরেশ্তারা ও তাদের নেতা জিব্রাইল (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করে উপাসনারত সব মানুষের জন্য দু’আ করতে থাকেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, শবে ক্বদরে হযরত জিব্রাইল (আ.) ফেরেশ্তাদের বিরাট একটি দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাযরত অথবা যিকিরে মশ্গুল থাকে তাঁদের জন্য রহমতের দু’আ করেন (মাযহারী)।
রাসূল (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সাওয়াবের আশায় শবে ক্বদরে রাত জাগরণ করে নফল নামায ও ইবাদাত-বন্দেগী পালন করবে তার পূর্বেও সকল সগীরাহ্ গুণাহ্ মাফ করে দেয়া হবে।
শবে ক্বদরের রাতে নূন্যতম ৮ রাকায়াত থেকে শুরু করে সম্ভব যত রাকায়াত নামায আদায় করা যায় ততই উত্তম। এ জন্য সাধারণ সুন্নত নামাযের নিয়মে দু রাকায়াত নফল নামাযের নিয়্যত করছি বলে নামায শুরু করে যথারীতি শেষ করতে হবে। এ জন্য সূরা ফাতিহার সাথে জানা যে কোনো সূরা মিলালেই চলবে। এছাড়াও এ রাতে সালাতুত্ তাওবা, সালাতুল্ হাযত, সালাতুত্ তাসবীহ্ নামাযও আদায় করা যেতে পারে। রাতের শেষভাগে কমপক্ষে ৮ রাকায়াত তাহাজ্জুদের নামায আদায় করা উত্তম। কারণ এ নামায সর্বশ্রেষ্ঠ নফল ইবাদাত। আর রাতের এ অংশ দুআ কবুলের উত্তম সময়।
পরিশেষে, মহান আল্লাহ্ পাকের কাছে প্রার্থনা তিনি যেন আমাদেরকে তার ইবাদাতগুলো সঠিকভাবে পালন করার এবং শবে ক্বদরের পবিত্রতা রক্ষা করার তৌফিক দান করেন।
লেখক: কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সহকারী অধ্যাপক, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর। ই-মেইল : dr.alim1978@gmail.com 

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

অবাধে মাছ নিধন অমানবিক নির্যাতনে শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা আহত ইয়াবা উদ্ধার উড়াল সড়ক খুন গাছে বেঁধে নির্যাতন গাছের চারা বিতরণ ঘূর্ণিঝড় 'কোমেন' চাঁদা না পেয়ে স্কুলে হামলা ছিটমহল জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় শোক দিবস জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ ঝিনাইগাতী টেস্ট ড্র ড. গোলাম রহমান রতন পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত প্রত্যেক বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বন্যহাতির তান্ডব বন্যহাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত বাল্যবিয়ের হার ভেঙে গেছে ব্রিজ মতিয়া চৌধুরী মাদারীপুর মির্জা ফখরুলের মেডিকেল রিপোর্ট রিমান্ডে লাশ উদ্ধার শাবলের আঘাতে শিশু খুন শাহ আলম বাবুল শিশু রাহাত হত্যা শেরপুর শেরপুরে অপহরণ শেরপুরে বন্যা শেরপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংঘর্ষে নিহত ৫ সোমেশ্বরী নদীর বেড়িবাঁধে ভাঙ্গন স্কুলছাত্র রাহাত হত্যা স্কুলছাত্রী অপহরণ হাতি বন্ধু কর্মশালা হুমকি ২ স্কুলছাত্রী হত্যা
error: Content is protected !!