জগৎপুর গণহত্যার ক্ষরণ : শতবর্ষী শহীদ জননী জ্যোতি রাণীর ভাগ্যে জুটেনি বয়স্ক ভাতাও

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শেরপুর অঞ্চলের ভয়াল স্মৃতি হয়ে থাকা জায়গাগুলোর এক অন্যতম নাম ‘জগৎপুর’; এক ইতিহাস ‘জগৎপুর গণহত্যা’। একাত্তরের ৩০ এপ্রিল ঝিনাইগাতী উপজেলার নিভৃত ছায়া-সুনিবিড় ওই প্রত্যন্ত পল্লী জগৎপুরে অতর্কিতে হামলে পড়ে পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা। তাদের নির্বিচারে চালানো গুলিতে সেদিন শহীদ হন ৩৫ গ্রামবাসীসহ ওই গ্রামে আশ্রয় নেওয়া শতাধিক নিরীহ মানুষ। একইসাথে আহত হয় আরও অর্ধশতাধিক মানুষ। জ্বালিয়ে দেওয়া হয় জগৎপুর গ্রাম। এতে ২শ’রও বেশি বাড়ি-ঘর পুড়ে ভষ্ম হয়।
জগৎপুরে পাকহানাদার বাহিনীর সেই হামলার দগদগে স্মৃতি বয়ে বেড়ানো এক শহীদের জননী জ্যোতি রাণী দে (১০০)। ৩০ এপ্রিল সকালে ভাত রেধে পাটশাক ভাঁজছিলেন হতদরিদ্র পরিবারের গৃহিণী জ্যোতি রাণী দে। এরই মাঝে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জ্যেষ্ঠ পুত্র ভজন চন্দ্র দে (১৪) বাড়ির বাহির আঙিনা থেকে দৌড়ে গিয়ে মাকে জানায় গুলি চালাতে চালাতে পাক সেনাদের এগিয়ে আসার কথা। অবস্থা দেখে বাড়িতে ছুটে আসেন গৃহকর্তা তরুণী কান্তি দে’ও। কিন্তু ততক্ষণে রক্ষা নেই। ভজনের ছুটাছুটিতে চটে যায় পাক সেনাদের কয়েকজন। পিতা তরুণী ও মাতা জ্যোতির আকুতি-মিনতি কেবল উপেক্ষা করেই নয়, তরুণীকে লাথিতে ও জ্যোতিকে রাইফেলের বাটে আঘাত করে মাটিতে লুটিয়ে দিয়ে তাদের সামনেই ভজনকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে তারা। অন্যদের মতো ভজনেরও ঠাঁই হয় গণকবরে। এরপর অবস্থা বেগতিক দেখে কোলের শিশুপুত্র শংকর চন্দ্র দে’কে নিয়ে অন্যদের মতো এলাকা ছাড়ে তারাও।
স্ব^াধীনতার দীর্ঘ ৪৭ বছর পরও সেই জগৎপুরে আজও যেমন নির্মিত হয়নি শহীদদের কোনো স্মৃতিফলক এবং পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি শহীদদের গণকবর সংরক্ষণের, ঠিক তেমনি এখনও সঠিক তালিকা হয়নি সেখানকার শহীদদের। ফলে মেলেনি শহীদদের স্বীকৃতিও। ‘শেখের বেটি শেখ হাসিনা’ ক্ষমতায় থাকায় ওইসবের বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখে আসছিলেন শতবর্ষী শহীদ জননী জ্যোতি রাণী দে। তার সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হলেও ‘জগৎপুর গণহত্যা’য় শহীদদের স্মরণে মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণে এগিয়ে যাওয়ায় তিনি বেজায় খুশি।
কিন্তু বয়সের ভারে নূব্জ হওয়া শহীদ জননী জ্যোতি রাণীর দিনমানের অবস্থা একেবারেই নাজুক। জগৎপুরে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, জ্যোতি রাণী স্বামীকে হারিয়েছেন অনেক আগেই। যুদ্ধে কোলে নিয়ে পালিয়ে রক্ষা করা দ্বিতীয় পুত্র সন্তানটি বিয়ের পর সন্তান-সন্ততি হলেও সংসার চলে দৈন্যদশায়। ভিটেবাড়ি ছাড়া কোনোমতন খাওন-দাওন জুটলেও চলাফেরাই তার দারুণ কষ্ট। কারণ সাহায্য ছাড়া কোনোভাবেই দাঁড়ানো ও হাঁটাচলা করতে পারেন না তিনি। পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিরা সহযোগিতা করলেও অধিকাংশ সময় তাকে এক হাতে সহায়ক লাঠি, অন্যহাতে ক্র্যাচ নিয়েই ঘর-বাহির, বাহির-ঘর হতে হয়। প্রকৃতির ডাক সারতেও তাকে পোহাতে হয় নিদারুণ কষ্ট। অথচ দারিদ্র্যক্লিষ্ট পরিবারে অনেকটা বোঝার মত হয়ে থাকা এ শতবর্ষী জ্যোতি রাণীর ভাগ্যে জুটেনি একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড। মেলেনি কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারি সহায়তায় একটি হুইলচেয়ার। গণহত্যা দিবসে জগৎপুর ঘুরে শতবর্ষী জ্যোতি রাণীকে দেখতে যান মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরের পরিচালক উৎপল কান্তি ধর, জাদুঘরের শেরপুর সদর নেটওয়ার্কের আহবায়ক সমাজসেবী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট রফিকুল ইসলাম আধার, লেখক-অধ্যাপক শিব শঙ্কর কারুয়া শিবু, জগৎপুর গণহত্যা গ্রন্থের রচয়িতা মোঃ রুকনুজ্জামান খানসহ বেশ কয়েকজন। ওইসময় জ্যোতি রাণীর দৈন্যদশায় রাজিয়া সামাদ ডালিয়া ও রফিকুল ইসলাম আধার আবেগাপ্লুত হয়ে তাকে তাৎক্ষণিক কিছু আর্থিক সহায়তা করেন। একই সময় সাথে থাকা জ্যোতি রাণীর প্রতিবেশি ও স্থানীয় শহীদ পরিবারের সদস্য শিক্ষক বিমল চন্দ্র দে বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যূষিত গ্রামটি এখনও নিদারুণ অবহেলায় রয়েছে। শতবর্ষী জ্যোতিরাণীর জন্য একটি বয়স্ক ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলামকে বার বার জানানোর পরও কোন ব্যবস্থা হয়নি। একই কথা জানান জ্যোতি রাণীকে দেখতে যাওয়া বিশিষ্ট সমাজসেবী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকে তিনি নিজেও একাধিক দফায় অনুরোধ করেছেন শহীদ জননী অশীতিপর বৃদ্ধা জ্যোতি রাণীর জন্য কিছু করতে।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ধানশাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেন, জ্যোতি রাণীকে বয়স্ক ভাতার কার্ড দিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কবে নাগাদ তিনি তা পেতে পারেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পেলেই তিনি তা পেয়ে যাবেন। কিন্তু অভিজ্ঞজনদের প্রশ্ন, সেই ‘অনুমোদন পাওয়া’র সময়টা পর্যন্ত জ্যোতি রাণী আদৌ টিকবেন তো?
-রফিকুল ইসলাম আধার, শেরপুর।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

অবাধে মাছ নিধন অমানবিক নির্যাতনে শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা আহত ইয়াবা উদ্ধার উড়াল সড়ক খুন গাছে বেঁধে নির্যাতন গাছের চারা বিতরণ ঘূর্ণিঝড় 'কোমেন' চাঁদা না পেয়ে স্কুলে হামলা ছিটমহল জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় শোক দিবস জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ ঝিনাইগাতী টেস্ট ড্র ড. গোলাম রহমান রতন পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত প্রত্যেক বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বন্যহাতির তান্ডব বন্যহাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত বাল্যবিয়ের হার ভেঙে গেছে ব্রিজ মতিয়া চৌধুরী মাদারীপুর মির্জা ফখরুলের মেডিকেল রিপোর্ট রিমান্ডে লাশ উদ্ধার শাবলের আঘাতে শিশু খুন শাহ আলম বাবুল শিশু রাহাত হত্যা শেরপুর শেরপুরে অপহরণ শেরপুরে বন্যা শেরপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংঘর্ষে নিহত ৫ সোমেশ্বরী নদীর বেড়িবাঁধে ভাঙ্গন স্কুলছাত্র রাহাত হত্যা স্কুলছাত্রী অপহরণ হাতি বন্ধু কর্মশালা হুমকি ২ স্কুলছাত্রী হত্যা
error: Content is protected !!