গ্রন্থ আলোচনা ॥ বুকের জমিনে বসতি

আলোচক : তালাত মাহমুদ

‘হরহামেশা শুনছি এখন ভাঙ্গনের সুর চারদিকে/কেউবা একা গড়তে গেলে চোখ রাঙানি তারদিকে/ভাঙছে সমাজ, পরিবারও- বিশ্বায়নের দাপটে/নীতিহীনরা দিচ্ছে তালা নীতিবানদের কপাটে/মূর্খরা আজ দিচ্ছে বয়ান বুদ্ধিজীবীর আসরে/সরকার কিংবা বিরোধীদল ঠাঁই দিচ্ছে বাসরে’। পংক্তিমালাটি লব্ধ-প্রতিষ্ঠিত কবি রবিউল আলম টুকু’র ‘বুকের জমিনে বসতি’ কাব্যগ্রন্থের ‘ভাঙ্গনের সুর’ কবিতা থেকে চয়নকৃত।
‘বুকের জমিনে বসতি’ রবিউল আলম টুকু’র প্রথম কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশকাল- ফেব্রুয়ারি, ২০১৮: প্রকাশক-মাজেদুল হাসান : জয়ন্তী : ৬৮, কনকর্ড এম্পোরিয়াম, ২৫৩-২৫৪, কুদরত-ই-খুদা রোড, কাটাবন, ঢাকা-১২০৫ : প্রচ্ছদ- আহমেদ ফারুক : পৃষ্ঠা- ৬৪ : মূল্য- ১৫০ টাকা।
বিংশ শতাব্দীর নয় দশকের কবি রবিউল আলম টুকু মূলত: নিভৃতচারী কবি। তবে তাঁর নিরীক্ষাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি প্রখর। তাঁর কবিতার আঙ্গিক ভিন্ন। অভিনবত্ব রয়েছে কবিতার বিষয় নির্বাচন ও প্রকাশভঙ্গিতে। শব্দ চয়ন, উপমা-উৎপ্রেক্ষার প্রয়োগ, ভাব-গাম্ভীর্যতা এবং কাব্যশৈলীতে তিনি সিদ্ধহস্ত। তাঁর কবিতা পড়ে বোঝার উপায় নেই যে, তিনি মফস্বলে অবস্থান করে কবিতা রচনা করছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তার স্ফুরণ এবং অবস্থিতি দিগন্ত বিস্তৃত বললে অত্যুক্তি হবে না। নদী,পাখি, মেঘ আর প্রাকৃতিক নিসর্গের মাঝে কবি বিরহ-মিলনের কথা বলেছেন, আশা-নিরাশার কথা বলেছেন, মানবতার কথা বলেছেন, রাজনীতি-অপনীতির কথা বলেছেন এবং দেশপ্রেম, নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্বের কথা বলেছেন। আসলে তাবৎ বিশ্বকে কবি তাঁর একটি ছোট্ট কবিতার মাঝে তুলে আনতে পারেন। তবে তা পাঠকের বোধগম্যে ধারণ করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
ভাঙ্গনের সুর, আমার গ্রাম, তুমি যদি চাও, নিজের ঢোল, দ্বিধা, নামেই ঢাকা, প্রেমে নয়তো বিদ্রোহ, প্রথম মৃত্যুর পর, জাতি সঙ’ঘ, অপরূপা, বঙ্গবন্ধুর মার্চ, মহাকবি মুজিব, জননেত্রী শেখ হাসিনা, সু চি হবে অসূচি, সু চিকে প্রেম প্রস্তাব, পতিতা পুরুষ, বুকের জমিনে বসতি, সময়ের সহযাত্রী, পার্বতী নয়, চন্দ্রমূখীÑ এরকম ৫১টি কবিতা রয়েছে ‘বুকের জমিনে বসতি’ কাব্যগ্রন্থে। কবিতাগুলোর শিরোনাম দেখেই অনুমিত হয়, কবি কোন্ কবিতায় কী বলতে চেয়েছেন। আলোচনার শুরুতে ‘ভাঙ্গনের সুর’ কবিতার প্রথম ৬ লাইন চয়ন করেছি কবির স্পৃহায়, নৈর্ব্যক্তিকতায়, আদর্শবোধে হতাশা, বিশ্বাসহীনতা এবং আনুগত্য না থাকার কারণটি চিহ্নিত করার প্রয়াসে। অর্থাৎ প্রচলিত ভান্ত ধারণার খোলস থেকে বেরিয়ে কবির নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করার মানসিকতাকে চিহ্নিত করা। কবিকে আবিস্কার করা। আর এখানেই তাঁর সংস্থিতি। পাশাপাশি কবিকে সমালোচনা সহ্য করার ধৈর্য ও মানসিকতা উভয়ই থাকতে হয়। সমালোচক ও পত্রিকার সম্পাদকের সাহচার্য ছাড়া বড় কবি বা বড় লেখক হওয়া যায়না। লেখনীকে শাণিত করতে কবি বা লেখককে আড্ডবাজ হতে হয়। প্রচুর পড়াশোনার পাশাপাশি পাঠককে আকৃষ্ট করার কৌশল আয়ত্ব করতে হয়।
কারণ, একজন কবি যে সময়ে, যে পরিবেশে, যে মন-মানসিকতা নিয়ে এবং যে বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে একটি কবিতা রচনা করেন; পাঠক কিন্তু সেসব ক্ষেত্র বা আধান সম্পর্কে জ্ঞাত নন। তাকে ভাবিয়ে তুলতে হয়। তাতে পাঠকের সুপ্ত চেতনাগুলোও জাগ্রত হয়ে ওঠে। তখন পাঠক কবি বা লেখক না হয়েও সমঝদার সাহিত্য সমালোচক হয়ে উঠতে পারেন।
কবিরা স্পষ্টবাদী হয়ে থাকেন এবং অপ্রিয় সত্য উক্তিটিও নির্দ্বিধায় প্রকাশ করেন । এজন্য কবিদের অনেক স্বভাব শত্রু থাকে। ক্ষেত্র বিশেষে অতি আপন স্বজনরাও কবির প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। আত্মাভিমানী কবি নিজের দুঃখ কষ্ট যাতনাকে বুকে লুকিয়ে রেখে অপরের কল্যাণে সুখ শান্তি সমৃদ্ধি ও প্রেম-ভালোবাসা এবং সৌন্দর্য ও পবিত্রতার জন্য অনাবিল আনন্দের বন্দনাগীত রচনা করে থাকেন। তবে কবি-সাহিত্যিকরা সাহিত্যের অনুশাসন মেনে চলেন না। অবশ্য আধুনিক বাংলা কবিতা এখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার; অধুনা বাংলা কবিতাকে পূর্ণাঙ্গ আধুনিক রূপ দিতে গবেষণা চলছে।
রবিউল আলম টুকু এমনি একজন সংস্কারবাদী কবি; যিনি বিভিন্ন বিষয়ের রসাস্বাদন করে তাঁর কাব্যে নানান আয়োজনের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ‘ঈদানন্দ’ কবিতায় কবি লিখেছেন-‘বনের পশুর আগে কর/মনের পশু জবাই/সাদা-কালো, ধনী-গরীব/সবাই তোমার ভাই’। ‘নেই ছন্দ অন্ত্যমিল’ কবিতায় প্রয়াত কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’কে সম্বোধন করে লিখেছেন-‘চারদিকে দেখ- শুধু লাশ আর লাশ/জীবিত অর্ধমৃত, ধর্ষিতা নয়তো বুভুক্ষু লাশ।/লাশ- শকুনের খাবলে খাওয়া কিশোরীর/লাশ- ভাইয়ের চোখের সামনে ধর্ষিতা বোনের/লাশ- জ্বলন্ত আগুনে সন্তান পুড়তে দেখা/অসহায় বাবা-মায়ের/…..দেখো কত লাশ ভাসছে নাফের লোনা জলে’……..! ‘আমি পথহারা’ কবিতায় কবি লিখেছেন-‘হে বৃক্ষ তুমি ফোটাইও না ফুল/মেলোনা আর শাখা/এই রক্ত-করবী চাইনা আমার/বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা/এ রক্তজবা চাইনা আমার/শেখ রাসেলের রক্তে রাঙা/এ শোকগীতি শোনাইও না আর/কোটি বাঙালির পাঁজর ভাঙা’। মূলত: রবিউল আলম টুক’ুর প্রতিটি কবিতাই পরখ করে যাওয়ার মতো। একবার চোখ বুলালে পুরো কবিতাই পাঠ করার আগ্রহ জাগে। যেমন ‘পতিতা পুরুষ’ বা ‘পার্বতী নয়, চন্দ্রমুখী’ কবিতা দু’টির মতো আরও কবিতা আছেÑ যা পাঠককে মোহগ্রস্ত করে তুলবে।
রবিউল আলম টুকু ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ সেপ্টেম্বর জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ি উপজেলার পরমানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম- মোঃ চাঁন মিয়া, মাতার নাম- সুফিয়া বেগম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে ¯œাতকোত্তর এই কবি শেরপুরের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আইডিয়াল প্রিপারেটরি এন্ড হাই স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক হিসাবে কর্মরত। ছোটবেলা থেকেই তিনি সাহিত্য চর্চার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নাটক রচনা ও মঞ্চস্থ করেছেন সহপাঠীদের নিয়ে। ফেসবুক গ্রুপসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখছেন। তাঁর সহধর্মিণী রোকসানা আক্তার একজন গৃহিণী। কন্যা রমা ও পুত্র রাহীকে নিয়ে তাঁর সুখের সংসার। রবিউল আলম টুক’ুর ‘বুকের জমিনে বসতি’ কাব্যগ্রন্থের প্রচ্ছদ ভালো হয়েছে। আমি কাব্যগ্রন্থটির উত্তরোত্তর বহ্লু প্রচার ও পাঠক প্রিয়তা কামনা করি।

আলোচক : সভাপতি, কবি সংঘ বাংলাদেশ।

আপনার মতামত দিন

XHTML: You can use these html tags: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

অবাধে মাছ নিধন অমানবিক নির্যাতনে শিশুর মৃত্যু আত্মহত্যা আহত ইয়াবা উদ্ধার উড়াল সড়ক খুন গাছে বেঁধে নির্যাতন গাছের চারা বিতরণ ঘূর্ণিঝড় 'কোমেন' চাঁদা না পেয়ে স্কুলে হামলা ছিটমহল জাতির জনকের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় শোক দিবস জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষার সূচি প্রকাশ ঝিনাইগাতী টেস্ট ড্র ড. গোলাম রহমান রতন পাঞ্জাবের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিহত প্রত্যেক বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রধানমন্ত্রী বন্যহাতির তান্ডব বন্যহাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে নিহত বাল্যবিয়ের হার ভেঙে গেছে ব্রিজ মতিয়া চৌধুরী মাদারীপুর মির্জা ফখরুলের মেডিকেল রিপোর্ট রিমান্ডে লাশ উদ্ধার শাবলের আঘাতে শিশু খুন শাহ আলম বাবুল শিশু রাহাত হত্যা শেরপুর শেরপুরে অপহরণ শেরপুরে বন্যা শেরপুরের নবাগত জেলা প্রশাসক শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংঘর্ষে নিহত ৫ সোমেশ্বরী নদীর বেড়িবাঁধে ভাঙ্গন স্কুলছাত্র রাহাত হত্যা স্কুলছাত্রী অপহরণ হাতি বন্ধু কর্মশালা হুমকি ২ স্কুলছাত্রী হত্যা
error: Content is protected !!